জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

খেলাপি ঋণ বেড়ে ৬ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা, অর্থনীতিকে লুটপাটমুক্ত করার তাগিদ

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫, ২২: ১৭
আজ রোববার (১৪ ডিসেম্বর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ের চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘বাংলাদেশ রিফর্ম ট্র্যাকার’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। সংগৃহীত ছবি

ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ উদ্বেগজনক হারে বেড়ে ৬ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। সামষ্টিক অর্থনীতির ঝুঁকি বিবেচনায় আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগেই আর্থিক খাতের এই অস্থিতিশীলতা দূর করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে প্রশাসনিক সংস্কার, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসন এবং ‘চামচা পুঁজিবাদ’ বা ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’ থেকে বেরিয়ে অর্থনীতিকে লুটপাটমুক্ত করার তাগিদ দিয়েছেন তাঁরা।

আজ রোববার (১৪ ডিসেম্বর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ের চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘বাংলাদেশ রিফর্ম ট্র্যাকার’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসব তথ্য ও মতামত উঠে আসে। বাংলাদেশ নাগরিক প্ল্যাটফর্ম আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।

অনুষ্ঠানে আলোচকরা জানান, গত বছরের শেষে দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল সাড়ে ৩ লাখ কোটি টাকা। কয়েক মাস আগে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকায়। বর্তমানে তা ৬ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এমন পরিস্থিতিতে আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

দেশের অর্থনীতি ও রাজনীতির আন্তঃসম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার আগে দেশে গণতন্ত্রহীনতার মধ্যে উচ্চবর্গীয় ব্যবসায়ী, আমলা ও রাজনীতিবিদদের সমন্বয়ে একটি গোষ্ঠী গড়ে উঠেছিল। তারা দেশকে সংস্কারবিরোধী অবস্থানে নিয়ে গিয়েছিল।

তিনি বলেন, ‘চক্রটি প্রতিযোগিতাপূর্ণ রাজনীতি বন্ধ করে দিয়ে দেশকে প্রতিযোগিতাহীন অর্থনীতির দিকে চালিত করেছিল। ফলে উন্নয়নের যে বয়ান তৈরি হয়েছিল, তা ছিল অতিরঞ্জিত এবং অংশগ্রহণমূলকহীন। এর ফলে একটি অলিগার্ক গোষ্ঠী বা ক্ষমতাসীন চক্রের সৃষ্টি হয়েছিল, যারা চামচা পুঁজিবাদ থেকে দেশকে লুটপাটতন্ত্রে নিয়ে যায়।’

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর যে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছি, সেখানেই চুরির মহাসাগর দেখতে পেয়েছি। সেগুলোকে পুকুর চুরিতে নামিয়ে আনাও বেশ কঠিন। আমার এক বছর সময় লেগেছে মাফিয়াদের তাড়াতে। এখন আবার নতুন নতুন মাফিয়া তৈরি হচ্ছে।’

প্রশাসনের ভঙ্গুর পরিস্থিতিতে সরকারের দায়িত্ব পালন বেশ কঠিন উল্লেখ করে উপদেষ্টা বলেন, ‘এ পরিস্থিতিতে সবার চাহিদামতো সংস্কার (রিফর্ম) করা সম্ভব নয় এত অল্প সময়ে। এ ছাড়া কাজ করতে গেলে বিভিন্ন সময় বিভিন্নজনকে ফ্যাসিবাদের দোসরের ট্যাগ দেওয়া হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশে যে শ্রম আইন হয়েছে সেটা অনেক বড় অর্জন। স্বার্থের সংঘাত বা কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্টের কারণে অনেক কিছু হয়নি। আমাদের বন্দরে ইতিমধ্যে এক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ এসেছে।’

এ সময় নির্বাচন কমিশনের সংস্কার প্রস্তাবনা নিয়ে দ্বিমত পোষণ করে এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘রিফর্ম কমিশন যে মতামত দিয়েছে, সেগুলোর সব বিষয়ে আমি একমত নই। তাদের অনেক সুপারিশই বাস্তবসম্মত নয়।’

মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি কামরান তানভিরুর রহমান বলেন, ‘রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর অবস্থাও ভালো নয়। তথ্যানুযায়ী, কিছু রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৯৭ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। পাঁচটি ইসলামি ব্যাংকের সম্পদ একত্র করে নতুন ব্যাংক করা হলেও তা যথেষ্ট নয়; আরও সংস্কার প্রয়োজন।’

বাংলাদেশে সংস্কারের বিষয়টি নতুন নয় উল্লেখ করে কামরান তানভিরুর রহমান বলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে বিরাষ্ট্রীয়করণ, ভ্যাট চালু, ভাসমান বিনিময় হারসহ নানা সংস্কার হয়েছে। তবে এবারের সংস্কারের মূল পার্থক্য হলো—এই উদ্যোগটি রাষ্ট্র নিজেই গ্রহণ করার চেষ্টা করছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘দেশ সংস্কারের বিষয়ে পুরো জাতি একমত হলেও সংস্কারের পথে সবচেয়ে বড় বাধা রাজনৈতিক এবং আমলা শক্তি। জুলাই আন্দোলন থেকে বিন্দুমাত্র শিক্ষা গ্রহণ করেনি এই দুই শক্তি। এ ছাড়া গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজেও এই ধরনের শক্তি রয়েছে।’ তিনি বলেন, সংস্কারমূলক অধ্যাদেশ জারির সময় যে প্রতিরোধ দেখা গিয়েছিল, তার উৎস ছিল প্রতিশ্রুতি ও সংকল্পের অভাব।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন সংসদ সদস্যদের (এমপি) দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট করার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, ‘এমপিদের সব কাজের এখতিয়ার দেওয়া হলে অনিয়মের ঝুঁকি বাড়ে। তাই তাঁদের দায়িত্ব ও আর্থিক ক্ষমতা পরিষ্কারভাবে নির্ধারণ করা জরুরি।’

নির্বাচন কমিশনের ওপর জনগণের আস্থা ফেরানোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মন্তব্য করেন নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। তিনি বলেন, ‘গত দেড় দশকে কমিশনের প্রতি আস্থা ও আত্মবিশ্বাসের বড় অধঃপতন ঘটেছে। এই আস্থা পুনরুদ্ধারই এখন কমিশনের অগ্রাধিকার।’ মনোনয়ন বাণিজ্যের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।

অনুষ্ঠানে সিপিডির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. রেহমান সোবহান বলেন, ‘আইনি কাঠামোর চেয়ে সংস্কারের কার্যকর বাস্তবায়ন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৯১ সালে প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দীনের সরকারে বড় কোনো সংস্কার ছাড়াই কেবল সততার কারণে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব হয়েছিল।’

অন্যদিকে সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘ব্যাংকিং অধ্যাদেশের পরও বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ এবং নির্বাচন কমিশনের অতীত ভূমিকা প্রমাণ করে, সামগ্রিক সুশাসন ছাড়া সংস্কার টেকসই হবে না।’

Ad 300x250

সম্পর্কিত