স্ট্রিম ডেস্ক
রাজধানীর কাকরাইলে জাতীয় পার্টির (জাপা) কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে দিয়ে গণঅধিকার পরিষদের একটি মিছিল যাওয়ার সময় সংঘর্ষে জড়ায় দুই পক্ষের নেতাকর্মীরা। দুই দফায় এই সংঘর্ষে পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে মারমুখী ভূমিকায় দেখা যায়। এসময় গুরুতর আহত হন গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর। বর্তমানে তিনি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তিনি এখনো শঙ্কামুক্ত নন। এছাড়াও দলটির অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন।
নূরের চিকিৎসায় মেডিক্যাল বোর্ড
গতকাল ঘটনার পরপরই নুরকে কাকরাইলের ইসলামী ব্যাংক সেন্ট্রাল হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে সেখান থেকে রাতেই তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
আজ শনিবার (৩০ আগস্ট) সকালে নুরের শারীরিক অবস্থার বিবরণ দিয়ে ঢামেকের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, তাঁর চিকিৎসায় ছয় সদস্যের মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। মেডিক্যাল বোর্ডে রয়েছেন– হাসপাতালের পরিচালক, এনেস্তেসিয়ার প্রধান, ক্যাজুয়ালটি বিভাগের একজন, নাক কান গলা বিভাগের একজন, নিউরোসার্জারি বিভাগ ও চক্ষু বিভাগেরসহ ছয় সদস্য।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আহত অবস্থায় রাতে যখন আনা হয় প্রথমে ক্যাজুয়ালটি বিভাগের চিকিৎসকরা নুরকে দেখেন। পরে সেখান থেকে তাকে ওয়ান স্টপ ইমারজেন্সি সেন্টারে (ওসেক) রাখা হয়। পরে রাতেই আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়েছে। নুরের নাকের হার ভেঙে গেছে, চোখের ওপরে আঘাত রয়েছে, মাথায় সামান্য রক্তক্ষরণ রয়েছে। রাতেই পাঁচ বিভাগের চিকিৎসকদের নিয়ে মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয় এবং তাদের পরামর্শে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।’
নুরের বর্তমান শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে পরিচালক বলেন, ‘তিনি বর্তমানে স্ট্যাবল, তবে ৪৮ ঘণ্টা না যাওয়া পর্যন্ত শঙ্কামুক্ত বলছি না। তার মস্তিষ্কে যে রক্তক্ষরণ রয়েছে, তা ওষুধে ভালো হয়ে যাবে বলে আশা করছি।’
কাকরাইলে কী ঘটেছিল?
সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গতকাল শুক্রবার (২৯ আগস্ট) সন্ধ্যায় জাতীয় পার্টিসহ ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের দোসরদের রাজনীতি নিষিদ্ধ, নিবন্ধন বাতিল ও ফ্যাসিবাদী সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তারের দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ কর্মসূচি ছিল গণঅধিকার পরিষদের। এতে উপস্থিত ছিলেন সভাপতি নুরুল হক নুর ও সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ রাশেদ খানসহ কেন্দ্রীয় নেতারা। সমাবেশ থেকে জাপার চেয়ারম্যান জি এম কাদেরকে গ্রেপ্তার ও দলটিকে নিষিদ্ধের দাবি জানানো হয়।
এ ঘটনার পর জাপার মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী এক সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন, যে দাবিতে গণঅধিকার পরিষদ সভা করেছে, এ ধরনের সমাবেশ করা বেআইনি।
এদিকে, বিক্ষোভের পর নুর ফেসবুকে পোস্ট দিয়েও জাপা চেয়ারম্যান জিএম কাদেরকে গ্রেপ্তারের দাবি করেন। এমনকি গ্রেপ্তার না করা হলে সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচিরও ঘোষণা দেন। পরে কর্মসূচির অংশ হিসেবে দলটির নেতাকর্মীরা সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় দিকে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন।
দলটির শীর্ষ নেতাদের অভিযোগ, তাঁরা পল্টন মোড়ে গেলে মিছিলের পেছনের অংশে ‘হামলা’ করা হয়। জাতীয় পার্টির অফিসের সামনে থেকে ‘দুই-তিনশ লোক’ এই হামলায় অংশ নেন এবং হামলাকারীদের মধ্যে আওয়ামী লীগ, যুবলীগের নেতাকর্মীরাও উপস্থিত ছিলেন বলেও দাবি তাঁদের।
ঘটনার পর গণঅধিকার পরিষদের উচ্চতর পরিষদ সদস্য আবু হানিফ এক বার্তায় বলেন, গণঅধিকার পরিষদের মিছিলে হামলা হলে এক পর্যায়ে তাঁদের নেতাকর্মী ও সমর্থকরাও ‘প্রতিরোধ’ করেন। এতে সেখানে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়।
অন্যদিকে, জাপা চেয়ারম্যানের প্রেস সচিব খন্দকার দেলোয়ার জালালী এক বার্তায় দাবি করেন, জাতীয় পার্টি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ‘সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা’ ঘটেছে।
এদিকে, প্রথম দফার এই ঘটনার প্রতিবাদে রাতেই মশাল মিছিলের ডাক দেয় গণঅধিকার পরিষদ। এই মশাল মিছিলের শেষ পর্যায়েই ব্যাপক মারধরের শিকার হন নুর। মশাল মিছিল নিয়ে জাপা অফিসের দিকে যায় গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীরা। পরিস্থিতি উত্তেজনাকর হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিজয়নগর পানির ট্যাংকি এলাকা থেকে ধাওয়া শুরু করে। সেসময় নেতাকর্মীরা তাদের দলীয় অফিস আল রাজী কমপ্লেক্সের দিকে চলে যায়। এ সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লাঠিচার্জে নুরসহ অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী আহত হন।
রাতে গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান গণমাধ্যমে বলেন, ‘প্রথম দফায় বিক্ষোভ মিছিলে হামলার প্রতিবাদে জাতীয় পার্টিসহ আওয়ামী লীগের দোসরদের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে রাত সাড়ে ৯টার দিকে তাঁদের মশাল মিছিলের কর্মসূচি ছিল। সেটি শেষ করে গণঅধিকার পরিষদ কার্যালয়ের সামনে প্রেস ব্রিফিং করতে গেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাঁদের ওপর লাঠিপেটা করে।’
নুরের ওপর হামলার ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদ
গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরের ওপর হামলার ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। নুরকে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের সহযোদ্ধা আখ্যা দিয়ে রাতেই বিক্ষোভ মিছিল করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাকর্মীরা। রাত ১১টার দিকে দলীয় কার্যালয়ের সামনে তারা এ বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন। মিছিল থেকে বিভিন্ন স্লোগানও দেওয়া হয়।
এ ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে বিএনপিও। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির চর্চাকে ব্যাহত করে এমন কোনো কর্মকাণ্ডকে বিএনপি সমর্থন করে না এবং সুস্থধারার রাজনৈতিক কর্মসূচিতে হামলাকেও আমরা নিন্দা জানাই।’
তিনি নুরের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার সর্বাত্মক পদক্ষেপের পাশাপাশি দ্রুত তার আরোগ্য কামনা করেছেন।
নুরের আহত হওয়ার ঘটনাকে ‘ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে ঘটনার তীব্র নিন্দা, ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। শুক্রবার মধ্যরাতে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক ও মহাসচিব জালালুদ্দীন আহমদ এক যৌথ বিবৃতিতে এ নিন্দা জানান। এতে বলা হয়, ‘ভিপি নুরের ওপর এ কাপুরুষোচিত হামলা দেশের স্বাধীনতাকামী ও বাংলাদেশপন্থি জনতার কণ্ঠরোধের নোংরা প্রয়াস। বিশেষত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতায় একটি দলের প্রধানের ওপর এমন হামলা জাতির জন্য গভীরভাবে উদ্বেগজনক এবং ভয়াবহ অশনিসংকেত বহন করছে।’
তবে নুরের আহত হওয়ার ঘটনাটিকে জাপার ‘সন্ত্রাসীদের’ হামলা বলে অভিহিত করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, ‘শুক্রবার সন্ধ্যার দিকে রাজধানীর বিজয়নগরে আওয়ামী ফ্যাসিবাদের দোসর জাতীয় পার্টির সন্ত্রাসীদের ন্যক্কারজনক হামলায় গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি, ডাকসুর সাবেক ভিপি অন্যতম জুলাইযোদ্ধা নুরুল হক নুরসহ অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী গুরুতর আহত হয়েছেন। আমরা এ মর্মান্তিক ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি ও তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করছি। সেইসঙ্গে আমরা আহতদের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করছি এবং তাদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করছি।’
এ ছাড়াও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির এ হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন এবং অবিলম্বে দায়ীদের তদন্তপূর্বক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
‘আওয়ামী লীগকে ফেরানোর’ চেষ্টার অভিযোগ
নুরের ওপর হামলার ঘটনার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে সরব ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণ নেতারা। তাদের অন্যতম সারজিস আলম এক পোস্টে লিখেছেন, ‘প্ল্যান-বি হলো জাতীয় পার্টির ওপর ভর করে লীগকে ফেরানো। সেজন্য জাতীয় পার্টির বিষয়ে জিরো টলারেন্সে উত্তরপাড়া-দক্ষিণপাড়া মিলে-মিশে একাকার। নুর ভাইদের উপর বর্বরতম হামলার মূল কারণও এটা। অর্থাৎ জাতীয় পার্টির বিষয়ে স্ট্রং মেসেজ দেওয়া হলো সব দলকে! এমন ঘৃণ্যতর হামলার নিন্দা জানাচ্ছি।’
তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ যেভাবে অপরাধী, তার দোসর, বি টিম এবং বৈধতা দানকারী জাতীয় পার্টিও একইভাবে অপরাধী। জাতীয় পার্টিকে বিচারের আওতায় আনতে হবে। আওয়ামী লীগ এবং জাতীয় পার্টি একই পথের পথিক। তাদের পরিণতিও একই হবে।’
পরে নুরের ওপর হামলার একটি ভিডিও পোস্ট করে তার ক্যাপশনে সারজিস লেখেন, ‘ফ্যাসিস্টবিরোধী লড়াইয়ের মাধ্যমে হাসিনা পতন আন্দোলনের অন্যতম সহযোদ্ধা নুর ভাইয়ের উপর সেনাবাহিনীর এই বর্বর রক্তাক্ত হামলাকে আমি স্বাভাবিক হামলা হিসেবে দেখি না। আর্মি কখন ওপরের নির্দেশ ছাড়া একটা পা-ও ফেলে না। সেনাবাহিনীর মধ্যকার কার নির্দেশে নুর ভাইকে রক্তাক্ত করা হলো- এর জবাব সেনাপ্রধানকে দিতে হবে। সেনাবাহিনীর মধ্যকার কারা একটা রাজনৈতিক দলের সভাপতিকে মেরে হলেও জাতীয় পার্টিকে রক্ষার মিশনে নেমেছে, সেটাও খুঁজে বের করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘পুলিশের মধ্যকার যে আওয়ামী দালালরা এখনো রয়ে গেছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এই সেনাবাহিনী এবং পুলিশ অবশ্যই নুরুল হক নুরকে ভালো করে চেনে। তারপরও প্ল্যান করে তাকে রক্তাক্ত করা হয়েছে। যারা পিছন থেকে কালো হাতের খেলা খেলার চেষ্টা করছে তাদের কালো হাত ভেঙে দেওয়া হবে।’
একইরকম পোস্ট দেন গণঅভ্যুত্থানের আরেক নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহও। তিনি লিখেছেন, ‘শুরুটা হয়েছিল রিফাইন্ড আওয়ামী লীগের পরিকল্পনা দিয়ে, যে পরিকল্পনা আমি ১১ মার্চ প্রকাশ করে দিই। সেই প্ল্যান ভেস্তে গেলেও ওরা থামেনি। সেই একই গ্রুপ এবার আওয়ামী লীগ পুনর্বাসনের জন্য বেছে নিয়েছে জাতীয় পার্টিকে। ভারতের প্রত্যক্ষ মদদে জাতীয় পার্টির মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ব্যাক করানোর এই খেলায় প্রথম রক্ত দিলেন আমাদের নুর ভাই। এখন যদি আমরা নুরুল হক নুরের উপর এই ন্যক্কারজনক হামলার প্রতিবাদ না করতে পারি, জাতীয় পার্টিকে দিয়ে ফ্যাসিবাদ ফেরানোর এই চেষ্টা প্রতিহত না করতে পারি, তাহলে বাংলাদেশটাই আবার নুর ভাইয়ের মত রক্তাক্ত হয়ে যাবে।’
তিনি বলেন, ‘নুরুল হক নুরের রক্ত বৃথা যেতে দেব না। ভারতের প্রেসক্রিপশনে বিপ্লবীদের রক্তাক্ত করে আওয়ামী লীগ ফেরানোর এই চেষ্টা আমরা সফল হতে দেব না।’
তোপের মুখে আইন উপদেষ্টা
এদিকে নুরুল হক নুরের খোঁজখবর নিতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে গিয়ে গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীদের তোপের মুখে পড়েছেন আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল। এ সময় তিনি ঢামেকের জরুরি বিভাগে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। এর কিছুক্ষণ পর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাশের গেট দিয়ে বের হয়ে যান আইন উপদেষ্টা।
এর আগে, শুক্রবার (২৯ আগস্ট) রাত ১১টা ৫০ মিনিট নাগাদ তিনি ঢামেকে উপস্থিত হলে বিক্ষোভ শুরু করেন দলটির নেতাকর্মীরা। পরে তিনি ঢামেকের জরুরি বিভাগে গেলে গণঅধিকার পরিষদ নেতাকর্মীদের বিক্ষোভের মুখে সেখানেই আটকা পড়েন।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আইন উপদেষ্টার ঢামেকে আসার খবর শুনে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন দলটির নেতাকর্মীরা। এ সময় তারা ‘ভুয়া ভুয়া’ ধ্বনি দিতে থাকেন। একপর্যায়ে তারা ঢামেকের জরুরি বিভাগের সামনে গিয়েও বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। পরে দলটির সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান ও অন্য নেতাদের অনুরোধে তারা হাসপাতালের ভেতর থেকে বের হয়ে জরুরি বিভাগের প্রবেশমুখে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন।
অবশ্য এর আগে ফেসবুকে এক পোস্ট দিয়েও এ ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন আইন উপদেষ্টা। তিনি পোস্টে লিখেছেন, ‘ভিপি নুরুল হক নূরের উপর বর্বরোচিত হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।’
এই পোস্টের নিচেও কমেন্ট করে তোপ দেগেছেন হাসনাত আব্দুল্লাহ। তিনি লিখেছেন, ‘প্রতিবাদের কাজ আপনার? ভণ্ডামি বাদ দেন স্যার। যেই জন্য বসানো হইছে সেটা না করে কী কী করছেন এসবের হিসাব দিতে হবে। কে কোথায় কীভাবে কোন কাজে বাধা দিছে, এসব খবর আমাদের কাছে আছে। এসব প্রতিবাদের ভং না ধরে কাজটা করেন।’
প্রেস সচিবের নিন্দা
রাতে নুরুল হক নুরকে দেখতে ঢামেক হাসপাতালে যান প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলমও। তিনি রাত সোয়া ১১টার দিকে তিনি ঢামেকের জরুরি বিভাগে পৌঁছে নুরের শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নেন। এ সময় হাসপাতালের চিকিৎসকদের কাছ থেকেও বিস্তারিত তথ্য নেন তিনি।
পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ‘আমাদের সময়ের সাহসী কণ্ঠস্বর গণঅধিকার পরিষদের নেতা নুরুল হক নুরের ওপর বর্বরোচিত এ হামলার তীব্র নিন্দা জানাই। ছাত্রনেতা হিসেবে নুর ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছিলেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ন্যায়বিচারের দাবিতে তিনি এক প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন।’
সম্প্রতি জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নুর ও তার সংগঠন জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন উল্লেখ করে শফিকুল আলম আরও বলেন, ‘তাঁরা গণতন্ত্র, জবাবদিহি ও মর্যাদার জন্য চলমান লড়াইয়ের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান চলাকালে নুরকে গ্রেপ্তার করে হেফাজতে নির্মম নির্যাতন করা হয়েছিল। এটি শুধু কেবল মৌলিক মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন ছিল না, বরং এটি ছিল ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার সরকারের হাতে জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার ওপর সরাসরি আঘাত।’
শফিকুল আলম আরও বলেন, ‘আমি নিশ্চিত, কর্তৃপক্ষ এই হামলার তদন্ত করবে।’
আইএসপিআরের বিবৃতি
এই ঘটনায় রাতেই বিবৃতি দিয়েছে আইএসপিআর। তাতে বলা হয়েছে, ‘আজ রাত আনুমানিক ৮টায় রাজধানীর কাকরাইল এলাকায় দুটি রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় বেশ কয়েকজন আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সেনাবাহিনী ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়। প্রথমে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। তবে একপর্যায়ে সংঘর্ষ বেড়ে গেলে তারা সেনাবাহিনীর সহযোগিতা কামনা করে। পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে তাদের ওপর আক্রমণ চালানো হয় এবং এতে কয়েকজন সদস্য আহত হন।'
ঘটনার শুরুতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা উভয় পক্ষকে শান্ত থাকতে এবং শান্তিপূর্ণ ভাবে স্থান ত্যাগ করার জন্য ও দেশের বিদ্যমান আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে শান্তিপূর্ণ প্রক্রিয়া নিজেদের মধ্যে মতপার্থক্য দূর করার অনুরোধ জানিয়েছিল বলে উল্লেখ করে আইএসপিআর। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘বারংবার অনুরোধ সত্ত্বেও কতিপয় নেতাকর্মীরা তা উপেক্ষা করে মব ভায়োলেন্সের মাধ্যমে পরিস্থিতি অশান্ত করার চেষ্টা করে। তারা সংগঠিতভাবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালায় এবং আনুমানিক রাত ৯টার দিকে মশাল মিছিলের মাধ্যমে সহিংসতা আরও বৃদ্ধি করে। এ সময় তারা ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে এবং বিভিন্ন স্থাপনায় আগুন দেওয়ারও চেষ্টা চালায়। এছাড়াও বিজয়নগর, নয়াপল্টন ও তৎসংলগ্ন এলাকায় সাধারণ জনগণের চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয় এবং জনদুর্ভোগ বৃদ্ধি পায়। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী শান্তিপূর্ণ সমাধানের সকল চেষ্টা তারা অগ্রাহ্য করে। ফলস্বরূপ, জননিরাপত্তা রক্ষার্থে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বল প্রয়োগে বাধ্য হয়। উল্লেখ্য আজকের উদ্ভূত ঘটনায় সেনাবাহিনীর ৫ জন সদস্য আহত হয়।’
সব ধরনের মব ভায়োলেন্সের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে উল্লেখ করে আইএসপিআর জানায়, ‘বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সরকারের এই সিদ্ধান্ত পুনর্ব্যক্ত করছে এবং জনমনে স্বস্তি ও নিরাপত্তা আনয়নে সকল ধরনের মব ভায়োলেন্সের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করতে সদা প্রস্তুত রয়েছে। জননিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা ও শান্তি বজায় রাখতে সেনাবাহিনী সর্বদা বদ্ধপরিকর।’
রাজধানীর কাকরাইলে জাতীয় পার্টির (জাপা) কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে দিয়ে গণঅধিকার পরিষদের একটি মিছিল যাওয়ার সময় সংঘর্ষে জড়ায় দুই পক্ষের নেতাকর্মীরা। দুই দফায় এই সংঘর্ষে পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে মারমুখী ভূমিকায় দেখা যায়। এসময় গুরুতর আহত হন গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর। বর্তমানে তিনি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তিনি এখনো শঙ্কামুক্ত নন। এছাড়াও দলটির অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন।
নূরের চিকিৎসায় মেডিক্যাল বোর্ড
গতকাল ঘটনার পরপরই নুরকে কাকরাইলের ইসলামী ব্যাংক সেন্ট্রাল হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে সেখান থেকে রাতেই তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
আজ শনিবার (৩০ আগস্ট) সকালে নুরের শারীরিক অবস্থার বিবরণ দিয়ে ঢামেকের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, তাঁর চিকিৎসায় ছয় সদস্যের মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। মেডিক্যাল বোর্ডে রয়েছেন– হাসপাতালের পরিচালক, এনেস্তেসিয়ার প্রধান, ক্যাজুয়ালটি বিভাগের একজন, নাক কান গলা বিভাগের একজন, নিউরোসার্জারি বিভাগ ও চক্ষু বিভাগেরসহ ছয় সদস্য।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আহত অবস্থায় রাতে যখন আনা হয় প্রথমে ক্যাজুয়ালটি বিভাগের চিকিৎসকরা নুরকে দেখেন। পরে সেখান থেকে তাকে ওয়ান স্টপ ইমারজেন্সি সেন্টারে (ওসেক) রাখা হয়। পরে রাতেই আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়েছে। নুরের নাকের হার ভেঙে গেছে, চোখের ওপরে আঘাত রয়েছে, মাথায় সামান্য রক্তক্ষরণ রয়েছে। রাতেই পাঁচ বিভাগের চিকিৎসকদের নিয়ে মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয় এবং তাদের পরামর্শে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।’
নুরের বর্তমান শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে পরিচালক বলেন, ‘তিনি বর্তমানে স্ট্যাবল, তবে ৪৮ ঘণ্টা না যাওয়া পর্যন্ত শঙ্কামুক্ত বলছি না। তার মস্তিষ্কে যে রক্তক্ষরণ রয়েছে, তা ওষুধে ভালো হয়ে যাবে বলে আশা করছি।’
কাকরাইলে কী ঘটেছিল?
সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গতকাল শুক্রবার (২৯ আগস্ট) সন্ধ্যায় জাতীয় পার্টিসহ ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের দোসরদের রাজনীতি নিষিদ্ধ, নিবন্ধন বাতিল ও ফ্যাসিবাদী সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তারের দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ কর্মসূচি ছিল গণঅধিকার পরিষদের। এতে উপস্থিত ছিলেন সভাপতি নুরুল হক নুর ও সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ রাশেদ খানসহ কেন্দ্রীয় নেতারা। সমাবেশ থেকে জাপার চেয়ারম্যান জি এম কাদেরকে গ্রেপ্তার ও দলটিকে নিষিদ্ধের দাবি জানানো হয়।
এ ঘটনার পর জাপার মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী এক সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন, যে দাবিতে গণঅধিকার পরিষদ সভা করেছে, এ ধরনের সমাবেশ করা বেআইনি।
এদিকে, বিক্ষোভের পর নুর ফেসবুকে পোস্ট দিয়েও জাপা চেয়ারম্যান জিএম কাদেরকে গ্রেপ্তারের দাবি করেন। এমনকি গ্রেপ্তার না করা হলে সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচিরও ঘোষণা দেন। পরে কর্মসূচির অংশ হিসেবে দলটির নেতাকর্মীরা সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় দিকে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন।
দলটির শীর্ষ নেতাদের অভিযোগ, তাঁরা পল্টন মোড়ে গেলে মিছিলের পেছনের অংশে ‘হামলা’ করা হয়। জাতীয় পার্টির অফিসের সামনে থেকে ‘দুই-তিনশ লোক’ এই হামলায় অংশ নেন এবং হামলাকারীদের মধ্যে আওয়ামী লীগ, যুবলীগের নেতাকর্মীরাও উপস্থিত ছিলেন বলেও দাবি তাঁদের।
ঘটনার পর গণঅধিকার পরিষদের উচ্চতর পরিষদ সদস্য আবু হানিফ এক বার্তায় বলেন, গণঅধিকার পরিষদের মিছিলে হামলা হলে এক পর্যায়ে তাঁদের নেতাকর্মী ও সমর্থকরাও ‘প্রতিরোধ’ করেন। এতে সেখানে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়।
অন্যদিকে, জাপা চেয়ারম্যানের প্রেস সচিব খন্দকার দেলোয়ার জালালী এক বার্তায় দাবি করেন, জাতীয় পার্টি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ‘সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা’ ঘটেছে।
এদিকে, প্রথম দফার এই ঘটনার প্রতিবাদে রাতেই মশাল মিছিলের ডাক দেয় গণঅধিকার পরিষদ। এই মশাল মিছিলের শেষ পর্যায়েই ব্যাপক মারধরের শিকার হন নুর। মশাল মিছিল নিয়ে জাপা অফিসের দিকে যায় গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীরা। পরিস্থিতি উত্তেজনাকর হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিজয়নগর পানির ট্যাংকি এলাকা থেকে ধাওয়া শুরু করে। সেসময় নেতাকর্মীরা তাদের দলীয় অফিস আল রাজী কমপ্লেক্সের দিকে চলে যায়। এ সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লাঠিচার্জে নুরসহ অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী আহত হন।
রাতে গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান গণমাধ্যমে বলেন, ‘প্রথম দফায় বিক্ষোভ মিছিলে হামলার প্রতিবাদে জাতীয় পার্টিসহ আওয়ামী লীগের দোসরদের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে রাত সাড়ে ৯টার দিকে তাঁদের মশাল মিছিলের কর্মসূচি ছিল। সেটি শেষ করে গণঅধিকার পরিষদ কার্যালয়ের সামনে প্রেস ব্রিফিং করতে গেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাঁদের ওপর লাঠিপেটা করে।’
নুরের ওপর হামলার ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদ
গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরের ওপর হামলার ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। নুরকে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের সহযোদ্ধা আখ্যা দিয়ে রাতেই বিক্ষোভ মিছিল করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাকর্মীরা। রাত ১১টার দিকে দলীয় কার্যালয়ের সামনে তারা এ বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন। মিছিল থেকে বিভিন্ন স্লোগানও দেওয়া হয়।
এ ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে বিএনপিও। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির চর্চাকে ব্যাহত করে এমন কোনো কর্মকাণ্ডকে বিএনপি সমর্থন করে না এবং সুস্থধারার রাজনৈতিক কর্মসূচিতে হামলাকেও আমরা নিন্দা জানাই।’
তিনি নুরের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার সর্বাত্মক পদক্ষেপের পাশাপাশি দ্রুত তার আরোগ্য কামনা করেছেন।
নুরের আহত হওয়ার ঘটনাকে ‘ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে ঘটনার তীব্র নিন্দা, ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। শুক্রবার মধ্যরাতে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক ও মহাসচিব জালালুদ্দীন আহমদ এক যৌথ বিবৃতিতে এ নিন্দা জানান। এতে বলা হয়, ‘ভিপি নুরের ওপর এ কাপুরুষোচিত হামলা দেশের স্বাধীনতাকামী ও বাংলাদেশপন্থি জনতার কণ্ঠরোধের নোংরা প্রয়াস। বিশেষত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতায় একটি দলের প্রধানের ওপর এমন হামলা জাতির জন্য গভীরভাবে উদ্বেগজনক এবং ভয়াবহ অশনিসংকেত বহন করছে।’
তবে নুরের আহত হওয়ার ঘটনাটিকে জাপার ‘সন্ত্রাসীদের’ হামলা বলে অভিহিত করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, ‘শুক্রবার সন্ধ্যার দিকে রাজধানীর বিজয়নগরে আওয়ামী ফ্যাসিবাদের দোসর জাতীয় পার্টির সন্ত্রাসীদের ন্যক্কারজনক হামলায় গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি, ডাকসুর সাবেক ভিপি অন্যতম জুলাইযোদ্ধা নুরুল হক নুরসহ অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী গুরুতর আহত হয়েছেন। আমরা এ মর্মান্তিক ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি ও তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করছি। সেইসঙ্গে আমরা আহতদের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করছি এবং তাদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করছি।’
এ ছাড়াও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির এ হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন এবং অবিলম্বে দায়ীদের তদন্তপূর্বক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
‘আওয়ামী লীগকে ফেরানোর’ চেষ্টার অভিযোগ
নুরের ওপর হামলার ঘটনার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে সরব ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণ নেতারা। তাদের অন্যতম সারজিস আলম এক পোস্টে লিখেছেন, ‘প্ল্যান-বি হলো জাতীয় পার্টির ওপর ভর করে লীগকে ফেরানো। সেজন্য জাতীয় পার্টির বিষয়ে জিরো টলারেন্সে উত্তরপাড়া-দক্ষিণপাড়া মিলে-মিশে একাকার। নুর ভাইদের উপর বর্বরতম হামলার মূল কারণও এটা। অর্থাৎ জাতীয় পার্টির বিষয়ে স্ট্রং মেসেজ দেওয়া হলো সব দলকে! এমন ঘৃণ্যতর হামলার নিন্দা জানাচ্ছি।’
তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ যেভাবে অপরাধী, তার দোসর, বি টিম এবং বৈধতা দানকারী জাতীয় পার্টিও একইভাবে অপরাধী। জাতীয় পার্টিকে বিচারের আওতায় আনতে হবে। আওয়ামী লীগ এবং জাতীয় পার্টি একই পথের পথিক। তাদের পরিণতিও একই হবে।’
পরে নুরের ওপর হামলার একটি ভিডিও পোস্ট করে তার ক্যাপশনে সারজিস লেখেন, ‘ফ্যাসিস্টবিরোধী লড়াইয়ের মাধ্যমে হাসিনা পতন আন্দোলনের অন্যতম সহযোদ্ধা নুর ভাইয়ের উপর সেনাবাহিনীর এই বর্বর রক্তাক্ত হামলাকে আমি স্বাভাবিক হামলা হিসেবে দেখি না। আর্মি কখন ওপরের নির্দেশ ছাড়া একটা পা-ও ফেলে না। সেনাবাহিনীর মধ্যকার কার নির্দেশে নুর ভাইকে রক্তাক্ত করা হলো- এর জবাব সেনাপ্রধানকে দিতে হবে। সেনাবাহিনীর মধ্যকার কারা একটা রাজনৈতিক দলের সভাপতিকে মেরে হলেও জাতীয় পার্টিকে রক্ষার মিশনে নেমেছে, সেটাও খুঁজে বের করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘পুলিশের মধ্যকার যে আওয়ামী দালালরা এখনো রয়ে গেছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এই সেনাবাহিনী এবং পুলিশ অবশ্যই নুরুল হক নুরকে ভালো করে চেনে। তারপরও প্ল্যান করে তাকে রক্তাক্ত করা হয়েছে। যারা পিছন থেকে কালো হাতের খেলা খেলার চেষ্টা করছে তাদের কালো হাত ভেঙে দেওয়া হবে।’
একইরকম পোস্ট দেন গণঅভ্যুত্থানের আরেক নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহও। তিনি লিখেছেন, ‘শুরুটা হয়েছিল রিফাইন্ড আওয়ামী লীগের পরিকল্পনা দিয়ে, যে পরিকল্পনা আমি ১১ মার্চ প্রকাশ করে দিই। সেই প্ল্যান ভেস্তে গেলেও ওরা থামেনি। সেই একই গ্রুপ এবার আওয়ামী লীগ পুনর্বাসনের জন্য বেছে নিয়েছে জাতীয় পার্টিকে। ভারতের প্রত্যক্ষ মদদে জাতীয় পার্টির মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ব্যাক করানোর এই খেলায় প্রথম রক্ত দিলেন আমাদের নুর ভাই। এখন যদি আমরা নুরুল হক নুরের উপর এই ন্যক্কারজনক হামলার প্রতিবাদ না করতে পারি, জাতীয় পার্টিকে দিয়ে ফ্যাসিবাদ ফেরানোর এই চেষ্টা প্রতিহত না করতে পারি, তাহলে বাংলাদেশটাই আবার নুর ভাইয়ের মত রক্তাক্ত হয়ে যাবে।’
তিনি বলেন, ‘নুরুল হক নুরের রক্ত বৃথা যেতে দেব না। ভারতের প্রেসক্রিপশনে বিপ্লবীদের রক্তাক্ত করে আওয়ামী লীগ ফেরানোর এই চেষ্টা আমরা সফল হতে দেব না।’
তোপের মুখে আইন উপদেষ্টা
এদিকে নুরুল হক নুরের খোঁজখবর নিতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে গিয়ে গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীদের তোপের মুখে পড়েছেন আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল। এ সময় তিনি ঢামেকের জরুরি বিভাগে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। এর কিছুক্ষণ পর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাশের গেট দিয়ে বের হয়ে যান আইন উপদেষ্টা।
এর আগে, শুক্রবার (২৯ আগস্ট) রাত ১১টা ৫০ মিনিট নাগাদ তিনি ঢামেকে উপস্থিত হলে বিক্ষোভ শুরু করেন দলটির নেতাকর্মীরা। পরে তিনি ঢামেকের জরুরি বিভাগে গেলে গণঅধিকার পরিষদ নেতাকর্মীদের বিক্ষোভের মুখে সেখানেই আটকা পড়েন।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আইন উপদেষ্টার ঢামেকে আসার খবর শুনে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন দলটির নেতাকর্মীরা। এ সময় তারা ‘ভুয়া ভুয়া’ ধ্বনি দিতে থাকেন। একপর্যায়ে তারা ঢামেকের জরুরি বিভাগের সামনে গিয়েও বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। পরে দলটির সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান ও অন্য নেতাদের অনুরোধে তারা হাসপাতালের ভেতর থেকে বের হয়ে জরুরি বিভাগের প্রবেশমুখে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন।
অবশ্য এর আগে ফেসবুকে এক পোস্ট দিয়েও এ ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন আইন উপদেষ্টা। তিনি পোস্টে লিখেছেন, ‘ভিপি নুরুল হক নূরের উপর বর্বরোচিত হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।’
এই পোস্টের নিচেও কমেন্ট করে তোপ দেগেছেন হাসনাত আব্দুল্লাহ। তিনি লিখেছেন, ‘প্রতিবাদের কাজ আপনার? ভণ্ডামি বাদ দেন স্যার। যেই জন্য বসানো হইছে সেটা না করে কী কী করছেন এসবের হিসাব দিতে হবে। কে কোথায় কীভাবে কোন কাজে বাধা দিছে, এসব খবর আমাদের কাছে আছে। এসব প্রতিবাদের ভং না ধরে কাজটা করেন।’
প্রেস সচিবের নিন্দা
রাতে নুরুল হক নুরকে দেখতে ঢামেক হাসপাতালে যান প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলমও। তিনি রাত সোয়া ১১টার দিকে তিনি ঢামেকের জরুরি বিভাগে পৌঁছে নুরের শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নেন। এ সময় হাসপাতালের চিকিৎসকদের কাছ থেকেও বিস্তারিত তথ্য নেন তিনি।
পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ‘আমাদের সময়ের সাহসী কণ্ঠস্বর গণঅধিকার পরিষদের নেতা নুরুল হক নুরের ওপর বর্বরোচিত এ হামলার তীব্র নিন্দা জানাই। ছাত্রনেতা হিসেবে নুর ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছিলেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ন্যায়বিচারের দাবিতে তিনি এক প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন।’
সম্প্রতি জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নুর ও তার সংগঠন জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন উল্লেখ করে শফিকুল আলম আরও বলেন, ‘তাঁরা গণতন্ত্র, জবাবদিহি ও মর্যাদার জন্য চলমান লড়াইয়ের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান চলাকালে নুরকে গ্রেপ্তার করে হেফাজতে নির্মম নির্যাতন করা হয়েছিল। এটি শুধু কেবল মৌলিক মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন ছিল না, বরং এটি ছিল ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার সরকারের হাতে জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার ওপর সরাসরি আঘাত।’
শফিকুল আলম আরও বলেন, ‘আমি নিশ্চিত, কর্তৃপক্ষ এই হামলার তদন্ত করবে।’
আইএসপিআরের বিবৃতি
এই ঘটনায় রাতেই বিবৃতি দিয়েছে আইএসপিআর। তাতে বলা হয়েছে, ‘আজ রাত আনুমানিক ৮টায় রাজধানীর কাকরাইল এলাকায় দুটি রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় বেশ কয়েকজন আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সেনাবাহিনী ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়। প্রথমে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। তবে একপর্যায়ে সংঘর্ষ বেড়ে গেলে তারা সেনাবাহিনীর সহযোগিতা কামনা করে। পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে তাদের ওপর আক্রমণ চালানো হয় এবং এতে কয়েকজন সদস্য আহত হন।'
ঘটনার শুরুতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা উভয় পক্ষকে শান্ত থাকতে এবং শান্তিপূর্ণ ভাবে স্থান ত্যাগ করার জন্য ও দেশের বিদ্যমান আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে শান্তিপূর্ণ প্রক্রিয়া নিজেদের মধ্যে মতপার্থক্য দূর করার অনুরোধ জানিয়েছিল বলে উল্লেখ করে আইএসপিআর। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘বারংবার অনুরোধ সত্ত্বেও কতিপয় নেতাকর্মীরা তা উপেক্ষা করে মব ভায়োলেন্সের মাধ্যমে পরিস্থিতি অশান্ত করার চেষ্টা করে। তারা সংগঠিতভাবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালায় এবং আনুমানিক রাত ৯টার দিকে মশাল মিছিলের মাধ্যমে সহিংসতা আরও বৃদ্ধি করে। এ সময় তারা ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে এবং বিভিন্ন স্থাপনায় আগুন দেওয়ারও চেষ্টা চালায়। এছাড়াও বিজয়নগর, নয়াপল্টন ও তৎসংলগ্ন এলাকায় সাধারণ জনগণের চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয় এবং জনদুর্ভোগ বৃদ্ধি পায়। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী শান্তিপূর্ণ সমাধানের সকল চেষ্টা তারা অগ্রাহ্য করে। ফলস্বরূপ, জননিরাপত্তা রক্ষার্থে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বল প্রয়োগে বাধ্য হয়। উল্লেখ্য আজকের উদ্ভূত ঘটনায় সেনাবাহিনীর ৫ জন সদস্য আহত হয়।’
সব ধরনের মব ভায়োলেন্সের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে উল্লেখ করে আইএসপিআর জানায়, ‘বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সরকারের এই সিদ্ধান্ত পুনর্ব্যক্ত করছে এবং জনমনে স্বস্তি ও নিরাপত্তা আনয়নে সকল ধরনের মব ভায়োলেন্সের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করতে সদা প্রস্তুত রয়েছে। জননিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা ও শান্তি বজায় রাখতে সেনাবাহিনী সর্বদা বদ্ধপরিকর।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’ প্যানেলের মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমার বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ অবমাননার অভিযোগ এনেছে ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য’ প্যানেল।
৫ ঘণ্টা আগেরাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচনে প্রার্থী ও ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সাইবার বুলিংরোধে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট বিশেষ কমিটি গঠন করেছে নির্বাচন কমিশন। বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মো. একরামুল হামিদকে আহ্বায়ক করে এ কমিটি করা হয়েছে
৬ ঘণ্টা আগেবাংলাদেশের রাজনীতিতে নুরুল হক নুর প্রাসঙ্গিক হতে শুরু করেন ২০১৮ সালের কোটা সংস্কারের আন্দোলনের পর থেকে। কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা থেকে ডাকসুর ভিপি পদে নির্বাচিত হওয়া নুরের ওপর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অন্তত ২৫ বার হামলার খবর পাওয়া যায়। ২৯ আগস্ট রাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আরেক দফা হামলার শিকার হন
৭ ঘণ্টা আগেগণ-অধিকার পরিষদের সভাপতি ও সাবেক ডাকসু ভিপি নুরুল হক নুরের ওপর হামলার ঘটনায় দেশের পরিচালনা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব অধ্যক্ষ হাফেজ মাওলানা ইউনুস আহমদ একথা বলেছেন।
৭ ঘণ্টা আগে