সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে হওয়া সব নির্বাচনে বিরোধীদের উপস্থিতি ছিল খুবই নগণ্য। বিরোধীরা হয় ভোট বর্জন করত, নয়তো গণগ্রেপ্তারের শিকার হয়ে কারাগারে থাকতে বাধ্য হতো। তবে আর দুই দিন পর বাংলাদেশে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, সেই নির্বাচনের আগে বাংলাদেশের সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে।
এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেই। শেখ হাসিনার দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ রয়েছে বাংলাদেশে। তবে শেখ হাসিনা সরকারকে উৎখাত করা গণঅভ্যুত্থানের ছাত্র-জনতা বলছে, ২০০৯ সালের পর এটিই সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে।
ধারণা করা হচ্ছে, আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ব্যাপকভাবে জয়ী হবে। তবে বিএনপির চোখ রাঙাচ্ছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলের জোট। এবারের নির্বাচনে জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়েছে জেনজি প্রভাবিত দল ‘এনসিপি’, যাদের নেতাদের বয়স ৩০ বছরের কম।
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছে, তাঁর দল সংসদের ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৯২টিতে প্রার্থী দিয়েছে এবং ‘সরকার গঠনের জন্য যথেষ্ট’ আসনে জয়ী হওয়ার ব্যাপারে তাঁরা আত্মবিশ্বাসী।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের দেশ বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার জন্য ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশজুড়ে নানা অস্থিরতায় পোশাকখাতসহ অন্যান্য শিল্পখাত হুমকির মুখে পড়েছে। তাই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাও জরুরি। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, বাংলাদেশের নির্বাচনে এশিয়ার দুই পরাশক্তি চীন ও ভারতের ভূমিকাও প্রভাব ফেলবে।
মোট ভোটারের এক-চতুর্থাংশই জেনজি
ঢাকার সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসি বলেন, ‘জনমত জরিপে বিএনপির জয়ের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, ভোটারদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখনও সিদ্ধান্তহীন।’
এই বিশ্লেষক আরও বলেন, ‘এই নির্বাচনে জেনজিদের পছন্দ-অপছন্দই ফলাফল নির্ধারণ করবে। কারণ তারাই মোট ভোটারের এক-চতুর্থাংশ। ফলে, তারা কীভাবে ভোট দেয়, সেটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
রয়টার্সের প্রতিবেদনের স্ক্রিনশটবিএনপি-জামায়াতসহ নির্বাচনে অংশ নেওয়া সব দলের প্রার্থী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা সারা দেশে প্রচারণা চালাচ্ছেন। সাদা-কালো পোস্টার ও ব্যানারে ভরে গেছে রাস্তার পাশের দেয়ালগুলো। মাইকে মাইকে দলীয় গান বাজছে।
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জনমত জরিপ বলছে, এক সময়ের নিষিদ্ধ দল জামায়াত, যারা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়েও বিরোধিতা করেছিল, তারা এবার জয়ী না হলেও, ইতিহাসের সবচেয়ে স্মরণীয় ফল অর্জন করবে।
ভারতের প্রভাব কমছে, বাড়ছে চীনের প্রভাব
এই নির্বাচনের ফলাফল আগামী বছরগুলোতে বাংলাদেশে চীন ও ভারতের ভূমিকার ওপর প্রভাব ফেলবে। ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর চীন বাংলাদেশে তাদের অবস্থান আরও দৃঢ় করেছে।
অন্যদিকে ভারতের প্রভাব কমেছে। কারণ শেখ হাসিনা ছিলেন কট্টর ভারতপন্থী। তবে কোনো কোনো বিশ্লেষক মনে করছেন, ভারত এখন জামায়াতের তুলনায় বিএনপিকে বেশি গ্রহণযোগ্য মনে করছে।
ভারত মনে করছে, বাংলাদেশে যদি জামায়াত নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় বসে, তাহলে তারা পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকতে পারে। পাকিস্তান ঐতিহাসিকভাবেই ভারতের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী। ফলে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠতা বাড়লে, তা ভারতের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হওয়াই স্বাভাবিক।
এদিকে জামায়াতের জেনজি মিত্র এনসিপির প্রচারণার মূল বিষয় ‘ভারতীয় আধিপত্যবাদ’ দূর করা। এই দলের নেতারা সম্প্রতি চীনেও সফর করেছেন। তবে জামায়াত বলছে, তারা নির্দিষ্ট কোনো দেশের দিকে ঝুঁকতে চায় না।
বিএনপি প্রধান তারেক রহমান বলেছেন, তাঁর দল সরকার গঠন করলে সেই দেশগুলোর সঙ্গেই সম্পর্ক রাখবে, যারা বাংলা উপযুক্ত সম্মান ও মর্যাদা দেবে।
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। এখানে দারিদ্র্যের হার চরম। উপরন্তু উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাস এবং মন্থর বিনিয়োগের কারণে প্রায় পর্যুদস্ত। ২০২২ সাল থেকে এই পরিস্থিতি চলছে। ফলে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং বিশ্বব্যাংক থেকে বিলিয়ন ডলারসহ বড় ধরনের বৈদেশিক অর্থায়ন খুঁজতে বাধ্য হয়েছে বাংলাদেশ।
ঢাকার থিঙ্ক ট্যাংক কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন এবং বাংলাদেশ ইলেকশন অ্যান্ড পাবলিক ওপিনিয়ন স্টাডিজের একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, ১২ কোটি ৮০ লাখ ভোটারের মধ্যে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো দুর্নীতি। এরপর রয়েছে মুদ্রাস্ফীতি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, জামায়াতের ‘ক্লিন ইমেজ’ বা স্বচ্ছ ভাবমূর্তি তাদের পক্ষে একটি ইতিবাচক ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করছে। এটি ভোটের মাঠে ইসলামী ঝোঁকের চেয়েও বেশি কার্যকর হিসেবে দেখা যাচ্ছে।
কোনো কোনো সমীক্ষায় বলা হয়েছে, ভোটাররা তারা ধর্মীয় বা প্রতীকী ইস্যুগুলোর চেয়ে দুর্নীতি এবং অর্থনৈতিক উদ্বেগকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন এবং এমন নেতাদের প্রতি সমর্থন জানাচ্ছেন, যারা যত্নশীলতা, দক্ষতা ও জবাবদিহিতা প্রদর্শন করবেন।
তবে অন্য এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমান পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে আছেন। তারপর রয়েছেন জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান।
এবার প্রথমবারের মতো ভোট দিতে যাচ্ছেন ২১ বছর বয়সী মোহাম্মদ রাকিব। তিনি বলেন, ‘হাসিনার আওয়ামী লীগের দুঃশাসনে সবাই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। জাতীয় নির্বাচনের সময় মানুষ ভোট পর্যন্ত দিতে পারত না। মানুষের কোনো কণ্ঠস্বর ছিল না। আমি আশা করি, পরবর্তী সরকার, যে-ই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তারা জনগণের বাকস্বাধীনতা হরণ করবে না।’