জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

আমেরিকায় প্রবেশ নিষেধ—৪

আমেরিকার স্বাধীনতার আঁতুড়ঘরে: ফিলাডেলফিয়ায় এক বিকেল

ভূ-পর্যটক তারেক অণুর ধারাবাহিক ভ্রমণ-কাহিনি ‘আমেরিকায় প্রবেশ নিষেধ’-এর পঞ্চম পর্ব প্রকাশিত হলো আজ। প্রতি বুধবার চোখ রাখুন বাংলা স্ট্রিমের ফিচার পাতায়।

আমেরিকার স্বাধীনতার আঁতুড়ঘরে। ছবি লেখকের সৌজন্যে

‘১৭৭৬ সাল থেকে আজ পর্যন্ত এই ঘরে শুধু একটি জিনিস বদলেছে, বাকি সব একই আছে। বলতে পারো সেটা কী?’—গম্ভীর কিন্তু দুষ্টু হাসি নিয়ে প্রশ্ন করলেন আমাদের মার্কিন ট্যুর গাইড।

আমরা দাঁড়িয়ে আছি এক বিশাল ঘরে। আদালত কক্ষের মতো সুবিশাল কামরা। চেয়ার, টেবিল, বই, এমনকি পালকের কলমও সাজানো আছে আগের মতো। শুধু মানুষগুলো যেন কর্মবিরতিতে গেছে। এই বুঝি যেকোনো সময় জজ সাহেব এসে এজলাসে বসবেন। প্রায় ২৫০ বছর পেরিয়ে গেছে, তবু সবকিছু একই রকম রাখা হয়েছে। তাহলে বদলেছে কোন জিনিসটা?

ইন্ডিপেনডেন্স হল। ছবি লেখকের সৌজন্যে
ইন্ডিপেনডেন্স হল। ছবি লেখকের সৌজন্যে

গাইড সাহেবই উত্তর দিলেন, ‘মূল আসনের পেছনে ঝুলত ইংল্যান্ডের রাজা জর্জ দ্য থার্ডের প্রতীক (যেটা গাইড হাতে করে এনে দেখাচ্ছেন)। স্বাধীনতার ঘোষণা হওয়ার পর সেটি নামিয়ে সেখানে টাঙানো হয় স্বাধীন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রতীক।’

বিকেল চারটার দিকে আমরা পৌঁছালাম ফিলাডেলফিয়া শহরে। ইতিহাসে ভরা এই জমজমাট মহানগরীর নাম প্রথম শুনেছিলাম টম হ্যাঙ্কসের প্রথম অস্কারজয়ী সিনেমা ‘ফিলাডেলফিয়া’র কল্যাণে। তাঁর সঙ্গে ছিলেন আন্তোনিও ব্যান্দেরাসও। পরে আরও অনেক সিনেমায় এই শহরের নাম শুনেছি। কিন্তু আমেরিকানদের কাছে ফিলাডেলফিয়ার গুরুত্ব অন্য কারণে।

হাজার হাজার মাইল দূরে থাকা একটি দ্বীপ ইংল্যান্ড যে তাদের ভাগ্যের নিয়ন্তা হতে পারে না, সেই বৈপ্লবিক ধারণা এখানেই শক্ত ভিত্তি পায়। চূড়ান্ত রূপরেখা হিসেবে স্বাধীনতার ঘোষণা এবং সংবিধান রচনা হয়েছিল এখানেই। তাই আমেরিকা ভ্রমণের শুরুতেই আমাদের এখানে নিয়ে এসেছেন আশরাফ ভাইয়া।

ইন্ডিপেনডেন্স হলের ভেতরে। ছবি লেখকের সৌজন্যে
ইন্ডিপেনডেন্স হলের ভেতরে। ছবি লেখকের সৌজন্যে

বড় শহরে গেলে প্রথম চিন্তা থাকে গাড়ি কোথায় পার্ক করব। সেই ঝামেলা চুকিয়ে প্রথমেই দেখতে গেলাম স্বাধীনতার ঘণ্টা ‘লিবার্টি বেল’। গল্পে বলা হয়, ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই স্বাধীনতা ঘোষণাপত্র পাঠের পরপরই এই ঘণ্টাধ্বনির আওয়াজে ইংরেজ শাসন থেকে মুক্ত হওয়ার দ্রোহের মন্ত্র ছড়িয়ে গিয়েছিল সারা মহাদেশে। তবে ইতিহাস বলছে, ঘণ্টা বাজানো হয়েছিল ৮ জুলাই! কিন্তু নানা কারণে, গল্পে, প্রোপাগান্ডায় চালু হয়ে গেছে ৪ জুলাইয়ের কথা।

ইনডিপেনডেন্স ন্যাশনাল হিস্টোরিক্যাল পার্কের লিবার্টি বেল সেন্টারে রাখা আছে এই বিখ্যাত ঘণ্টা। দেয়ালে সুন্দর ম্যুরাল আঁকা, কালো মানুষের মুক্তির গানও সেখানে শোনা যায়। দর্শনার্থীরা এর মাঝে লাইন ধরে ঘণ্টা দেখে সেই স্বাধীনতা ইতিহাসের সাক্ষী হতে আসে।

মাঝারি আকারের ঘণ্টা। মস্কোর জার বেলের মতো বিশালও না। তবে এতে স্পষ্ট একটি ফাটল আছে। ১৭৫২ সালে লন্ডনে প্রায় ৯০০ কেজি ওজনের এই ঘণ্টা তৈরি হয়। ফিলাডেলফিয়ায় আনার পরপরই এতে ফাটল ধরে। কয়েকবার মেরামত করা হলেও শেষ পর্যন্ত এভাবেই রেখে দেওয়া হয়েছে। এখন এটি স্বাধীনতার প্রতীক। ডাকটিকিট, পোস্টার, বই—সবখানেই এর সরব উপস্থিতি।

লিবার্টি বেল। ছবি লেখকের সৌজন্যে
লিবার্টি বেল। ছবি লেখকের সৌজন্যে

এরপর আমরা গেলাম ইন্ডিপেনডেন্স হল দেখতে। টিকিট কাটতে গিয়ে মজার জিনিস জানা গেল। বিকেল ৫টা থেকে ৭টার মধ্যে এখানে টিকেট লাগে না। ফ্রি গাইডেড ট্যুর পাওয়া যায়। এখন শুধু ধৈর্য ধরে অপেক্ষার পালা।

ইন্ডিপেনডেন্স হলের সামনে জর্জ ওয়াশিংটনের প্রমাণ আকারের ভাস্কর্য। পাথরে খোদাই করে লেখা আছে কোথায় আব্রাহাম লিংকন দাঁড়িয়ে পতাকা উড়িয়েছিলেন, কোথায় জন এফ কেনেডি ভাষণ দিয়েছিলেন ইত্যাদি।

দীর্ঘ লাইন পেরিয়ে অবশেষে আমাদের পালা এল। একেকটা দল ভেতরে গিয়ে ১০-১৫ মিনিট সময় পাচ্ছে। ভেতরে দুইটি কক্ষ। প্রথমটির কথা তো শুরুতেই পড়লেন। কী দারুণ রোমাঞ্চকর এক জায়গা। যেন দেখতে পাচ্ছি জর্জ ওয়াশিংটন, টমাস জেফারসন, বেঞ্জামিন ফ্রাংকলিন, জন অ্যাডামস সদলবলে আলোচনা করে যাচ্ছেন মুক্তির মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে। রচিত হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান, চলছে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্ততি।

গাইড বলে যাচ্ছে সেই ঝঞ্জাময় সময়ের কথা। তখন কেউ জানত না ভবিষ্যতে কী হবে।। কিন্তু সবাই মুক্ত হতে চায় দূরদেশের শাসন থেকে, সাহসী পদক্ষেপ দিয়ে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত