জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

নতুন বিশ্বব্যবস্থার সন্ধিক্ষণে: সভ্যতাভিত্তিক রাজনীতির উত্থান ও আগামীর চ্যালেঞ্জ

প্রকাশ : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৬: ৫৬
স্ট্রিম গ্রাফিক

স্যামুয়েল হান্টিংটনের ‘সভ্যতার সংঘাত’ তত্ত্ব আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আলোচনায় দীর্ঘদিন ধরে অন্যতম বিতর্কিত ধারণা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এই তত্ত্বে বলা হয়, স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর বিশ্ব রাজনীতির সংঘাত আর কমিউনিজম বনাম পুঁজিবাদের মতো মতাদর্শভিত্তিক থাকবে না। বরং বড় বড় সভ্যতার সাংস্কৃতিক বিভাজন রেখা বরাবর নতুন সংঘাত তৈরি হবে। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, এই ধারণা ভুল ছিল না, শুধু সময়ের আগে প্রকাশিত হয়েছিল।

ইতিহাসবিদ এবং বার্গগ্রুয়েন ইনস্টিটিউটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধান অপারেটিং অফিসার নিলস গিলম্যান জানিয়েছেন, বর্তমান বিশ্বরাজনীতি এক গভীর রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আমরা এমন একটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি, যা ১৯১৯, ১৯৪৫ কিংবা ১৯৮৯ সালের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। এসব সময়ের মতোই বর্তমানেও বিশ্বব্যস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে। পুরোনো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং নতুন এক ব্যবস্থার জন্ম হচ্ছে। ১৯৯০-র দশকে গড়ে ওঠা উদার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার অবসান এখন বাস্তবতা হয়ে উঠছে।

এই প্রেক্ষাপটেই আবারও আলোচনায় এসেছে স্যামুয়েল হান্টিংটনের বিখ্যাত ‘সভ্যতার সংঘাত’ তত্ত্ব। তিনি-সহ সাম্প্রতিক অনেক ইতিহাসবিদের মতে, এই ধারণা ভুল ছিল না; বরং এটি সময়ের আগেই ভবিষ্যতের বাস্তবতা ইঙ্গিত করেছিল।

ইতিহাসও দেখায়, প্রতিটি বড় পরিবর্তনের আগে পুরোনো ব্যবস্থা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। পরে হঠাৎ করেই তা ভেঙে পড়ে। তখনকার মানুষ সব সময় বিষয়টি স্পষ্টভাবে বুঝতে পারেন না। কিন্তু পরে ফিরে তাকালে দেখা যায়, নতুন ব্যবস্থার বীজ অনেক আগেই রোপিত হয়েছিল।

ফুকুয়ামার ‘ইতিহাসের সমাপ্তি’ বনাম হান্টিংটনের ‘সভ্যতার সংঘাত’ তত্ত্ব

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের শেষ বড় পুনর্বিন্যাসের সময় সবচেয়ে আলোচিত বিতর্ক ছিল ফ্রান্সি ফুকুইয়ামার ‘ইতিহাসের সমাপ্তি’ এবং স্যামুয়েল হান্টিংটনের ‘সভ্যতার সংঘাত’ ধারণাকে ঘিরে।

ফুকুয়ামার ধারণাটি বার্লিন প্রাচীর পতনের মাত্র কয়েক মাস আগে এক প্রবন্ধে প্রকাশিত হয়েছিল। পরে এটি বই আকারে প্রকাশিত হয় ‘দ্য এন্ড অব হিস্টোরি অ্যান্ড দ্য লাস্ট ম্যান’-এ। হান্টিংটনের ধারণা তার চার বছর পর প্রকাশিত হয় এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আলোচনায় বড় বিতর্ক তৈরি করে।

ফুকুয়ামার মতে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর উদার গণতন্ত্র ও বাজার অর্থনীতি মানব শাসনের চূড়ান্ত রূপ হয়ে উঠেছে। তাঁর ধারণায় ভবিষ্যৎ হবে শান্তিপূর্ণ। গণতান্ত্রিক দেশগুলোর মধ্যে বড় যুদ্ধ থাকবে না। সংঘাত কমে গিয়ে প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় সীমাবদ্ধ থাকবে। তিনি আশা করেছিলেন, রাশিয়া ও চীন ধীরে ধীরে উদার গণতন্ত্রের পথে আসবে এবং বৈশ্বিক ব্যবস্থায় একীভূত হবে।

তবে ফুকুয়ামা নিজেই স্বীকার করেছিলেন, ‘ইতিহাসের সমাপ্তি’ ধারণা বিশ্বের বাস্তব অবস্থা নিয়ে সরাসরি বক্তব্য নয়। এটি ছিল উদার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের ন্যায্যতা ও কার্যকারিতা নিয়ে একটি নীতিগত যুক্তি। সে সময় উদারপন্থীরা এই ধারণাকে সমর্থনযোগ্য মনে করেছিলেন।

শতাব্দীর শুরুতে অনেকেই মনে করেছিলেন যে ফুকুয়ামার ধারণা বাস্তবতাতেও সত্যি হচ্ছে। তারা বরিস ইয়েলতসিনের রাশিয়া এবং জিয়াং জেমিন-এর চীনে কিছু সংস্কার দেখে বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে উদার গণতন্ত্রের পথই ভবিষ্যৎ।

হান্টিংটন এই ধারণার সঙ্গে একমত ছিলেন না। তিনি ও ফুকুয়ামা দুজনই মনে করতেন, ঠান্ডা যুদ্ধের পূর্ব-পশ্চিম বিভাজন এবং উত্তর-দক্ষিণ অর্থনৈতিক বিভাজন আর আগের মতো প্রাসঙ্গিক থাকবে না। কিন্তু ফুকুয়ামা যেখানে ভবিষ্যৎকে উদার গণতন্ত্র ও বাজার ভিত্তিক পুঁজিবাদের ভিত্তিতে স্থায়ী শান্তির দিকে এগোবে বলে মনে করেছিলেন, সেখানে হান্টিংটন ভিন্ন ভবিষ্যৎ কল্পনা করেছিলেন। তার মতে সংঘাত শেষ হবে না। বরং নতুন ধরনের বিভাজনের ভিত্তিতে তা চলতে থাকবে।

হান্টিংটনের মতে নতুন বিশ্ব রাজনীতির প্রধান শক্তি হবে ‘সভ্যতা’। তিনি এই ধারণা গ্রহণ করেন ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ আর্নল্ড জে টয়েনবি-র বহু খণ্ডের গ্রন্থ অ্যা স্টাডি অব হিস্টোরি থেকে। হান্টিংটনের ভাষায় সভ্যতার মধ্যে থাকা ‘ফল্ট লাইন’ বা বিভাজন রেখাগুলোই ভবিষ্যৎ সংঘাতের কেন্দ্র হবে। তাঁর মতে ভবিষ্যতে সভ্যতার পরিচয় আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বিশ্বের প্রধান সংঘাতগুলো পশ্চিমা, কনফুসীয়, জাপানি, ইসলামি, হিন্দু, স্লাভিক-অর্থডক্স, লাতিন আমেরিকান এবং সম্ভাব্য আফ্রিকান সভ্যতার মধ্যে ঘটবে। এই সংঘাত হবে সাংস্কৃতিক বিভাজন রেখা বরাবর।

হান্টিংটনের ধারণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ‘ইউনিভার্সালিজম’ বা একক বৈশ্বিক মূল্যবোধের ধারণা প্রত্যাখ্যান করা। তিনি মনে করতেন, সাংস্কৃতিক পার্থক্য অস্বীকার করলে সংঘাত বাড়বে। কিন্তু যদি সভ্যতাগুলো একে অপরের প্রভাবক্ষেত্রকে সম্মান করে, তাহলে একটি স্থিতিশীল বহুমেরু বিশ্ব তৈরি হতে পারে। তিনি বিশ্বাস করতেন, সভ্যতাভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা বিশ্বযুদ্ধ প্রতিরোধের একটি কার্যকর উপায় হতে পারে।

১৯৯৩ সালে হান্টিংটন প্রথম এই ধারণা উপস্থাপন করেন ফরেইন অ্যাফেয়ার্সে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে। পরে ১৯৯৬ সালে এটি বিস্তৃত আকারে প্রকাশিত হয় তার বই ‘দ্য ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশনস অ্যান্ড দ্য রিমেকিং অব ওয়ার্ল্ড অর্ডার’-এ।

হান্টিংটনের ভবিষ্যৎচিত্র ছিল ফুকুয়ামার তুলনায় অনেক বেশি অন্ধকার। তবে দুজনেই কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। ফুকুয়ামা তার প্রবন্ধের শেষে বলেন, স্থায়ী শান্তির মূল্য হতে পারে একঘেয়ে জীবন। আদর্শবাদী সংগ্রামের জায়গা নেবে অর্থনৈতিক হিসাব, প্রযুক্তিগত সমস্যা সমাধান এবং ভোক্তা চাহিদা পূরণ। তিনি আশঙ্কা করেছিলেন যে ‘একঘেয়ে শতাব্দী’ মানুষের জীবনে অর্থহীনতার সংকট তৈরি করতে পারে।

অন্যদিকে হান্টিংটনের মতে সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা দলগত পরিচয় দীর্ঘস্থায়ী। ঠান্ডা যুদ্ধের মতাদর্শিক কাঠামো দুর্বল হলে এসব পরিচয় আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে। তিনি ‘সভ্যতাভিত্তিক রাষ্ট্র’ ধারণাও তুলে ধরেন। এতে নেতারা সাংস্কৃতিক পরিচয়কে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক শক্তি সংগঠিত করেন। এটি ২০শ শতকের মতাদর্শভিত্তিক রাজনীতির বিপরীত। ১৯৯৬ সালের বইয়ে তিনি ‘কোর স্টেট’ বা কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রের ধারণা দেন। এই রাষ্ট্রগুলো নিজেদের সভ্যতার প্রভাববলয়ে আধিপত্য বজায় রাখবে।

হান্টিংটিন বলেন, সভ্যতার সংঘর্ষ বিশ্বশান্তির জন্য বড় হুমকি হতে পারে। কারণ সাংস্কৃতিক পার্থক্যকে গুরুত্ব দিলে শত্রুতা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। তিনি আরও ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে অভিবাসনবিরোধী মনোভাব অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

তবে তিনি একই সঙ্গে বলেন, যদি সভ্যতাগুলো অন্য সভ্যতার ওপর নিজেদের সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা না করে, তাহলে সভ্যতাভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা বিশ্বযুদ্ধ প্রতিরোধে সহায়ক হতে পারে। তাঁর মতে সংঘাত অনিবার্য হলেও তা সব সময় যুদ্ধের রূপ নাও নিতে পারে। এটি কখনো কেবল উত্তেজনাপূর্ণ প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।

হান্টিংটনের ধারণা ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। ইতিহাসবিদ ও নৃবিজ্ঞানীরা বলেন, সভ্যতার ধারণা অস্পষ্ট এবং পরিবর্তনশীল। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা দেখান, অনেক বড় সংঘাত সভ্যতার ভেতরেই ঘটে। যেমন সুন্নি-শিয়া সংঘাত বা আফ্রিকার বিভিন্ন যুদ্ধ। উদারপন্থীরা এই তত্ত্বকে নৈতিকভাবে সমস্যাজনক মনে করেন।

স্নায়ু যুদ্ধের পর প্রথম দুই দশক বিশ্বব্যবস্থা মূলত ফুকুয়ামার নীতিগত কাঠামোর মধ্যেই পরিচালিত হয়। ১৯৯০–এর দশকের মাঝামাঝি থেকে ২০১০–এর দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত অধিকাংশ দেশ উদার আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে চলার চেষ্টা করে। ইউরোপ একীভূত হওয়ার পথে এগোয় ইইউর মাধ্যমে। বাণিজ্য বিরোধ নিষ্পত্তি হয় বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার মাধ্যমে।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক আদালত প্রতিষ্ঠিত হয়। এসব উদ্যোগ উদার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার শক্তি ও প্রভাবের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হয়।

সাম্প্রতিক বিশ্ব পরিস্থিতি ও ‘সভ্যতার সংঘাত’ ধারণার নতুন গুরুত্ব

১৯৯০-র দশকে বলকান, ২০০৩ সালে ইরাক এবং ২০১১ সালে লিবিয়ায় যুদ্ধ শুরু করার সময় যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক কোনো সংস্থার আইনি সমর্থন নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। কখনো জাতিসংঘ, কখনো ন্যাটো-র অনুমোদন চাওয়া হয়েছিল। যদিও বিরোধিতা থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেনি। তবুও তারা আন্তর্জাতিক নিয়মের প্রতি আনুগত্যের একটি বার্তা দিতে চেয়েছিল।

সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জর্জ ডাব্লিউ বুশ বারবার জোর দিয়ে বলেন, সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ এবং ইরাকে শাসন পরিবর্তনের অভিযান কোনো সভ্যতার সংঘাত নয়। তার বক্তব্য ছিল, নারী-পুরুষের মৌলিক অধিকার সবার জন্য এক। স্বাধীনতার প্রয়োজন আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা এবং পুরো ইসলামি বিশ্বে সমানভাবে প্রযোজ্য। ইসলামি দেশগুলোর মানুষও অন্য দেশের মানুষের মতো একই সুযোগ ও স্বাধীনতা চায় এবং তাদের সরকারকে সেই আশা শুনতে হবে।

স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থায় রাশিয়া ছিল সবচেয়ে বড় ভূরাজনৈতিক ক্ষতিগ্রস্ত দেশ। তাই এটি ছিল সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ সমালোচকও। তবুও শুরুতে রাশিয়া নতুন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রতি কিছুটা শ্রদ্ধা দেখায়। প্রতিবেশী অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করলেও তারা আনুষ্ঠানিকভাবে সেসব অঞ্চল সংযুক্ত করেনি। ১৯৯২ সালের পর মলদোভা থেকে ট্রান্সনিস্ট্রিয়া এবং ২০০৮ সালের পর জর্জিয়া থেকে আবখাজিয়া ও দক্ষিণ ওসেটিয়া কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়। তবে এগুলো আইনগতভাবে সংযুক্ত করা হয়নি। এটি দেখায় যে নতুন আন্তর্জাতিক নিয়মের প্রতি একটি ন্যূনতম আনুগত্য তখনও বজায় ছিল।

ফুকুয়ামার দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, প্রতিটি যুগের ভেতরেই পরবর্তী যুগের বীজ লুকিয়ে থাকে। ২০১০-এর দশকের শুরুতে উদার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভেতরে ফাটল দেখা দিতে শুরু করে। নতুন উদীয়মান শক্তিগুলো নিজেদের সভ্যতার পরিচয়ের ভিত্তিতে বিশ্ব রাজনীতিতে অবস্থান নিতে শুরু করে।

১৯৯০-র দশকে সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার মতো কিছু দেশ ‘এশীয় মূল্যবোধ’ ধারণা প্রচার করেছিল। কিন্তু ২০১৪ সালের দিকে পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভ্লাদিমির এবং শি জিনপিং প্রকাশ্যে বলতে শুরু করেন যে রাশিয়া ও চীন নিজস্ব মূল্যবোধসম্পন্ন পৃথক সভ্যতা। তাদের মতে এই মূল্যবোধ পশ্চিমা গণতন্ত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং অনেক ক্ষেত্রে শ্রেয়।

২০১৪ সাল এখন একটি মোড় পরিবর্তনের বছর হিসেবে বিবেচিত হয়। ওই বছর রাশিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে ক্রিমিয়া দখল করে নেয়। এটি ছিল আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান নীতি বলপ্রয়োগ করে সীমান্ত পরিবর্তন না করার নীতিকে সরাসরি অস্বীকার। পুতিন এই পদক্ষেপকে ‘রাশিয়ান বিশ্ব’ রক্ষার নামে সভ্যতাগত যুক্তিতে ব্যাখ্যা করেন।

একই বছরে ভারতের রাজনীতিতেও বড় পরিবর্তন আসে। নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি ক্ষমতায় আসে। তাদের হিন্দুত্ব মতাদর্শ ভারতকে একটি হিন্দু সভ্যতাভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপন করে। এতে ধর্মীয় পরিচয় রাজনীতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

চীনে শি জিনপিং-এর নেতৃত্বে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দেখা যায়। চীন আর উদার গণতন্ত্রের দিকে ধীরে ধীরে এগোবে—এই ধারণা দুর্বল হয়ে পড়ে। বরং চীন নিজস্ব আদর্শিক অবস্থান আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে শুরু করে। ফলে গণতন্ত্র বিস্তারের ‘তৃতীয় ঢেউ’ ধারণা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়।

ইতিহাসবিদ নিলস গিলম্যান বলেন, এই দৃষ্টিকোণ থেকে গত ২৫ বছরকে হান্টিংটনের পূর্বাভাসের প্রস্তুতিপর্ব হিসেবে দেখা যায়। তিনি ভুল ছিলেন না; বরং তাঁর ধারণা সময়ের আগে প্রকাশ পেয়েছিল। উদার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভেতরে যে দ্বন্দ্ব জমে উঠছিল, তিনি সেটিই আগেই শনাক্ত করেছিলেন। গত এক দশকে সেই দ্বন্দ্ব স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে।

১৯৯০-র দশকের উদার আন্তর্জাতিক আশাবাদের দৃষ্টিকোণ থেকে বর্তমান সময়কে অনেকেই ‘হান্টিংটনের প্রত্যাবর্তন’ হিসেবে দেখছেন। উদার গণতন্ত্র ও বৈশ্বিক পুঁজিবাদের পক্ষে সর্বজনীন ঐকমত্যের স্বপ্ন এখন দুর্বল হয়ে পড়েছে। মস্কো, বেইজিং, দিল্লি, ইস্তাম্বুল এবং ওয়াশিংটন—সব জায়গায় সভ্যতাভিত্তিক রাজনীতি শক্তিশালী হচ্ছে।

নতুন বিশ্বব্যবস্থায় সাহসী ও দৃঢ় নেতৃত্ব বেশি গুরুত্ব পাবে। নমনীয় ও নিয়মমাফিক আচরণ তুলনামূলকভাবে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা হবে আরও প্রতিযোগিতামূলক ও সংঘাতপূর্ণ। এখানে কঠোরতা পুরস্কৃত হতে পারে, আর দুর্বলতা কাজে লাগানো হতে পারে। অনেকের মতে, এই বাস্তবতা দেখেই হান্টিংটনের ধারণা আজ নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

নিলস গিলম্যান বলেন, পুরোনো ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন ব্যবস্থার রূপ নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য কী হবে—এটাই এখন মূল আলোচ্য বিষয়। ধারণা করা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে শূন্য-সম প্রতিযোগিতা–মানে এক পক্ষের লাভ মানেই অন্য পক্ষের ক্ষতি বাড়বে। শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো নিজেদের ক্ষমতা আরও জোরালোভাবে প্রয়োগ করবে। জাতীয় পরিচয় ও সভ্যতাভিত্তিক রাজনীতি গুরুত্ব পাবে। তবে নতুন বিশ্বব্যবস্থা আগের মতো একমেরু হবে না। বার্লিন প্রাচীর পতনের পর যুক্তরাষ্ট্র একক প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে উঠে এসেছিল। এখন সেই পরিস্থিতি বদলে যাচ্ছে। ভবিষ্যতের বিশ্ব হবে আরও ভারসাম্যপূর্ণ, কিন্তু একই সঙ্গে আরও প্রতিযোগিতামূলক।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত