নতুন বছর মানেই কেবল ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে যাওয়া নয়; এটি মানবসভ্যতার জন্য পেছনে তাকিয়ে শেখার, সামনে তাকিয়ে নতুন করে ভাবার সময়। যুদ্ধ, সংঘাত, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, জলবায়ু বিপর্যয় ও রাজনৈতিক মেরুকরণে ক্লান্ত মানবসভ্যতা নতুন বছরে যে প্রত্যাশাটি সবচেয়ে বেশি করে, তা হলো শান্তি। ২০২৬ সালের সূচনায় দাঁড়িয়ে এই প্রত্যাশা যেমন বৈশ্বিক, তেমনি গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক বাংলাদেশের জন্যও। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, ন্যায়বিচার, কাজের সুযোগ, মুক্ত গণমাধ্যম, ভোটের অধিকার, মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে মুক্তি এবং সম্মানজনক জীবনের নিশ্চয়তা এখন বাংলাদেশের গণমানুষের প্রধান চাওয়া।
রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বৈশ্বিক অর্থনীতি
গত কয়েক বছরে ইউরোপ থেকে মধ্যপ্রাচ্য-যুদ্ধের ডামাডোলে বিশ্বব্যবস্থা নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, এই যুদ্ধের ফলে শুধু ইউরোপেই কয়েক কোটির বেশি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপে পড়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘসূত্রতা যেমন ইউরোপের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনীতিকে চাপের মুখে ফেলেছে, তেমনি গাজা ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত মানবিক বিপর্যয়কে আরও গভীর করেছে। লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত, শিশুদের শিক্ষা বন্ধ, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়া—এই দৃশ্য কেবল একটি অঞ্চলের নয়, পুরো বিশ্বের নৈতিক ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবিও বটে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেল-গ্যাসের দাম বেড়ে যায়। বাংলাদেশ যুদ্ধের ময়দান না হলেও আমদানিনির্ভর হওয়ায় এর সরাসরি প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন ও শিল্প উৎপাদনে। ২০২২ সালে সরকার জ্বালানি তেলের বড় মূল্যবৃদ্ধি করে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, ওই সময়ে ডিজেল ও কেরোসিনে ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ এবং অকটেন ও পেট্রোলে ৫১ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি করেছিল সরকার, যা সার্বিকভাবে দ্রব্যমূল্য বাড়ার একটি বড় কারণ ছিল। এলএনজির স্পট দামে যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে বড় লাফ দেখা যায়। বাংলাদেশের পক্ষে স্পট মার্কেট থেকে কেনা কঠিন হয়ে পড়ে, ফলে গ্যাস ও বিদ্যুৎ-সংকটে লোডশেডিং বেড়ে যায়।
এদিকে শান্তির আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী শক্তিগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও ভূরাজনৈতিক স্বার্থের সংঘাতে বহু উদ্যোগই ফলপ্রসূ হয়নি। নতুন বছরে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, কূটনীতির ভাষা যেন আবার মানুষের জীবনের ভাষায় ফিরে আসে।
জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আঞ্চলিক জোটগুলো সংঘাত নিরসনে সক্রিয় হতে চাইছে। বারবার সতর্ক করা হচ্ছে যে অব্যাহত সহিংসতা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও যুদ্ধনীতির গুরুতর লঙ্ঘনের ঝুঁকি তৈরি করছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, আঞ্চলিক জোটগুলোর সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে কি সত্যিই মানুষ? নাকি কোনো মহাশক্তিধর দেশ বা জোটের স্বার্থ?
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনা মহামারি-পরবর্তী সময়েও বিশ্ব অর্থনীতি পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়নি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সুদের হার বৃদ্ধি, জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দামে অস্থিরতা—সব মিলিয়ে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের জীবন চাপে পড়েছে। উন্নত বিশ্বে যেমন জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে, তেমনি উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বৈদেশিক ঋণ ও মুদ্রার অবমূল্যায়ন নতুন সংকট তৈরি করেছে।
বাংলাদেশ গমের চাহিদার বড় একটি অংশ আমদানি করে। আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইএফপিআরআই জানিয়েছে, বাংলাদেশে গমের আমদানির পরিমাণ ৮০ শতাংশেরও বেশি। যুদ্ধ, বাণিজ্য বাধা ও লজিস্টিক শকের কারণে আমদানির উৎস দেশ বদলাতে হয়, যার প্রভাব পড়ে খাদ্যমূল্যের ওপর। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা ও লোহিত সাগর (রেড সি) রুট ঝুঁকিতে থাকায় এশিয়া-ইউরোপ শিপিংয়ে সময় ও ভাড়া বেড়েছে। ফলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য রপ্তানিতে লিড টাইম, কনটেইনার সংকট ও ফ্রেইট সারচার্জের মতো সমস্যা বাড়ার কথা বিশেষজ্ঞরা তাঁদের বিশ্লেষণে উল্লেখ করেছেন। নতুন বছরে বৈশ্বিক প্রত্যাশা—অর্থনীতি যেন কেবল সূচকের ভাষায় না চলে মানুষের দৈনন্দিন বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেয়।
জলবায়ু সংকট
জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর আশঙ্কা নয়, এটিই বাস্তবতা। দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপাঞ্চলে চরম তাপপ্রবাহ, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও খরার তীব্রতা বেড়েছে। উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে ঘূর্ণিঝড় ও জমিতে লবণাক্ততা বাড়ছে। ফলে খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির মুখে।
বড় দেশগুলো ও বিশ্বনেতারা কার্বন নিঃসরণ কমানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবায়নের গতি ধীর। নতুন বছরে মানুষের প্রত্যাশা তাই তাঁদের প্রতি আরও বেশি। উন্নয়নের নামে প্রকৃতি ধ্বংস নয়, টেকসই পথই একমাত্র বিকল্প হতে পারে জলবায়ু সংকট মোকাবিলায়।
রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশ
নতুন বছরে বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে এক সংবেদনশীল রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে। নির্বাচন, শাসনব্যবস্থা ও গণতান্ত্রিক চর্চা নিয়ে দীর্ঘ আন্দোলনের ভেতর সাধারণ মানুষের চাওয়া খুব সরল—সহিংসতামুক্ত ও স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও সামাজিক স্থিতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। ফলে গণমানুষের প্রত্যাশা, রাজনৈতিক সহিংসতা ও অনিশ্চয়তা যেন তাদের দৈনন্দিন জীবনকে অনিরাপদ না করে ফেলে। বিশেষ করে জুলাই আন্দোলনের পর ৫ আগস্ট-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতিতে তরুণদের অংশগ্রহণ ও বিভিন্ন দলের আত্মপ্রকাশ একই সঙ্গে যেমন একটি নতুন বন্দোবস্তের স্বপ্ন দেখিয়েছে, তেমনি নানা রাজনৈতিক স্যাবোটাজের ঘটনা গণমানুষের আস্থায় আঘাতও করেছে। গণমানুষের প্রত্যাশা এমন রাজনীতি, যেখানে ভিন্নমত থাকবে কিন্তু সহিংসতা নয়; প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে কিন্তু প্রতিহিংসা নয়।
অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ন্যায়বিচার
মূল্যস্ফীতি, নিত্যপণ্যের দাম ও কর্মসংস্থান—এই তিনটি ইস্যু এখন বাংলাদেশের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তৈরি পোশাকশিল্প বৈদেশিক আয়ের প্রধান উৎস হলেও বৈশ্বিক মন্দার চাপ সেখানে স্পষ্ট। একই সঙ্গে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে। ইউএসএআইডির সহায়তা তহবিল বন্ধ হওয়ার কারণে বাংলাদেশের উন্নয়ন খাতে (ডেভেলপমেন্ট সেক্টর) লাখ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়েছে। প্রবাসী আয় অর্থনীতির জন্য কিছুটা স্বস্তি আনলেও গ্রাম ও শহরের দরিদ্র মানুষের জীবনযাত্রা এখনো উদ্বেগজনক।
নতুন বছরে তাই প্রত্যাশা—মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কৃষক ও শ্রমজীবীদের ন্যায্য পারিশ্রমিক এবং মানুষের জন্য দক্ষতাভিত্তিক কাজের সুযোগ সৃষ্টি।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা—এই খাতগুলোতে কিছুটা অগ্রগতি থাকলেও তা উল্লেখযোগ্য নয়। তরুণ প্রজন্ম তথ্যপ্রযুক্তি ও ফ্রিল্যান্সিংয়ে এগিয়ে থাকলেও দেশের ভেতরে কর্মসংস্থানের অভাব তাদের হতাশ করে। একই সঙ্গে আছে সামাজিক স্বীকৃতির অভাব। নারী ক্ষমতায়নে কিছুটা সাফল্য থাকলেও উল্লেখযোগ্য হারে সহিংসতা ও বৈষম্যের ঘটনা কমানো যায়নি। আইনের শাসন যেন শুধু মুখে নয়, বাস্তবেও দেখা যায়। ন্যায়বিচার যেন প্রভাবশালীদের জন্য আলাদা না হয়—এটিই নতুন বছরে মানুষের প্রত্যাশা।
আঞ্চলিক রাজনীতি, শান্তিরক্ষা মিশন ও জলবায়ু আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে বাংলাদেশ। শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অবদান আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। নতুন বছরে প্রত্যাশা, এই বৈশ্বিক ভূমিকা যেন দেশের ভেতরের শান্তি ও ন্যায়বিচারের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। বাংলাদেশ শান্তিরক্ষা মিশনে যে পেশাদারত্ব, শৃঙ্খলা, মানবিকতা এবং নিয়মকানুন মেনে কাজ করার মানদণ্ড তৈরি করেছে, দেশের ভেতরেও যেন সেই একই মানদণ্ডে দল-মত-নির্বিশেষে সবার জন্য একই আইন প্রয়োগ করা হয়। আটক বা জিজ্ঞাসাবাদে আইনগত প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ, জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং কমিউনিটি ট্রাস্ট গড়ে তোলার মাধ্যমে রাষ্ট্রযন্ত্র যেন গণমানুষের আস্থার প্রতীক হয়ে ওঠে।
নতুন বছরে প্রত্যাশা
গ্রামের কৃষক থেকে শহরের তরুণ, পোশাকশ্রমিক থেকে প্রবাসী—সবাই চায় একটি নিরাপদ জীবন, সম্মানজনক কাজ ও সুন্দর ভবিষ্যৎ। গণমানুষের কাছে বিশ্বযুদ্ধ বা কূটনীতির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আজকের বাজারদর, আগামীকালের চাকরি বা পরশুর নিরাপত্তা। মানুষ প্রত্যাশা করে বিশ্বদরবারে বাংলাদেশ নিজের জন্য নতুন করে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করবে। তারা বিশ্বাস করে যুদ্ধের বদলে সংলাপ, বৈষম্যের বদলে ন্যায়বিচার, অস্থিরতার বদলে স্থিতিশীলতা এবং প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি মানবিকতা—এই পথেই শান্তি সম্ভব।
নতুন বছরের সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার হোক একটি শান্ত, স্থিতিশীল ও মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যৎ। ২০২৬ সালে বিশ্ববাসী ও বাংলাদেশের গণমানুষ একসঙ্গেই এই প্রত্যাশা বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। এই আশা পূরণ হোক—এটাই নতুন বছরের সবচেয়ে বড় কামনা।