দীর্ঘ দুই দশক পর নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে ফিরছে বিএনপি। নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান হবে আগামী মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) সকালে। একই দিন বিকেলে শপথ নেবেন নতুন সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্যরা। এরই মধ্যে রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে নতুন মন্ত্রিপরিষদ নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ। কে পাচ্ছেন কোন মন্ত্রণালয়, কার কাঁধে উঠছে গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের ভার—এসব জল্পনা-কল্পনার ডালপালা যখন মেলছে, ঠিক তখনই বারবার আলোচনায় আসছে একটি বিশেষ শব্দ: ‘টেকনোক্র্যাট’।
গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় মন্ত্রী হওয়ার প্রথাগত পথ হলো জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে সংসদ সদস্য হিসেবে সংসদে প্রবেশ করা। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনা একটি জটিল ও কারিগরি জ্ঞানসাপেক্ষ কাজ। অর্থনীতি, আইন, প্রযুক্তি, বিজ্ঞান কিংবা আন্তর্জাতিক কূটনীতির মতো বিষয়গুলো কেবল রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা বা বক্তৃতা দিয়ে সামলানো যায় না; এর জন্য প্রয়োজন বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান ও দক্ষতা।
ঠিক এই প্রয়োজন থেকেই সংবিধানে বিশেষ দরজার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যার মাধ্যমে ভোটের মাঠে লড়াই না করেও কেবল মেধা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনার শীর্ষ পদে আসীন হওয়া যায়। এদেরই বলা হয় ‘টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী’। মন্ত্রিসভায় কীভাবে টেকনোক্র্যাট নেওয়া হয়, কারা এরা, আর ঠিক কী কারণেই ভোটের লড়াইয়ে না নামা এই ব্যক্তিরা হয়ে ওঠেন সরকারপ্রধানের তুরুপের তাস—এমন হাজারো প্রশ্ন এখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
‘টেকনোক্র্যাট’ কাকে বলে?
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় ‘টেকনোক্র্যাট’ বলতে এমন এক শ্রেণির নীতিনির্ধারককে বোঝানো হয়, যারা রাজনৈতিক দলের মতাদর্শ বা জনসমর্থনের ভিত্তিতে নয়, বরং তাদের বিশেষায়িত জ্ঞান, কারিগরি দক্ষতা এবং পেশাগত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সরকারের উচ্চপদে নিয়োগ পান। ‘টেকনোক্র্যাট’ শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ—‘tekhne’ (যার অর্থ দক্ষতা বা শিল্প) এবং ‘kratos’ (যার অর্থ ক্ষমতা বা শাসন) থেকে।
একাডেমিক সংজ্ঞানুযায়ী, যখন কোনো অর্থনীতিবিদ, বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী বা অভিজ্ঞ আমলাকে কোনো নির্দিষ্ট সংকট মোকাবিলায় বা বিশেষ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং সেই ব্যক্তি কোনো রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় (নির্বাচন) নির্বাচিত নন, তখন তাঁকে টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী বলা হয়।
ফরাসি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জাঁ মেইনো ১৯৬৪ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘টেকনোক্ৰেসি’তে বলেন, টেকনোক্র্যাট হলো ক্ষমতার এমন এক উত্থান, যেখানে রাজনীতিবিদেরা সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভার বিশেষজ্ঞদের হাতে ছেড়ে দেন। মেইনো’র মতে, আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা এতটাই জটিল হয়ে পড়েছে যে, প্রথাগত রাজনীতিবিদদের পক্ষে সব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়; তাই রাষ্ট্রকে সচল রাখতে ‘টেকনিক্যাল র্যাশনালিটি’ বা কারিগরি যুক্তিবিদ্যার প্রয়োগ জরুরি হয়ে পড়ে।
সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার তাঁর ‘আমলাতন্ত্র’ তত্ত্বে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, রাষ্ট্র পরিচালনায় ভবিষ্যতে বিশেষায়িত জ্ঞানের কদর বাড়বে। তাঁর মতে, আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ‘র্যাশনাল-লিগ্যাল অথরিটি’ বা যৌক্তিক-আইনি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য নির্বাচিত আবেগী নেতার চেয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং নিরাবেগ বিশেষজ্ঞদের ভূমিকা অপরিহার্য হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্বরাজনীতিতে দেখা যায়, সাধারণত অর্থনৈতিক মহামন্দা বা জাতীয় বিপর্যয়ের সময় যখন ‘হার্ড চয়েস’ বা কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন হয়, তখনই রাজনৈতিক নেতারা জনপ্রিয়তার ঝুঁকি এড়াতে টেকনোক্র্যাট মন্ত্রীদের ওপর নির্ভর করেন।
বাংলাদেশের সংবিধানে টেকনোক্র্যাট মন্ত্রীর ধারণা আছে কি?
বাংলাদেশের সংবিধানে সরাসরি ‘টেকনোক্র্যাট’ শব্দটি নেই। তবে সংবিধানের ৫৬(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, একটি মন্ত্রিসভার ৯০ শতাংশ সদস্য অবশ্যই নির্বাচিত এমপি হবেন। কিন্তু সরকারপ্রধানের হাতে বাকি ১০ শতাংশ মন্ত্রী বাইরে থেকে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ও কারিগরি প্রয়োজন মেটাতে প্রধানমন্ত্রী এই ১০ শতাংশ কোটায় সাধারণত বিভিন্ন পেশাজীবী ও বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞদের নিয়োগ দিয়ে থাকেন। তবে এই সাংবিধানিক সুযোগটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে মেধার চেয়ে দলীয় আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়ার অভিযোগও বেশ পুরনো। প্রায়শই প্রকৃত যোগ্য ব্যক্তির বদলে দলের আস্থাভাজনদের নিয়োগ দেওয়া হয় বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে জোরালো সমালোচনা রয়েছে।
টেকনোক্র্যাট মন্ত্রীর যোগ্যতা কী?
অন্যান্য মন্ত্রীদের মতই টেকনোক্র্যাটদের আইনি যোগ্যতা—যেমন বয়স ২৫ বছর হওয়া, নাগরিকত্ব থাকা বা ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডিত না হওয়া—থাকতে হবে। তবে ক্ষমতার মসনদে বসলেও টেকনোক্র্যাট মন্ত্রীদের একটি সীমাবদ্ধতা আছে। সংবিধানের ৭৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, তাঁরা সংসদে বক্তব্য দিতে পারেন, বিতর্ক করতে পারেন, কিন্তু যখন ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের পালা আসে, তখন তাঁরা কেবল দর্শক। জনগণের ভোটে নির্বাচিত না হওয়ার কারণেই সংবিধান তাঁদের এই ‘ভোটাধিকার’ থেকে বঞ্চিত রেখেছে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে কারা ছিলেন টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী?
১৯৯১ সালে বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পর থেকে প্রায় প্রতিটি সরকারই টেকনোক্র্যাট মন্ত্রীদের ওপর ভরসা রেখেছে। ১৯৯১-১৯৯৬ মেয়াদে বিএনপি সরকার সেলিনা রহমান ও রিয়াজ রহমানের মতো ব্যক্তিদের টেকনোক্র্যাট কোটায় প্রতিমন্ত্রী করেছিল। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় আসে, তখন শেখ হাসিনা অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদের দায়িত্ব দিয়েছিলেন শাহ এ এম এস কিবরিয়াকে। তিনি একজন সফল কূটনীতিক ও অর্থনীতিবিদ ছিলেন এবং পুরো মেয়াদজুড়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি সামলানোর গুরুদায়িত্ব পালন করেছিলেন। ২০০১ সালের চারদলীয় জোট সরকার আমলেও আমরা রিয়াজ রহমানকে পুনরায় পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হিসেবে দেখেছি।
২০০৯-এর পরবর্তী সময়ে টেকনোক্র্যাট কোটার ব্যবহার আরও বিস্তৃত হয়। বামপন্থী রাজনীতিক দিলীপ বড়ুয়া থেকে শুরু করে আইনজীবী শফিক আহমেদ আইনমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এই কোটায়। প্রযুক্তিবিদ মোস্তাফা জব্বার এবং স্থপতি ইয়াফেস ওসমান যথাক্রমে ডাক ও টেলিযোগাযোগ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দায়িত্বে ছিলেন দীর্ঘ সময়। এমনকি ২০২৪-এর জানুয়ারিতে গঠিত স্বল্পস্থায়ী মন্ত্রিসভাতেও আমরা বার্ন স্পেশালিস্ট ডা. সামন্ত লাল সেনকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে দেখেছি।
বিশ্বরাজনীতিতে উজ্জ্বল টেকনোক্র্যাট কারা?
শুধু বাংলাদেশ নয়, উন্নত ও উন্নয়নশীল বিশ্বের বহু দেশে টেকনোক্র্যাট সরকার বা মন্ত্রীরা রাষ্ট্রকে বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করেছেন। ইতালির কথা ধরা যাক। ১৯৯০-এর দশকে যখন দেশটি ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে ধুঁকছিল, তখন ব্যাংক অব ইতালির সাবেক গভর্নর কার্লো আজেলিও চিয়াম্পি এবং পরে মারিও দ্রাঘি টেকনোক্র্যাট প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশের অর্থনীতিকে টেনে তুলেছিলেন। গ্রিসে ২০১০ সালের ঋণ সংকটের সময় লুকাস পাপাদেমোস দায়িত্ব নিয়েছিলেন। এমনকি ভারতের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্করও একজন টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী। তিনি দীর্ঘদিনের আমলা এবং কূটনীতিক জীবন শেষ করে সরাসরি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েছেন, কোনো নির্বাচনে জয়ী না হয়েই। সিঙ্গাপুরের উত্থানের পেছনেও লি কুয়ান ইউ-এর টেকনোক্র্যাটিক মানসিকতার সরকারব্যবস্থার বিশাল ভূমিকা ছিল।
টেকনোক্র্যাট ব্যবস্থার ভালো দিক কী?
টেকনোক্র্যাট নিয়োগের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো পেশাদারিত্ব। একজন নির্বাচিত এমপি হয়তো জনদরদী নেতা, কিন্তু তিনি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আইন বা জটিল সাইবার নিরাপত্তা নাও বুঝতে পারেন। সেখানে একজন বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞ বা ‘সাবজেক্ট ম্যাটার এক্সপার্ট’ অনেক দ্রুত ও কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তাঁরা সাধারণত জনপ্রিয়তার তোয়াক্কা করেন না, ফলে কঠিন বা অপ্রিয় কিন্তু প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া তাঁদের পক্ষে সহজ হয়।
টেকনোক্র্যাট ব্যবস্থার মন্দ দিক কী?
এই ব্যবস্থার অসুবিধার জায়গাও কম নয়। টেকনোক্র্যাট মন্ত্রীদের জনগণের প্রতি সরাসরি কোনো দায়বদ্ধতা থাকে না। তাঁরা নির্বাচনী ইশতেহার বা তৃণমূলের আবেগের সঙ্গে অনেক সময় সংযোগ রাখতে ব্যর্থ হন। ফলে তাঁদের নেওয়া সিদ্ধান্ত অনেক সময় সাধারণ মানুষের কাছে ‘আমলাতান্ত্রিক’ বা ‘জনবিচ্ছিন্ন’ মনে হতে পারে। তবে সবচেয়ে বড় সমালোচনার বিষয় হলো তাঁদের নিয়োগ প্রক্রিয়ার অস্পষ্টতা। প্রায়ই দেখা যায়, দলীয় অনুগত বিশেষায়িত জ্ঞানের অধিকারী ব্যক্তিকেই এইসব পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। ফলে অনেক ক্ষেত্রে এই মন্ত্রীরা নিরপেক্ষ পেশাদারিত্ব বজায় রাখার চেয়ে অন্ধ দলীয় আনুগত্য বা রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তিতেই বেশি মনোযোগী হয়ে পড়েন।
গণতন্ত্র ও দক্ষতা—এই দুইয়ের মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করাই হলো টেকনোক্র্যাট মন্ত্রিত্বের মূল দর্শন। সংবিধান প্রণেতারা বুঝেছিলেন, শুধু জনসমর্থন দিয়ে দেশ চালানো কঠিন, মাঝে মাঝে প্রয়োজন হয় বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের ছোঁয়া। বাংলাদেশে গত তিন দশকে আমরা দেখেছি টেকনোক্র্যাট মন্ত্রীদের সাফল্য ও ব্যর্থতা দুটোই।
আগামী দিনের রাজনীতিতেও যখন নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ—যেমন জলবায়ু পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা বৈশ্বিক মহামারি—সামনে আসবে, তখন রাজনৈতিক স্লোগানের চেয়ে টেকনোক্র্যাটদের বিজ্ঞানসম্মত সমাধানই হয়তো বেশি জরুরি হয়ে উঠবে। তাই ১০ শতাংশের এই সাংবিধানিক জানালাটি কেবল কোটা নয়, বরং এটি রাষ্ট্র পরিচালনায় মেধা ও মননশীলতা যুক্ত করার এক অনন্য সুযোগ।