জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

ভাষার ভেতর কীভাবে লেখা হয় জাতির ভবিষ্যৎ

স্মৃতি রুমানা
স্মৃতি রুমানা

প্রকাশ : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২১: ১৪
ভাষার ভেতর কীভাবে লেখা হয় জাতির ভবিষ্যৎ। ছবি: স্ট্রিম গ্রাফিক

শিশুরা যখন জীবনে প্রথমবার বই খুলে কালো কালো অক্ষরের দিকে তাকায়, তার সামনে নতুন একটা পৃথিবীর দরজা খুলে যায়। বইয়ের পাতায় সে যখন আঙুল রাখে, হালকা খসখস শব্দ হয়, সেই শব্দের ভেতর দিয়ে যেন একটি অদৃশ্য ক্ষমতা কথা বলা শুরু করে। সে ক্ষমতা ভাষার, ভাষা খুব ধীরে অথচ নিয়মিত এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে শিশুর কাছে একটা নতুনতর আস্বাদ নিয়ে আসে। পাঠ্যপুস্তকের বাংলা ভাষাই তাই শিশুর কাছে রাষ্ট্রের প্রথম কণ্ঠস্বর।

এই শিশু বই খোলার আগে, বাড়িতে, উঠোনে, গলিতে, মাঠে ভাষার মধ্যে ছিল। সে শব্দ শুনেছে, তর্ক শুনেছে, গান শুনেছে, গালিও শুনেছে, আদরও শুনেছে। ভাষা ছিল তার জীবনের গন্ধ। তারপর বই খুলে সে সেই প্রাত্যহিক ভাষা পায় না। পায় আরেক ভাষা, যে ভাষা আরও মসৃণ, পরিমিত আর নিয়মে বাঁধা। এই ভাষা তাকে শেখায়, ভাষা মানেই নিয়ম। আর নিয়ম মানে কর্তৃত্ব। কর্তৃত্ব মানে ভয়। কখনো খোলা ভয়, কখনো সূক্ষ্ম ভয়। সেই ভয়কে আমরা অনেক সময় ‘শৃঙ্খলা’ নামে সাজিয়ে দিই।

আমরা যদি বাংলাদেশের যেকোনো একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে ঢুকে যাই, দেখব শিশুরা সারিবদ্ধভাবে বেঞ্চে বসে আছে। কারও পা মাটি ছুঁয়েছে, কারও চোখ বাইরে দৌড়াচ্ছে। জানালা দিয়ে ঢুকে পড়া রোদ শিশুদের খোলাবইয়ের পাতায় পড়ে অক্ষরগুলো ঝিলমিল করে উঠছে। শিশুরা শব্দ করে পড়ছে বা পড়তে চেষ্টা করছে। কাঠের বেঞ্চে বসে থাকা সেইসব ভবিষ্যতের নাগরিকদের কৌতূহলী চোখ বইয়ের পাতায় আটকে আছে ঠিকই, কিন্তু চোখের সেই স্থিরতায় মন নেই। শিক্ষক উচ্চস্বরে পড়ছেন, ‘পরিবেশ সংরক্ষণের অপরিহার্যতা মানবজীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

আমরা যদি পাঠ্যবই থেকে শিক্ষকের পড়া এই বাক্যটি ভালো করে শুনি, উপলব্ধি করতে পারব, এই বাক্যে শব্দ আছে। অর্থ আছে, কিন্তু ভাষা যেন কোথাও নেই। যে বাংলায় তারা বাড়িতে কথা বলে, খেলতে খেলতে ঝগড়া করে, নদী-গাছ-আকাশের গল্প শোনে, সে বাংলা এই বইয়ের পাতায় অচেনা। শব্দগুলো বাতাসে ভাসে, কিন্তু শিশুদের মনে গিয়ে ঠেকে না। তারা শব্দ শোনে, বাক্য মুখস্থ করে, অথচ ভাষা তাদের আপন হয়ে ওঠে না। বই আছে, অক্ষর আছে, শুদ্ধতাও হয়তো আছে। কেবল হারিয়ে গেছে ভাষার উষ্ণতা।

একটি শিশু যখন বই খুলে নতুন একটা পৃথিবীতে প্রবেশ করার সীমানায় দাঁড়ায়, সেই মুহূর্তে আমরা ঠিক করে দিই—ভাষা তাকে হাত ধরবে, না গলা চেপে ধরবে। পাঠ্যপুস্তকের বাংলা ভাষা যদি শিশুকে কেবল শিখিয়ে দেয় কীভাবে ভুল এড়াতে হয়, তবে সে ভাষা ব্যর্থ।

এই দৃশ্যটি কোনো একক শ্রেণিকক্ষের নয়; এটি আমাদের পাঠ্যবইকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার এক নীরব প্রতিচ্ছবি। যে ভাষার হাত ধরে শিশুদের চিন্তার জগতে প্রবেশ করার কথা, সেই ভাষাই যখন দুর্বোধ্য ও কৃত্রিম হয়ে ওঠে। তখন পাঠ্যবই আর শেখার সঙ্গী থাকে না, বরং দূরত্ব তৈরি করে। ভাষা এখানে আর গল্প বলে না, ছবি আঁকে না, প্রশ্ন জাগায় না। বরং নির্দেশ দেয়, উপদেশ দেয়, আর ক্রমাগত ভার চাপিয়ে দিতে থাকে। শিশু তখন বই পড়ে না, বই সহ্য করে। শেখা আনন্দ হয়ে ওঠার আগেই দায়িত্বে রূপ নেয়। এখান থেকেই জন্ম নেয় সেই মৌলিক প্রশ্নটি—আমাদের পাঠ্যবইয়ে আমরা আসলে কেমন বাংলা ভাষা চাই?

আমাদের শ্রেণিকক্ষের ভেতর বইয়ের ভাষা প্রায় নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে। বইয়ের পাতায় সে আছে, নিয়মে আছে, পরীক্ষার খাতায়ও তার আনাগোনা, তবু শিক্ষার্থীর মনে তার স্থায়ী জায়গা নেই। শব্দের পর শব্দ সাজানো, বাক্যের পর বাক্য গাঁথা, কিন্তু সেই গাঁথুনির ভেতর দিয়ে জীবনের স্বাভাবিক প্রবাহ বয়ে যায় না। ভাষা এখানে আর অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসা কোনো সহজ স্রোত নয়। ভাষা তখন শ্রেণিকক্ষে ঢুকে প্রথমেই শিক্ষকের সহায়তা চায়। শিক্ষককে আগে সেই ভাষার সহজ অনুবাদ করতে হয়, তারপর বিষয়বস্তু বোঝাতে হয়। অর্থাৎ পাঠ্যবইয়ের ভাষা নিজে কথা বলতে পারে না; তাকে হয়ে উঠতে হয় ব্যাখ্যার বস্তু।

আমাদের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যপুস্তকের বাংলা ভাষা কেমন হওয়া উচিত—এই প্রশ্নের ভেতর লুকিয়ে আছে ‘আমরা কেমন মানুষ গড়ে তুলতে চাই?’—সেই প্রশ্নটিও। মুখস্থবিদ্যায় দক্ষ, না চিন্তায় সাহসী? অনুগত, না দায়িত্বশীল?

এ লেখা কোনো অভিযোগপত্র নয়, কোনো আবেগী আহ্বানও নয়। আমাদের পাঠ্যবইয়ের বাংলা ভাষা নিয়ে আরও একবার নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। যে ভাষার মাধ্যমে শিশুরা জীবনের পাঠ নেবে, সেই ভাষা অবশ্যই জীবনের কাছাকাছি হওয়া দরকার।

বইয়ের ভাষা বনাম জীবনের ভাষা

শিশু যে বাংলা ভাষায় কথা বলে, স্বপ্ন দেখে, পাঠ্যপুস্তকের পাতায় সেই ভাষা প্রায়ই অনুপস্থিত। বইয়ের বাংলা যেন নির্বাসনে থাকা এক নাগরিক—শুদ্ধ, পরিমিত, কিন্তু জীবন উত্তাপের ছোঁয়া পায় না। ফলে শিশুর কাছে বই আর জীবন দুই আলাদা জগৎ হয়ে ওঠে; একটি পরীক্ষার জন্য, অন্যটি বেঁচে থাকার জন্য।

এই বিচ্ছেদ ভাষাকে নিষ্প্রাণ করে তুলছে। কারণ ভাষা তখন আর অভিজ্ঞতা বহন করছে না, কেবল তথ্য বহন করছে। অথচ মানুষ তথ্য দিয়ে শেখে না; মানুষ শেখে অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে। শিশু বৃষ্টির দিনে জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকে; তার চোখে পানি, মাটির গন্ধ, আকাশ—সব একসঙ্গে থাকে। পাঠ্যবই যদি সেই বৃষ্টিকে শুধু ‘বর্ষাকাল’ নামে ডেকে একটি অনুচ্ছেদে থামিয়ে দেয়, তবে শিশুর অভিজ্ঞতার সঙ্গে বইয়ের দূরত্ব তৈরি হয়।

আমাদের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যপুস্তকের বাংলা ভাষা কেমন হওয়া উচিত—এই প্রশ্নের ভেতর লুকিয়ে আছে ‘আমরা কেমন মানুষ গড়ে তুলতে চাই?’—সেই প্রশ্নটিও। মুখস্থবিদ্যায় দক্ষ, না চিন্তায় সাহসী? অনুগত, না দায়িত্বশীল?

একটি বিজ্ঞান বই যদি বলে ‘বাষ্পীভবন একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া’। তাতে তথ্য আছে, কিন্তু অনুভব নেই। কিন্তু যদি ভাষা বলে ‘রোদে ভেজা কাপড় শুকিয়ে গেলে তুমি যা দেখো, সেটাই বাষ্পীভবন’—তবে সেই একই ধারণা জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। ভাষা তখন জানায় না শুধু, ছুঁয়ে দেয়। ‘ছুঁয়ে দেওয়া’—এটাই আসলে পাঠ্যপুস্তকের ভাষার গোপন দায়িত্ব। শিশু আগে স্পর্শে শেখে, পরে সংজ্ঞায় শেখে। আমরা উল্টোটা করি, প্রথমে সংজ্ঞা, পরে স্পর্শ। তাই শিশুর কাছে শেখা ভারী হয়ে ওঠে।

জীবনঘেঁষা ভাষা মানে কথ্য ভাষার অনুকরণ নয়। বরং জীবনের দৃশ্য, গন্ধ, শব্দকে ভাষার ভেতরে ঢুকতে দেওয়া। আরেকটি ভুল বোঝাবুঝি আছে যে, জীবনঘেঁষা মানে শুদ্ধ নয়। অনেকেই ভাবেন, বইয়ের ভাষায় আঞ্চলিক শব্দ ঢুকলেই শুদ্ধতা নষ্ট হবে। কিন্তু শুদ্ধতা মানে কি জীবনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো? তা তো নয়। শুদ্ধতা মানে ভাবের স্বচ্ছতা। আঞ্চলিক শব্দ যদি প্রসঙ্গে আসে, যদি তা ঠিকমতো উপস্থাপন করা হয়, তবে তা ভাষার অসঙ্গতি নয়, ভাষার শক্তি হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত হবে।

ভাষার সিঁড়ি: প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক—একটি অসম যাত্রা

ভাষা শেখা কোনো একদিনের ঘটনা নয়। এটি হাঁটার মতো—ধীরে, পড়ে গিয়ে, আবার উঠে দাঁড়িয়ে চলতে শেখা। কিন্তু আমাদের পাঠ্যপুস্তকে ভাষা শেখার এই স্বাভাবিক যাত্রাটিকে প্রায়ই অস্বীকার করা হয়। প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিকে উঠেই ভাষা যেন হঠাৎ গতি পাল্টায়। বাক্য দীর্ঘ হয়, শব্দ ভারী হয়, ধারণা বিমূর্ত হয়ে ওঠে। শিশু তখন বুঝে উঠতে পারে না যে, ভাষা বদলেছে, না সে নিজেই অযোগ্য হয়ে গেছে।

বাংলা পাঠ্যপুস্তকে ‘শুদ্ধ ভাষা’ বহুদিন ধরে একধরনের ভয়ের উৎস। শুদ্ধতা এখানে আনন্দের নয়, পরীক্ষার অস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রাথমিক স্তরের বইগুলোতে শব্দ ও বাক্যের ব্যবহারে সরলীকরণের চেষ্টা থাকলেও মাধ্যমিকের শুরুতেই শিশুদের হোঁচট খেতে হয় ভীষণভাবে। সেখানে শিশু অনেক ক্ষেত্রেই তার পরিচিত জগতের শব্দ খুঁজে পায় না। এখানে ভাষা প্রায়ই অতিরিক্ত ভারী, তথ্যবহুল এবং রচনাশৈলী প্রবন্ধনির্ভর।

কিছুক্ষেত্রে ভুল ও জটিল শব্দের প্রয়োগ পাঠকে আরও দুর্বোধ্য করে তোলে। যেমন, বিজ্ঞান বইয়ে সময়ের ‘ক্রমাঞ্চন’, অথবা ‘মাপচোঙে কিছু পানি দিয়ে তার আয়তনের পাঠ নাও’ –এমন ভাষার ব্যবহার শিক্ষার্থীর পড়ে শেখার আনন্দতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। পাঠকে তথ্যসমৃদ্ধ করতে বিদেশি ভাষার আক্ষরিক অনুবাদ করে হুবহু পাঠ্যবইয়ে তুলে দেবার অলসতা থেকে বের হওয়া খুবই জরুরি। তথ্য ঠিক রেখে সেটাকে শিক্ষার্থীদের বয়সপোযোগী ও সহজে অনুধাবনযোগ্য সহজ বাংলায় উপস্থাপন করতে পারলেই শিক্ষার্থীদের পড়ে শেখার বিষয়টা সহজ হয়ে উঠবে।

এছাড়াও সংস্কৃতঘেঁষা শব্দ, কৃত্রিম বাক্যগঠন এবং বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন উদাহরণ পাঠকে নিরানন্দ করে তোলে। ভাষা যেখানে শেখার আনন্দ জাগানোর কথা, সেখানে তা হয়ে ওঠে মুখস্থের বোঝা।

শুদ্ধতার আরেকটি অর্থ আছে—ভাবের স্বচ্ছতা, শব্দের যথাযথতা, বাক্যের ভারসাম্য। এই অর্থে শুদ্ধতা ভয় তৈরি করে না; বরং ভাষাকে নিরাপদ করে তোলে।

আরেকটি গুরুতর সমস্যা হলো পাঠ্যবইয়ের ভাষা প্রায়ই একঘেয়েমিপূর্ণ, প্রাণহীন ও গতানুগতিক। ভাষার ধারাক্রম যদি পরিকল্পিত না হয়, তবে ভাষা তখন সিঁড়ি হয় না, দেয়াল হয়ে এগিয়ে যাবার পথ আটকে দাঁড়ায়। তখন সেই দেয়াল টপকাতে হয়। কেউ সেই টপকাতে পারে, কেউ পারে না, পড়ে যায়। আমাদের পাঠ্যবইয়ে ভাষা এই ধারাক্রম মানে না, প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিকে পৌঁছে কেমন হঠাৎ বদলে যায়। ভাষার আকস্মিক রূপান্তর ভাষাকে শেখার উপকরণ না বানিয়ে পরীক্ষার ফাঁদ বানিয়ে তোলে। ভাষা তখন আর শিশুর সহযাত্রী থাকে না; সে হয়ে ওঠে একজন কঠোর পাহারাদার। যে পারবে, সে টিকবে; যে পারবে না, সে বাদ পড়বে। এটাকে বলা যায় ভাষার নির্মম পরিণতি। পাঠ্যপুস্তকের ভালো বাংলা ভাষা নিশ্চয়ই এই নিষ্ঠুরতা এড়াতে পারে। যেমন, প্রাথমিক স্তরে ভাষা হবে ছোট বাক্যের, স্পষ্ট ভাবের, পরিচিত অভিজ্ঞতার। মাধ্যমিকে গিয়ে সেই ভাষাই ধীরে ধীরে দীর্ঘ হবে, যুক্তি শিখবে, তুলনা করবে। ভাষা হঠাৎ বদলাবে না; ভাষা বড় হবে শিশুর সঙ্গে সঙ্গে।

ভাষার একটা আদর্শ ধারাক্রম হতে পারে, এমন:

  • প্রাথমিক পর্যায়ে শব্দভান্ডার বাড়বে গল্পে, দৃশ্যে, সংলাপে,
  • মাধ্যমিকে এসে সেই শব্দভাণ্ডার যুক্তির কাঠামো পাবে: কারণ–ফলাফল, তুলনা–বিপরীত, উদাহরণ–উপসংহার।
  • পরে সাহিত্যিক গদ্য, প্রবন্ধ, প্রতিবেদন ধীরে ধীরে আসবে।

এভাবে ভাষা শেখা হলে সেটিই হবে একটি অভিযাত্রা—সেখানে ভয়ের আধিপত্য একবারে থাকবে না।

পরীক্ষার শৃঙ্খলে বন্দি ভাষা

বাংলাদেশের পাঠ্যপুস্তকের ভাষা দীর্ঘদিন ধরে একটি অদৃশ্য শৃঙ্খলে বাঁধা, তার নাম পরীক্ষা। এই শৃঙ্খল চোখে দেখা যায় না, কিন্তু ভাষার প্রতিটি বাক্যে তার ছাপ থাকে। কী বলা যাবে, কীভাবে বলা যাবে, কতটুকু বলা যাবে—সবকিছু নির্ধারিত হয় পরীক্ষার সম্ভাব্য উত্তরের কথা ভেবে।

পাঠ্যপুস্তকের ভাষা যদি কেবল শহুরে মধ্যবিত্ত জীবনের নীতি, স্বপ্ন ও শব্দ ব্যবহার করে, তাহলে পাহাড়ের শিশু, চর অঞ্চলের শিশু, হাওরের শিশু, বস্তির শিশু—তাদের জীবন যেন ‘ব্যতিক্রম’ হয়ে দাঁড়ায়। অথচ রাষ্ট্রের কাজ হলো ব্যতিক্রমকে কেন্দ্রের কাছে আনা, এবং কেন্দ্রকে ব্যতিক্রমের প্রতি জবাবদিহি করা। পাঠ্যবইয়ের ভাষাও তাই। ভাষা যদি একমুখী হয়, তবে রাষ্ট্রও একমুখী হয়ে ওঠে।

পরীক্ষা ভাষাকে প্রশ্ন করতে শেখায় না; পরীক্ষা ভাষাকে নিরাপদ থাকতে শেখায়। নিরাপদ মানে এমন বাক্য, যেগুলো ভুল হওয়ার ঝুঁকি কম। ফলে পাঠ্যপুস্তকের বাংলা ধীরে ধীরে রূপ নেয় মুখস্থযোগ্য কাঠামোয়—সংজ্ঞা, তালিকা, পূর্বনির্ধারিত ব্যাখ্যা। ভাষা তখন আর ভাবনার জায়গা নয়; সে হয়ে ওঠে নম্বর পাওয়ার যন্ত্র। শিক্ষাক্রম যেসব বিষয়ভিত্তিক ও শ্রেণিভিত্তিক অর্জন উপযোগী যোগ্যতা নির্দিষ্ট করেছে, তার কতটুকু শিক্ষার্থীরা অর্জন করতে পারছে সে বিষয়ে প্রশ্ন তুলতে গেলে শিক্ষক, শিখন-শিখানো পদ্ধতি, কৌশলের সঙ্গে পাঠ্যবইয়ের দিকেও আঙুল তুলতে হয়।

ঘোষণার ভাষা থেকে সংলাপের ভাষা

পাঠ্যপুস্তকের ভাষা দীর্ঘদিন ধরে ঘোষণা দিতে অভ্যস্ত। ‘এটি হলো’, ‘এভাবে করা হয়’—ধরনের বাক্যগুলো শিশুদের সামনে একটি সম্পূর্ণ পৃথিবী হাজির করে, যেখানে প্রশ্ন করার জায়গা কমই থাকে। এধরনের ঘোষণামুখী বিবৃতিধর্মী ভাষা একধরনের এককেন্দ্রিক জ্ঞানতত্ত্ব তৈরি করে। ব্যাপারটি এরকম যে, বই সব জানে, শিশু কিছু জানে না।

কিন্তু যে ভাষা প্রশ্ন করতে শেখায় না, সে ভাষা চিন্তাও শেখাতে পারে না। প্রশ্নহীন ভাষা ধীরে ধীরে প্রশ্নহীন নাগরিক তৈরি করে। যে নাগরিক কেবল শোনে, মানে, মুখস্থ করে; কিন্তু দ্বিধা করে না, অনুসন্ধানও করে না। রাষ্ট্রের জন্য প্রশ্নহীন নাগরিক সুবিধাজনক। কারণ প্রশ্ন মানে জবাবদিহি। প্রশ্ন মানে ক্ষমতার কাছে হিসাব চাওয়া। প্রশ্ন মানে—যে কাঠামোকে ‘স্বাভাবিক’ বলা হয়, তার ভেতরের ফাটলকে দেখতে পাওয়া। রাষ্ট্র অনেকক্ষেত্রেই ফাটলটাকে আড়াল করে রাখতে চায় কি?

পাঠ্যপুস্তকের বাংলা ভাষা যদি মাঝেমধ্যে থেমে গিয়ে প্রশ্ন তোলে ‘তুমি কী ভাবছ?’, ‘এটা কি অন্যভাবে হতে পারত?’—তবে ভাষা নিশ্চয়ই তখন শাসনের হাতিয়ার না হয়ে সংলাপের জায়গা হয়ে ওঠে। পৃথিবীর ইতিহাস বলছে, সংলাপই হলো গণতান্ত্রিক চর্চার প্রথম পাঠ।

এখানে ‘প্রশ্ন’ বলতে আমরা কেবল অনুশীলনী প্রশ্ন বোঝাতে চাইছি না—‘কাকে বলে?’, ‘কত সালে?’—ধরনের প্রশ্নের উত্তর বইয়ের মধ্যেই বন্দি। প্রকৃত প্রশ্ন হলো এমন প্রশ্ন, যার উত্তর জীবনের ভেতর খুঁজতে হয়:

  • ‘তুমি হলে কী করতে?’
  • ‘এটা কি সবার জন্য সমান?’
  • ‘কোনটা ন্যায্য?’
  • ‘কেন তুমি তা ভাবছ?’

এই প্রশ্নগুলো ভাষাকে মুক্ত ও অবাধ করে দেয়। তখন এই মুক্ত ভাষা মানুষকে মুক্তির দিকে ঠেলে দেয়—অন্তত চিন্তার মুক্তির দিকে।

নৈতিকতা—উপদেশ নয়, অভিজ্ঞতা

নৈতিকতা শেখানোর ভাষা যত বেশি উপদেশমুখী হয়, নৈতিকতার শক্তি তত কমে যায়। পাঠ্যপুস্তকে নৈতিকতা প্রায়ই আসে নির্দেশ হয়ে—কী করা উচিত, কী করা উচিত নয়। ভাষা তখন সিদ্ধান্ত নেয়, শিশুর কাজ শুধু মেনে নেওয়া।

কিন্তু নৈতিক মানুষ তৈরি হয় অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে, দ্বিধার ভেতর দিয়ে। নৈতিকতা আসলে ‘বাক্য’ নয়—নৈতিকতা ‘পরিস্থিতি’। একটি পরিস্থিতি এসে দাঁড়ায়, আর মানুষকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। পাঠ্যপুস্তকের বাংলা ভাষা যদি ঘটনা দেখায়, পরিস্থিতি তৈরি করে এবং সিদ্ধান্তের ভার শিশুর ওপর ছেড়ে দেয় তবে নৈতিকতা আর বোঝা থাকে না। বই যদি বলে, ‘মিথ্যা বলা মহাপাপ’ তাহলেই গল্পটা শেষ। কিন্তু যদি বই বলে ‘তুমি হলে কী করতে?’ তাহলে নৈতিকতা শুরু হয় সেখান থেকেই।

একটি গল্প, একটি দৃশ্য, একটি অসম্পূর্ণ সিদ্ধান্ত—এইসব জায়গায় ভাষা সবচেয়ে শক্তিশালী হয়। কারণ সেখানে ভাষা বলে না, দেখায়। আর দেখাতে পারা মানেই ভাষার মানবিকতা। পাঠ্যপুস্তকের বাংলা ভাষা যদি মানবিক হতে চায়, তাকে উপদেশের উচ্চাসন থেকে নামতে হবে। শিশুর পাশে বসতে হবে। তাকে বলতে হবে: ‘আমি তোমাকে জোর করছি না; আমি তোমার সঙ্গে হাঁটছি।’

অন্তর্ভুক্তির ভাষা

বাংলাদেশ যেমন একক অভিজ্ঞতার দেশ নয় তেমনি একক ভাষার দেশও নয়। একক ভাষা বলতে কেবল, বাংলা, চাকমা, হাজং, মারমা বা কুরুক নয়। আমাদের আছে আঞ্চলিক ভাষার বহুবৈচিত্র্য। তাই, এই দেশের শিশুরা যেমন একরকম ভাষায় বড় হয় না, তেমনি একরকম জীবনে হাঁটেও না। তাদের জীবনে অঞ্চলভেদে, অবস্থা ভেদে যে অভিজ্ঞতা নিয়ে তারা বড় হয়, পাঠ্যবইয়ের পাতায় নিজের সে জীবনের দেখা না পেলে শিশু ধীরে ধীরে শিখে নেয় যে, তার গল্প, তার আশপাশ ততো গুরুত্বপূর্ণ নয়। তখন সে জীবনে প্রথমবারের মতো আত্মপরিচয়ের সংকটে পড়ে। এই সংকটের সীমায়তন আমরা কখনো গুরুত্ব দিয়ে বিচার করিনি।

বহুস্বরের বাংলা ভাষা এই নীরবতাকে ভাঙতে পারে। মানে, বাংলাদেশের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ভাষা, আঞ্চলিক ভাষার সুসমন্বয় এই নীরবতার একটা উপশম হতে পারে বলে মনে হয়। নানা জীবন, নানা অভিজ্ঞতা, নানা দৃষ্টিভঙ্গি ভাষার ভেতরে এলে শিশু শিখবে, ভিন্নতা মানেই দূরত্ব নয়; ভিন্নতা মানে কখনো কখনো সহাবস্থান।

পাঠ্যপুস্তকের ভাষা যদি কেবল শহুরে মধ্যবিত্ত জীবনের নীতি, স্বপ্ন ও শব্দ ব্যবহার করে, তাহলে পাহাড়ের শিশু, চর অঞ্চলের শিশু, হাওরের শিশু, বস্তির শিশু—তাদের জীবন যেন ‘ব্যতিক্রম’ হয়ে দাঁড়ায়। অথচ রাষ্ট্রের কাজ হলো ব্যতিক্রমকে কেন্দ্রের কাছে আনা, এবং কেন্দ্রকে ব্যতিক্রমের প্রতি জবাবদিহি করা। পাঠ্যবইয়ের ভাষাও তাই। ভাষা যদি একমুখী হয়, তবে রাষ্ট্রও একমুখী হয়ে ওঠে।

ভাষার পেছনের ক্ষমতার বিন্যাস

পাঠ্যপুস্তকের ভাষা কোনো নিরীহ বস্তু নয়। এর পেছনে থাকে দৃষ্টিভঙ্গি আর রাষ্ট্রের নীরব উপস্থিতি। আরেকটি সত্য হলো, পাঠ্যবই রচনার প্রক্রিয়ায় অনেক সময় নিরাপত্তা-ভাবনা বড় হয়ে ওঠে: ‘এটা লিখলে বিতর্ক হবে না তো?’

বিতর্ককে আমরা ভয় পাই। অথচ জ্ঞানচর্চা বিতর্ক ছাড়া হয় না। বিতর্ক মানে শত্রুতা নয়; বিতর্ক মানে চিন্তার চলাচল। পাঠ্যবইয়ের ভাষা যদি বিতর্ককে শত্রু ভাবে, তবে সে ভাষা স্থির হয়ে যায়। স্থির ভাষা মরে যায়।

ভাষা যেন সাহস হয়ে ওঠে

এমন একটি শ্রেণিকক্ষের কথা কল্পনা করা যাক, যেখানে শিক্ষক পাঠ্যবই খুলে পড়ছেন না; তিনি যেন পাঠ্যবইয়ের সঙ্গে কথা বলছেন। বইয়ের ভাষাই প্রশ্ন তুলছে। শিক্ষক সেই প্রশ্ন শ্রেণিকক্ষে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। আর সেই পাঠ্যবইয়ে আছে ন্যায্যতা। বই বলছে না, ‘ন্যায্যতা মানে এই।’ বই বলছে, ‘তোমরা কখনো অন্যায় দেখেছ?’ শিশুরা নিজেদের কথা বলছে: কেউ বলে ফুটবল খেলায় রেফারির পক্ষপাতের কথা। কেউ বলছে, বাড়িতে ভাইকে বেশি আদর করা হয়। কেউ বলছে, বাসে গরিব বলে একজনকে বসতে দেওয়া হয়নি। শিক্ষক কোনো উত্তর দেন না; শিক্ষক শোনেন। তারপর বলেন ‘তোমরা যা বললে, সেখান থেকেই ন্যায্যতার একটা মানে বের করো।’ একেকজন শিক্ষার্থী একেকভাবে উত্তর দেয়। শিক্ষক বলেন না, তুমি ভুল। তিনি বলেন, আরও বলো। এই ‘আরও বলো’—এই দুই শব্দের ভেতরেই শিক্ষা বদলে যায়। কারণ এখানে ভাষা শাসন করে না, আমন্ত্রণ জানায়।

কল্পিত এই শ্রেণিকক্ষে ভাষা ভয় তৈরি করে না। ভাষা নিরাপত্তা দেয় না; ভাষা সাহস দেয়। এখানে পাঠ্যবই কোনো নির্দেশিকা নয়, একটি সহযাত্রী। আর সহযাত্রী মানে, যে সামনে হাঁটে না, পেছনে ঠেলে দেয় না; পাশে পাশে হাঁটে।

পাঠ্যবইয়ের ভাষা যদি এমন হতে পারে, তবে শিশুদের ভবিষ্যৎও অন্যরকম হবে। তারা কেবল পরীক্ষায় পাশ করবে না; তারা কথায়, চিন্তায়, যুক্তিতে দাঁড়াবে।

বই যেন ভয় না হয়

একটি শিশু যখন বই খুলে নতুন একটা পৃথিবীতে প্রবেশ করার সীমানায় দাঁড়ায়, সেই মুহূর্তে আমরা ঠিক করে দিই—ভাষা তাকে হাত ধরবে, না গলা চেপে ধরবে। পাঠ্যপুস্তকের বাংলা ভাষা যদি শিশুকে কেবল শিখিয়ে দেয় কীভাবে ভুল এড়াতে হয়, তবে সে ভাষা ব্যর্থ। কিন্তু যদি সেই ভাষা শিশুকে শেখায় কীভাবে ভাবতে হয়, কীভাবে প্রশ্ন করতে হয়, কীভাবে নিজের ভাষা খুঁজে নিতে হয়, তবে সেই ভাষাই ভবিষ্যৎ তৈরি করে।

বই বলে, এখান থেকে শুরু করো। এবং ‘শুরু’ মানে শুধু বইয়ের পরের পাতা নয়। এই ‘শুরু’ মানে, একটি জাতির ভবিষ্যৎকে ভাষার ভেতরে নতুন করে লেখা।

Ad 300x250

সম্পর্কিত