leadT1ad

ইউক্রেন ও তাইওয়ান সমীকরণ: ভেনেজুয়েলা ইস্যুতে রাশিয়া-চীনের ভিন্ন কৌশল

প্রকাশ : ০৫ জানুয়ারি ২০২৬, ২১: ৩৬
এআই দ্বারা নির্মিত ছবি

গত শুক্রবার রাতে ভেনেজুয়েলায় বিমান হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। ভোরের আগে রাজধানী কারাকাস বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে ওঠে। এর কিছুক্ষণ পরই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে দেশের বাইরে নিয়ে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমগুলোর দেওয়া সর্বশেষ তথ্যমতে, নিকোলাস মাদুরোকে ব্রুকলিনের কারাগার থেকে ম্যানহাটনের ফেডারেল আদালতে স্থানান্তর করা হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্থানীয় সময় দুপুরে তাঁকে আদালতে হাজির করার কথা রয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে মাদক ও অস্ত্র চোরাচালানের গুরুতর অভিযোগ তুলেছে যুক্তরাষ্ট্র।

একটি স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে এভাবে ভিনদেশি বাহিনীর তুলে নিয়ে আসার ঘটনা নজিরবিহীন। এই ঘটনার পরপরই বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যুক্তরাষ্ট্রের এমন কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছে। বিশেষ করে ভেনেজুয়েলার দীর্ঘদিনের মিত্র চীন ও রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের কঠোর সমালোচনা করেছে।

ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলাকে ‘সশস্ত্র আগ্রাসন’ উল্লেখ করে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে রাশিয়া। মস্কো স্পষ্টভাবে বলেছে, নিজের ভাগ্য নিজে নির্ধারণ করার অধিকার রয়েছে ভেনেজুয়েলার। সেখানে বিদেশি শক্তির সামরিক হস্তক্ষেপ কাম্য নয়।

অন্যদিকে, ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে আমেরিকার ‘সরাসরি সশস্ত্র আগ্রাসনের’ ঘটনায় বিস্ময় ও তীব্র নিন্দা প্রকাশ করেছে চীন। শনিবার এক বিবৃতিতে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানান, একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র এবং তার প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরনের বলপ্রয়োগ আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন এবং জাতিসংঘের সনদের পরিপন্থী।

মাদুরোকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় লাতিন আমেরিকা অঞ্চলজুড়ে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই একতরফা পদক্ষেপ বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে, বিশেষ করে ওয়াশিংটনের সাথে বেইজিং ও মস্কোর সম্পর্কে নতুন করে ফাটল ধরাবে।

রাশিয়ার সতর্ক প্রতিক্রিয়া ও ইউক্রেন সমীকরণ

নিকোলাস মাদুরো ছিলেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র। রাশিয়া বরাবরই মাদুরো সরকারকে সমর্থন দিয়ে এসেছে। দুই দেশের মধ্যে সামরিক ও জ্বালানি সহযোগিতার সম্পর্ক ছিল। আমেরিকার এই একতরফা পদক্ষেপ মস্কোর জন্য অত্যন্ত অস্বস্তিকর। যদিও রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই অভিযানকে স্বাধীন দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছে। তবে রাশিয়ার প্রতিক্রিয়া ছিল বেশ সতর্ক। তারা শুধু নিন্দাই জানায়নি। ভবিষ্যতের সম্ভাবনার দিকেও নজর রেখেছে।

মাদুরোর পতন রাশিয়ার জন্য নিঃসন্দেহে খারাপ সংবাদ। তবে এর মাধ্যমে ইউক্রেন ইস্যুতে আমেরিকার ওপর চাপ সৃষ্টি করা যেতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টায় আছে মস্কো। তারা এখনই আমেরিকার সঙ্গে বড় ধরনের কোনো দ্বন্দ্বে জড়াতে চায় না। পুতিন নিশ্চিতভাবেই এখন সতর্ক থাকবেন। ট্রাম্প যদি ভেনেজুয়েলায় এমন আগ্রাসন চালাতে পারেন তবে তা ইউক্রেনের জন্য এক বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত হতে পারে। ট্রাম্প মাদুরোকে অপরাধী আখ্যা দিয়েছেন। ভবিষ্যতে পুতিনও ইউক্রেনের জেলেনস্কির ক্ষেত্রে একই কৌশল ব্যবহারের কথা ভাবতে পারেন। বিষয়টি তাদের নিজেদের জন্যও সতর্কবার্তা হতে পারে।

চীনের বিনিয়োগ ও ভূ-রাজনীতির সংকট

চীনের জন্য ভেনেজুয়েলা ছিল লাতিন আমেরিকায় প্রবেশের রাস্তা। ২০০০ সালের পর থেকে চীন বিশ্বজুড়ে জ্বালানির সন্ধান করছিল। তখন হুগো চাভেজের ভেনেজুয়েলা তাদের সামনে বিশাল সুযোগ নিয়ে আসে। চীন দেশটির অবকাঠামো খাতে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের বিনিময়ে তেল পেত। মাদুরোর শাসনামলে অর্থনৈতিক ধসের কারণে সেই বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়লেও বেইজিং শেষ পর্যন্ত তাঁর পাশে ছিল।

গ্রেপ্তারের ১০ ঘণ্টা আগে চীনা প্রতিনিধিদলের সঙ্গে মাদুরোর বৈঠক সেকথাই প্রমাণ করে। আমেরিকার এই পদক্ষেপের পর বেইজিং কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আমেরিকার এই কাজকে উন্মুক্ত আধিপত্যবাদ বলেছে। তারা দাবি করেছে এই হামলা আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন। চীন আশঙ্কা করছে আমেরিকার লক্ষ্য শুধু মাদুরোকে সরানো নয়। তারা ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদের ওপর একক আধিপত্য চায়। এই অঞ্চলে চীনের প্রভাব ভেঙে দেওয়াই আমেরিকার মূল উদ্দেশ্য।

আমেরিকার নতুন ডন-রো নীতি

ডিসেম্বরের শুরুতে ট্রাম্প প্রশাসন ‘ট্রাম্প করোলারি’ নামে নতুন নীতি ঘোষণা করে। এতে বলা হয়, পশ্চিম গোলার্ধের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সামরিক বিষয়গুলো যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণেই থাকতে হবে। এই নীতির অংশ হিসেবে ওই অঞ্চলের খনিজ ও জ্বালানি সম্পদে প্রবেশের জন্য মার্কিন সামরিক বাহিনী ব্যবহার করা যাবে। মাদুরোকে গ্রেপ্তারের পর সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প ১৯ শতকের কুখ্যাত ‘মনরো ডকট্রিন’-এর প্রসঙ্গ টেনে বলেন, লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আধিপত্য বজায় থাকবে। তিনি নতুন এই রীতিকে ‘ডন-রো ডকট্রিন’ (Don-Roe doctrine) নাম দিয়ে ঘোষণা করেন, ‘পশ্চিম গোলার্ধে আমেরিকার আধিপত্য নিয়ে আর কখনোই কোনো প্রশ্ন উঠবে না।’ ট্রাম্পের এই নীতি সরাসরি চীনের স্বার্থে আঘাত হেনেছে।

রাশিয়া ও চীন আমেরিকার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। তবে সমালোচকরা এই প্রতিক্রিয়াকে ভণ্ডামি বলছেন। রাশিয়া নিজেই ইউক্রেনে আগ্রাসন চালিয়েছে, অন্যদিকে চীন তাইওয়ান প্রণালীতে নিয়মিত সামরিক মহড়া চালাচ্ছে। পরাশক্তিগুলো নিজেদের স্বার্থে আন্তর্জাতিক আইন ভাঙতে দ্বিধা করে না। তাই আমেরিকার বিরুদ্ধে তাদের এই নৈতিক অবস্থান আদতে কৌশল মাত্র। চীন এই ঘটনাকে ব্যবহার করে তাইওয়ান বা দক্ষিণ চীন সাগরে তাদের অবস্থান শক্ত করতে পারে। আমেরিকার এই আগ্রাসনকে অজুহাত দেখিয়ে বেইজিং হয়তো নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর যুক্তি দেবে।

রাশিয়ার ভবিষ্যৎ কৌশল

রাশিয়া লাতিন আমেরিকায় তাদের হারানো অবস্থান নিয়ে খুব বেশি মাথা ঘামাবে না। তারা বরং আমেরিকার মনোযোগ অন্যদিকে সরানোর চেষ্টা করবে। ভেনেজুয়েলার বিশৃঙ্খলা রাশিয়াকে সুবিধা দিতে পারে। ইউক্রেনে তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে রাশিয়া বাড়তি সময় পাবে। মাদুরো নেই। তাই ক্রেমলিনের নিরাপত্তা নিশ্চয়তার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। ভেনেজুয়েলায় স্থাপিত রাশিয়ার এস-৩০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আমেরিকার অভিযান ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে। এতে রাশিয়ার অস্ত্রের কার্যকারিতা নিয়েও সংশয় দেখা দিতে পারে।

অন্যদিকে চীনের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তাদের ঋণ ফেরত পাওয়া। ভেনেজুয়েলা চীনের কাছে বিপুল পরিমাণ অর্থ ঋণী। ট্রাম্প যদি তেল খাত উন্মুক্ত করে দেন তবে চীন সেই সুযোগ নেবে। রাজনৈতিকভাবে এই ঘটনায় পিছিয়ে থাকলেও অর্থনৈতিকভাবে তারা আমেরিকার নতুন নীতি থেকে লাভবান হওয়ার চেষ্টা করবে। চীন তেলের জন্য ভেনেজুয়েলার ওপর আর আগের মতো নির্ভরশীল নয়। তারা বৈদ্যুতিক যানের দিকে ঝুঁকছে। তবে পুরনো বিনিয়োগ ও পাওনা টাকা উদ্ধারে বেইজিং কূটনৈতিক চাপ বজায় রাখবে।

আমেরিকার সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ

মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করা আমেরিকার জন্য সহজ হলেও পরবর্তী পরিস্থিতি সামলানো কঠিন হবে। আমেরিকার অভ্যন্তরীণ সামরিক মহড়া বা সিমুলেশনগুলো বলছে ভেনেজুয়েলায় বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি নেতৃত্বশূন্যতা তৈরি হতে পারে। শরণার্থী সংকট ও গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা প্রবল। কলম্বিয়া সীমান্তে ইতিমধ্যেই উত্তেজনা বেড়েছে।

একটি দেশ চালানো আর একজনকে গ্রেপ্তার করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। ট্রাম্প বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রই এখন থেকে ভেনেজুয়েলা চালাবে। কিন্তু তা কীভাবে সম্ভব তা নিয়ে ধোঁয়াশা আছে।

ভেনেজুয়েলায় আমেরিকার এই ঝটিকা অভিযান আধুনিক বিশ্বব্যবস্থায় শক্তির ভারসাম্য নাড়িয়ে দিয়েছে। রাশিয়া ও চীন তাদের মিত্র হারানোর বেদনার চেয়ে এখন নিজেদের স্বার্থরক্ষায় বেশি মনোযোগী হবে। এই ঘটনাকে শুধু সরকার পতন হিসেবে দেখলে হবে না, বরং এ হচ্ছে পরাশক্তিগুলোর মধ্যে চলমান স্নায়ুযুদ্ধের নতুন ফ্রন্ট।

আগামীর দিনগুলোতে ভেনেজুয়েলার তেল নিয়ে ত্রিমুখী লড়াই তীব্র হবে। ওয়াশিংটন ও বেইজিং একে অপরের মুখোমুখি অবস্থানে থাকবে। পৃথিবী এখন দেখছে ‘ডন-রো ডকট্রিন’ আসলে কী ফল বয়ে আনে। এই নীতি লাতিন আমেরিকায় দীর্ঘস্থায়ী সংকটের দাবানল জ্বালিয়ে দিতে পারে।

তথ্যসূত্র: মর্ডান ডিপ্লোম্যাসি, প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, আল-জাজিরা ও দ্য গার্ডিয়ান

Ad 300x250

সম্পর্কিত