নুরুল হুদা সাকিব

বাংলাদেশে দুর্নীতি নিয়ে জনসাধারণের মধ্যে আলোচনা, গণমাধ্যমের প্রতিবেদন এবং নীতিগত বিতর্ক—সব ক্ষেত্রেই দীর্ঘদিন ধরে একটি বহুল ব্যবহৃত সংজ্ঞা প্রায় অচল সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত, ‘দুর্নীতি মানে ব্যক্তিগত লাভের জন্য অর্পিত ক্ষমতার অপব্যবহার’। ঘুষ, কমিশন, আত্মসাৎ, অবৈধ সম্পদ—এসবই দুর্নীতির প্রধান চিত্র হিসেবে সবার সামনে আসে।
কিন্তু বাস্তব প্রশাসনিক অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, ক্ষমতার অপব্যবহারের সব রূপ আর্থিক লেনদেন বা সরাসরি ব্যক্তিগত লাভের মাধ্যমে ঘটে না। অনেক সময় সিদ্ধান্ত, প্রক্রিয়া এবং নীতির ভেতরেই এমন বিকৃতি থাকে যা আইন ভাঙে না, কিন্তু প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে। এখানেই রাজনৈতিক তত্ত্বের একটি নতুন পদ্ধতি ‘ধারণাগত পুনর্গঠন’ বা ‘কনসেপ্টুয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং’ আমাদের ভাবনাকে নতুনভাবে সাজাতে সাহায্য করতে পারে, বিশেষ করে বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র বোঝার ক্ষেত্রে।
ধারণাগত পুনর্গঠন মূলত বলে, আমরা যে ধারণাগুলো ব্যবহার করি—যেমন দুর্নীতি, জবাবদিহি, ন্যায়, অংশগ্রহণ—এসব স্থির নয়। যদি কোনো ধারণা বাস্তব সমস্যাকে ঠিকমতো ধরতে না পারে, তবে সেটিকে ইচ্ছাকৃতভাবে উন্নত করা দরকার। অর্থাৎ, শুধু সংজ্ঞা বিশ্লেষণ নয়, সংজ্ঞাকে উন্নত করা।
দুর্নীতির ক্ষেত্রেও সাম্প্রতিক তাত্ত্বিক কাজ দেখায়, ‘ব্যক্তিগত লাভ’-কেন্দ্রিক সংজ্ঞা অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক বিকৃতি ধরতে ব্যর্থ। তাই একটি নতুন ধারণা সামনে এসেছে, দুর্নীতি হলো অফিস জবাবদিহির ঘাটতি। যখন কোনো পদধারী তাঁর অফিসের ক্ষমতা এমনভাবে ব্যবহার করেন যার যুক্তি তার অফিসের ম্যান্ডেট, উদ্দেশ্য এবং জনস্বার্থের মানদণ্ড দিয়ে ন্যায্যতা পায় না। এই দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র বিশ্লেষণে বিশেষভাবে কার্যকর। কারণ এখানে বহু সমস্যাই “আইন ভাঙা” নয়, বরং “দায়িত্ব ভাঙা”—অর্থাৎ অফিসের উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুতি।
বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রের বাস্তবতায় এই নতুন সংজ্ঞা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। এখানে বহু ক্ষতিকর চর্চা আছে যা সবসময় ঘুষ বা অর্থ লেনদেন নয়—যেমন রাজনৈতিক বিবেচনায় বদলি-পোস্টিং, নির্বাচিতভাবে আইন প্রয়োগ, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রভাব খাটানো, ফাইল আটকে রাখা, বা অনানুষ্ঠানিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করা। এগুলো প্রায়ই “প্রশাসনিক বিবেচনা” নামে বৈধতা পায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এসব সিদ্ধান্ত কি অফিসের মূল দায়িত্ব ও জনস্বার্থের ম্যান্ডেট দিয়ে ন্যায্যতা পায়? যদি না পায়, তবে তা জবাবদিহির ঘাটতি—অর্থাৎ পুনর্গঠিত অর্থে দুর্নীতি।
প্রথমে আমরা বাস্তব কিছু উদাহরণ বিবেচনা করি—-
উদাহরণ ১: ধরা যাক, একটি উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার প্রক্রিয়া পুরোপুরি আইন মেনে সম্পন্ন হয়েছে। কাগজে-কলমে কোনো ঘুষ নেই, নিয়ম ভাঙা হয়নি। কিন্তু টেন্ডারের শর্ত এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে নির্দিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানেরই যোগ্যতা থাকে। অন্য প্রতিযোগীরা শুরুতেই বাদ পড়ে। এখানে ব্যক্তিগত অর্থ লেনদেন প্রমাণ করা কঠিন।
প্রচলিত সংজ্ঞায় এটি দুর্নীতি হিসেবে ধরা নাও পড়তে পারে। কিন্তু যদি আমরা অফিস জবাবদিহির ঘাটতির ধারণা ব্যবহার করি, তাহলে প্রশ্ন করব, সিদ্ধান্তগ্রহণকারী কি তার ক্ষমতা এমনভাবে ব্যবহার করেছেন যা ন্যায্য প্রতিযোগিতা ও জনস্বার্থের ম্যান্ডেটের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ? যদি উত্তর না হয়, তবে এটি দুর্নীতির একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ।
উদাহরণ ২ : প্রশাসনে বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রে কোনো কর্মকর্তা বারবার এমন জায়গায় পোস্টিং পান যেখানে “সংবেদনশীল” আর্থিক বা নিয়ন্ত্রণমূলক ক্ষমতা রয়েছে। কারণ তিনি রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য। অন্যদিকে দক্ষ কিন্তু স্বাধীনচেতা কর্মকর্তাকে গুরুত্বহীন স্থানে সরিয়ে দেওয়া হয়। এখানে সরাসরি ঘুষের প্রমাণ নাও থাকতে পারে। কিন্তু অফিসের ক্ষমতা কি পেশাগত মানদণ্ডে ব্যবহৃত হচ্ছে, নাকি আনুগত্যের ভিত্তিতে? যদি দ্বিতীয়টি সত্য হয়, তবে এটি অফিসের ম্যান্ডেটের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ—অর্থাৎ জবাবদিহির ঘাটতি।
উদাহরণ ৩: একটি শিল্প প্রতিষ্ঠান বারবার পরিবেশ আইন লঙ্ঘন করছে। তবুও নিয়ন্ত্রক সংস্থা কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে না—কারণ “উপর থেকে নির্দেশ” আছে, অথবা “অর্থনীতির স্বার্থে নমনীয়তা” দেখানো হচ্ছে। কাগজে আইনি ব্যাখ্যা দাঁড় করানো সম্ভব। কিন্তু নিয়ন্ত্রক অফিসের মূল উদ্দেশ্য যদি জনস্বার্থ রক্ষা হয়, তবে এই নরম আচরণ সেই ম্যান্ডেটের বিরুদ্ধে যায়। এখানেও দুর্নীতির পুনর্গঠিত ধারণা কার্যকর।
পুরনো দুর্নীতি-ধারণা ব্যক্তিকেন্দ্রিক—খারাপ লোক খোঁজে। নতুন জবাবদিহি-কেন্দ্রিক ধারণা প্রাতিষ্ঠানিক—খারাপ কাঠামো, নষ্ট প্রণোদনা, দুর্বল নজরদারি খোঁজে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় সমস্যাটি প্রায়ই কাঠামোগত—পদোন্নতি ও বদলির ওপর রাজনৈতিক প্রভাব, ঊর্ধ্বতন নির্দেশের অস্বচ্ছতা, অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনার দুর্বলতা, এবং পৃষ্ঠপোষকতার সংস্কৃতি। একজন কর্মকর্তা ব্যক্তিগত লাভ না করেও অফিসের ক্ষমতা এমনভাবে ব্যবহার করতে পারেন যা তার দায়িত্বের উদ্দেশ্যের বিরুদ্ধে যায়—এখানেই নতুন ধারণাটি বিশ্লেষণকে গভীর করে। এতে দুর্নীতি দমন কৌশলও বদলে যায় ।
প্রচলিত পদ্ধতিতে দুর্নীতি দমন মানে নজরদারি বাড়াও, মামলা দাও, শাস্তি দাও। কিন্তু যদি আমরা দুর্নীতিকে জবাবদিহির ঘাটতি হিসেবে দেখি, তবে সংস্কারের ক্ষেত্র বিস্তৃত হয়। যেমন:
প্রথমত, অফিসের ম্যান্ডেট স্পষ্ট করতে হবে। অনেক প্রশাসনিক পদে দায়িত্ব অস্পষ্ট, ফলে যেকোনো সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করানো যায়। স্পষ্ট ম্যান্ডেট জবাবদিহির মানদণ্ড তৈরি করে।
দ্বিতীয়ত, সিদ্ধান্তের লিখিত যুক্তি বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। বড় প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে “কারণ দর্শাও” সংস্কৃতি গড়ে উঠলে পরবর্তী পর্যালোচনা সহজ হয়।
তৃতীয়ত, সহকর্মীদের জবাবদিহি জোরদার করা দরকার। শুধু বাহ্যিক অডিট নয়—অভ্যন্তরীণ পিয়ার রিভিউ, নৈতিকতা কমিটি এবং সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা বোর্ড কার্যকর হতে পারে।
চতুর্থত, অফিস-নৈতিকতার প্রশিক্ষণ। আমরা আইন শেখাই, কিন্তু অফিসের নৈতিক যুক্তি শেখাই কম। একজন কর্মকর্তাকে বুঝতে হবে— “আমি পারি” মানেই “আমার করা উচিত” নয়।
পঞ্চমত, জবাবদিহি ব্যবস্থা—যেমন প্রকাশ্য ব্যাখ্যা, নাগরিক শুনানি, এবং স্বচ্ছ তথ্যপ্রকাশ—দুর্নীতির ঝুঁকি কমাতে পারে, এমনকি ফৌজদারি শাস্তি ছাড়াও।
এই ধারণাগত পুনর্গঠন হাইব্রিড ক্ষেত্রেও কার্যকর—যেখানে রাষ্ট্র ও বেসরকারি খাত মিশে যায়। যেমন পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ প্রকল্প। এখানে সিদ্ধান্ত কে নিচ্ছে—সরকারি কর্মকর্তা, না বেসরকারি অংশীদার? ক্ষমতার ব্যবহার কোন ম্যান্ডেটের অধীনে? পুরনো সংজ্ঞা বিভ্রান্ত হয়, নতুন জবাবদিহি-কেন্দ্রিক সংজ্ঞা প্রশ্ন তোলে: যে অফিস বা ভূমিকা থেকে ক্ষমতা প্রয়োগ হচ্ছে, তার উদ্দেশ্য কী, এবং সেই উদ্দেশ্যের সঙ্গে সিদ্ধান্তটি সঙ্গতিপূর্ণ কি না।
সমালোচকেরা বলতে পারেন—এভাবে দুর্নীতির ধারণা বাড়ালে সবকিছুই দুর্নীতি হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে উল্টো। এই পদ্ধতি মানদণ্ড কঠোর করে। সব ভুল সিদ্ধান্ত দুর্নীতি নয়, সব অদক্ষতা দুর্নীতি নয়, সব নীতিগত মতভেদও দুর্নীতি নয়। দুর্নীতি তখনই, যখন অফিসের ক্ষমতার ব্যবহার তার ন্যায্য ম্যান্ডেট দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না এবং প্রাতিষ্ঠানিক কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত করে।
বাংলাদেশে সুশাসন নিয়ে আমরা প্রায়ই প্রতিষ্ঠান সংস্কার, আইন সংশোধন, ডিজিটাল সেবা—এসব নিয়ে আলোচনা করি। কিন্তু ধারণাগত সংস্কার নিয়ে খুব কম কথা বলি। অথচ আমরা দুর্নীতি কীভাবে সংজ্ঞায়িত করি, সেটাই নির্ধারণ করে আমরা কী দেখতে পাব, কী মাপব, এবং কী ঠিক করতে চাইব। যদি ধারণা সংকীর্ণ হয়, সমাধানও সংকীর্ণ হবে।
ধারণাগত পুনর্গঠন আমাদের মনে করিয়ে দেয়— ভাল শাসনের লড়াইয়ে শক্তিশালী ধারণা কোনো বিলাসিতা নয়—এটি একটি বাস্তব নীতিগত হাতিয়ার। বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রকে কার্যকর, ন্যায়ভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক করতে চাইলে, দুর্নীতির ধারণাটিকেও নতুন করে প্রতিস্থাপিত করতে হবে। নইলে আমরা লক্ষণ দেখব, কিন্তু রোগ চিনব না।
লেখক: অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

বাংলাদেশে দুর্নীতি নিয়ে জনসাধারণের মধ্যে আলোচনা, গণমাধ্যমের প্রতিবেদন এবং নীতিগত বিতর্ক—সব ক্ষেত্রেই দীর্ঘদিন ধরে একটি বহুল ব্যবহৃত সংজ্ঞা প্রায় অচল সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত, ‘দুর্নীতি মানে ব্যক্তিগত লাভের জন্য অর্পিত ক্ষমতার অপব্যবহার’। ঘুষ, কমিশন, আত্মসাৎ, অবৈধ সম্পদ—এসবই দুর্নীতির প্রধান চিত্র হিসেবে সবার সামনে আসে।
কিন্তু বাস্তব প্রশাসনিক অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, ক্ষমতার অপব্যবহারের সব রূপ আর্থিক লেনদেন বা সরাসরি ব্যক্তিগত লাভের মাধ্যমে ঘটে না। অনেক সময় সিদ্ধান্ত, প্রক্রিয়া এবং নীতির ভেতরেই এমন বিকৃতি থাকে যা আইন ভাঙে না, কিন্তু প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে। এখানেই রাজনৈতিক তত্ত্বের একটি নতুন পদ্ধতি ‘ধারণাগত পুনর্গঠন’ বা ‘কনসেপ্টুয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং’ আমাদের ভাবনাকে নতুনভাবে সাজাতে সাহায্য করতে পারে, বিশেষ করে বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র বোঝার ক্ষেত্রে।
ধারণাগত পুনর্গঠন মূলত বলে, আমরা যে ধারণাগুলো ব্যবহার করি—যেমন দুর্নীতি, জবাবদিহি, ন্যায়, অংশগ্রহণ—এসব স্থির নয়। যদি কোনো ধারণা বাস্তব সমস্যাকে ঠিকমতো ধরতে না পারে, তবে সেটিকে ইচ্ছাকৃতভাবে উন্নত করা দরকার। অর্থাৎ, শুধু সংজ্ঞা বিশ্লেষণ নয়, সংজ্ঞাকে উন্নত করা।
দুর্নীতির ক্ষেত্রেও সাম্প্রতিক তাত্ত্বিক কাজ দেখায়, ‘ব্যক্তিগত লাভ’-কেন্দ্রিক সংজ্ঞা অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক বিকৃতি ধরতে ব্যর্থ। তাই একটি নতুন ধারণা সামনে এসেছে, দুর্নীতি হলো অফিস জবাবদিহির ঘাটতি। যখন কোনো পদধারী তাঁর অফিসের ক্ষমতা এমনভাবে ব্যবহার করেন যার যুক্তি তার অফিসের ম্যান্ডেট, উদ্দেশ্য এবং জনস্বার্থের মানদণ্ড দিয়ে ন্যায্যতা পায় না। এই দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র বিশ্লেষণে বিশেষভাবে কার্যকর। কারণ এখানে বহু সমস্যাই “আইন ভাঙা” নয়, বরং “দায়িত্ব ভাঙা”—অর্থাৎ অফিসের উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুতি।
বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রের বাস্তবতায় এই নতুন সংজ্ঞা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। এখানে বহু ক্ষতিকর চর্চা আছে যা সবসময় ঘুষ বা অর্থ লেনদেন নয়—যেমন রাজনৈতিক বিবেচনায় বদলি-পোস্টিং, নির্বাচিতভাবে আইন প্রয়োগ, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রভাব খাটানো, ফাইল আটকে রাখা, বা অনানুষ্ঠানিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করা। এগুলো প্রায়ই “প্রশাসনিক বিবেচনা” নামে বৈধতা পায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এসব সিদ্ধান্ত কি অফিসের মূল দায়িত্ব ও জনস্বার্থের ম্যান্ডেট দিয়ে ন্যায্যতা পায়? যদি না পায়, তবে তা জবাবদিহির ঘাটতি—অর্থাৎ পুনর্গঠিত অর্থে দুর্নীতি।
প্রথমে আমরা বাস্তব কিছু উদাহরণ বিবেচনা করি—-
উদাহরণ ১: ধরা যাক, একটি উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার প্রক্রিয়া পুরোপুরি আইন মেনে সম্পন্ন হয়েছে। কাগজে-কলমে কোনো ঘুষ নেই, নিয়ম ভাঙা হয়নি। কিন্তু টেন্ডারের শর্ত এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে নির্দিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানেরই যোগ্যতা থাকে। অন্য প্রতিযোগীরা শুরুতেই বাদ পড়ে। এখানে ব্যক্তিগত অর্থ লেনদেন প্রমাণ করা কঠিন।
প্রচলিত সংজ্ঞায় এটি দুর্নীতি হিসেবে ধরা নাও পড়তে পারে। কিন্তু যদি আমরা অফিস জবাবদিহির ঘাটতির ধারণা ব্যবহার করি, তাহলে প্রশ্ন করব, সিদ্ধান্তগ্রহণকারী কি তার ক্ষমতা এমনভাবে ব্যবহার করেছেন যা ন্যায্য প্রতিযোগিতা ও জনস্বার্থের ম্যান্ডেটের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ? যদি উত্তর না হয়, তবে এটি দুর্নীতির একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ।
উদাহরণ ২ : প্রশাসনে বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রে কোনো কর্মকর্তা বারবার এমন জায়গায় পোস্টিং পান যেখানে “সংবেদনশীল” আর্থিক বা নিয়ন্ত্রণমূলক ক্ষমতা রয়েছে। কারণ তিনি রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য। অন্যদিকে দক্ষ কিন্তু স্বাধীনচেতা কর্মকর্তাকে গুরুত্বহীন স্থানে সরিয়ে দেওয়া হয়। এখানে সরাসরি ঘুষের প্রমাণ নাও থাকতে পারে। কিন্তু অফিসের ক্ষমতা কি পেশাগত মানদণ্ডে ব্যবহৃত হচ্ছে, নাকি আনুগত্যের ভিত্তিতে? যদি দ্বিতীয়টি সত্য হয়, তবে এটি অফিসের ম্যান্ডেটের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ—অর্থাৎ জবাবদিহির ঘাটতি।
উদাহরণ ৩: একটি শিল্প প্রতিষ্ঠান বারবার পরিবেশ আইন লঙ্ঘন করছে। তবুও নিয়ন্ত্রক সংস্থা কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে না—কারণ “উপর থেকে নির্দেশ” আছে, অথবা “অর্থনীতির স্বার্থে নমনীয়তা” দেখানো হচ্ছে। কাগজে আইনি ব্যাখ্যা দাঁড় করানো সম্ভব। কিন্তু নিয়ন্ত্রক অফিসের মূল উদ্দেশ্য যদি জনস্বার্থ রক্ষা হয়, তবে এই নরম আচরণ সেই ম্যান্ডেটের বিরুদ্ধে যায়। এখানেও দুর্নীতির পুনর্গঠিত ধারণা কার্যকর।
পুরনো দুর্নীতি-ধারণা ব্যক্তিকেন্দ্রিক—খারাপ লোক খোঁজে। নতুন জবাবদিহি-কেন্দ্রিক ধারণা প্রাতিষ্ঠানিক—খারাপ কাঠামো, নষ্ট প্রণোদনা, দুর্বল নজরদারি খোঁজে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় সমস্যাটি প্রায়ই কাঠামোগত—পদোন্নতি ও বদলির ওপর রাজনৈতিক প্রভাব, ঊর্ধ্বতন নির্দেশের অস্বচ্ছতা, অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনার দুর্বলতা, এবং পৃষ্ঠপোষকতার সংস্কৃতি। একজন কর্মকর্তা ব্যক্তিগত লাভ না করেও অফিসের ক্ষমতা এমনভাবে ব্যবহার করতে পারেন যা তার দায়িত্বের উদ্দেশ্যের বিরুদ্ধে যায়—এখানেই নতুন ধারণাটি বিশ্লেষণকে গভীর করে। এতে দুর্নীতি দমন কৌশলও বদলে যায় ।
প্রচলিত পদ্ধতিতে দুর্নীতি দমন মানে নজরদারি বাড়াও, মামলা দাও, শাস্তি দাও। কিন্তু যদি আমরা দুর্নীতিকে জবাবদিহির ঘাটতি হিসেবে দেখি, তবে সংস্কারের ক্ষেত্র বিস্তৃত হয়। যেমন:
প্রথমত, অফিসের ম্যান্ডেট স্পষ্ট করতে হবে। অনেক প্রশাসনিক পদে দায়িত্ব অস্পষ্ট, ফলে যেকোনো সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করানো যায়। স্পষ্ট ম্যান্ডেট জবাবদিহির মানদণ্ড তৈরি করে।
দ্বিতীয়ত, সিদ্ধান্তের লিখিত যুক্তি বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। বড় প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে “কারণ দর্শাও” সংস্কৃতি গড়ে উঠলে পরবর্তী পর্যালোচনা সহজ হয়।
তৃতীয়ত, সহকর্মীদের জবাবদিহি জোরদার করা দরকার। শুধু বাহ্যিক অডিট নয়—অভ্যন্তরীণ পিয়ার রিভিউ, নৈতিকতা কমিটি এবং সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা বোর্ড কার্যকর হতে পারে।
চতুর্থত, অফিস-নৈতিকতার প্রশিক্ষণ। আমরা আইন শেখাই, কিন্তু অফিসের নৈতিক যুক্তি শেখাই কম। একজন কর্মকর্তাকে বুঝতে হবে— “আমি পারি” মানেই “আমার করা উচিত” নয়।
পঞ্চমত, জবাবদিহি ব্যবস্থা—যেমন প্রকাশ্য ব্যাখ্যা, নাগরিক শুনানি, এবং স্বচ্ছ তথ্যপ্রকাশ—দুর্নীতির ঝুঁকি কমাতে পারে, এমনকি ফৌজদারি শাস্তি ছাড়াও।
এই ধারণাগত পুনর্গঠন হাইব্রিড ক্ষেত্রেও কার্যকর—যেখানে রাষ্ট্র ও বেসরকারি খাত মিশে যায়। যেমন পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ প্রকল্প। এখানে সিদ্ধান্ত কে নিচ্ছে—সরকারি কর্মকর্তা, না বেসরকারি অংশীদার? ক্ষমতার ব্যবহার কোন ম্যান্ডেটের অধীনে? পুরনো সংজ্ঞা বিভ্রান্ত হয়, নতুন জবাবদিহি-কেন্দ্রিক সংজ্ঞা প্রশ্ন তোলে: যে অফিস বা ভূমিকা থেকে ক্ষমতা প্রয়োগ হচ্ছে, তার উদ্দেশ্য কী, এবং সেই উদ্দেশ্যের সঙ্গে সিদ্ধান্তটি সঙ্গতিপূর্ণ কি না।
সমালোচকেরা বলতে পারেন—এভাবে দুর্নীতির ধারণা বাড়ালে সবকিছুই দুর্নীতি হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে উল্টো। এই পদ্ধতি মানদণ্ড কঠোর করে। সব ভুল সিদ্ধান্ত দুর্নীতি নয়, সব অদক্ষতা দুর্নীতি নয়, সব নীতিগত মতভেদও দুর্নীতি নয়। দুর্নীতি তখনই, যখন অফিসের ক্ষমতার ব্যবহার তার ন্যায্য ম্যান্ডেট দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না এবং প্রাতিষ্ঠানিক কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত করে।
বাংলাদেশে সুশাসন নিয়ে আমরা প্রায়ই প্রতিষ্ঠান সংস্কার, আইন সংশোধন, ডিজিটাল সেবা—এসব নিয়ে আলোচনা করি। কিন্তু ধারণাগত সংস্কার নিয়ে খুব কম কথা বলি। অথচ আমরা দুর্নীতি কীভাবে সংজ্ঞায়িত করি, সেটাই নির্ধারণ করে আমরা কী দেখতে পাব, কী মাপব, এবং কী ঠিক করতে চাইব। যদি ধারণা সংকীর্ণ হয়, সমাধানও সংকীর্ণ হবে।
ধারণাগত পুনর্গঠন আমাদের মনে করিয়ে দেয়— ভাল শাসনের লড়াইয়ে শক্তিশালী ধারণা কোনো বিলাসিতা নয়—এটি একটি বাস্তব নীতিগত হাতিয়ার। বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রকে কার্যকর, ন্যায়ভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক করতে চাইলে, দুর্নীতির ধারণাটিকেও নতুন করে প্রতিস্থাপিত করতে হবে। নইলে আমরা লক্ষণ দেখব, কিন্তু রোগ চিনব না।
লেখক: অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

এই মুহূর্তে বাংলাদেশের আইনসভাকে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট করা তথা উচ্চকক্ষ গঠন আদৌ প্রয়োজন কি না, তা নিয়েও আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। তবে এটাও ঠিক যে সংসদকে জবাবদিহির মধ্যে রাখা তথা আইন প্রণয়ন ও সংবিধান সংশোধনে সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের লাগাম টানার উপায় কী—তা নিয়েও আলোচনার অবকাশ রয়েছে।
২ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশে বর্তমানে ৭ কোটিরও বেশি মানুষ সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয়, যা প্রযুক্তির এক বিশাল জয়যাত্রা। কিন্তু এই অগ্রগতির সমান্তরালে হানা দিয়েছে ‘ডিপফেক’ নামক এক ভয়ংকর ডিজিটাল আতঙ্ক। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে তৈরি করা বিকৃত কনটেন্ট এখন সুস্থ রাজনীতির জন্য প্রধান অন্তরায়।
১৭ ঘণ্টা আগে
আগামী এক দশকে অর্থনীতিতে যে কাঠামোগত পরিবর্তন আসবে, তা নিশ্চিতভাবেই সাম্প্রতিক অতীতের যেকোনো ঘটনার চেয়ে নাটকীয় হবে। অনেকেই ভাবছেন এআই শুধু কাজের ধরন বদলাবে; কিন্তু আমাদের মনে রাখা দরকার, এটি ব্যবসার পুরো দৃশ্যপটকেই নতুন করে সাজাবে।
১৭ ঘণ্টা আগে
মাত্র ৩ জন নারী মন্ত্রিত্ব পেয়েছেন। একটি দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী হওয়া সত্ত্বেও কেবিনেটে তাদের এই নগণ্য উপস্থিতি প্রতিনিধিত্বমূলক নয়। বড় রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে আমাদের প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।
১ দিন আগে