গাজীপুর সাফারি পার্ক

চুরি হওয়া দুটি লেমুর ভারতে, বেঁচে নেই শাবক দুটিও

স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক থেকে মার্চে চুরি যাওয়া দুটি প্রাপ্তবয়স্ক রিং-টেইলড লেমুর ভারতে পাচার হয়ে গেছে। তবে সেখানে ঠিক কোথায় লেমুরগুলোকে রাখা হয়েছে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

সাফারি পার্ক সূত্রে জানা গেছে, লেমুর দুটির ছানা ছিল দুটি। এর একটি আগেই মারা যায়। বাবা-মা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর সম্প্রতি অন্যটিরও মৃত্যু হয়।

একসময় লেমুর চারটি ছিল গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কের অন্যতম বড় আকর্ষণ।পৃথিবীর সবচেয়ে বিপন্ন স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যে লেমুর অন্যতম। লাতিন শব্দ ‘লেমুরেস’ বা ‘ভূত’ থেকে এর নামকরণ করা হয়েছে। রাতের আঁধারে নিঃশব্দ চলাফেরা ও জ্বলজ্বলে চোখের কারণেই এমন নাম। প্রাইমেট বর্গের আদিম এ প্রজাতিটির আবাসস্থল হলো মূলত আফ্রিকার মাদাগাস্কার ও কমোরোস দ্বীপপুঞ্জ।

২০১৮ সালে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে অবৈধভাবে পাচারের সময় কাস্টমসের হাতে ধরা পড়ে দুটি লেমুর। সেগুলোর জায়গা হয় গাজীপুর সাফারি পার্কে। সেখানে স্ত্রী লেমুরটি দুটি পুরুষ ছানার জন্ম দেয়। এর মধ্যে একটি ২০২২ সালেই মারা যায়।

সাফারি পার্ক থেকে বাকি তিনটি লেমুর (বাবা, মা ও বেঁচে থাকা শাবকটি) চুরি হয় চলতি বছরের ২৩ মার্চ গভীর রাতে। প্রায় তিন সপ্তাহ পর ১৮ এপ্রিল রাজধানীর ধোলাইপাড় এলাকা থেকে খাঁচাবন্দী অবস্থায় চুরি যাওয়া লেমুর শাবকটিকে পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। সেটিকে সাফারি পার্কে ফেরত দেওয়া হয়। যদিও ছানাটিকে শেষ পর্যন্ত আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি। বাবা-মা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়াই শাবকটির মৃত্যুর কারণ বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

সিআইডির তদন্তে উঠে এসেছে, এরই মধ্যে লেমুর দুটি ভারতে পাচার হয়ে গেছে। তবে সেখানে এগুলোর অবস্থান সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত হতে পারেননি তদন্তকারীরা।

এ বিষয়ে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মো. ছুফি উল্লাহ বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) বিকেলে স্ট্রিমকে বলেন, ‘লেমুর দুটি কোথায় আছে, সে বিষয়ে আমরা এখনো নিশ্চিত নই। ২০১৮ সালে যাদের কাছ থেকে লেমুর দুটি উদ্ধার করা হয়েছিল, তাদের তথ্য চেয়ে কাস্টমসকে দুবার চিঠি দিলেও কোনো জবাব মেলেনি।’

এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার ৮, ক্রেতা ভারত থেকে আসা বাবলু ও শিপলু

সাফারি পার্ক থেকে লেমুর চুরির ঘটনায় মামলা হয়েছিল গাজীপুরর শ্রীপুর থানায়। তদন্তের ভিত্তিতে এখন পর্যন্ত থানার পুলিশ ছয়জনকে এবং পরে সিআইডি আরো দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে। গ্রেপ্তার হওয়া আটজন হলেন—মো. জহির মিয়া, নিপেল মাহমুদ, দেলোয়ার হোসেন, জুয়েল মিয়া, ইসমাইল হোসেন হৃদয়, সাব্বির হোসেন তপন, মজনু মিয়া ও তোফাজ্জল হোসেন। তাদের মধ্যে সাতজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

সিআইডি জানিয়েছে, আসামিদের জবানবন্দি অনুযায়ী, ভারত থেকে বাবলু ও শিপলু নামের দুজন বাংলাদেশে এসেছিলেন। স্থানীয় চোরেরা লেমুরগুলোকে নিজেদের কাছেই রেখে দিয়েছিল। পরে ১০ থেকে ১৫ এপ্রিলের মধ্যে বাংলাদেশে আসা ওই দুই ক্রেতার কাছে তারা এগুলো বিক্রি করে দেয়।

আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের মাধ্যমে সিআইডি জানতে পেরেছে, সন্দেহভাজন ক্রেতাদের মধ্যে বাবলু ওই সময়ই (১০-১৫ এপ্রিল) বাংলাদেশে অবস্থান করছিলেন। তবে শিপলু সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। এই দুজনের নাগরিকত্ব নিয়েও সুনিশ্চিত কোনো তথ্য বলা যাচ্ছে না। তবে পাচার চক্রে দেশি-বিদেশি আরো অনেক সদস্য রয়েছে বলে জানিয়েছে সিআইডি।

চুরি যাওয়া লেমুরের ডিএনএ প্রোফাইলিং নিয়েও জটিলতা

সিআইডির কাছে থাকা তথ্য রয়েছে, চুরি হওয়া লেমুর দুটি ৪৮ লাখ রুপিতে ভারতের আম্বানি পরিবারের পার্ক ‘ভনতারা’য় বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। ইন্টারপোলের মাধ্যমে ভনতারা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে সেখান থেকে প্রাণীদুটির ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের তথ্য চাওয়া হয়। কিন্তু সাফারি পার্কের কাছে লেমুর দুটির ডিএনএ রেকর্ড নেই।

তবে উদ্ধার হওয়া মৃত শাবকটির ডিএনএ প্রোফাইল রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বন অধিদপ্তরের ‘ওয়াইল্ডলাইফ ফরেনসিক ল্যাবরেটরি’তে সংরক্ষিত রয়েছে। ভবিষ্যতে চুরি হওয়া লেমুরের সন্ধান মিললে শাবকটির ডিএনএ তথ্যের মিলিয়ে পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছেন বন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।

বন অধিদপ্তরের ওয়াইল্ডলাইফ ফরেনসিক ল্যাবরেটরির ঊর্ধ্বতন ল্যাব টেকনিশিয়ান কনক রায় স্ট্রিমকে বলেন, ‘সিআইডির চিঠি পেয়ে আমরা কাজ শুরু করেছি। লেমুরের ডিএনএ প্রোফাইলিং একটি জটিল ও গবেষণামূলক প্রক্রিয়া। এটি কোনো সাধারণ পরীক্ষা নয় যে সঙ্গে সঙ্গে ফল পাওয়া সম্ভব। ডেটাগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে আগামী দুই মাসের মধ্যে আমরা আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেব।’

সিআইডি জানিয়েছে, বন বিভাগের ফরেনসিক ল্যাবের প্রতিবেদন পাওয়ার পর অভিযোগপত্র জমা দেয়া হবে।

তবে তদন্তপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বন অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা। নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে তিনি বলেন, ‘গণমাধ্যমে লেমুরের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য এসেছে। যারা চুরি করেছে, তাদের কাছ থেকে কি এই প্রাণীর ডিএনএ পাওয়া যাবে? উচিত ছিল, আগে চুরি হওয়া প্রাণীর ডিএনএ সংগ্রহ করে তারপর এখানকার ডিএনএর সঙ্গে মেলানো। কিন্তু সিআইডি উল্টো পথে হাঁটছে, যা লেমুর উদ্ধারকে আরো জটিল করে তুলেছে।’

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত