-028855-480x270.webp)
গতকাল থেকে ফেসবুক খুললেই মনে হচ্ছে, সময়টা হঠাৎ কয়েক দশক পিছিয়ে গেছে। পরিচিত মানুষগুলোকে যেন চিনতে পারছি, আবার পারছিও না। ছবিতে মুখটা একই, মানুষটাও একই, পাশে হয়তো তাঁর স্ত্রী কিংবা পুরোনো কোনো বন্ধু, শুধু সময়টা বদলে গেছে। হঠাৎ তাঁরা আশির দশকের মানুষ।
কারও গায়ে ঢোলা শার্ট, কারও চুলে পুরোনো দিনের স্টাইল, কারও ছবির পেছনে পুরোনো ঢাকার রাস্তা, কারও বসার ঘর দেখে মনে হচ্ছে ছবিটা কোনো পুরোনো অ্যালবাম থেকে পাওয়া। ছবির রংটাও এমন, যেন বহু বছর ধরে একটা কাঠের আলমারির ভেতর পড়ে ছিল। অথচ আমরা জানি, ছবিটা আসলে গতকালই এআই দিয়ে বানানো হয়েছে।
প্রথমে ব্যাপারটা বেশ মজারই লাগে। আমিও হয়তো কয়েকটা ছবি দেখে হাসি, কারও ছবিতে পুরোনো দিনের পোশাক দেখে অবাক হই। কোনো স্বামী-স্ত্রীর ছবি দেখে মনে হয়, সত্যিই যদি এরা সেই সময়ে থাকতেন! কিন্তু একটু পরেই অন্য একটা প্রশ্ন মাথায় আসে—মানুষ এত আগ্রহ নিয়ে নিজের ছবিকে আশির দশকে নিয়ে যাচ্ছে কেন? এর ভেতরে কি আমাদের মন সম্পর্কে অন্য কোনো গল্প লুকিয়ে আছে?
আশির দশকে নিজেকে দেখতে চাইছি কেন
বাংলাদেশের আশির দশকের একটা নিজস্ব দৃশ্যপট আছে। ঢাকার রাস্তায় রিকশা, গলির মাথায় চায়ের দোকান, পাড়ার মাঠে বিকেলের আড্ডা, বাসার ড্রয়িংরুমে বিটিভি, টেলিফোনে কথা বলার জন্য অপেক্ষা, দূরের আত্মীয়ের চিঠি, ঈদের আগে নতুন জামাকাপড়, ক্যাসেটে গান রেকর্ড করা, সিনেমা হলের পোস্টার—এসব মিলে আমাদের মাথায় সেই সময়ের একটা ছবি তৈরি হয়েছে। কারও নিজের স্মৃতি থেকে, কারও বাবা-মায়ের গল্প থেকে, পুরোনো অ্যালবাম, সিনেমা কিংবা গান থেকে।

তাই নিজের ছবিকে সেই সময়ে বসিয়ে দিলে প্রশ্ন জাগে, ‘আমি যদি তখন থাকতাম?’ অন্য সময়ে জন্মালে, অন্য শহরে থাকলে কিংবা অন্য পেশা বেছে নিলে জীবনটা কেমন হতো, এ ধরনের প্রশ্নের উত্তর বাস্তবে জানা সম্ভব নয়।
এআই সেই অসম্ভব কৌতূহলটাকে দৃশ্যমান করে দিয়েছে। নিজের একটা ছবি দিলাম, এআইকে বললাম এটা যদি আশির দশকের হতো? কিছুক্ষণের মধ্যে সামনে চলে এলো সেই মানুষটার আরেকটি সংস্করণ।
মনোবিজ্ঞানে এর সঙ্গে ‘কাউন্টারফ্যাকচুয়াল থিংকিং’-এর সম্পর্ক আছে। যা ঘটেছে, তার বদলে কী ঘটতে পারত, তা নিয়ে ভাবা। নস্টালজিয়া নিয়েও গবেষণায় দেখা গেছে, অতীতের কথা ভাবার সঙ্গে নিজের পরিচয়, সম্পর্ক এবং জীবনের অর্থ খোঁজার বিষয়গুলো জড়িয়ে থাকে।
যে সময়টা আমাদের ছিল না, সেটাও কেন এত আপন
ইন্টারনেটে ‘অ্যানেমোইয়া’ নামে একটা শব্দ এ ধরনের অনুভূতি বোঝাতে বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। নিজে যে সময় বাঁচিনি, তার জন্য নস্টালজিয়া। শব্দটি মনোবিজ্ঞানের কোনো নির্দিষ্ট মানসিক অবস্থার নাম নয়, কিন্তু ধারণাটা এই ট্রেন্ড বোঝার ক্ষেত্রে বেশ কাজে লাগে। আমরা অনেক সময় নিজের জীবনের স্মৃতি নয়, অন্যের স্মৃতি আর সাংস্কৃতিক চিহ্নের মধ্য দিয়েও কোনো একটা অতীতের সঙ্গে আবেগ তৈরি করি।
বাংলাদেশে ব্যাপারটা আরও সহজে বোঝা যায়। আশির দশকের একটা বাড়ি দেখলে হয়তো কারও নিজের বাড়ি মনে পড়ে না, কিন্তু মনে পড়ে নানাবাড়ি। পুরোনো রিকশা দেখলে নিজের কোনো স্মৃতি না থাকলেও মনে পড়ে বাবার বলা গল্প। ক্যাসেটের ছবি দেখলে মনে হয়, এই জিনিসটা তো আমাদের বাসাতেও ছিল। পুরোনো টেলিফোন দেখলে মনে পড়ে, কারও বাসায় ফোন আসার অপেক্ষা করতে হতো।
কিছু স্মৃতি তাই শুধু ব্যক্তিগত নয়। পরিবারে গল্প হয়ে, ছবিতে, গানে কিংবা সিনেমায় ঘুরতে ঘুরতে সেগুলো প্রজন্ম পেরিয়ে যায়। নিজের অভিজ্ঞতা না হয়েও একসময় খুব পরিচিত মনে হয়।
স্মৃতি কি অতীতকে সুন্দর করে
আশির দশকের আসল ছবিতে একটা ব্যাপার খুব সহজেই চোখ এড়িয়ে যায়, সেই সময়ের কঠিন বাস্তবতা। সেখানে দেখা যায় না বিদ্যুৎহীন পরিবেশ, যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা, তথ্য পাওয়ার অসুবিধা, চিকিৎসার সীমাবদ্ধতা কিংবা জীবনের হাজারো অনিশ্চয়তা।
এটাই সম্ভবত নস্টালজিয়ার স্বভাব। সময় চলে যাওয়ার পর আমরা পুরো সময়টাকে মনে রাখি না; কিছু দৃশ্য বেছে নিই। পরে সেই দৃশ্যগুলোই পুরো অতীতের প্রতীক হয়ে ওঠে।
মনোবিজ্ঞানের গবেষণায় নস্টালজিয়াকে তাই অনেক সময় ‘বিটারসুইট ইমোশন’ বলা হয়। এতে আনন্দ যেমন আছে, তেমনি হারানোর অনুভূতিও আছে।এই আনন্দ আর বিষণ্নতার মিশ্রণই নস্টালজিয়াকে এত শক্তিশালী করে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, নস্টালজিয়া মানুষের ‘সোশ্যাল কানেক্টেডনেস’ বা অন্য মানুষের সঙ্গে যুক্ত থাকার অনুভূতি বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে ‘সেলফ-কনটিনিউটি’ বা নিজের অতীত ও বর্তমানকে একই জীবনের ধারাবাহিক অংশ হিসেবে অনুভব করতেও সাহায্য করতে পারে।
‘হতে পারত’ জীবনের প্রতি কৌতূহল
হয়তো এই ট্রেন্ডের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকটা এখানেই। এতদিন অতীতকে আমরা দেখতাম পুরোনো ছবি, অ্যালবাম, সিনেমা কিংবা বাবা-মায়ের গল্পের ভেতর দিয়ে। এখন সেই অতীতের ভেতর নিজেদেরও বসিয়ে দেওয়া যাচ্ছে।
বাস্তবে এসব কখনো ঘটেনি। তবু ছবিটা দেখে মনে হয়, এমনটা তো হতে পারত। মানুষের মনে এই ‘হতে পারত’ জীবনের প্রতি কৌতূহল আছে। জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে অনেক সম্ভাবনাকে পেছনে ফেলে আসি। এআই সেই সম্ভাবনাগুলোর অন্তত একটা ছবি বানিয়ে দিচ্ছে।
হয়তো এ কারণেই ছবিগুলো এত আপন লাগে। আমরা যে জীবনটা বেঁচেছি, তার অনেক ছবি আছে। কিন্তু যে জীবনটা বাঁচা হয়নি, তার কোনো ছবি নেই। এআই সেই না-বাঁচা জীবনের একটা কাল্পনিক ছবি বানিয়ে দিয়েছে। তাই হয়তো আমরা সত্যিই আশির দশকে ফিরে যেতে চাইছি না। এত দ্রুত বদলে যাওয়া বর্তমানের ভেতর দাঁড়িয়ে শুধু একটু ধীর একটা সময়কে কল্পনা করতে চাইছি
.png)









