জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোটে যোগদানের ঘটনায় অবাক হওয়ার কিছু নেই। দলটির পরবর্তী পদক্ষেপ বিষয়ে অনুমান করা কঠিন ছিল অবশ্য। মাঝে তো এমন পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছিল—এনসিপি যেন বিএনপি-নেতৃত্বাধীন জোটেই যোগ দেবে। তবে বিএনপির কাছ থেকে ‘আশানুরূপ’ আসনের প্রতিশ্রুতি নাকি পায়নি দলটি। সত্যি বলতে, প্রতিটি আসনে বিএনপির এত মনোনয়নপ্রত্যাশী যে এনসিপি আসন ছাড় পেলেও দলটির স্বতন্ত্র প্রার্থীর কাছে হেরে যাওয়ার শঙ্কা ছিল বেশি। জামায়াতের জোটে সেই শঙ্কা অনেক কম।
সর্বশেষ প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, জামায়াত জোটসঙ্গীদের ১০০ আসন ছেড়েছে। বিএনপির পক্ষে এর সিকিভাগ আসনও জোটসঙ্গীদের ছেড়ে দেওয়া কঠিন। এ পর্যন্ত প্রাপ্ত খবর—জোটসঙ্গীদের ১৫টি আসন ছেড়েছে বিএনপি। এক এনসিপির দাবিই নাকি ছিল এর চেয়ে বেশি। এমনটিও ধারণা করা হচ্ছে, এনসিপিকে জোটে নিতে বেশি উৎসাহী ছিল না বিএনপি। কারণ দলটি যাদের সঙ্গে থাকবে, তাদের ভোট দেবে না আওয়ামী লীগ সমর্থকেরা। গণ-অভ্যুত্থানে দলটির সরকার উৎখাত হলেও তাদের উল্লেখযোগ্য ভোটার দেশে রয়েছে। জরিপগুলোতেও দেখা যাচ্ছে সেই চিত্র। অন্যদিকে এনসিপির সমর্থক তেমন নেই। যত দিন গেছে—বোধগম্য কিছু কারণে তাদের সমর্থন কমেছে।
চার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে হয়ে যাওয়া ছাত্র সংসদ নির্বাচনেও তাদের সমর্থিতরা ভালো করেনি। যদিও শিক্ষার্থীদের ভেতর থেকে গড়ে ওঠা আন্দোলনের পরিণতিতেই শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে আর এতে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্র-তরুণদের একাংশ নিয়েই গঠিত হয় এনসিপি। এদের কয়েকজন আবার অন্তর্বর্তী সরকারে যোগদান করেন। তাঁদেরই একজন পরে সরকার থেকে বেরিয়ে এসে এনসিপি গঠন করেন। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগমুহূর্তে তাঁদের বাকি দুজন পদত্যাগ করেছেন। তাঁদের একজন এনসিপিতে যোগ দিয়েছেন। আরেকজন বলেছেন, তিনি দলটির সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত নন। গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্র-তরুণদের অনেকের কাছে ‘তাত্ত্বিক গুরু’ বলে তিনি পরিচিত।
এনসিপির জামায়াত জোটে যাওয়ার সিদ্ধান্তের যাঁরা বিরোধী, তাঁদের কয়েকজন ইতিমধ্যে পদত্যাগ করেছেন। এদের কেউ নির্বাচন করছেন; কেউ করছেন না। তাঁরা এখন আরেকটি এনসিপি কিংবা অন্য কোনো দল গড়ে তুলবেন কি না, সে প্রশ্নও রয়েছে। তবে এটা ঠিক, এনসিপির বড় অংশই জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোটে যাওয়ার সিদ্ধান্তের সঙ্গে আছে। এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তাঁদের রয়েছে বৈকি। এনসিপি বিএনপি-নেতৃত্বাধীন জোটে গেলেও সেটা তাঁর অধিকার বলে বিবেচিত হতো। তবে জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত কতটা রাজনৈতিক আর কতটা কৌশলগত, সে প্রশ্ন রয়েছে।
এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলাম বলেছেন, এটা নির্বাচনী জোট। নির্বাচনে জামায়াতের কাছ থেকে ৩০টি আসনের প্রতিশ্রুতি তাঁরা পেয়েছেন বলে জানা যাচ্ছে। এসব আসনে জামায়াতসহ জোটসঙ্গীদের জোর সমর্থন পাবেন বলে তাঁরা আশাবাদী। বিনিময়ে অন্যান্য আসনে তাঁরা জোটের প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারণা চালাবেন। কিছুদিনের মধ্যে আসন সমঝোতার চিত্রটি স্পষ্ট হবে। তবে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন পর্যন্ত ঘটবে নানা ঘটনা। এ নিয়ে জটিলতাও সৃষ্টি হতে পারে। এনসিপির দিক থেকে না হলেও জোটসঙ্গী ইসলামী আন্দোলনের মতো দলের তরফ থেকে সেটা ঘটলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। দেশের অনেক স্থানে তাদের বাঁধা ভোট রয়েছে বলে দাবি করা হয়। ফলে জামায়াতের কাছ থেকে বেশি আসনে ছাড় পাওয়ার দাবি তাদের জোরালো।
এনসিপির পাশাপাশি এ জোটে যোগ দিয়েছে কর্নেল (অব.) অলি আহমদের এলডিপি। এনসিপি মাঝে যে দুটি দলের সঙ্গে জোট গঠন করেছিল, তার একটি এবি পার্টিও জামায়াত জোটে যোগ দিয়েছে। অপর দল রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন এতে যোগ দেওয়ার কথা নয়। সংস্কার বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলার ক্ষেত্রে তাদের বড় ভূমিকা থাকলেও নির্বাচনের মাঠে দলটির গুরুত্ব নেই বললেই চলে। তারা যোগ না দেওয়ায় জামায়াতসহ এ জোটভুক্তদের অখুশি হওয়ার কথা নয়। তবে রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের নেতা-কর্মীরা এনসিপির সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হবেন। তাঁদের সঙ্গে আলোচনা না করেই নাকি এনসিপি ওই জোটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রাজনীতিতে এসব অবশ্য ঘটে থাকে। তা ছাড়া সামনেই জাতীয় নির্বাচন। এর সঙ্গে রয়েছে রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার সম্পর্ক। ক্ষমতায় যেতে না পারলেও সংসদে বিরোধী দলের আসনে গিয়ে বসতে পারাটাও কম নয়।
এবার জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে রাষ্ট্র সংস্কার প্রশ্নে গণভোটও হতে যাচ্ছে। এতে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হলে নির্দিষ্ট সময়ে গঠিত হবে উচ্চকক্ষ। প্রাপ্ত ভোটের ভিত্তিতে তাতে সদস্য হিসেবে মনোনীত হওয়ার সম্ভাবনাও এনসিপির মতো দলের নেতাদের রয়েছে। নবগঠিত এনসিপিকে অনেক শুভানুধ্যায়ী বলছিলেন—প্রস্তুতিহীন অবস্থায় আগামী নির্বাচনে অংশ না নিয়ে রাজনীতির মাঠে থাকতে। নির্বাচনে গেলে বিএনপি কিংবা জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোটে না গিয়ে স্বতন্ত্র অবস্থানে থাকার পরামর্শও তাঁদের প্রতি ছিল। মাঝে এবি পার্টি ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে জোট গঠনের পর সেটাকে স্বাগত জানিয়েছিলেন অনেকে। এবি পার্টি জামায়াতের ভেতর থেকে এলেও তাদের সংস্কারবাদী বলেই বিবেচনা করা হচ্ছিল। আর রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন তো বামধারা থেকে আগত। শেষতক দেখা গেল, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনকে একা রেখে অপর দুই দল এনসিপি ও এবি পার্টি চলে গেল জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোটে। আর এসব দেখে অনেকেই বলছেন, ঘটনাটি রাজনৈতিক।
এবি পার্টি তো বলতে গেলে জামায়াত থেকেই এসেছিল। এনসিপিকেও মনে করা হচ্ছিল জামায়াতের ‘বি’ বা ‘সি’ টিম। বাস্তবে অতটা না হলেও বিভিন্ন ইস্যুতে দেখা যাচ্ছিল এ দুই দলের অভিন্ন কিংবা কাছাকাছি অবস্থান। এনসিপি নেতা জামায়াত জোটে যাওয়ার অন্যতম যুক্তি হিসেবে বলেছেন, সংস্কার প্রশ্নে তারা বেশি কাছাকাছি। রাজনৈতিক-আদর্শগত ক্ষেত্রেও তাদের বক্তব্যে কিন্তু মিল ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দাবিদাওয়া উত্থাপনেও তারা পরস্পরের কাছাকাছি। এনসিপির কিছু কর্মসূচি পালনে জামায়াত-শিবির লোকবল জুগিয়েছে বলে খবর ছিল। এনসিপিকে দিয়ে কিছু কৌশলগত দাবি আদায়ে জামায়াত সচেষ্ট ছিল বলেও জানা যায়। সুতরাং জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোটে এনসিপির যাওয়ার বিষয়টিকে নিছক নির্বাচনকেন্দ্রিক বলে বর্ণনার সুযোগ কমই। তাই এর রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা সহসা থামবে না।
এনসিপি নিরুপায় হয়ে জামায়াত জোটে গেল, নাকি এটা পূর্বনির্ধারিত—এ প্রশ্নে আলোচনা চলবে আরও কিছুদিন। দক্ষিণপন্থী ঝোঁক থাকায় এনসিপির বড় অংশটি একপর্যায়ে জামায়াতে বিলীন হবে বলেও অনেকে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। সেটি না ঘটলেও এ পর্যন্ত যা ঘটেছে, তাতে গণ-অভ্যুত্থানের পর মাঠে সবচাইতে উৎসাহী দক্ষিণপন্থীরা খুশি হবে। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান যে এদের নেতৃত্বেই ঘটেছে, সেটা তারা এখন আরও জোরালোভাবে দাবি করতে পারবে। আর জামায়াত জোটটি ক্ষমতায় যেতে না পারলেও ভবিষ্যতে এনসিপিকে সঙ্গে নিয়ে থাকতে পারবে রাজনীতিতে। সামনে যে সরকার আসবে, তার সীমাবদ্ধতা ও ব্যর্থতা নিয়ে তারা জোরালো আন্দোলন গড়ে তুলতে পারবে। তাই মনে করা হচ্ছে, একটা সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য থেকেই জামায়াত, অন্যান্য ধর্মভিত্তিক দল, এবি পার্টি ও এনসিপি একত্র হয়েছে—যাদের লক্ষ্য আসলে ২০৩১ সালের নির্বাচন। আগামী সরকার দেশ পরিচালনায় ব্যর্থ হলে মধ্যবর্তী নির্বাচনও অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে, এমন কথাবার্তা রয়েছে বাজারে।
অত দূরে না তাকিয়ে নিকটেই যে নির্বাচন, সেটা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হলেই অবশ্য আমরা আপাতত রক্ষা পাব। এটা আরও আগে হয়ে যাওয়াটাই মঙ্গলজনক ছিল, এ কথা বলার মতো মানুষ বর্তমানে অনেক বেড়েছে। এনসিপি কোনো একটা জোটে যাওয়ার ফলে এবং এরই মধ্যে মনোনয়নপত্র জমাদানের সময় সুষ্ঠুভাবে অতিক্রান্ত হওয়ায় নির্বাচন বিষয়ে যেটুকু সংশয় ছিল, সেটাও কাটবে। এনসিপি তার সুবিধা বা পছন্দমতো যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার—নিয়েছে। সেটা যাদের পছন্দ হয়নি, তারা সরে যাচ্ছে দলটি থেকে। কয়েকজন আলোচিত নারীনেত্রী ছিলেন দলটির সামনের কাতারে। তাঁরা সরে যাওয়ার কারণ কতটা ‘রাজনৈতিক’, সে প্রশ্নও রয়েছে। জামায়াত-নেতৃত্বাধীন একটা দক্ষিণপন্থী জোটে বিকশিত হতে পারবেন না, এমন শঙ্কাও নাকি তাঁদের তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে দলটির বাইরে।
জামায়াত জোটে এনসিপির কী অভিজ্ঞতা হয়, সেটা দেখার অপেক্ষায় আমরা থাকব। গণ-অভ্যুত্থানের ভেতর দিয়ে ‘নয়া বন্দোবস্ত’সহ কিছু আকর্ষণীয় শব্দগুচ্ছ তারা সামনে এনেছিল। সেই দিনগুলোর কথাও আমরা মনে রাখব।
হাসান মামুন: সাংবাদিক ও কলামিস্ট