leadT1ad

দেশে ফিরে প্রথম সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান, ক্ষমতার সঙ্গে দায়িত্বও আসে

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

তারেক রহমান। ছবি: সংগৃহীত

১৭ বছর পর দেশে ফিরেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার শাসনামলের একটা সময় দেশের গণমাধ্যমে তাঁর বক্তব্য প্রচার নিষিদ্ধ ছিল। দেশে ফেরার পর প্রথমবার যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক টাইম ম্যাগাজিনকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন তিনি। সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান স্পাইডার-ম্যান চলচ্চিত্রের একটি উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, ‘ক্ষমতার সঙ্গে দায়িত্বও আসে। আমি এটি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি।’

বুধবার (২৯ জানুয়ারি) সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করে টাইম ম্যাগাজিন। সাক্ষাৎকারে দেশের বিভিন্ন সমস্যা, সম্ভাবনা, নিজের পরিকল্পনা ও দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন তারেক রহমান। এর মধ্যে রয়েছে ২০০৭-২০০৮ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দেওয়া ৮৪টি অভিযোগে ১৮ মাস কারাদণ্ড, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও দুর্বল টাকার কারণে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমায় আমদানি সীমিত হওযা, এর পরিপ্রেক্ষিতে উৎপাদন ও জ্বালানি সরবরাহে প্রভাব, পোশাক রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতিকে বহুমুখী করার প্রচেষ্টায় ধীরগতি, বেকারত্ব, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক, যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক, দুর্নীতি ও পরবর্তী প্রজন্মের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি।

সাক্ষাৎকারে বলা হয়, তারেক রহমানের জন্য গত কয়েক সপ্তাহ নানান উত্থান-পতনের মধ্যে দিয়ে গেছে। ২৫ ডিসেম্বর তিনি দেশে ফেরেন। দেশে ফেরার পাঁচ দিন পরই তাঁর মা বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া মারা যান।

পারিবারিক বাসভবনে বসে টাইমকে এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তিনি আসলে খুব ভালো কথা বলতে পারেন না। কিন্তু যদি তাঁকে কোনো কাজ করতে বলা হয়, তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন।

মায়ের মৃত্যুর প্রসঙ্গ আসতেই চোখ ছল ছল হয়ে উঠে তাঁর। তিনি বলেন, ‘মায়ের কাছ থেকে আমি যে শিক্ষা পেয়েছি, তা হলো—আপনার যদি কোনো দায়িত্ব থাকে, তাহলে সেটি পালন করতেই হবে।’

সেই দায়িত্ব হয়তো তার মায়ের পথ অনুসরণ করেই হবে। সমস্যাও কম নয়। দেশের ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ যুবক বেকার। আর প্রতিবছর ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। তাই পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সুযোগ তৈরিই এখন জরুরি প্রয়োজন।

তবে তারেক রহমানকে যে অতীত ছাড়ছে না সেটাও টাইম বলেছে। এখনো তাঁর প্রধান পরিচয় তিনি খালেদা জিয়া ও স্বাধীনতা যুদ্ধের নায়ক জিয়াউর রহমানের ছেলে হিসেবে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দলের একটির নেতা তিনি।

সমর্থকদের কাছে তিনি নির্যাতিত ত্রাণকর্তা, বিপর্যস্ত স্বদেশকে বাঁচাতে ফিরেছেন। সমালোচকদের চোখে তিনি এক দুর্নীতিগ্রস্ত, সুবিধাভোগী, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া ‘রাজপুত্র’, যার নেতৃত্বের একমাত্র যোগ্যতা জন্মসূত্রে তিনি পেয়েছেন।

তবে নিজেকে বিভক্ত জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য সঠিক মানুষ দাবি করে তারেক রহমান বলেন, ‘আমি এখানে এসেছি শুধু বাবা-মায়ের ছেলে বলে নয়। আমার দলের সমর্থকরাই আমাকে আজ এখানে এনেছেন।’

অনেক বাংলাদেশিই তার কথায় আস্থায় রাখছে বলে মনে করে টাইম। ডিসেম্বরের শেষ দিকে করা জরিপের সূত্রে টাইম বলছে, তাঁর নেতৃত্বাধীন বিএনপির প্রতি সমর্থন প্রায় ৭০ শতাংশ। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন ১৯ শতাংশ। তবে উদ্বেগও স্পষ্ট। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপির শাসনামলে টানা চার বছর ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) বাংলাদেশকে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল।

তারেক রহমান অবশ্য দুর্নীতির সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। অন্তর্বর্তী সরকার তাঁর বিরুদ্ধে দেওয়া আগের দণ্ড বাতিল করেছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তারা কিছুই প্রমাণ করতে পারেনি।’

তারেক রহমানের দেশে ফেরার দিনের ছবি
তারেক রহমানের দেশে ফেরার দিনের ছবি

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, ‘যারা জীবন হারিয়েছে, তাঁদের প্রতি আমাদের খুব বড় দায়িত্ব রয়েছে। আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে, ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, যেন মানুষ তাদের রাজনৈতিক অধিকার ফিরে পায়।’

নিজের পরিকল্পনা হিসেবে পানির স্তর পুনরুদ্ধারে ১২ হাজার মাইল খাল খনন, প্রতিবছর ৫ কোটি গাছ লাগানো, ঢাকায় ৫০টি নতুন সবুজ জায়গা তৈরি, বর্জ্য পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন, কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংস্কার এবং দেশের স্বাস্থ্য সেবা খাতের ওপর চাপ কমাতে বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে অংশীদারত্বের কথা জানান তিনি।

বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমি যদি আমার পরিকল্পনার মাত্র ৩০ শতাংশ বাস্তবায়ন করতে পারি, আমি নিশ্চিত বাংলাদেশের মানুষ আমাকে সমর্থন করবে।’

২০০৭–২০০৮ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় কারাগারে নির্যাতন শিকার হন তিনি। আজও তাঁর মেরুদণ্ডে সমস্যা। চিকিৎসার জন্যই প্রথমে যুক্তরাজ্যে যান। সেই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘শীত বেশি হলে পিঠে ব্যথা বাড়ে। কিন্তু এটি মানুষের প্রতি আমার দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়। ভবিষ্যতে অন্যরা যাতে এই ধরনের কষ্ট না পায়, সেজন্য আমার সেরাটা দিতে হবে।’

২০১৮ সালে তাঁর অসুস্থ মাকে দুর্নীতির অভিযোগে আটক করা হয়। দুর্নীতির অভিযোগগুলোকে খালেদা জিয়া রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছিলেন। মা আটক হলে তারেক রহমান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হন। বিদেশ থেকে দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা করেন।

এ সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ কিছু ক্ষেত্রে অর্থনৈতিকভাবে এগোলেও রাজনৈতিকভাবে আরও দমনমূলক হয়ে ওঠে। শেখ হাসিনার শাসনামলে ৩,৫০০ জনের বেশি মানুষ গুম হয়েছেন বলে অন্তর্বর্তী সরকারের দাবি। জুলাই অভ্যুত্থানের পর পরিস্থিতি পাল্টালেও আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে, গণপিটুনি ও সহিংসতা বেড়েছে।

সম্প্রতি ট্রাম্প প্রশাসন বাংলাদেশের ওপর ২০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছে। এটি বাংলাদেশের রপ্তানি-নির্ভর অর্থনীতিতে আঘাত হেনেছে। এই ব্যাপারে তারেক রহমান জানিয়েছেন, তিনি দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর উপায় খুঁজছেন। বোয়িং বিমান ও মার্কিন জ্বালানি অবকাঠামো ক্রয়ের সম্ভাবনা তৈরি করে এই পরিস্থিতি থেকে উতরানোর চেষ্টা করছেন।

নির্বাচনের আগে তারেক রহমানের ছবি সম্বলিত পোস্টার।
নির্বাচনের আগে তারেক রহমানের ছবি সম্বলিত পোস্টার।

তিনি বলেন, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দেশের স্বার্থ দেখবেন। আমি আমার দেশের স্বার্থ দেখব। কিন্তু আমরা একে অপরকে সাহায্যও করতে পারি। আমি নিশ্চিত ট্রাম্প একজন অত্যন্ত যুক্তিবাদী মানুষ।’

দেশের আইনের শাসন নিয়ে বলতে গিয়ে তারেক রহমানের ভাষ্য, ‘আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার হবে আইনের শাসন নিশ্চিত করা। রাস্তাঘাটে মানুষ যেন নিরাপদ থাকে এবং নির্ভয়ে ব্যবসা করতে পারে, তা নিশ্চিত করা।’

আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা সঠিক ছিল কিনা এমন প্রশ্নে তারেক রহমান সরাসরি কিছু বলেননি। তবে নীতিগতভাবে তিনি কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের বিপক্ষে। তিনি বলেন, ‘আজ যদি আপনি একটি দল নিষিদ্ধ করেন, তবে কাল যে আমাকে নিষিদ্ধ করবেন না তার নিশ্চয়তা কী? অবশ্যই কেউ যদি অপরাধী হয়, তাকে তার পরিণাম ভোগ করতে হবে।’

এদিকে, জানুয়ারির শুরুতে জামায়াত নেতা এক ভারতীয় কূটনীতিকের সঙ্গে গোপন বৈঠকের কথা প্রকাশ করেন। এই ব্যাপারে তারেক রহমান জানান, এ নিয়ে তিনি চিন্তিত নন। বরং তিনি মনে করেন মানুষ কেবল গণতন্ত্রে ফিরতে চায়, যেখানে তারা মুক্তভাবে কথা বলতে পারবে।

যে-ই ক্ষমতায় আসুক না কেন ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামত অগ্রাধিকার হবে। এ ব্যাপারে তারেক রহমান বলেন, ‘আমাদের দেশ ও মানুষের স্বার্থ রক্ষা সবার আগে। তবে আমরা সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করব।’

অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিচ্ছেন তারেক রহমান—এমনটাই উল্লেখ করেছে টাইম। উদাহরণ হিসেবে গত বছরের মে মাসে তিনি নিজেকে নিয়ে করা একটি ব্যঙ্গাত্মক কার্টুন শেয়ার করে মুক্ত সাংবাদিকতার কথা বলা এবং মায়ের শেষকৃত্যে তিনি হাসিনাকে আক্রমণ না করে ঐক্যের ডাক দিয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়।

লন্ডনের প্রবাস জীবনের কোনো কিছু মিস করেন কিনা এমন প্রশ্নে এক বাক্যে তারেক রহমান বলেন, ‘আমার স্বাধীনতা।’

ঢাকার কড়া নিরাপত্তা বেষ্টনীতে নিজেকে অবরুদ্ধ মনে হয় তাঁর। পাড়ার দোকানে হাঁটা বা নিজের গাড়ি চালিয়ে কোথাও যাওয়ার দিনগুলো এখন শেষ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যখন আমি এই বাড়িতে এলাম এবং এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেখলাম, আমার নিজেকে অবরুদ্ধ মনে হলো। পাড়ার দোকানে ঘুরে বেড়ানো কিংবা বেন নেভিস পর্বত থেকে নামার সময় জাইমাকে চমকে দিতে হঠাৎ নিজের লেক্সাস গাড়ি চালিয়ে ফোর্ট উইলিয়ামে যাওয়ার দিনগুলো এখন অতীত। প্রতিদিনের ১০ হাজার কদম হাঁটার লক্ষ্য পূরণ করতে এখন আমাকে নানান কৌশল অবলম্বন করতে হয়।’

তবে তারেক রহমান কোনো অভিযোগ করেননি। তিনি তাঁর এ প্রত্যাবর্তনকে কেবল খেয়াল খুশিতে নয়, বরং একটি বড় উদ্দেশ্যে হয়েছে বলে মনে করছেন। তিনি স্পাইডার-ম্যান চলচ্চিত্রের একটি উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, ‘ক্ষমতার সঙ্গে দায়িত্বও আসে। আমি এটি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি।’

Ad 300x250

সম্পর্কিত