২০২৬ কি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের বছর হতে পারবে

স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

দেশের রাজনীতি বর্তমানে এক অনিশ্চিত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। ভবিষ্যৎ নিয়ে যেমন শঙ্কা রয়েছে, তেমনি সম্ভাবনাও কম নয়। তাই ২০২৬ সাল হতে পারে দেশের ভবিষ্যৎ পথনির্দেশ নির্ধারণের বছর। তবে দেশ ও দেশের রাজনীতি স্থিতিশীলতার দিকে অগ্রসর হবে, নাকি দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতার চক্রে প্রবেশ করবে—তা অনেকাংশেই নির্ভর করবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের দক্ষতা, বিচক্ষণতা এবং দূরদর্শিতার ওপর।

২০২৬-এ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জনগণকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় আস্থাশীল করা। একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে স্বাভাবিক রাজনীতিতে ফিরে আসা। আবার, নির্বাচন হলেই গণতন্ত্র ফিরে আসবে তা বলা যাবে না। তবে, সাধারণ মানুষ চেয়ে আছে নির্বাচনের দিকে। কেমন হবে ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জাতীয় নির্বাচন? এই নির্বাচন গণতন্ত্রের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারবে? নির্বাচন মানে এক দলের পতন আর অন্য দলের জন্য জায়গা দাখল নয় তো?

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান যে স্ফুলিঙ্গ জ্বালিয়েছিল, যে সম্ভাবনাময় আগামীর বার্তা দিয়েছিল; একটু একটু করে তা নিভে যাচ্ছে দিন দিন। তরুণ সমাজ ও মধ্যবিত্তের একটি বড় অংশ ২০২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে পরিবর্তনের আশা করেছিল দেশের চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে সেই আশা ভাঙনের মুখে পড়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম থেকেই এখন পর্যন্ত দেশের টালমাটাল এক অবস্থা বিদ্যমান। দেশের পূর্ণ স্থিতিশীলতার লক্ষ্যে সব দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো ক্ষমতা প্রয়োগ ও নিয়ন্ত্রণের পথে না হেঁটে সমন্বয় ও সমঝোতার মাধ্যমে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে যাওয়া।

সম্প্রতি প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট-এর কার্যালয়ে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও হামলার ঘটনায় সংশয়, ক্ষোভ ও ভীতিকর অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সরকারি মহল বা সরকারের একটি অংশ এই হামলার ঘটনা ঘটতে দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সাংবাদিক সমাজ, রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজ এই ঘটনার প্রতি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং এ ধরনের সহিংসতার কারণে গণমাধ্যম স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অবকাঠামোর ওপর বড় হুমকি তৈরি হয়েছে বলে তারা জানিয়েছেন। এ ছাড়া ময়মনসিংহে এক ধর্মীয় সংখ্যালঘু শ্রমিককে হত্যার পরে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। এসবের ফলে আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। আর এসব ঘটনার পরে এই প্রশ্নটি আরো বেশি করে উত্থাপিত হচ্ছে, আগামী নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য এবং শান্তিপূর্ণ হবে?

এই সবকিছু মিলয়ে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন কেবল একটি নির্বাচন আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং গণতন্ত্রের পথে অগ্রযাত্রা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। নানান উদ্বেগ, অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব; এই বাস্তবতার মধ্যে মানুষ আশা করে আছে গ্রহণযোগ্য, শান্তিপূর্ণ ও বিশ্বাসযোগ্য একটি নির্বাচনের মাধ্যমে আবার গণতন্ত্রের দিকে যাত্রা করার। আরেকটি বিতর্কিত অধ্যায় না হয়ে আগামী নির্বাচন হতে পারে নতুন আস্থার সূচনা।

আগামী নির্বাচন নিরপেক্ষ ও স্বাধীনভাবে অনুষ্ঠিত হতে পারবে কিনা এই নিয়ে জনমনে রয়েছে আতঙ্ক ও সংশয়। এই আতঙ্ক ও সংশয়ের বাস্তব ভিত্তি রয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি, রাজনৈতিক দলগুলোর টানাপোড়েন, পারস্পরিক দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন মহলের আন্দোলন, সংস্কার, ক্ষমতার ভেতরে ও বাইরের নানাবিধ নতুন সমীকরণ এবং পুরোনো ও নতুন রাজনৈতিক শক্তির দ্বন্দ্ব-সংঘাতে ঘটনাবহুল সময় পার করছে দেশ।

দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের লন্ডন থেকে দেশে ফিরে আসা বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তাঁর দেশে ফেরা কেবল একজন রাজনৈতিক নেতার প্রত্যাবর্তন নয়; বরং এটি সম্ভাব্য রাজনৈতিক পরিবর্তনের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত, যা দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে।

দেশে ফিরে দেওয়া তাঁর বক্তব্যে আবেগনির্ভর রাজনীতির পরিবর্তে দেশ ও জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি বৃহত্তর জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন, যা তাঁর দলের ভেতরে নতুন উদ্দীপনা ও গতি সঞ্চার করেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে একটি উন্নত, গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার যে আহ্বান তিনি জানিয়েছেন, তা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নতুন প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছে।

ফলে, দেশের মানুষ কেবল একটি নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে নেই। দেশের স্থিতিশীলতা, রাজনীতিতে সহনশীলতা, গণতান্ত্রিক চর্চা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক অবস্থান, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও সামাজিক ন্যায়বিচারের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে—এমন প্রত্যাশাই এখন সাধারণ মানুষের।

তবে শেষ পর্যন্ত একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে কি না, এবং দেশের ভবিষ্যৎ এই নির্বাচনের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত