জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

নতুন সরকারকে যেসব সামাজিক-অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে

প্রকাশ : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৯: ০৫
স্ট্রিম গ্রাফিক

সদ্য অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন জোট বড় ব্যবধানে বিজয় অর্জনের পর সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। নির্বাচনে বিএনপি ও তার মিত্ররা জাতীয় সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাধীনতার পর এই প্রথমবারের মতো এত বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ সামনে এসেছে।

দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা বিপর্যস্ত। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ প্রায় তলানিতে ঠেকেছে। মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩৬ শতাংশের কাছাকাছি। একই সঙ্গে ২০২৬ সালের নভেম্বর মাসে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের সময়সীমা ঘনিয়ে আসছে।

এসব পরিপ্রেক্ষিতে নতুন সরকারকে ৪৬২ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার কঠিন দায়িত্ব নিতে হবে। ধীরগতির প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর জনগণের আস্থাহীনতায়ও ভুগছে দেশের অর্থনীতি।

বিশ্লেষকদের মতে, দেশের অর্থনীতির চাকা সচল করতে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। দুর্বল আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটিয়ে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করা। এ ছাড়া উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের নেতারাও স্বীকার করেছেন যে নতুন সরকারকে অনেক সামাজিক-অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। তারা বলেছেন, সরকার গঠনের পর এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অগ্রাধিকারভিত্তিক একটি তালিকা তৈরি করা হবে। দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নিতে সেই অনুযায়ী কাজ করা হবে।

জুলাই সনদ ও নতুন সামাজিক চুক্তি

এবার সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি জনগণ ‘জুলাই সনদ’ নামে পরিচিত সাংবিধানিক সংস্কারের একটি প্রস্তাবকে সমর্থন করেছে। এই সনদের লক্ষ্য গত ষোল বছরে গড়ে ওঠা স্বৈরশাসনের কাঠামো ভেঙে দেওয়া। গণভোটে ৬৮ শতাংশ ভোটার ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে এটি অনুমোদন করেছেন। এর ফলে জবাবদিহিমূলক শাসনের একটি নতুন কাঠামো তৈরি হবে। নতুন সরকারকে সেই কাঠামোর মধ্যেই কাজ করতে হবে।

তবে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় তারেক রহমান ছোট দলগুলোর ওপর নির্ভর না করেই নিজের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে পারবেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই শক্তি একই সঙ্গে একটি ঝুঁকিও। অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, নতুন সংসদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। শুধু আগের সরকারের ফেলে যাওয়া জায়গা দখল করলেই হবে না।

অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগ পরিবেশ পুনরুদ্ধার

অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতির দ্রুত পতন থামাতে পেরেছিল। কিন্তু পুরোপুরি পুনরুদ্ধার করতে পারেনি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বারবার কমিয়ে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে বলে ধারণা দিয়েছে। আগে তারা ৬ দশমিক ৫ শতাংশ পূর্বাভাস দিয়েছিল। বিশ্বব্যাংক ৪ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির কথা বলেছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ৫ দশমিক ০ শতাংশের পূর্বাভাস দিয়েছে।

তবে নতুন সরকার ৫ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরে আসায় বিনিয়োগ বাড়বে বলে তারা আশা করছে।

ফেনী-৩ আসন থেকে নির্বাচিত বিএনপির সংসদ সদস্য ও ব্যবসায়ী নেতা আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, ‘প্রথম চ্যালেঞ্জ হবে প্রশাসনের পুনর্গঠন। এটি জোটের দুর্নীতিবিরোধী অঙ্গীকারের অংশ। দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হবে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করা। বর্তমানে মোট দেশজ উৎপাদনের তুলনায় বিনিয়োগ প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম।’

তাঁর মতে, এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দ্রুত উন্নত করতে হবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগের পথে থাকা অন্যান্য প্রতিবন্ধকতাও দূর করতে হবে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, তাঁর দল আইনশৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেবে। কক্সবাজার-১ আসন থেকে নির্বাচিত এই নেতা বলেন, সঠিক আইন প্রয়োগ এবং নাগরিক অধিকার রক্ষা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। সামাজিক শৃঙ্খলা নষ্ট করে এমন সব বেআইনি কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে বিএনপি শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ করবে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে নীতির ধারাবাহিকতা এবং একটি পূর্ণাঙ্গ বিনিয়োগ কাঠামো অত্যন্ত প্রয়োজন। অলিগার্কিক কাঠামো ভেঙে দেওয়া, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা, এশিয়া ও ইউরোপের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি করাও প্রয়োজন। জিডিপির ২ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছাতে হবে বিনেয়োগ। এর মাধ্যমে ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্য পূরণ সম্ভব হতে পারে।’

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশে পৌঁছেছে। ডিসেম্বর ২০২৫-এ তা ছিল ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ। এতে বোঝা যায় ঊর্ধ্বমুখী চাপ এখনও রয়েছে।

অর্থনীতিবিদ ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বিশ্ববাজারে খাদ্যের দাম কমলেও বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি ১৮ মাসের বেশি সময় ধরে ৮ শতাংশের ওপরে রয়েছে। অথচ প্রতিবেশী দেশ ভারত ও শ্রীলঙ্কা তা ৫ শতাংশের নিচে নামাতে পেরেছে। বাজার সিন্ডিকেট বা কিছু ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর মূল্য নিয়ন্ত্রণে কারসাজির কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। নতুন সরকারের কাজ হবে এই সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া।

গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক এবং বিএনপি জোট থেকে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য জোনায়েদ সাকি বলেন, ‘আমাদের জোট মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে আনতে নীতিমালা প্রণয়ন করব।’

বেকারত্ব মোকাবিলা ও সামাজিক সুরক্ষা

দেশে ২৭ লাখের বেশি মানুষ বেকার। এদের মধ্যে প্রায় ১০ লাখ বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রিধারী। কর্মসংস্থানের অভাব একটি বড় সমস্যা হয়ে রয়েছে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে এই সমস্যা বেশি। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে ১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি খাত, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং নতুন শিল্পে এসব কর্মসংস্থান তৈরি করার কথা বলা হয়। এ ছাড়া বিএনপি ১৮ মাসের মধ্যে এক কোটি কর্মসংস্থান তৈরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

তারেক রহমান সাম্প্রতিক ভাষণে তিনি ১০ বিলিয়ন ডলারের একটি সামাজিক কল্যাণ কর্মসূচির কথা তুলে ধরেন। এর মাধ্যমে ৪০ লাখ পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে সহায়তা দেওয়া হবে। শিক্ষিত বেকারদের জন্য ভাতা দেওয়া হবে। কৃষকদের সহায়তা দেওয়া হবে।

তবে অনেক বিশ্লেষক এই লক্ষ্যকে অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী মনে করেন। বর্তমান প্রবৃদ্ধির পরিস্থিতিতে এটি অর্জন কঠিন হতে পারে। অর্থনীতিবিদরা এর ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। যদি সারা দেশে এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়, তাহলে বছরে প্রায় ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন টাকা ব্যয় হবে। এতে বর্তমান সামাজিক সুরক্ষা বাজেট প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাবে।

ভূরাজনীতি ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক সামাল দেওয়া

নতুন সরকারকে জটিল আঞ্চলিক পরিস্থিতিও সামাল দিতে হবে। আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার কারণে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক গণঅভ্যুত্থানের পর প্রায় তলানিতে পৌঁছায়। তবে তারকে রহমানের প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অভিনন্দন বার্তাকে অনেকেই সম্পর্ক উন্নয়নের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। যদিও টানাপোড়েন এখনো রয়ে গেছে।

বিএনপির ইশতেহারে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। এতে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। একই সঙ্গে বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা হবে। ঐতিহাসিকভাবে বিএনপির সঙ্গে চীন ও পাকিস্তানের সম্পর্ক ভালো। তাই নতুন সরকারকে ঘিরে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ হিসেবে চীন বিষয়টিকে দেখতে পারে।

একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও সম্পর্ক সামলাতে হবে। বিশেষ করে পারস্পরিক শুল্ক চুক্তির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। এই চুক্তি ‘নন-মার্কেট’ দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য সীমিত করতে পারে। এলডিসি উত্তরণের আগে দ্বিপাক্ষিক মুক্তবাণিজ্য চুক্তি নিশ্চিত করতে অর্থনৈতিক কূটনীতিতে দক্ষতা দেখাতে হবে।

২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বেরিয়ে আসবে। এটি অর্থনৈতিক অগ্রগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি। তবে এর সঙ্গে বড় ধরনের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জও তৈরি হবে। কারণ এতদিন যে বিশেষ বাণিজ্য সুবিধাগুলো ছিল, সেগুলো ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাবে। এতে সামগ্রিকভাবে রপ্তানি আয়ে প্রায় ১৪ শতাংশ পতন ঘটতে পারে। ফলে বছরে প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য সতর্ক করে বলেছেন, সরকারকে শুধু আশা নয়, সক্ষমতার প্রমাণ দিতে হবে। অর্থনীতিকে সস্তা শ্রম ও অবকাঠামোনির্ভর মডেল থেকে উৎপাদনশীলতা, স্বচ্ছতা ও সামাজিক ন্যায়ের ভিত্তিতে গড়ে তুলতে হবে।

বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। দেশ উন্নতির পথে দ্রুত এগোতে পারে। আবার প্রতিষ্ঠানগত দখলদারত্ব ও অর্থনৈতিক স্থবিরতার পুরোনো চক্রেও ফিরে যেতে পারে। ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে নতুন সরকারের কার্যকর পদক্ষেপের ওপর। বিশ্লেষকদের মতে, ধারাবাহিকভাবে সংস্কার কার্যকর করতে পারলেই কেবল বাংলাদেশ স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির পথে এগোতে পারবে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত