হুমায়ূন শফিক

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও বিজয়ের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ক্ষমতার পালাবদল আসন্ন। আগামী মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) নতুন সরকারের শপথ গ্রহণের প্রস্তুতি চলছে। ঠিক এই সময়ে দেশের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে একটি নতুন বিষয় সামনে এসেছে—তা হলো ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ বা ‘শ্যাডো ক্যাবিনেট’।
বিশেষত, সুনামগঞ্জ-২ আসনে জামায়াতে ইসলামীর পরাজিত প্রার্থী ও বিশিষ্ট আইনজীবী শিশির মনিরের একটি ফেসবুক পোস্ট এবং পরবর্তীতে এনসিপি মুখপাত্র ও সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের সমর্থনসূচক মন্তব্যের পর বিষয়টি নিয়ে কৌতূহল ছড়িয়ে পড়েছে। শিশির মনির প্রথম ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের ঘোষণা দেন এবং আসিফ মাহমুদ জানান, সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এবং ‘ওয়াচডগ’ বা পর্যবেক্ষ হিসেবে কাজ করতে তারাও এই প্রস্তুতির অংশীদার হচ্ছেন।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ আসলে কী? সংসদীয় গণতন্ত্রে এর গুরুত্ব কতটুকু এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশে বা প্রতিবেশী ভারতে এর চর্চা কেমন?
ছায়া মন্ত্রিসভা কী
সহজ কথায়, শ্যাডো ক্যাবিনেট বা ছায়া মন্ত্রিসভা হলো বিরোধী দলের সিনিয়র সদস্যদের নিয়ে গঠিত একটি বিকল্প মন্ত্রিসভা। এটি ওয়েস্টমিনিস্টার শাসন ব্যবস্থার (যুক্তরাজ্য ও কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর সংসদীয় রীতি) একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য।
এই মন্ত্রিসভার সদস্যদের কোনো নির্বাহী ক্ষমতা থাকে না, কিন্তু তারা ক্ষমতাসীন সরকারের মন্ত্রীদের কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। সরকারি মন্ত্রিসভায় যেমন স্বরাষ্ট্র, অর্থ বা স্বাস্থ্যমন্ত্রী থাকেন, ছায়া মন্ত্রিসভাতেও ঠিক একইভাবে বিরোধী দলের একজন জ্যেষ্ঠ সদস্যকে নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি সরকারের ওই নির্দিষ্ট মন্ত্রীর ‘ছায়া’ হিসেবে কাজ করেন। সরকারের নীতি ও পরিকল্পনার সমালোচনা করা এবং বিকল্প প্রস্তাব তুলে ধরাই তাদের প্রধান কাজ। এই সমান্তরাল দায়িত্ব পালনকে ‘শ্যাডো পোর্টফোলিও’ বলা হয়।
কেন এই ব্যবস্থার প্রয়োজন
যখন কোনো নির্বাচনে একটি দল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় (যেমনটি সাম্প্রতিক নির্বাচনে বিএনপির ক্ষেত্রে ঘটেছে), তখন পার্লামেন্টে সরকারের একচ্ছত্র আধিপত্য তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। অতীতে দেখা গেছে, শক্তিশালী বিরোধী দলের অভাবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিল সংসদে কোনো বিতর্ক ছাড়াই পাস হয়ে গেছে। সরকারের সমালোচনা বা সেন্সর করার মতো কেউ থাকে না।
এমন পরিস্থিতিতে সরকারের হাতে অবিসংবাদিত কর্তৃত্ব থাকে এবং পার্লামেন্টের সাধারণ সদস্যরা অনেক সময় সরকারের কৌশল সম্পর্কে অন্ধকারে থাকেন। এই ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’-এর অভাব দূর করতেই ছায়া মন্ত্রিসভার ধারণাটির উদ্ভব। এর মূল লক্ষ্য হলো সরকারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং আইনের শাসন সমুন্নত রাখা।
উৎপত্তি ও বিকাশ: যুক্তরাজ্য থেকে অস্ট্রেলিয়া
ছায়া মন্ত্রিসভার ধারণাটি মূলত ব্রিটিশ পার্লামেন্টের একটি অনানুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া থেকে বিবর্তিত হয়েছে। ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ব্রিটেনে যখন একটি সংগঠিত বিরোধী দলের উত্থান ঘটে, তখন তারা সরকারের কাজের পর্যালোচনার জন্য সিনিয়র সদস্যদের নিয়ে অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করত।
ব্রিটিশ শিক্ষাবিদ ডি.আর. টার্নার এবং আর.এম. পানেটের গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৩৭ সালে ব্রিটেনে এই ব্যবস্থাটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়, যখন বিরোধী দলীয় নেতার জন্য সরকারিভাবে বেতন নির্ধারণ করা হয়। তবে মজার বিষয় হলো, অস্ট্রেলিয়া এই ক্ষেত্রে ব্রিটেনের চেয়ে এগিয়ে ছিল। সেখানে প্রধানমন্ত্রী বিলি হিউজেসের উদ্যোগে ১৯৩৭ সালের ১৭ বছর আগেই বিরোধী দলীয় কাঠামোর উন্নয়ন ঘটেছিল।
অস্ট্রেলিয়ার লেবার পার্টি ১৯৬৫ সালে তাদের শ্যাডো মিনিস্ট্রিকে আরও সুসংগঠিত করে। বিরোধী দলীয় নেতা গফ হুইটলাম দলীয় ককাসের মাধ্যমে ছায়া মন্ত্রীদের পোর্টফোলিও বণ্টন করেন। যদিও লিবারেল পার্টির প্রতিষ্ঠাতা রবার্ট মেঞ্জিস শুরুতে এর বিরোধিতা করেছিলেন, কিন্তু পরবর্তীতে এটি রাজনৈতিক প্রশিক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে স্বীকৃত হয়।
গঠন ও কার্যপ্রণালী
ছায়া মন্ত্রিসভা সাধারণত প্রধান বিরোধী দলীয় নেতার নেতৃত্বে গঠিত হয়। এর গঠন প্রক্রিয়া ও নিয়মাবলী নিম্নরূপ:
১. সদস্য সংখ্যা: বিরোধী দলীয় নেতা কমপক্ষে ২ জন এবং অনধিক ৯ জন কাউন্সিলর বা জ্যেষ্ঠ সদস্য নিয়ে এটি গঠন করতে পারেন।
২. নেতৃত্ব: যিনি বিরোধী দলের নেতা হবেন, তিনি এই ছায়া মন্ত্রিসভার নেতৃত্ব দেবেন। তবে তিনি সরকারি মন্ত্রিসভার কোনো পদে থাকতে পারবেন না।
৩. অধিকার: তাত্ত্বিকভাবে, ছায়া মন্ত্রিসভার যেকোনো সদস্য বা বিরোধী দলীয় নেতা সরকারের মন্ত্রিসভার যেকোনো সভায় উপস্থিত থাকার অধিকার রাখেন, তবে এর জন্য ৪৮ ঘণ্টা আগে লিখিত নোটিশ দিতে হয় (যদিও এটি দেশভেদে ভিন্ন হতে পারে)।
৪. নামকরণ: যুক্তরাজ্যে একে ‘শ্যাডো ক্যাবিনেট’ বলা হলেও, কানাডায় এর সদস্যদের ‘বিরোধী দলীয় সমালোচক’ এবং নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যের হাউস অফ লর্ডসে ‘মুখপাত্র’ বলা হয়।
ছায়া মন্ত্রিসভার উদ্দেশ্য ও ভূমিকা
ছায়া মন্ত্রিসভার কাজ কেবল বিরোধিতা করা নয়, বরং এটি একটি ‘সরকার গঠনের প্রস্তুতিমূলক’ প্রতিষ্ঠান। এর প্রধান ১০টি উদ্দেশ্য ও ভূমিকা হলো:
১. তদারকি ও জবাবদিহি: সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ড নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করা। তবে তারা আনুষ্ঠানিক ‘স্ক্রুটিনি কমিটি’ নয়, বরং রাজনৈতিকভাবে এটি করে।
২. বিকল্প নীতি প্রণয়ন: সরকারি নীতির ভুলগুলো ধরিয়ে দিয়ে ভোটারদের সামনে একটি বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প বা ‘অল্টারনেটিভ ভিশন’ উপস্থাপন করা।
৩. সরকার গঠনের প্রস্তুতি: ছায়া মন্ত্রীরা তাদের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাজ সম্পর্কে অভিজ্ঞ হয়ে ওঠেন, যাতে ভবিষ্যতে দল ক্ষমতায় এলে তারা দক্ষভাবে মন্ত্রণালয় পরিচালনা করতে পারেন।
৪. সংসদীয় বিতর্ক: সংসদে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর বক্তব্যের জবাব দেওয়া এবং বিতর্ক করা। যেমন—ছায়া স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কথার জবাব দেন।
৫. দলীয় শৃঙ্খলা: সংসদীয় ভোটে এবং দলের নীতি নির্ধারণে একাত্মতা বজায় রাখা।
৬. নির্বাচনী কৌশল: পরবর্তী নির্বাচনের জন্য দলের ইশতেহার ও কৌশল তৈরি করা।
৭. মিডিয়া ও জনমত: দলের এজেন্ডাগুলো মিডিয়ার সামনে তুলে ধরা এবং জনমত গঠন করা।
৮. রাজনৈতিক ভারসাম্য: দলের ভেতরে লিঙ্গ, বর্ণ ও আঞ্চলিক বৈচিত্র্য নিশ্চিত করা।
৯. ভোটারদের স্বার্থ রক্ষা: সরকারের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে জনগণের বা নির্বাচনী এলাকার স্বার্থের পক্ষে কথা বলা।
১০. স্থানীয় সংযোগ: স্থানীয় অংশীদারদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে তদারকিতে সহায়তা করা।
ভারতীয় উপমহাদেশে ছায়া মন্ত্রিসভার অভিজ্ঞতা
ভারতের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে ছায়া মন্ত্রিসভার আনুষ্ঠানিক কোনো স্বীকৃতি বা কাঠামো নেই। তবে রাজ্য স্তরে বিভিন্ন সময়ে এর পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে:
মহারাষ্ট্র (২০০৫): বিজেপি ও শিবসেনা মিলে কংগ্রেস-এনসিপি সরকারের বিরুদ্ধে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করেছিল।
মধ্যপ্রদেশ (২০১৪): কংগ্রেস সেখানে বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে এই উদ্যোগ নেয়।
গোয়া (২০১৫): কোনো রাজনৈতিক দল নয়, বরং ‘জেন নেক্সট’ নামে একটি এনজিও ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করেছিল।
কেরালা (২০১৮): সিভিল সোসাইটির সদস্যরা সরকারি কৌশল বিশ্লেষণের জন্য এটি গঠন করে।
ভারতে মূলত পার্লামেন্টারি কমিটিগুলো (যেমন: পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি বা প্যাক) সরকারের তদারকির কাজ করে। তবে প্যাকে সরকারি ও বিরোধী উভয় দলের সদস্য থাকে বলে তাকে পুরোপুরি ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ বলা যায় না।
সংসদীয় কমিটি থেকে কীভাবে আলাদা ছায়া মন্ত্রিসভা
বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে সংসদীয় কমিটি হলো সংসদের ভেতরের ছোট, কার্যকরী অংশ—যেখানে আইন, নীতি ও প্রশাসনিক কার্যক্রমকে খুঁটিয়ে দেখা হয়। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালিতে স্থায়ী কমিটির (যেমন মন্ত্রণালয়ভিত্তিক কমিটি) কথা রয়েছে। সংসদের পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে সব বিষয়ে গভীর আলোচনা সম্ভব নয়; তাই কমিটি পর্যায়ে সদস্যরা নথি তলব করেন, সচিব–কর্মকর্তাদের ডেকে ব্যাখ্যা চান, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও ব্যয়ের অগ্রগতি পরীক্ষা করেন, এমনকি মাঠপর্যায়ে পরিদর্শনও করেন। এখানে বক্তৃতার চেয়ে নথি, পরিসংখ্যান ও বাস্তব ফলাফল বেশি গুরুত্ব পায়—যা জবাবদিহির একটি ভালো উপায় বলে মনে করা হয়।
অন্যদিকে, পাশ্চাত্যের ‘ছায়া সরকার’ ধারণা ভিন্ন রাজনৈতিক পরিবেশে জন্ম নিয়েছে। উদাহরণ হিসেবে যুক্তরাজ্যের সংসদীয় ব্যবস্থায় বিরোধী দলের ‘শ্যাডো ক্যাবিনেট’ সরকার-মন্ত্রিসভার সমান্তরাল প্রতিচ্ছবি গড়ে তোলে; তারা বিকল্প নীতি উপস্থাপন করে এবং প্রতিটি মন্ত্রীর সমকক্ষ একজন ‘শ্যাডো’ মুখপাত্র থাকে। লক্ষ্য একটাই—সরকারকে নিরন্তর চাপে রাখা এবং ক্ষমতায় গেলে প্রস্তুত থাকা। আমাদের সংসদীয় কমিটি সরাসরি বিকল্প সরকার গড়ে তোলে না; তারা নীতির খুঁটিনাটি যাচাই করে, প্রশাসনিক দক্ষতা ও আর্থিক শৃঙ্খলা দেখভাল করে। মিল আছে জবাবদিহির দর্শনে; অমিল আছে কাঠামো ও রাজনৈতিক ভূমিকায়। শ্যাডো সরকার মূলত রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রতিষ্ঠান; সংসদীয় কমিটি মূলত প্রাতিষ্ঠানিক তদারকির যন্ত্র।
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে পরিবর্তিত বাংলাদেশে ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’র আলোচনাটি অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এটি যদি কার্যকরভাবে গঠন করা যায়, তবে তা সরকারের স্বেচ্ছাচারিতা রোধে এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহি নিশ্চিতে ভূমিকা রাখতে পারে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও বিজয়ের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ক্ষমতার পালাবদল আসন্ন। আগামী মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) নতুন সরকারের শপথ গ্রহণের প্রস্তুতি চলছে। ঠিক এই সময়ে দেশের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে একটি নতুন বিষয় সামনে এসেছে—তা হলো ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ বা ‘শ্যাডো ক্যাবিনেট’।
বিশেষত, সুনামগঞ্জ-২ আসনে জামায়াতে ইসলামীর পরাজিত প্রার্থী ও বিশিষ্ট আইনজীবী শিশির মনিরের একটি ফেসবুক পোস্ট এবং পরবর্তীতে এনসিপি মুখপাত্র ও সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের সমর্থনসূচক মন্তব্যের পর বিষয়টি নিয়ে কৌতূহল ছড়িয়ে পড়েছে। শিশির মনির প্রথম ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের ঘোষণা দেন এবং আসিফ মাহমুদ জানান, সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এবং ‘ওয়াচডগ’ বা পর্যবেক্ষ হিসেবে কাজ করতে তারাও এই প্রস্তুতির অংশীদার হচ্ছেন।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ আসলে কী? সংসদীয় গণতন্ত্রে এর গুরুত্ব কতটুকু এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশে বা প্রতিবেশী ভারতে এর চর্চা কেমন?
ছায়া মন্ত্রিসভা কী
সহজ কথায়, শ্যাডো ক্যাবিনেট বা ছায়া মন্ত্রিসভা হলো বিরোধী দলের সিনিয়র সদস্যদের নিয়ে গঠিত একটি বিকল্প মন্ত্রিসভা। এটি ওয়েস্টমিনিস্টার শাসন ব্যবস্থার (যুক্তরাজ্য ও কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর সংসদীয় রীতি) একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য।
এই মন্ত্রিসভার সদস্যদের কোনো নির্বাহী ক্ষমতা থাকে না, কিন্তু তারা ক্ষমতাসীন সরকারের মন্ত্রীদের কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। সরকারি মন্ত্রিসভায় যেমন স্বরাষ্ট্র, অর্থ বা স্বাস্থ্যমন্ত্রী থাকেন, ছায়া মন্ত্রিসভাতেও ঠিক একইভাবে বিরোধী দলের একজন জ্যেষ্ঠ সদস্যকে নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি সরকারের ওই নির্দিষ্ট মন্ত্রীর ‘ছায়া’ হিসেবে কাজ করেন। সরকারের নীতি ও পরিকল্পনার সমালোচনা করা এবং বিকল্প প্রস্তাব তুলে ধরাই তাদের প্রধান কাজ। এই সমান্তরাল দায়িত্ব পালনকে ‘শ্যাডো পোর্টফোলিও’ বলা হয়।
কেন এই ব্যবস্থার প্রয়োজন
যখন কোনো নির্বাচনে একটি দল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় (যেমনটি সাম্প্রতিক নির্বাচনে বিএনপির ক্ষেত্রে ঘটেছে), তখন পার্লামেন্টে সরকারের একচ্ছত্র আধিপত্য তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। অতীতে দেখা গেছে, শক্তিশালী বিরোধী দলের অভাবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিল সংসদে কোনো বিতর্ক ছাড়াই পাস হয়ে গেছে। সরকারের সমালোচনা বা সেন্সর করার মতো কেউ থাকে না।
এমন পরিস্থিতিতে সরকারের হাতে অবিসংবাদিত কর্তৃত্ব থাকে এবং পার্লামেন্টের সাধারণ সদস্যরা অনেক সময় সরকারের কৌশল সম্পর্কে অন্ধকারে থাকেন। এই ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’-এর অভাব দূর করতেই ছায়া মন্ত্রিসভার ধারণাটির উদ্ভব। এর মূল লক্ষ্য হলো সরকারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং আইনের শাসন সমুন্নত রাখা।
উৎপত্তি ও বিকাশ: যুক্তরাজ্য থেকে অস্ট্রেলিয়া
ছায়া মন্ত্রিসভার ধারণাটি মূলত ব্রিটিশ পার্লামেন্টের একটি অনানুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া থেকে বিবর্তিত হয়েছে। ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ব্রিটেনে যখন একটি সংগঠিত বিরোধী দলের উত্থান ঘটে, তখন তারা সরকারের কাজের পর্যালোচনার জন্য সিনিয়র সদস্যদের নিয়ে অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করত।
ব্রিটিশ শিক্ষাবিদ ডি.আর. টার্নার এবং আর.এম. পানেটের গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৩৭ সালে ব্রিটেনে এই ব্যবস্থাটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়, যখন বিরোধী দলীয় নেতার জন্য সরকারিভাবে বেতন নির্ধারণ করা হয়। তবে মজার বিষয় হলো, অস্ট্রেলিয়া এই ক্ষেত্রে ব্রিটেনের চেয়ে এগিয়ে ছিল। সেখানে প্রধানমন্ত্রী বিলি হিউজেসের উদ্যোগে ১৯৩৭ সালের ১৭ বছর আগেই বিরোধী দলীয় কাঠামোর উন্নয়ন ঘটেছিল।
অস্ট্রেলিয়ার লেবার পার্টি ১৯৬৫ সালে তাদের শ্যাডো মিনিস্ট্রিকে আরও সুসংগঠিত করে। বিরোধী দলীয় নেতা গফ হুইটলাম দলীয় ককাসের মাধ্যমে ছায়া মন্ত্রীদের পোর্টফোলিও বণ্টন করেন। যদিও লিবারেল পার্টির প্রতিষ্ঠাতা রবার্ট মেঞ্জিস শুরুতে এর বিরোধিতা করেছিলেন, কিন্তু পরবর্তীতে এটি রাজনৈতিক প্রশিক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে স্বীকৃত হয়।
গঠন ও কার্যপ্রণালী
ছায়া মন্ত্রিসভা সাধারণত প্রধান বিরোধী দলীয় নেতার নেতৃত্বে গঠিত হয়। এর গঠন প্রক্রিয়া ও নিয়মাবলী নিম্নরূপ:
১. সদস্য সংখ্যা: বিরোধী দলীয় নেতা কমপক্ষে ২ জন এবং অনধিক ৯ জন কাউন্সিলর বা জ্যেষ্ঠ সদস্য নিয়ে এটি গঠন করতে পারেন।
২. নেতৃত্ব: যিনি বিরোধী দলের নেতা হবেন, তিনি এই ছায়া মন্ত্রিসভার নেতৃত্ব দেবেন। তবে তিনি সরকারি মন্ত্রিসভার কোনো পদে থাকতে পারবেন না।
৩. অধিকার: তাত্ত্বিকভাবে, ছায়া মন্ত্রিসভার যেকোনো সদস্য বা বিরোধী দলীয় নেতা সরকারের মন্ত্রিসভার যেকোনো সভায় উপস্থিত থাকার অধিকার রাখেন, তবে এর জন্য ৪৮ ঘণ্টা আগে লিখিত নোটিশ দিতে হয় (যদিও এটি দেশভেদে ভিন্ন হতে পারে)।
৪. নামকরণ: যুক্তরাজ্যে একে ‘শ্যাডো ক্যাবিনেট’ বলা হলেও, কানাডায় এর সদস্যদের ‘বিরোধী দলীয় সমালোচক’ এবং নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যের হাউস অফ লর্ডসে ‘মুখপাত্র’ বলা হয়।
ছায়া মন্ত্রিসভার উদ্দেশ্য ও ভূমিকা
ছায়া মন্ত্রিসভার কাজ কেবল বিরোধিতা করা নয়, বরং এটি একটি ‘সরকার গঠনের প্রস্তুতিমূলক’ প্রতিষ্ঠান। এর প্রধান ১০টি উদ্দেশ্য ও ভূমিকা হলো:
১. তদারকি ও জবাবদিহি: সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ড নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করা। তবে তারা আনুষ্ঠানিক ‘স্ক্রুটিনি কমিটি’ নয়, বরং রাজনৈতিকভাবে এটি করে।
২. বিকল্প নীতি প্রণয়ন: সরকারি নীতির ভুলগুলো ধরিয়ে দিয়ে ভোটারদের সামনে একটি বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প বা ‘অল্টারনেটিভ ভিশন’ উপস্থাপন করা।
৩. সরকার গঠনের প্রস্তুতি: ছায়া মন্ত্রীরা তাদের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাজ সম্পর্কে অভিজ্ঞ হয়ে ওঠেন, যাতে ভবিষ্যতে দল ক্ষমতায় এলে তারা দক্ষভাবে মন্ত্রণালয় পরিচালনা করতে পারেন।
৪. সংসদীয় বিতর্ক: সংসদে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর বক্তব্যের জবাব দেওয়া এবং বিতর্ক করা। যেমন—ছায়া স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কথার জবাব দেন।
৫. দলীয় শৃঙ্খলা: সংসদীয় ভোটে এবং দলের নীতি নির্ধারণে একাত্মতা বজায় রাখা।
৬. নির্বাচনী কৌশল: পরবর্তী নির্বাচনের জন্য দলের ইশতেহার ও কৌশল তৈরি করা।
৭. মিডিয়া ও জনমত: দলের এজেন্ডাগুলো মিডিয়ার সামনে তুলে ধরা এবং জনমত গঠন করা।
৮. রাজনৈতিক ভারসাম্য: দলের ভেতরে লিঙ্গ, বর্ণ ও আঞ্চলিক বৈচিত্র্য নিশ্চিত করা।
৯. ভোটারদের স্বার্থ রক্ষা: সরকারের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে জনগণের বা নির্বাচনী এলাকার স্বার্থের পক্ষে কথা বলা।
১০. স্থানীয় সংযোগ: স্থানীয় অংশীদারদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে তদারকিতে সহায়তা করা।
ভারতীয় উপমহাদেশে ছায়া মন্ত্রিসভার অভিজ্ঞতা
ভারতের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে ছায়া মন্ত্রিসভার আনুষ্ঠানিক কোনো স্বীকৃতি বা কাঠামো নেই। তবে রাজ্য স্তরে বিভিন্ন সময়ে এর পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে:
মহারাষ্ট্র (২০০৫): বিজেপি ও শিবসেনা মিলে কংগ্রেস-এনসিপি সরকারের বিরুদ্ধে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করেছিল।
মধ্যপ্রদেশ (২০১৪): কংগ্রেস সেখানে বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে এই উদ্যোগ নেয়।
গোয়া (২০১৫): কোনো রাজনৈতিক দল নয়, বরং ‘জেন নেক্সট’ নামে একটি এনজিও ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করেছিল।
কেরালা (২০১৮): সিভিল সোসাইটির সদস্যরা সরকারি কৌশল বিশ্লেষণের জন্য এটি গঠন করে।
ভারতে মূলত পার্লামেন্টারি কমিটিগুলো (যেমন: পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি বা প্যাক) সরকারের তদারকির কাজ করে। তবে প্যাকে সরকারি ও বিরোধী উভয় দলের সদস্য থাকে বলে তাকে পুরোপুরি ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ বলা যায় না।
সংসদীয় কমিটি থেকে কীভাবে আলাদা ছায়া মন্ত্রিসভা
বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে সংসদীয় কমিটি হলো সংসদের ভেতরের ছোট, কার্যকরী অংশ—যেখানে আইন, নীতি ও প্রশাসনিক কার্যক্রমকে খুঁটিয়ে দেখা হয়। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালিতে স্থায়ী কমিটির (যেমন মন্ত্রণালয়ভিত্তিক কমিটি) কথা রয়েছে। সংসদের পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে সব বিষয়ে গভীর আলোচনা সম্ভব নয়; তাই কমিটি পর্যায়ে সদস্যরা নথি তলব করেন, সচিব–কর্মকর্তাদের ডেকে ব্যাখ্যা চান, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও ব্যয়ের অগ্রগতি পরীক্ষা করেন, এমনকি মাঠপর্যায়ে পরিদর্শনও করেন। এখানে বক্তৃতার চেয়ে নথি, পরিসংখ্যান ও বাস্তব ফলাফল বেশি গুরুত্ব পায়—যা জবাবদিহির একটি ভালো উপায় বলে মনে করা হয়।
অন্যদিকে, পাশ্চাত্যের ‘ছায়া সরকার’ ধারণা ভিন্ন রাজনৈতিক পরিবেশে জন্ম নিয়েছে। উদাহরণ হিসেবে যুক্তরাজ্যের সংসদীয় ব্যবস্থায় বিরোধী দলের ‘শ্যাডো ক্যাবিনেট’ সরকার-মন্ত্রিসভার সমান্তরাল প্রতিচ্ছবি গড়ে তোলে; তারা বিকল্প নীতি উপস্থাপন করে এবং প্রতিটি মন্ত্রীর সমকক্ষ একজন ‘শ্যাডো’ মুখপাত্র থাকে। লক্ষ্য একটাই—সরকারকে নিরন্তর চাপে রাখা এবং ক্ষমতায় গেলে প্রস্তুত থাকা। আমাদের সংসদীয় কমিটি সরাসরি বিকল্প সরকার গড়ে তোলে না; তারা নীতির খুঁটিনাটি যাচাই করে, প্রশাসনিক দক্ষতা ও আর্থিক শৃঙ্খলা দেখভাল করে। মিল আছে জবাবদিহির দর্শনে; অমিল আছে কাঠামো ও রাজনৈতিক ভূমিকায়। শ্যাডো সরকার মূলত রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রতিষ্ঠান; সংসদীয় কমিটি মূলত প্রাতিষ্ঠানিক তদারকির যন্ত্র।
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে পরিবর্তিত বাংলাদেশে ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’র আলোচনাটি অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এটি যদি কার্যকরভাবে গঠন করা যায়, তবে তা সরকারের স্বেচ্ছাচারিতা রোধে এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহি নিশ্চিতে ভূমিকা রাখতে পারে।

সদ্য অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন জোট বড় ব্যবধানে বিজয় অর্জনের পর সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। নির্বাচনে বিএনপি ও তার মিত্ররা জাতীয় সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে।
৩ ঘণ্টা আগে
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বিএনপি এবং গণভোটে অনুমোদিত জুলাই সনদ এখন উচ্চকক্ষ ইস্যুতে মুখোমুখি। জুলাই সনদে সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে সিনেট গঠনের কথা থাকলেও বিএনপির ইশতেহারে রয়েছে ভিন্ন প্রস্তাব।
৬ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর প্রতিবার বিশ্বনেতাদের মধ্যে যাঁর অভিনন্দনবার্তা প্রথম পৌঁছয় ঢাকায়, তিনি প্রায় অবধারিতভাবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী।
১ দিন আগে
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সাথে অনুষ্ঠিত হওয়া ঐতিহাসিক গণভোটে বড় ব্যবধানে জয়ী হয়েছে ‘হ্যাঁ’ পক্ষ। স্বভাবতই মানুষের প্রশ্ন জাগছে, ‘হ্যাঁ’ ভোট জেতার ফলে জুলাই সনদের ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের আলোকে আগামী দিনে কী কী বড় পরিবর্তন আসতে যাচ্ছ?
২ দিন আগে