leadT1ad

ব্রিটিশ-মার্কিন গবেষক ক্লিনটন বেনেটের চোখে খালেদা জিয়া

‘রানি’ ও ‘জননী’র দ্বৈত সত্তা

প্রকাশ : ০২ জানুয়ারি ২০২৬, ১৫: ১৯
খালেদা জিয়া। ছবি: সংগৃহীত

২০০৫ সালে বিশ্বখ্যাত ফোর্বস ম্যাগাজিন বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারীদের একটি তালিকা প্রকাশ করে, যেখানে ২৯তম স্থানে উঠে আসে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নাম। পশ্চিমা বিশ্বের কাছে বাংলাদেশ তখন মূলত বন্যা আর প্রাকৃতিক দুর্যোগের দেশ হিসেবে পরিচিত, কৌশলগতভাবে খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। অথচ সেই দেশটির একজন নারী নেত্রী কীভাবে বিশ্বমঞ্চে এমন শক্তিশালী অবস্থানে জায়গা করে নিলেন?

গবেষক ও ইসলামি স্টাডিজের অধ্যাপক ক্লিনটন বেনেট তাঁর ‘মুসলিম উইমেন অব পাওয়ার: জেন্ডার, পলিটিক্স অ্যান্ড কালচার ইন ইসলাম’ গ্রন্থে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন অত্যন্ত নিবিড়ভাবে। একজন বিদেশি গবেষকের নির্মোহ দৃষ্টিতে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্থান, ধর্ম ও সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর দলের সম্পর্ক এবং বাংলাদেশের গণতন্ত্রের পালাবদল—সবকিছুই এক ভিন্ন মাত্রায় ধরা দিয়েছে।

পাকিস্তান বনাম বাংলাদেশ: গণতান্ত্রিক বৈধতার মানদণ্ড

ক্লিনটন বেনেট তাঁর বিশ্লেষণের শুরুতেই দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরেছেন। পাকিস্তানের সীমান্তে চীন, সঙ্গে ভারতের দীর্ঘ সংঘাত ও পারমাণবিক সক্ষমতা—সব মিলিয়ে দেশটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের আকর্ষণের কেন্দ্রে। সবাই জানতে চায় পাকিস্তানের ‘বোতাম’ কার হাতে। তুলনায় বাংলাদেশ কৌশলগতভাবে অনেকটাই গুরুত্বহীন ও ‘হুমকিহীন’ একটি রাষ্ট্র। কিন্তু বেনেট যুক্তি দেন, বাংলাদেশ যা অর্জন করেছে, তার জন্য দেশটি অনেক বেশি মনোযোগের দাবিদার।

বেনেটের মতে, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক বৈধতার (ডেমোক্রেটিক লেজিটিমেসির) গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে, যেখানে পাকিস্তান ব্যর্থ। বাংলাদেশে ১৯৯১ সাল থেকে দুটি নারী নেতৃত্বাধীন প্রশাসন (খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা) তাদের পূর্ণ মেয়াদ সফলভাবে সম্পন্ন করেছে এবং পালাক্রমে ক্ষমতায় এসেছে। তুলনায় পাকিস্তানের কোনো নির্বাচিত সরকার তখন পর্যন্ত সামরিক বা রাষ্ট্রপতির হস্তক্ষেপ ছাড়া পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পারেনি।

ক্লিনটন বেনেটের লেখা বই ‘মুসলিম উইমেন অব পাওয়ার’। ছবি: গুডরিডস
ক্লিনটন বেনেটের লেখা বই ‘মুসলিম উইমেন অব পাওয়ার’। ছবি: গুডরিডস

বেনেট দেখিয়েছেন, দারিদ্র্য ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও খালেদা জিয়ার শাসনামালে বাংলাদেশে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ছিল স্থিতিশীল (বার্ষিক প্রায় ৪ শতাংশ, যা ১৯৯৮ সালে ৫ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছায়), যা রোনাল্ড রিগ্যান আমলের যুক্তরাষ্ট্রের প্রবৃদ্ধির হারের সঙ্গে তুলনীয়।

রাজনীতির মঞ্চে আবির্ভাব: স্বামীর ছায়া নাকি নিজস্ব প্রজ্ঞা?

খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে আসা ও টিকে থাকার বিষয়টি বেনেট অত্যন্ত কৌতূহলের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করেছেন। ১৯৪৫ সালে জন্ম নেওয়া খালেদা জিয়া ১৯৮১ সাল পর্যন্ত ছিলেন একজন সাধারণ গৃহবধূ ও ফার্স্ট লেডি। স্বামী জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর তিনি যখন রাজনীতির মাঠে নামেন, তখন অনেকেই ভেবেছিলেন তিনি কেবল ‘সহানুভূতির ভোট’ আদায়ের মাধ্যম হবেন।

কিন্তু বেনেট দাবি করেছেন, খালেদা জিয়া নিজেকে কেবল জিয়ার বিধবা স্ত্রী হিসেবেই সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং নিজেকে একজন দক্ষ রাজনীতিবিদ হিসেবে প্রমাণ করেছেন।

বেনেটের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, বিএনপি যখন নেতৃত্বের সংকটে পড়েছিল, তখন খালেদা জিয়াকে বেছে নেওয়া হয়েছিল মূলত দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখার জন্য। কিন্তু তিনি দ্রুতই নিজেকে একজন ‘ক্রাউড পুলার’ বা জনসমুদ্রে জোয়ার তোলা নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। বেনেটের মতে, এরশাদবিরোধী আন্দোলনে খালেদা জিয়ার ভূমিকা ছিল আপসহীন। তিনি স্বামীর জনপ্রিয়তা ও নিজের পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তিকে কাজে লাগিয়ে জনগণের সঙ্গে একাত্ম হতে পেরেছিলেন।

ইমেজ সংকট ও নির্মাণ: ‘রানি’ ও ‘জননী’র দ্বৈত সত্তা

ক্লিনটন বেনেট খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ইমেজের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি লক্ষ করেছেন, খালেদা জিয়া জনগণের মাঝে নিজেকে উপস্থাপন করার ক্ষেত্রে একটি দ্বৈত কৌশল অবলম্বন করেন। একদিকে তিনি ‘মাদার’ বা মমতাময়ী জননী, যিনি বন্যার সময় কাদা-পানিতে নেমে ত্রাণ বিতরণ করেন এবং জনগণের দুঃখ-কষ্টের অংশীদার হন। অন্যদিকে, তিনি নিজেকে উপস্থাপন করেন ‘কুইন’ বা রানির মতো এক সম্ভ্রমজাগানিয়া দূরত্ব বজায় রেখে।

মুসলিম উইমেন অব পাওয়ার বইয়ে খালেদা জিয়াকে নিয়ে লেখার শিরোনাম
মুসলিম উইমেন অব পাওয়ার বইয়ে খালেদা জিয়াকে নিয়ে লেখার শিরোনাম

বেনেট খালেদা জিয়ার পোশাক ও নামের ব্যবহারের দিকেও নজর দিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, খালেদা জিয়া নামের আগে ‘বেগম’ শব্দটি ব্যবহার করেন এবং দামি সিল্কের শাড়ি ও চাদরে নিজেকে আবৃত রাখেন, যা তাঁকে একধরনের আভিজাত্য বা রাজকীয় গাম্ভীর্য দেয়। সাধারণ বাংলাদেশি নারীরা যেখানে সুতির শাড়ি পরেন, সেখানে খালেদা জিয়ার এই সাজপোশাক তাঁকে জনগণের কাছে ‘নিচে নেমে আসা রানি’ হিসেবে চিত্রিত করে। এই ইমেজ তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে শ্রদ্ধার পাত্র করে তোলে, যা অন্য বিএনপি নেতাদের পক্ষে অর্জন করা সম্ভব হয়নি।

বিএনপি, ইসলাম ও নারী নেতৃত্বের প্যারাডক্স

বেনেটের গবেষণার বড় অংশজুড়ে রয়েছে খালেদা জিয়ার দল বিএনপি এবং ইসলামের সম্পর্কের বিশ্লেষণ। তিনি দেখিয়েছেন, পাকিস্তানের পিপলস পার্টি (পিপিপি) বা বাংলাদেশের আওয়ামী লীগের তুলনায় বিএনপি অনেক বেশি ইসলামি ভাবধারার দল। জিয়াউর রহমান সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ দিয়ে ‘আল্লাহর ওপর আস্থা’ স্থাপন করেছিলেন ও মুসলিম পরিচিতিনির্ভর বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের প্রবর্তন করেছিলেন।

বেনেট এখানে চমকপ্রদ প্যারাডক্স বা বৈপরীত্য তুলে ধরেছেন। একটি ইসলামি ভাবধারার দল এবং জামায়াতে ইসলামীর মতো কট্টরপন্থীদের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়েও একজন নারী (খালেদা জিয়া) কীভাবে দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন? বেনেটের মতে, এটি প্রমাণ করে যে ইসলাম নারী নেতৃত্বের পথে অন্তরায় নয়। জামায়াতে ইসলামীর সদস্যরা তাত্ত্বিকভাবে নারী নেতৃত্বের বিরোধিতা করলেও রাজনৈতিক বাস্তবতায় তারা খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব মেনে নিয়েছে এবং তাঁর মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছে।

খালেদা জিয়া। ছবি: সংগৃহীত
খালেদা জিয়া। ছবি: সংগৃহীত

খালেদা জিয়া নিজেও রাজনৈতিক প্রচারণায় ইসলামি প্রতীক ও ভাষা ব্যবহারে অত্যন্ত কুশলী ছিলেন। বেনেট উল্লেখ করেছেন, খালেদা জিয়া জনসভায় নিয়মিত মাথায় কাপড় দেন এবং ইসলামি মূল্যবোধ রক্ষার কথা বলেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে তিনি স্লোগান দিয়েছিলেন, ‘স্বাধীনতা ও ইসলাম রক্ষায় ধানের শীষে ভোট দিন।’ বেনেট মনে করেন, খালেদা জিয়ার এই ‘ধার্মিক’ ইমেজ তাঁকে রক্ষণশীল ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।

শাসনকাল: উন্নয়ন ও কর্তৃত্বপরায়ণতা

খালেদা জিয়ার শাসনকালকে বেনেট মিশ্রভাবে মূল্যায়ন করেছেন। তিনি স্বীকার করেছেন যে খালেদা জিয়ার সরকার অর্থনৈতিক সংস্কার, মুক্তবাজার অর্থনীতি এবং নারী শিক্ষার প্রসারে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে মেয়েদের জন্য দশম শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা চালু করা এবং উপবৃত্তি প্রদান—বেনেটের মতে, এটি ছিল জেন্ডার সমতায় এক বিশাল পদক্ষেপ। এছাড়াও তাঁর সময়ে তৈরি পোশাকশিল্পে নারীদের অংশগ্রহণ এবং ক্ষুদ্রঋণের প্রসার বাংলাদেশকে উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়েছে।

তবে বেনেট খালেদা জিয়ার শাসনশৈলীকে ‘কর্তৃত্বপরায়ণ’ হিসেবেও চিহ্নিত করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, খালেদা জিয়া দলের ভেতরে একক সিদ্ধান্ত নিতে পছন্দ করতেন এবং সংসদীয় রীতিনীতির তোয়াক্কা কম করতেন। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিরোধী দলকে বাদ দিয়ে একতরফা নির্বাচন করা এবং সংসদে বিরোধী দলের সঙ্গে অসহিষ্ণু আচরণ—এসব বিষয় বেনেটের দৃষ্টি এড়ায়নি। তিনি আরও উল্লেখ করেছেন যে খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার পারস্পরিক শত্রুতা এবং সংসদ বর্জনের সংস্কৃতি বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাওয়ার পথে বাধা সৃষ্টি করেছে।

পারিবারিক উত্তরাধিকার ও যোগ্যতার রাজনীতি

বেনেট বাংলাদেশের রাজনীতিতে পারিবারিক উত্তরাধিকার বা ‘ডাইনেস্টি’র প্রভাব নিয়েও আলোচনা করেছেন। খালেদা জিয়ার উত্থানের পেছনে তাঁর স্বামীর লিগ্যাসি বা উত্তরাধিকার বড় ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু তিনি এও মনে করিয়ে দিয়েছেন, কেবল পারিবারিক পরিচয় দিয়ে দুই দশকের বেশি সময় রাজনীতিতে টিকে থাকা সম্ভব নয়। খালেদা জিয়াকে যোগ্যতা প্রমাণ করতে হয়েছে।

বেনেট তাঁর লেখায় খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমানের প্রসঙ্গও এনেছেন। আওয়ামী লীগ যাকে ‘রানি খালেদার ক্রাউন প্রিন্স’ বা যুবরাজ হিসেবে অভিহিত করে।

ক্লিনটন বেনেট তাঁর অধ্যায়ের শেষে খালেদা জিয়াকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম কারিগর হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, পাকিস্তান যেখানে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় ভুগছে, সেখানে বাংলাদেশ কার্যকর দ্বিদলীয় ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। এই ব্যবস্থায় খালেদা জিয়া ও তাঁর দল বিএনপি অপরিহার্য শক্তি।

বেনেটের মতে, খালেদা জিয়ার শাসনামলে দুর্নীতি বা স্বজনপ্রীতির অভিযোগ থাকলেও, তিনি বাংলাদেশকে এমন রাজনৈতিক কাঠামো দিয়েছেন, যা পাকিস্তানের জন্য ঈর্ষণীয় হতে পারে। স্টিফেন পি. কোহেনের উদ্ধৃতি দিয়ে বেনেট শেষ করেছেন এই বলে, পাকিস্তান হয়তো ভাবছে কবে তারা বাংলাদেশের মতো রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা ও স্থিতিশীলতা অর্জন করবে। আর এই অর্জনে খালেদা জিয়ার নাম ইতিহাসের পাতায় অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত