ফাবিহা বিনতে হক

‘শহরে সেদিন মিছিল ছিল।
পৃথিবী সেদিন উল্টো ঘোরেনি; এগিয়ে গেছে।
সবাই শুনলোঃ খুন হয়ে গেছে, খুন হয়ে গেল।
মায়ের দু’চোখের দু'ফোটা পানি গড়িয়ে পড়েছে রমনার পথে।’
কবি ফজলে লোহানী তাঁর একুশের কবিতায় এভাবেই স্মরণ করছেন বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সেই রক্তক্ষয়ী দিনটিকে। আমরা পৃথিবীর সেই গর্বিত জাতিদের একটি, যাঁরা মাতৃভাষার অধিকার রক্ষার আন্দোলনে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিতে দ্বিধাবোধ করেনি।
যাঁদের রক্তের বিনিময়ে আজ আমরা স্বাধীনভাবে বাংলায় কথা বলতে পারছি, লিখতে পারছি একুশে ফেব্রুয়ারির এই প্রাক্কালে সেই মহান ভাষা শহীদদের স্মরণ করা আমাদের একান্ত কর্তব্য। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে আমরা পাঁচজন শহিদের নাম বেশি শুনতে পাই: সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার ও শফিউর। এই পাঁচজনের বাইরেও আরও অনেকে আছেন যাঁরা রাজপথে পুলিশের গুলিতে শহীদ হয়েছেন। কিন্তু আমরা এই ভাষাশহীদদের ব্যাপারে কতটুকু জানি?
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ থেকে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ছাত্র-জনতা মিছিল বের করে। মিছিলটি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের কাছাকাছি পৌঁছালে পুলিশ বিনা উসকানিতে নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি চালায়। মুহূর্তের মধ্যে রাজপথ রঞ্জিত হয় তাজা রক্তে। শহীদ হন রফিক, সালাম, বরকত, জব্বারসহ নাম না জানা আরও অনেকে। এই ঘটনার প্রতিবাদে ২২ ফেব্রুয়ারি আবারও শোকমিছিল বের হলে সেখানেও পুলিশ ও মিলিটারি গুলি চালায়, শহীদ হন শফিউর রহমান, আব্দুল আউয়াল, কিশোর অহিউল্লাহসহ আরও কয়েকজন।
একুশে ও বাইশে ফেব্রুয়ারি ঠিক কতজন শহীদ হয়েছিলেন, তা নিয়ে ইতিহাসে আজও ভিন্নমত আছে। আমরা সাধারণত ৫-৭ জন শহীদের নাম জানলেও, প্রকৃত শহীদের সংখ্যা আরও অনেক বেশি বলে মনে করেন অনেক ইতিহাসবিদ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির সন্ধ্যায় সীমান্ত পত্রিকার অন্যতম সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম চৌধুরী ‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি’ শিরোনামে একটি দীর্ঘ কবিতা লেখেন। কবিতার প্রথম কয়েকটি লাইন ছিল এ রকম:
‘ওরা চল্লিশজন কিংবা আরও বেশি
যারা প্রাণ দিয়েছে ওখানে রমনার রোদ্রদগ্ধ
কৃষ্ণচূড়া গাছের তলায়...
চল্লিশটি তাজা প্রাণ আর অঙ্কুরিত বীজের খোসার মধ্যে আমি দেখতে পাচ্ছি তাদের অসংখ্য বুকের রক্ত...’
উল্লেখিত কবিতায় কবি যে ৪০ সংখ্যাটি ব্যবহার করেছেন, তা কি শুধু কবিতার জন্য, নাকি প্রকৃত সংখ্যাটি এমনই, তা আজও এক রহস্য।
তবে ভাষাশহিদ হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেয়েছেন পাঁচজন। আবুল বরকত, আবদুল জব্বার, রফিকউদ্দিন আহমদ, আবদুস সালাম ও শফিউর রহমান। ২০০০ সালে তাদের রাষ্ট্রীয় একুশে পদকে ভূষিত করা হয়েছে। ১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারিতেও পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারানোর খবর পাওয়া যায়। সেই তালিকায় পাওয়া যায় দুটো নাম, অহিউল্লাহ ও আবদুল আউয়াল। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের ওয়েবসাইটে ভাষাশহিদ হিসেবে এই দুজনের নাম-পরিচয় উল্লেখ আছে।
এ ছাড়া সালাউদ্দীন নামেও একজন ২১ ফেব্রুয়ারি শহিদ হন বলে বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু একুশের শহীদ হিসেবে তাদের স্বীকৃতি মেলেনি। আর এ কারণে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিপ্রাপ্ত পাঁচজনই ভাষাশহীদ হিসেবে সমাদৃত হচ্ছেন।
রফিকউদ্দিন আহমদ
মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর উপজেলার পারিল গ্রামেরই সন্তান রফিকউদ্দিন আহমদ। কলকাতায় পড়ালেখা করে দেশে এসে ম্যাট্রিক পাস করেন। পড়েন আইকম ক্লাস পর্যন্ত। এক পর্যায়ে কাজ শুরু করেন বাবার প্রেস পরিচালনার। ১৯৫২ সালে তিনি ছিলেন জগন্নাথ কলেজের হিসাব বিজ্ঞানের ছাত্র।
২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজের হোস্টেল প্রাঙ্গণে পুলিশের গুলি এসে সরাসরি আঘাত হানে আন্দোলনরত রফিকের মাথায়। সেখানেই খুলি উড়ে যায়। ছয়-সাত জন ধরাধরি করে তাকে এনে রাখেন ঢাকা মেডিকেলের এনাটমি হলের পেছনের বারান্দায়। ১৭ নং রুমের পূর্ব দিকে তার লাশ পড়ে ছিল। ড. মশাররফুর রহমান খান তার ছিটকে পড়া মগজ হাতে করে কুড়িয়ে নিয়ে আসেন।

রাত তিনটায় সামরিক বাহিনীর প্রহরায় আজিমপুর কবরস্থানে শহীদ রফিককে সমাহিত করা হয়। সেসময় তাঁর বয়স হয়েছিল মাত্র ২৬ বছর। তিনি ছিলেন ভাষা আন্দোলনের প্রথম শহীদ।
আবুল বরকত
মুর্শিদাবাদের বাবলা গ্রামের ছেলে আবুল বরকত। দেশভাগের পর পরিবারের সাথে ঢাকায় চলে আসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে স্নাতকোত্তর শ্রেণিতে ভর্তি হন। একুশে ফেব্রুয়ারির উত্তাল দুপুরে তিনি ছিলেন মেডিকেল কলেজ হোস্টেলের ১২ নম্বর শেডের পাশে। পুলিশের গুলিবর্ষণ শুরু হলে একটি বুলেট তাঁর তলপেটে বিদ্ধ হয়। সেখানেই লুটিয়ে পড়েন তিনি।
তাঁকে ভর্তি করা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। মাত্র পঁচিশ বছরের টগবগে যুবক প্রচন্ড রক্তক্ষরণে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন রাত আটটায়। রাতেই এক ম্যাজিস্ট্রেটের তত্ত্বাবধানে তাঁকে দাফন করা হয় আজিমপুর কবরস্থানে।
আবদুল জব্বার
ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ের পাঁচুয়া গ্রামের সন্তান আবদুল জব্বার। কিছুদিন আগেই তাঁর কোলজুড়ে এসেছে শিশুসন্তান বাদল। ভাগ্যের ফেরে ঢাকায় এসেছিলেন ক্যানসারে আক্রান্ত শাশুড়ির চিকিৎসার জন্য। কিন্তু ২১শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল এলাকায় ছাত্র-জনতার বিশাল জমায়েত দেখে তিনি চলে যান মিছিলের একেবারে সামনে। পুলিশের বুলেটের নির্মম শিকার হন তিনি। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলে ওই রাতেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
আবদুস সালাম
ফেনীর দাগনভূঞার লক্ষণপুর গ্রামের ছেলে আবদুস সালাম। তিনি ঢাকায় সরকারের শিল্প বিভাগের (ডিরেক্টরেট অব ইন্ডাস্ট্রিজ) একজন পিয়ন হিসেবে কর্মরত ছিলেন। একুশে ফেব্রুয়ারির সেই উত্তাল দিনে তিনিও যোগ দিয়েছিলেন রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে হওয়া মিছিলে। পুলিশের গুলিতে তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মৃত্যু হয়নি। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দীর্ঘ দেড় মাসেরও বেশি সময় ধরে তিনি মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়েন। অবশেষে ৭ই এপ্রিল এই বীর ভাষাসৈনিক না ফেরার দেশে পাড়ি জমান।
শফিউর রহমান
একুশে ফেব্রুয়ারির ঘটনা সবাই জানলেও, খুব কম মানুষ জানেন বাইশে ফেব্রুয়ারির ঘটনা। আগের দিনের গুলিবর্ষণের প্রতিবাদ ও রাষ্ট্রভাষা বাংলা করবার আন্দোলন চলছিল সেদিনও, নওয়াবপুর রোডে। সেদিন সকাল দশটার দিকে রঘুনাথ লেনের বাসা থেকে সাইকেলে চড়ে অফিসের জন্য বেরিয়ে পড়েন শফিউর রহমান, তিনি ছিলেন ঢাকা হাইকোর্টের হিসাব রক্ষণ শাখার কেরানি।
নওয়াবপুর রোড পার হবার সময় পুলিশ সেদিনই গুলি চালায়। রাইফেলের গুলি এসে লাগে শফিউরের পিঠে। সরকারি অ্যাম্বুলেন্সে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা মেডিকেলে। সেখানে ডক্টর অ্যালিন্সন তার অপারেশন করেন, বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন তার বৃদ্ধ বাবা-মা, স্ত্রী আর কন্যা শাহনাজ। দেখা গেল, তার কলিজা ছিঁড়ে গিয়েছে। সন্ধ্যা সাড়ে ছ’টায় তিনি মারা যান, ৩৪ বছর বয়সে। কিন্তু মারা যাবার পর তার লাশ পুলিশ আত্মীয়দের কাছে হস্তান্তর করেনি। পরে তাকে শহীদ আবুল বরকতের কবরের পাশেই দাফন করা হয়।

‘শহরে সেদিন মিছিল ছিল।
পৃথিবী সেদিন উল্টো ঘোরেনি; এগিয়ে গেছে।
সবাই শুনলোঃ খুন হয়ে গেছে, খুন হয়ে গেল।
মায়ের দু’চোখের দু'ফোটা পানি গড়িয়ে পড়েছে রমনার পথে।’
কবি ফজলে লোহানী তাঁর একুশের কবিতায় এভাবেই স্মরণ করছেন বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সেই রক্তক্ষয়ী দিনটিকে। আমরা পৃথিবীর সেই গর্বিত জাতিদের একটি, যাঁরা মাতৃভাষার অধিকার রক্ষার আন্দোলনে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিতে দ্বিধাবোধ করেনি।
যাঁদের রক্তের বিনিময়ে আজ আমরা স্বাধীনভাবে বাংলায় কথা বলতে পারছি, লিখতে পারছি একুশে ফেব্রুয়ারির এই প্রাক্কালে সেই মহান ভাষা শহীদদের স্মরণ করা আমাদের একান্ত কর্তব্য। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে আমরা পাঁচজন শহিদের নাম বেশি শুনতে পাই: সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার ও শফিউর। এই পাঁচজনের বাইরেও আরও অনেকে আছেন যাঁরা রাজপথে পুলিশের গুলিতে শহীদ হয়েছেন। কিন্তু আমরা এই ভাষাশহীদদের ব্যাপারে কতটুকু জানি?
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ থেকে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ছাত্র-জনতা মিছিল বের করে। মিছিলটি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের কাছাকাছি পৌঁছালে পুলিশ বিনা উসকানিতে নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি চালায়। মুহূর্তের মধ্যে রাজপথ রঞ্জিত হয় তাজা রক্তে। শহীদ হন রফিক, সালাম, বরকত, জব্বারসহ নাম না জানা আরও অনেকে। এই ঘটনার প্রতিবাদে ২২ ফেব্রুয়ারি আবারও শোকমিছিল বের হলে সেখানেও পুলিশ ও মিলিটারি গুলি চালায়, শহীদ হন শফিউর রহমান, আব্দুল আউয়াল, কিশোর অহিউল্লাহসহ আরও কয়েকজন।
একুশে ও বাইশে ফেব্রুয়ারি ঠিক কতজন শহীদ হয়েছিলেন, তা নিয়ে ইতিহাসে আজও ভিন্নমত আছে। আমরা সাধারণত ৫-৭ জন শহীদের নাম জানলেও, প্রকৃত শহীদের সংখ্যা আরও অনেক বেশি বলে মনে করেন অনেক ইতিহাসবিদ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির সন্ধ্যায় সীমান্ত পত্রিকার অন্যতম সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম চৌধুরী ‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি’ শিরোনামে একটি দীর্ঘ কবিতা লেখেন। কবিতার প্রথম কয়েকটি লাইন ছিল এ রকম:
‘ওরা চল্লিশজন কিংবা আরও বেশি
যারা প্রাণ দিয়েছে ওখানে রমনার রোদ্রদগ্ধ
কৃষ্ণচূড়া গাছের তলায়...
চল্লিশটি তাজা প্রাণ আর অঙ্কুরিত বীজের খোসার মধ্যে আমি দেখতে পাচ্ছি তাদের অসংখ্য বুকের রক্ত...’
উল্লেখিত কবিতায় কবি যে ৪০ সংখ্যাটি ব্যবহার করেছেন, তা কি শুধু কবিতার জন্য, নাকি প্রকৃত সংখ্যাটি এমনই, তা আজও এক রহস্য।
তবে ভাষাশহিদ হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেয়েছেন পাঁচজন। আবুল বরকত, আবদুল জব্বার, রফিকউদ্দিন আহমদ, আবদুস সালাম ও শফিউর রহমান। ২০০০ সালে তাদের রাষ্ট্রীয় একুশে পদকে ভূষিত করা হয়েছে। ১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারিতেও পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারানোর খবর পাওয়া যায়। সেই তালিকায় পাওয়া যায় দুটো নাম, অহিউল্লাহ ও আবদুল আউয়াল। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের ওয়েবসাইটে ভাষাশহিদ হিসেবে এই দুজনের নাম-পরিচয় উল্লেখ আছে।
এ ছাড়া সালাউদ্দীন নামেও একজন ২১ ফেব্রুয়ারি শহিদ হন বলে বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু একুশের শহীদ হিসেবে তাদের স্বীকৃতি মেলেনি। আর এ কারণে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিপ্রাপ্ত পাঁচজনই ভাষাশহীদ হিসেবে সমাদৃত হচ্ছেন।
রফিকউদ্দিন আহমদ
মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর উপজেলার পারিল গ্রামেরই সন্তান রফিকউদ্দিন আহমদ। কলকাতায় পড়ালেখা করে দেশে এসে ম্যাট্রিক পাস করেন। পড়েন আইকম ক্লাস পর্যন্ত। এক পর্যায়ে কাজ শুরু করেন বাবার প্রেস পরিচালনার। ১৯৫২ সালে তিনি ছিলেন জগন্নাথ কলেজের হিসাব বিজ্ঞানের ছাত্র।
২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজের হোস্টেল প্রাঙ্গণে পুলিশের গুলি এসে সরাসরি আঘাত হানে আন্দোলনরত রফিকের মাথায়। সেখানেই খুলি উড়ে যায়। ছয়-সাত জন ধরাধরি করে তাকে এনে রাখেন ঢাকা মেডিকেলের এনাটমি হলের পেছনের বারান্দায়। ১৭ নং রুমের পূর্ব দিকে তার লাশ পড়ে ছিল। ড. মশাররফুর রহমান খান তার ছিটকে পড়া মগজ হাতে করে কুড়িয়ে নিয়ে আসেন।

রাত তিনটায় সামরিক বাহিনীর প্রহরায় আজিমপুর কবরস্থানে শহীদ রফিককে সমাহিত করা হয়। সেসময় তাঁর বয়স হয়েছিল মাত্র ২৬ বছর। তিনি ছিলেন ভাষা আন্দোলনের প্রথম শহীদ।
আবুল বরকত
মুর্শিদাবাদের বাবলা গ্রামের ছেলে আবুল বরকত। দেশভাগের পর পরিবারের সাথে ঢাকায় চলে আসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে স্নাতকোত্তর শ্রেণিতে ভর্তি হন। একুশে ফেব্রুয়ারির উত্তাল দুপুরে তিনি ছিলেন মেডিকেল কলেজ হোস্টেলের ১২ নম্বর শেডের পাশে। পুলিশের গুলিবর্ষণ শুরু হলে একটি বুলেট তাঁর তলপেটে বিদ্ধ হয়। সেখানেই লুটিয়ে পড়েন তিনি।
তাঁকে ভর্তি করা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। মাত্র পঁচিশ বছরের টগবগে যুবক প্রচন্ড রক্তক্ষরণে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন রাত আটটায়। রাতেই এক ম্যাজিস্ট্রেটের তত্ত্বাবধানে তাঁকে দাফন করা হয় আজিমপুর কবরস্থানে।
আবদুল জব্বার
ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ের পাঁচুয়া গ্রামের সন্তান আবদুল জব্বার। কিছুদিন আগেই তাঁর কোলজুড়ে এসেছে শিশুসন্তান বাদল। ভাগ্যের ফেরে ঢাকায় এসেছিলেন ক্যানসারে আক্রান্ত শাশুড়ির চিকিৎসার জন্য। কিন্তু ২১শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল এলাকায় ছাত্র-জনতার বিশাল জমায়েত দেখে তিনি চলে যান মিছিলের একেবারে সামনে। পুলিশের বুলেটের নির্মম শিকার হন তিনি। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলে ওই রাতেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
আবদুস সালাম
ফেনীর দাগনভূঞার লক্ষণপুর গ্রামের ছেলে আবদুস সালাম। তিনি ঢাকায় সরকারের শিল্প বিভাগের (ডিরেক্টরেট অব ইন্ডাস্ট্রিজ) একজন পিয়ন হিসেবে কর্মরত ছিলেন। একুশে ফেব্রুয়ারির সেই উত্তাল দিনে তিনিও যোগ দিয়েছিলেন রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে হওয়া মিছিলে। পুলিশের গুলিতে তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মৃত্যু হয়নি। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দীর্ঘ দেড় মাসেরও বেশি সময় ধরে তিনি মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়েন। অবশেষে ৭ই এপ্রিল এই বীর ভাষাসৈনিক না ফেরার দেশে পাড়ি জমান।
শফিউর রহমান
একুশে ফেব্রুয়ারির ঘটনা সবাই জানলেও, খুব কম মানুষ জানেন বাইশে ফেব্রুয়ারির ঘটনা। আগের দিনের গুলিবর্ষণের প্রতিবাদ ও রাষ্ট্রভাষা বাংলা করবার আন্দোলন চলছিল সেদিনও, নওয়াবপুর রোডে। সেদিন সকাল দশটার দিকে রঘুনাথ লেনের বাসা থেকে সাইকেলে চড়ে অফিসের জন্য বেরিয়ে পড়েন শফিউর রহমান, তিনি ছিলেন ঢাকা হাইকোর্টের হিসাব রক্ষণ শাখার কেরানি।
নওয়াবপুর রোড পার হবার সময় পুলিশ সেদিনই গুলি চালায়। রাইফেলের গুলি এসে লাগে শফিউরের পিঠে। সরকারি অ্যাম্বুলেন্সে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা মেডিকেলে। সেখানে ডক্টর অ্যালিন্সন তার অপারেশন করেন, বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন তার বৃদ্ধ বাবা-মা, স্ত্রী আর কন্যা শাহনাজ। দেখা গেল, তার কলিজা ছিঁড়ে গিয়েছে। সন্ধ্যা সাড়ে ছ’টায় তিনি মারা যান, ৩৪ বছর বয়সে। কিন্তু মারা যাবার পর তার লাশ পুলিশ আত্মীয়দের কাছে হস্তান্তর করেনি। পরে তাকে শহীদ আবুল বরকতের কবরের পাশেই দাফন করা হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, ফোবিয়া তুলনামূলকভাবে চিকিৎসাযোগ্য মানসিক সমস্যাগুলোর একটি। অর্থাৎ, সঠিক চিকিৎসারমাধ্যমে এই ফোবিয়া কাটিয়ে ওঠা যায়।
১ ঘণ্টা আগে
সামনেই ভ্যাপসা গরম পড়বে। আর এই গরমে স্টাইল ও আরাম—এই দুইয়ের সমন্বয়ের জন্য ঢোলা বা অভারসাইজড পোশাক খুব ভালো অপশন। এখন আবার এই স্টাইলটাও বেশ ট্রেন্ডি হয়ে উঠেছে।
৫ ঘণ্টা আগে
মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন কিছু স্বাস্থ্য উদ্ভাবন রয়েছে, যেগুলো শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতিই ঘটায়নি, বরং কোটি কোটি মানুষের জীবন বাঁচিয়ে পৃথিবীর জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে আমূল বদলে দিয়েছে। কখনো একটি টিকার আবিষ্কার মহামারি থামিয়েছে, তো কখনো একটি সহজ চিকিৎসা পদ্ধতি লাখো মানুষের মৃত্যুর ঝুঁকি কমিয়েছে।
৬ ঘণ্টা আগে
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হওয়া তাপপ্রবাহ, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও দূষণ একসঙ্গে তাদের স্বাস্থ্যকে হুমকির মুখে ফেলছে। এমনকি জলবায়ুর এই পরিবর্তন শিশুদের জন্মের আগ থেকে শুরু হয়ে শৈশবের প্রতিটি ধাপে বহুমাত্রিক স্বাস্থ্যসংকট তৈরি করেছে।
৮ ঘণ্টা আগে