leadT1ad

উপকূলীয় জনজীবনের সমস্যা নিরসনে রাজনৈতিক ‘কমিটমেন্ট’ জরুরি

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ১১ জানুয়ারি ২০২৬, ১৭: ৫৯
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে উপকূলের মানুষের সংকট নিরসনের সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি নির্বাচনী ইশতেহারে অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্যে আয়োজিত জাতীয় সংলাপে। স্ট্রিম ছবি

প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা, সুপেয় পানি, স্বাস্থ্য ও স্যানিটেশনসহ নানা সমস্যায় রয়েছেন দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় চার কোটি মানুষ। তাঁদের সমস্যা সমাধানে রাজনৈতিক দলগুলোর ‘কমিটমেন্ট’ জরুরি।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে উপকূলের মানুষের সংকট নিরসনের সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি নির্বাচনী ইশতেহারে অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্যে আয়োজিত এক জাতীয় সংলাপে এসব কথা বলেন বক্তারা। রাজধানীর বাংলামোটরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে আজ রোববার (১১ জানুয়ারি) এ সংলাপের আয়োজন করা হয়।

লোকাল এনভায়রনমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচারাল রিসার্চ সোসাইটি (লিডার্স) ও মিডিয়া স্ট্রিমের যৌথ আয়োজনে এ সংলাপ শুরু হয় বেলা পৌনে ১১টায়। আয়োজনটির মিডিয়া পার্টনার ছিল ঢাকা স্ট্রিম।

উপকূলীয় সমস্যা সমাধানে রাজনৈতিক দলগুলোর ‘কমিটমেন্ট’ জরুরি বলে মনে করছেন বক্তারা। তাঁরা বলেন, রাজনৈতিক দলের নীতি পরবর্তীতে ধাপে ধাপে রাষ্ট্রীয়ভাবে বাস্তবায়িত হয়। তাই আসন্ন নির্বাচনের ইশতেহারে দলগুলোকে উপকূলীয় সমস্যা ও তা সমাধানের অঙ্গীকার অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

জাতীয় নির্বাচনের আগে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, সুশীল সমাজ ও বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধিরা সংলাপে অংশ নেন। ঢাকা স্ট্রিমের অপ-এড এডিটর জাভেদ হুসেনের সঞ্চালনায় স্বাগত বক্তব্য দেন লিডার্সের নির্বাহী পরিচালক মোহন কুমার মণ্ডল। তিনি বলেন, উপকূলের চার কোটি মানুষের সংকট নিয়ে এনজিওগুলো কাজ করছে। কিন্তু মূল দায়িত্ব রাষ্ট্রের। এসব সমস্যা সমাধানে আমাদের সবার একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

সংলাপে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন লিডার্সের ডিরেক্টর অব প্রোগ্রামস এবিএম জাকারিয়া। প্রবন্ধে বলা হয়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে উপকূলের মানুষ শহরে স্থানান্তরিত হচ্ছে। লবণাক্ততার কারণে কৃষি উৎপাদন, খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য এবং নারীর প্রজনন ক্ষমতায় দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

এসময় তিনি ২১ দফা দাবি উত্থাপন করেন। দাবির মধ্যে রয়েছে উপকূল উন্নয়ন বোর্ড গঠন, পরিবেশবান্ধব ইকোনমিক জোন গড়ে তোলা, উপকূলীয় অঞ্চলকে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ বা দুর্যোগ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ঘোষণা, বিশেষ মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন, জলাবদ্ধতা নিরসনে টেকসই ড্রেনেজ পরিকল্পনা এবং ভরাট হওয়া নদী ও খালে ড্রেজিং, নারী ও শিশুবান্ধব করে সাইক্লোন শেল্টার সংস্কার, স্থায়ী ও মজবুত বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও ভঙ্গুর স্লুইচগেট মেরামত করা। উপকূলীয় মানুষের নিরাপদ খাবার পানির টেকসই ও স্থায়ী সমাধান দেওয়া।

সংলাপে অংশ নিয়ে ওয়াটার এইড বাংলাদেশের পরিচালক পার্থ হাফেজ শেখ বলেন, জলবায়ু খাতে বরাদ্দ আছে, কিন্তু তার সুষ্ঠু বাস্তবায়ন প্রয়োজন। পানি ও স্যানিটেশন নিশ্চিতের বিষয়টি দলগুলোর ইশতেহারে থাকা দরকার।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক আমিনুর রসুল বাপা বলেন, উপকূলীয় এলাকায় যাঁরা সংসদ নির্বাচন করবেন, তাঁদের কাছে দাবিগুলো তুলে ধরতে হবে। তাঁরা যখন জনগণের কাছে যাবেন তখন যেন জবাবদিহি করা হয়।

আন্তর্জাতিক শাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশের নির্বাচন সংস্কার কমিশনের সদস্য মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, এক মাস পরেই নির্বাচন। এর মধ্য দিয়ে সরকার শুধু নয়, আমরা ভবিষ্যৎ নির্বাচন করব। অনেক রকম উন্নয়নের কথা হচ্ছে, কিন্তু ইমিনেন্ট জাতীয় সংকট ক্লাইমেট চেঞ্জ সেভাবে প্রাধান্য পাচ্ছে না। এজন্য দুটো জিনিস দরকার—পলিটিকাল উইল ও ন্যাশনাল অ্যাওয়ারনেস।

জলবায়ু অধিপরামর্শ ফোরামের সদস্যসচিব মাধব চন্দ্র দত্ত বলেন, ভারতের সঙ্গে সংযুক্ত নদীর প্রবাহ ঠিক রাখতে পলিটিক্যাল পার্টির কমিটমেন্ট দরকার। অতীতে যে পদ্ধতিতে নদী শাসন হয়েছে, এটি আত্মহত্যার মতো। এখান থেকে বেরিয়ে এসে নদী বাঁচাতে হবে।

হেলভেটাস-এর হেড অব প্রোগ্রামস মাহমুদুল হাসান বলেন, ১৮ কোটি মানুষের দেশে ১০ হাজার কোটি টাকা ওয়াশ বাজেট রয়েছে। যথেষ্ট বাজেট আছে, কিন্তু এই অর্থ কীভাবে ব্যয় হচ্ছে সে প্রশ্ন করার সময় এসেছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা) রিসার্চ, অ্যাডভোকেসি অ্যান্ড ক্যাম্পেইন কো-অর্ডিনেটর রেহনুমা নওরীন বলেন, আমাদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন আছে। কিন্তু সেখানে নারী ও শিশুর তেমন উল্লেখ নেই। আমরা মুখে অনেক কথা বলি, কিন্তু কাজ তেমন খুঁজে পাই না।

আদিবাসী ও দলীত সম্প্রদায় নিয়ে কাজ করা বৈশ্বিক সংস্থা হেক্স/এপার-এর উপদেষ্টা শেখর চক্রবর্তী বলেন, পলিটিকাল পার্টির কমিটমেন্ট ছাড়া ক্লাইমেট বাজেটের একাউন্টিবিলিটি নিশ্চিত হবে না। নদী দখল করলে ঠিক কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, ইশতেহারে এ ধরনের সুনির্দিষ্ট বিষয় চাই।

ইয়ুথনেট গ্লোবালের সাধারণ সম্পাদক আরিফুর রহমান বলেন, জলবায়ু ফান্ড যথাযথভাবে ব্যবহার হচ্ছে না। রাজনৈতিক দলের কাছে দাবি থাকবে, বরাদ্দটা যথাযথভাবে যেন ব্যবহার করা হয়।

অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের ম্যানেজার আবুল কালাম আজাদ বলেন, উপকূল বাংলাদেশের জন্য আশির্বাদ। এটি আশির্বাদ হবে নাকি অভিশাপ হবে সেটি রাজনৈতিক দলের ওপর নির্ভর করে; যেহেতু পলিসি ঠিক করে তারা।

ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের সমন্বয়ক শরীফ জামিল বলেন, উপকূলে অর্থনৈতিক উন্নয়নের নামে যাচ্ছেতাই হচ্ছে। পরিবেশ ও জলবায়ু সংক্রান্ত পরিকল্পনাগুলো রিভিউ করতে হবে।

রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের মধ্যে বাসদ মার্কসবাদীর সদস্য সীমা দত্ত বলেন, যখন যে দল ক্ষমতায় আসে তারা নিজেদের পকেটভারী করার কাজ করেন। সাধারণ নাগরিকদের রাজনৈতিক দলগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। সুপারিশগুলো শুধু ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করা নয়, বাসদ মার্ক্সবাদী ও বাম গণতান্ত্রিক জোট সাধারণ মানুষের এসব দাবি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কথা বলছে।

এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাসরিন সুলতানা মিলি বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে কার্বন ফাইন আদায় করা গেলে বাজেট নিয়ে কোনো সমস্যা থাকবে না। পানির নায্য হিস্যার জন্য আন্তর্জাতিক আদালতে যেতে হবে। সার্ভে হুইসেলও কিনতে হবে। এসব বিষয় আমাদের ইশতেহারে থাকবে।

গণসংহতি আন্দোলনের রাজনৈতিক পরিষদ সদস্য মনির উদ্দিন পাপ্পু বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো ইশতেহারে রাখার পাশাপাশি কমিটমেন্ট না দিলে কোনো বিষয়ে তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা যায় না। আমাদের ইশতেহারে জলবায়ু ও স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ হচ্ছে। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরে এসেও শিশু ড্রপআউট নিয়ে, খাবার পানি নিয়ে কথা বলতে হয়! এটা এত কঠিন ম্যানেজমেন্ট বলে আমি মনে করি না।

এনসিপির ঢাকা মহানগরের যুগ্ম আহ্বায়ক ওয়াহেদ আলম বলেন, নাহিদ ইসলাম ঘোষিত এনসিপির ২৪ দফার ১৭ নম্বর দফায় উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জন্য করণীয় উল্লেখ করা হয়েছে। উপকূলীয় এলাকায় ৫০ জন এমপি হবেন। উপকূলের মানুষের চাওয়া জানতে সেখানে যেতে হবে।

বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ বলেন, পলিসি লেভেলে কাজ করার জন্য প্রথমত নীতি দরকার। এরপর পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন হবে। পানির নায্য হিস্যার জন্য আন্তর্জাতিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি বাংলাদেশ। এটি দলগুলো ইশতেহারে রাখবে বলে মনে করি। প্রতিশ্রুতি গুরুত্বপূর্ণ।

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, পরিবেশ কোনো দল বা দেশের ইস্যু না। বাংলাদেশের টপ তিন ইস্যুর একটি এটি, এ বিষয়ে সবগুলো দলের ঐকমত্য হওয়া উচিত। এটি নিয়ে আমরা দেশ-বিদেশের এক্সপার্টদের যুক্ত করে কাজ করছি। ইতিমধ্যে অনলাইনে জনতার ইশতেহারে আমাদের ৩৫ হাজার মতামত এসেছে। আমরা সাধ্যমতো করব বলে প্রতিশ্রুতি দেব, সব করে দেব সেটা বলব না।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য রাগিব আহসান বলেন, বহুদিন থেকে পরিবেশ আন্দোলন করছি, কিন্তু ক্রমান্বয়ে আমরা বিপদের দিকেই যাচ্ছি। এটি রাজনৈতিক ও দার্শনিক সংকট। পার্টির ইশতেহারে রাজনৈতিক দার্শনিক সংকটের কথা বলার চেষ্টা করব।

বিএনপির সহ-আন্তর্জাতিক সম্পাদক নাহিদুল খান বলেন, করাপশন জাতির প্রত্যেক লেয়ারে রয়েছে। সেটি আস্তে আস্তে কাটিয়ে উঠতে হবে। রিজিওনাল জিওপলিটিক্সের পজিশনে আমরা বৃহৎ রাষ্ট্রের পাশে। আমাদের অনেক চ্যালেঞ্জ। বড় কোন প্রজেক্ট নিতে হলেও বড় দেশের পারমিশন লাগে। তবে জলবায়ুর মতো বিষয়ে জনমত তৈরি করা দরকার। নির্বাচিত সরকারকে দাবি ও সমস্যাগুলো উপস্থাপন করতে হবে, ফলোয়াপ করতে হবে। কালেক্টিভ ও কোলাবোরেটিভ ফর্মে এগোতে হবে।

সমাপনী বক্তব্যে ঢাকা স্ট্রিমের প্রধান সম্পাদক ইফতেখার মাহমুদ বলেন, এই আলোচনা আমরা শুরু বলছি। সবার অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা থাকলে এটি চালু রাখতে চাই। কোন দল ক্ষমতায় গেল এটা আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ না। জনগণের চিন্তার পক্ষে সম্মতি উৎপাদন গণমাধ্যমের কাজ। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে আমরা সে কাজটি করব।

Ad 300x250

সম্পর্কিত