আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে জোটগতভাবে মাঠে নেমেছে প্রায় সব রাজনৈতিক দল। এমনটা অতীতেও দেখা গেছে। তবে এবার চোখে পড়ার মতো বিষয় হলো, দলগুলোকে নিজ নিজ দলের প্রতীকে নির্বাচন করতে হচ্ছে; ফলে জোটের প্রধান বা বড় দলের প্রতীকে নির্বাচন করতে না পেরে নিজ দল ছেড়ে বড় দলে যোগ দিচ্ছে অনেকেই। আবার, কেউ কেউ দল বিলুপ্ত করে যোগ দিচ্ছে বড় দলে।
গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান দল ছেড়ে গত ২৭ ডিসেম্বর বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন; আর এই সিদ্ধান্তকে ‘নির্বাচনী কৌশলের অংশ’ হিসেবে তার দল অনুমোদনও দিয়েছে। তিনি কাঙ্ক্ষিত বিএনপির ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ঝিনাইদহ-৪ আসন থেকে নির্বাচন করবেন। লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) মহাসচিব রেদোয়ান আহমেদ দল ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করার জন্য।
বাংলাদেশ লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (বিএলডিপি) একাংশের চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিম গত ৮ ডিসেম্বর তাঁর দল বিলুপ্ত করে নেতাকর্মী নিয়ে বিএনপিতে যোগ দেন; লক্ষ্মীপুর-১ (রামগঞ্জ) আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করার জন্য তিনি মনোনয়ন জমা দিয়েছেন। জাতীয় দলের চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদা কিশোরগঞ্জ-৫ আসন থেকে নির্বাচন করবেন। গত ২২শে ডিসেম্বর তিনি জাতীয় দল বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগ দেন।
তবে, এর বাইরে গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি (ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়-৬), বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক (ঢাকা-১২), গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর (পটুয়াখালী-৩) বিএনপি জোটের প্রার্থী হয়ে নিজ দলের প্রতীকেই নির্বাচন করছেন।
উল্লেখ্য, এর আগে বাংলাদেশের নির্বাচনী আইন অনুযায়ী শরিক দলের প্রতীকে নির্বাচনের সুযোগ ছিল জোটবদ্ধ রাজনৈতিক দলগুলোর। গত নভেম্বরে নির্বাচন কমিশন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে (আরপিও) সংশোধনী আনলে এই সুযোগ উঠে যায়।
বিএনপিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল এই আইন পরিবর্তনের অনুরোধ জানালেও কোনো কাজ হয়নি। ইসির সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে গেলেও এটি অপরিবর্তিত থেকে যায়।
নির্বাচনে জেতার জন্য দলীয় প্রতীক গুরুত্বপূর্ণ। নিজ দলের প্রতীকে ভোট করলে ছোট রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা জয়লাভ করতে না-পারার আশঙ্কা থেকে এই যে দলত্যাগ—একে আবার বলা হচ্ছে নির্বাচনের একটি কৌশল। অথচ এতদিন বলা হতো একজন রাজনীতিক দল থেকে বেরিয়ে গিয়ে অথবা সেই দল বিলুপ্ত করে অন্য দলে যোগ দিলে এবং সেই দলের প্রতীকে নির্বাচন করলে নির্বাচনে জয়লাভ করা সহজ হবে।
দেশের এই রাজনৈতিক চিত্র, ভোটের এই রাজনীতি আর রাজনৈতিক কৌশলের মধ্য দিয়ে এটাই প্রমাণিত হয় যে, নেতাদের একমাত্র লক্ষ্য হলো যে করেই হোক ক্ষমতার কেন্দ্রে আসীন হওয়া। ন্যূনতম আদর্শ, সুস্পষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শ বা জনগণের কাছে দায়বদ্ধতার প্রশ্ন যখন গৌণ হয়ে যায়, তখন গণতন্ত্রও তার অর্থ হারায়। সংসদ আর জনস্বার্থের মঞ্চ থাকে না, বরং হয়ে ওঠে ব্যক্তিগত ও দলীয় অন্দরমহল। ভোটাররা গণতন্ত্র দেখতে পায় কেবল ভোটের রাজনীতিতে। যদিও গত তিনটি নির্বাচনে তা-ও ছিল না। আর রাজনীতিবিদরা গণতন্ত্রকে ব্যবহার করেন কেবল সংসদে যাওয়ার সিঁড়ি হিসেবে।
এই অবস্থায় গণতন্ত্রের সংকট ভোটে নয়, সংকট রাজনীতির নৈতিকতায়। আদর্শহীন রাজনীতি শেষ পর্যন্ত জনগণকে নয়, ক্ষমতাকেই প্রতিনিধিত্ব করে—আর এই রাজনীতি যতদিন চলবে, ততদিন পরিবর্তন কেবল শ্লোগানেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
অবশ্য, এর বিপরীতে দেখা গেছে, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনী জোটে যুক্ত হওয়ায় দলটির সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব তাসনিম জারা, যুগ্ম আহ্বায়ক তাজনূভা জাবীন-সহ বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা পদত্যাগ করেছেন। তাদের পদত্যাগের কারণ যে জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির জোট, দল ছাড়ার মধ্যে তার স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দিলে তাঁদের দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরা সদস্য অধ্যাপক লতিফুর রহমান। তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ (সদর) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পক্ষে আইন-আদালত ও থানা সামলানোর কথাও বলেছেন। গত মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) বিকেলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের ফাটাপাড়া মদনমোড় এলাকায় এক উঠান বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন।
একটি দলের শক্তি-সামর্থ্য বাড়ানোই যদি রাজনীতির একমাত্র লক্ষ্য হয়; তবে নীতি, নৈতিকতা আর আদর্শ কেবল নির্বাচনী ভাষণের অলংকারে পরিণত হয়। তখন রাজনীতি আর জনকল্যাণের অনুশীলন থাকে না, হয়ে ওঠে ক্ষমতা সঞ্চয়ের কৌশল। যেকোনো উপায়ে ক্ষমতার পথকে প্রসস্ত করা; এই মানসিকতার রাজনীতি দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী হয় না; আর আদর্শহীন শক্তি শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেই দুর্বল করে দেয়।
রাজনীতির লক্ষ্যই হলো ক্ষমতায় যাওয়া। তাই বলে রাজনীতি কি শুধুই ক্ষমতাকেন্দ্রিক? একটিবার ক্ষমতার কেন্দ্রে বসার জন্য, একবার হয়ে গেলে আরো অনেকবার—ক্ষমতার মোহে ছোট রাজনৈতিক দলগুলো বড় দলগুলোর সঙ্গে মিশে যাবে, আর মিশে গিয়ে একই তাল, লয় ও সুরে গাইবে বিজয়ের গান। আর বড় দলগুলো ছোটদলগুলোকে তাদের ছায়াতলে রেখে তাদের আধিপত্য ধরে রাখতে চাইবে কেয়ামত পর্যন্ত। বড় দলের ক্ষমতায় সহায়ক হচ্ছে ছোটদলগুলো এবং ছোটদল থেকে বেরিয়ে আসা ছোট নেতারা। না থাকছে তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক মতাদর্শ, না কোনো কর্মসূচি। এতে করে ছোট দলগুলো ছোটই থেকে যাচ্ছে, আর বড় হতে পারছে না। না বড় হতে পারছে ছোট নেতারা। রাজনীতিতে তাদের কোনো শক্ত, তাৎপর্যপূর্ণ ও স্বতন্ত্র অবস্থান দাঁড়াচ্ছে না।
দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আমূল পরিবর্তন হবে, পুরনো ধাঁচের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসবে রাজনৈতিক দলগুলো—জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর এমন প্রত্যাশাই ছিল সকলের। এত বড় একটা গণঅভ্যুত্থানের পর স্বভাবতই মানুষ আশা করেছিল নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের; যেখানে পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তন করে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার ওপর জোর দেওয়া হবে, যা হবে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর প্রত্যাশার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।
দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ধারণা করা হয়েছিল রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন ও উত্তরণ ঘটবে। কিন্তু অভ্যুত্থানের কয়েক মাস পেরোতে না পেরোতেই স্পষ্ট হয়ে যায়—রাজনীতি এগোচ্ছে সেই পুরোনো ধাঁচে। আদর্শ, নীতি ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের জায়গা দখল করেছে তাৎক্ষণিক লাভ, আর ক্ষমতার ভাগ-বাটোয়ারা। ফলে যে রাজনীতির নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের পথ দেখানোর কথা ছিল, তা আবারও পরিচিত বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে—যেখানে জনগণ দর্শক, আর গণতন্ত্র কেবল একটি ব্যবহারিক হাতিয়ার।
গণঅভ্যুত্থান রাষ্ট্রের ক্ষমতার কাঠামো কাঁপিয়ে দিলেও সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো রাজনৈতিক মানসিকতার ভেতরে যে পরিবর্তন প্রয়োজন ছিল তা ঘটেনি। সবই আবার সেই পুরনো ছকে ফিরে গেছে। ফলে গণঅভ্যুত্থানের ভেতর দিয়ে যে নতুন সম্ভাবনার জন্ম দেওয়ার কথা ছিল, তা আবারও ক্ষমতার হিসাব-নিকাশে বন্দি হয়ে পড়েছে। এমন বাস্তবতায় এই প্রশ্ন উঠে আসে যে, রাজনীতি কি কেবলই ক্ষমতা দখলের খেলা, নাকি জনগণের আকাঙ্ক্ষা, ন্যায়বিচার ও দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রগঠনের দায়ও তার অন্তর্গত?