জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

বিপর্যস্ত অর্থনীতি: আস্থা ফেরানোর কঠিন মিশনে তারেক রহমান

প্রকাশ : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৮: ৩৬
স্ট্রিম গ্রাফিক

রাজধানীর মিরপুরের একটি ছোট্ট গার্মেন্টস কারখানা। সকাল সাতটায় গেট খোলার কথা, কিন্তু আজ খোলেনি। গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন প্রায় পঞ্চাশজন শ্রমিক। তাঁদের চোখে প্রশ্ন, মুখে উদ্বেগ। কারখানার মালিক গতকাল বলে গেছেন, ব্যাংক থেকে ঋণ না পেলে আর চালানো সম্ভব নয়। এই দৃশ্য শুধু মিরপুরের নয়। সারাদেশে হাজারো ছোট-বড় কারখানা এখন অনিশ্চয়তার মুখে। ব্যাংকে টাকা নেই, বাজারে চাহিদা কমেছে, ডলারের দাম বেড়েছে। একদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ, অন্যদিকে কর্মসংস্থানের সংকট। এমন এক কঠিন পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন আগামী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। ২৯৯টি আসনের মধ্যে ২১২টি জিতে দলটি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। দ্রুতই বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পর ক্ষমতায় আসার এই মুহূর্তে তাঁর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করানো। প্রশ্ন হলো, কী সেই চ্যালেঞ্জগুলো, কীভাবে মোকাবেলা করা সম্ভব।

দৈনন্দিন বাজারে গেলেই বোঝা যায় সাধারণ মানুষের কষ্ট কত গভীর। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ এবং ২০২৪ সালের বেশিরভাগ সময় মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ শতাংশের কাছাকাছি। খাদ্য মূল্যস্ফীতি আরও বেশি। একজন রিকশাচালক যখন বলেন, আগে মাসে একবার মাংস খেতে পারলেও এখন তাঁরা কেউ মনে করতে পারেন না যে শেষ কবে মাংস খেয়েছেন তখন অর্থনীতির পরিসংখ্যান বাস্তব জীবনের কষ্টে রূপ নেয়। অন্যদিকে, একজন স্কুলশিক্ষক যদি সন্তানের টিউশন ফি জোগাড় করতেই হিমশিম খান, তাহলে বুঝতে বাকি থাকে না মধ্যবিত্তের অবস্থা কতটা নাজুক। জনাব তারেক রহমানের সরকারের প্রথম দায়িত্ব হবে এই সাধারণ মানুষের মুখে হাসি ফেরানো।

অর্থনীতির এই বিপর্যয় একদিনে তৈরি হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, খেলাপি ঋণের পরিমাণ এখন মোট ঋণের প্রায় ৯ থেকে ১০ শতাংশ। পুনঃতফসিল করা এবং আড়াল করা ঋণ যোগ করলে এই সংখ্যা আরও বেশি। দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংক খাতে রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তদারকি এবং ঋণ অনুমোদনে স্বজনপ্রীতি একটি ভঙ্গুর ভিত্তি তৈরি করেছে। ফলে ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট তীব্র হয়েছে। উচ্চ সুদের হার ব্যবসায়ীদের নতুন বিনিয়োগ থেকে বিরত রাখছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ব্যবসায়ীরা আস্থাহীনতায় ভুগেছেন। তাঁরা অপেক্ষা করছিলেন একটি নির্বাচিত সরকারের জন্য।

আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, এখন আর ছোটখাটো সমাধানে কাজ হবে না। গোটা অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকেই নতুন করে দাঁড় করাতে হবে। বিনিয়োগকারীদের মনে বিশ্বাস জাগাতে হবে যে তাঁদের বিনিয়োগ সুরক্ষিত থাকবে এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশে তাঁরা ব্যবসা করতে পারবেন। এজন্য প্রয়োজন একটি ক্র্যাশ প্রোগ্রাম। ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো, খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি বন্ধ করা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংককে প্রকৃত স্বায়ত্তশাসন দেওয়া এগুলো অগ্রাধিকার পেতে হবে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও বাংলাদেশকে আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা বাড়ানো, মূলধন পর্যাপ্ততা জোরদার করা এবং ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি শক্তিশালী করার পরামর্শ দিয়েছে। পেশাদার ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদদের হাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব দিতে পারলে মুদ্রানীতি কার্যকর হবে। ঋণ বিতরণে শৃঙ্খলা ফিরবে। ব্যাংকগুলোর মূলধন পর্যাপ্ততা বাড়ানো এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারলে সাধারণ আমানতকারী এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা আবার ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর ভরসা করবেন।

তবে ব্যাংক সংস্কার করলেই সব সমস্যার সমাধান হবে না। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করাও জরুরি। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৈশ্বিক জ্বালানি এবং খাদ্যদ্রব্যের দাম বৃদ্ধি বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দিয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০২১ সালে ছিল প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৪ সালে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এই পরিস্থিতিতে আমদানি ব্যবস্থাপনায় অগ্রাধিকার নির্ধারণ, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সবাই জানেন বাজারে সিন্ডিকেট ভাঙা প্রায় দুঃসাধ্য। তবে এটা না করলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। ব্যবসায়ীরা মনে করেন, প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারলে পণ্যের সরবরাহ বাড়বে এবং দাম সহনীয় পর্যায়ে নামবে। টিসিবির কার্যক্রম স্বচ্ছ করা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমাতে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। ডিজিটাল সাপ্লাই চেইন তৈরি করা গেলে কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত সরাসরি সংযোগ স্থাপন সম্ভব হবে। যদি সরকার শুরুতেই এই দুঃসাহসিক পদক্ষেপ নেয়, তাহলে সাধারণ মানুষ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে পারবে।

এখন আর ছোটখাটো সমাধানে কাজ হবে না। গোটা অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকেই নতুন করে দাঁড় করাতে হবে। বিনিয়োগকারীদের মনে বিশ্বাস জাগাতে হবে যে তাঁদের বিনিয়োগ সুরক্ষিত থাকবে এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশে তাঁরা ব্যবসা করতে পারবেন।

রপ্তানি খাতের দিকে তাকালে দেখা যায়, পোশাকশিল্প মোট রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশ জোগান দেয়। এই একক খাতের ওপর নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ। বৈশ্বিক চাহিদা কমলে বা বাণিজ্যনীতিতে পরিবর্তন এলে পুরো অর্থনীতি চাপে পড়ে। তাই আইটি, ফার্মাসিউটিক্যাল, চামড়া, হালকা প্রকৌশল এবং কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্যে প্রণোদনা বাড়ানো দরকার। দক্ষিণ কোরিয়া ও ভিয়েতনামের অভিজ্ঞতা দেখায়, বহুমুখীকরণ দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা আনে।

এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশকে শুল্কমুক্ত সুবিধা হারাতে হবে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় পণ্যের মান উন্নয়ন, নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। রপ্তানি উদ্যোক্তারা বলেন, ভারত-ইইউ চুক্তির বিপরীতে বাংলাদেশেরও কাউন্টার চুক্তির সুযোগ খোঁজা উচিত। তাঁরা আরও বলেন, ব্যবসায়ীরা চান সরকার তাঁদের কথা শুনুক এবং বাস্তব সমস্যার সমাধান দিক।

এবার আসা যাক কর-জিডিপি অনুপাতে জনাব তারেক রহমানের সরকার কী ভূমিকা নিতে পারে সে প্রসঙ্গে। বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য বলছে, এই অনুপাত ৮ থেকে ৯ শতাংশের মধ্যে আছে, যেখানে উন্নয়নশীল দেশের গড় ১৫ শতাংশের বেশি। রাজস্ব আহরণে কাঠামোগত দুর্বলতা স্পষ্ট। করের হার না বাড়িয়ে বরং করের আওতা বাড়ানো, ডিজিটাল ট্র্যাকিং জোরদার করা এবং স্বচ্ছতা বাড়ানো কার্যকর হতে পারে। স্বচ্ছভাবে কর দিলে ব্যবসায়ীদের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার ঘোষণা এলে কর আদায় বাড়বে। যদি তিনি একটি ব্যবসাবান্ধব কর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেন এবং করদাতাদের হয়রানি বন্ধ করতে পারেন, তাহলে রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।

মেগাপ্রজেক্টে অপচয় ও দুর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এগুলো কঠোর তদারকির আওতায় এনে ব্যয় সংকোচননীতি গ্রহণ করা হলে বাজেট ঘাটতি কমানো সম্ভব। অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রতিটি টাকার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

জ্বালানি সংকট বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সংকটের মূল কারণ হলো অতিরিক্ত আমদানিনির্ভরতা এবং দেশীয় সম্পদ অনুসন্ধানে পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাব। বর্তমানে বাংলাদেশ প্রায় ৫০ শতাংশের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনে আমদানিকৃত এলএনজি এবং কয়লার ওপর নির্ভরশীল। ডলারের দাম বাড়লে বা আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পেলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে উৎপাদন খরচে। ফলে শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা ব্যয়বহুল হয়ে যায় এবং প্রতিযোগিতা ক্ষমতা কমে যায়। বিএনপি সরকার এই সংকট মোকাবেলায় কয়েকটি পদক্ষেপ নিতে পারে।

দেশের অনশোর এবং অফশোর গ্যাস ব্লকগুলোতে নতুন করে অনুসন্ধান বাড়াতে হবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বঙ্গোপসাগরে এখনো বিপুল পরিমাণ গ্যাস মজুত রয়েছে। আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর সঙ্গে উৎপাদন ভাগাভাগি চুক্তি (PSC) করে দ্রুত অনুসন্ধান কাজ শুরু করতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতেও জোর দিতে হবে। সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুবিদ্যুৎ এবং জলবিদ্যুতে বিশেষ প্রণোদনা দিলে বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে দক্ষতা বাড়ানোও জরুরি। পুরনো বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো আধুনিকীকরণ করতে হবে। সঞ্চালন লাইনে অপচয় কমাতে হবে। সবচেয়ে জরুরি হলো শিল্পাঞ্চলগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা। রপ্তানিমুখী শিল্পগুলো যাতে উৎপাদন ব্যাহত না হয়, সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। জ্বালানি সংকট সমাধান না হলে শিল্পায়ন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি স্থবির হয়ে যাবে। তাঁরা যদি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেন, তাহলে তা অর্থনীতির জন্য বড় স্বস্তি আনবে।

ব্যবসায়ীরা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, অনানুষ্ঠানিক ব্যয় এবং নীতির ঘনঘন পরিবর্তনের অভিযোগ করেন। সিঙ্গাপুর বা মালয়েশিয়ায় ব্যবসা শুরু করা দ্রুত এবং স্বচ্ছ। বাংলাদেশে এখনও নানা ধাপ পেরোতে হয়। পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন এবং পেপারলেস ব্যবস্থাপনা চালু করলে সময় এবং ব্যয় কমবে। ছোট উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বেশি লাভবান হবেন।

ডিজিটাল সাপ্লাই চেইন তৈরি করা গেলে কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত সরাসরি সংযোগ স্থাপন সম্ভব হবে। যদি সরকার শুরুতেই এই দুঃসাহসিক পদক্ষেপ নেয়, তাহলে সাধারণ মানুষ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে পারবে।

অন্তর্বর্তী সরকার শেষ সময়ে কিছু সংবেদনশীল চুক্তি করেছে। বন্দর বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির বিষয়গুলো নতুন সরকারের পুনর্মূল্যায়ন করা উচিত। এসব চুক্তি জাতীয় স্বার্থে কতটা ইতিবাচক, নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি কিনা এবং ব্যবসার জন্য অনুকূল কিনা সেটা যাচাই করতে হবে।

কর্মসংস্থান এখন সবচেয়ে বড় সামাজিক চ্যালেঞ্জ। প্রতিবছর লাখো তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার হিসাব বলছে, যুব বেকারত্বের হার উদ্বেগজনক। দক্ষতা উন্নয়ন, কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহজ ঋণ নিশ্চিত করা জরুরি। স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম শক্তিশালী করলে প্রযুক্তিনির্ভর নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে।

গ্রামীণ অর্থনীতিতেও সংকটের ছাপ স্পষ্ট। কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পান না। মধ্যস্বত্বভোগীরা বাজার নিয়ন্ত্রণ করেন। ডিজিটাল সাপ্লাই চেইন, সরাসরি ক্রয়ব্যবস্থা এবং কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ালে কৃষি আয় বৃদ্ধি পাবে। গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হলে শহরমুখী চাপ কমবে।

যদিও রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর মানুষের প্রত্যাশা বাড়ে, তবু মনে রাখতে হবে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার তাৎক্ষণিক নয়। আর্থিক খাত সংস্কার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিয়োগ বাড়ানো সময়সাপেক্ষ। তবে সঠিক দিকনির্দেশনা থাকলে পরিবর্তনের সূচনা দ্রুত দৃশ্যমান হয়। ১৯৯০-এর দশকে পূর্ব ইউরোপের কয়েকটি দেশ কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে দ্রুত স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে এনেছিল। শুধু ইচ্ছা থাকলেই হবে না, সেই ইচ্ছাকে কাজে রূপ দিতে শক্ত প্রতিষ্ঠান দরকার।

আগামী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে থাকা চ্যালেঞ্জগুলো বিশাল। তবে সম্ভাবনাও কম নয়। তাঁর তারুণ্যনির্ভর নেতৃত্ব এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা কাজে লাগাতে পারলে পরিবর্তন সম্ভব। এমন একটি অর্থনীতি গড়তে হবে, যেখানে পরিচয় নয়, যোগ্যতা মূল্য পাবে। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ এবং তাঁদের সমস্যার দ্রুত সমাধান দিতে পারলে আস্থাহীনতার মেঘ কাটবে। প্রবাসীরা বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহিত হবেন।

বিশ্ববাজারও এখন স্থির নয়। কোথাও যুদ্ধ, কোথাও বাণিজ্য দ্বন্দ্ব—এর প্রভাব আমাদের ওপরও পড়ছে। বাণিজ্য যুদ্ধ, জ্বালানি দামের ওঠানামা এবং ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এসব মোকাবেলায় সতর্কতার সঙ্গে পা ফেলতে হবে। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা করে এগোতে হবে।

শুরুতেই মানুষকে পরিষ্কারভাবে বলতে হবে কী পরিকল্পনা, কী অগ্রাধিকার, আর কবে নাগাদ ফল পাওয়া যাবে। বেকারত্ব কমানো, কর্মসংস্থান বাড়ানো, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং জ্বালানি সংকট মোকাবেলা এগুলো অগ্রাধিকার পেতে হবে। ব্যাংক সংস্কার, বাজার সিন্ডিকেট ভাঙা, কর ব্যবস্থা আধুনিকীকরণ এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।

অর্থনীতির কথা আমরা সংখ্যায় বলি, কিন্তু এর প্রভাব পড়ে মানুষের জীবনে তাদের আয়, খরচ আর ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্নে। আগামী সরকারের সাফল্য নির্ভর করবে সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা পরিবর্তন আনতে পারে তার ওপর। রাজশাহীর সেই মুদি দোকানদার যদি আবার দিনে বারো হাজার টাকার মাল বিকোতে পারেন, মিরপুরের কারখানার শ্রমিকরা যদি নিশ্চিন্তে কাজে যেতে পারেন, রিকশাচালক যদি পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত খাবার কিনতে পারেন তাহলেই বোঝা যাবে অর্থনীতি সত্যিই ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

বিএনপির ভূমিধস বিজয় দেশবাসীর প্রত্যাশা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করতে পারলে তারেক রহমান কেবল একজন সফল প্রধানমন্ত্রী হিসেবেই নয়, বরং অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের নায়ক হিসেবেও ইতিহাসে স্থান পাবেন। তবে এজন্য প্রয়োজন সাহসী সিদ্ধান্ত, স্বচ্ছ শাসন এবং সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে অংশীদারিত্ব। দেশের বর্তমান এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির দুরবস্থা দেখে সাবধানে পা ফেলতে হবে। সবার সঙ্গে বসে পরামর্শ করে এগোতে হবে। মানুষের চোখে যে প্রত্যাশার আলো জ্বলেছে, সেটি টিকিয়ে রাখাই হবে সবচেয়ে বড় সাফল্য।

  • শোয়েব সাম্য সিদ্দিক: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
Ad 300x250

সম্পর্কিত