জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

গণভোটের রায় নাকি ইশতেহার: নতুন সরকারের সামনে প্রথম চ্যালেঞ্জ

এআই জেনারেটেড ছবি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে সরকার গঠন করতে চলেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন নিয়ে এই জয় যেমন বিপুল প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছে, তেমনই তৈরি করেছে এক জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতি। আগামীকাল ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন মন্ত্রিসভা শপথ গ্রহণের পরপরই যে চ্যালেঞ্জটি সামনে আসবে, তা হলো মানুষের ইচ্ছার প্রতিফলন—‘জুলাই চার্টার’ বা জুলাই সনদের বাস্তবায়নের প্রশ্ন। একদিকে গণভোটের মাধ্যমে পাস হওয়া জাতীয় সনদ, অন্যদিকে দলের নিজস্ব নির্বাচনী ইশতেহার—এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় সাধনই হবে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের জন্য প্রথম ও সবচেয়ে বড় অগ্নিপরীক্ষা।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে রাষ্ট্র সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, তারই রাজনৈতিক দলিল হলো ‘জুলাই সনদ’। এটি কোনো সাধারণ রাজনৈতিক ঘোষণাপত্র নয়, বরং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সম্পাদিত একটি ঐকমত্যের দলিল, যা পরে গণভোটের মাধ্যমে জনগণের সরাসরি আস্থাও অর্জন করেছে। প্রায় ৭০ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে জনগণ সনদে উল্লিখিত সাংবিধানিক সংস্কার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নির্বাচন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং ক্ষমতার ভারসাম্যসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাদের রায় দিয়েছে। ফলে, জুলাই সনদ এখন আর কেবল একটি রাজনৈতিক দলিলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি জনগণের সরাসরি ম্যান্ডেটে পরিণত হয়েছে, যা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য একটি সামাজিক চুক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

অন্যদিকে, বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে একটি মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। দলটির ইশতেহার পর্যালোচনায় দেখা যায়, জুলাই সনদের অনেক বিষয়ের সঙ্গে তারা একমত হলেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে, বিশেষ করে সংসদের উচ্চকক্ষ গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে তাদের ভিন্ন পরিকল্পনা রয়েছে। এখানেই তৈরি হয়েছে দ্বন্দ্বের মূল কেন্দ্রবিন্দু। প্রশ্ন উঠেছে, নতুন সরকার কি জনগণের গণভোটের রায়কে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করবে, নাকি নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী নিজেদের পরিকল্পনা অনুসারে দেশ পরিচালনা করবে?

এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ বিএনপির জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বিষয়। যদি সরকার গণভোটের রায়কে উপেক্ষা করে নিজেদের ইশতেহারকে অগ্রাধিকার দেয়, তবে তা রাজনৈতিকভাবে একটি বুমেরাং হতে পারে বলে মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক। কারণ, এবারের নির্বাচনে আশানুরূপ ফল না পাওয়া দলগুলো, যেমন জামায়াত বা এনসিপি—রাজপথে নামার সুযোগ খুঁজবে এটাই স্বাভাবিক। তারা ‘গণভোটের রায় অমান্য করা হচ্ছে’—এই যুক্তিকে সামনে এনে সহজেই একটি আন্দোলন তৈরি করার চেষ্টা করতে পারে। গণভোটের মতো একটি সর্বজনীন সিদ্ধান্তকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার যেকোনো প্রচেষ্টা গণতন্ত্রের প্রতি অশ্রদ্ধা হিসেবেই প্রতীয়মান হবে এবং এটি সরকারের জনপ্রিয়তায় দ্রুত ধস নামাতে পারে। এর ফলে দেশ আবারও সংঘাতের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

এই জটিল পরিস্থিতিতে জনগণের দৃষ্টি এখন মূলত তারেক রহমানের দিকে। প্রায় দেড় দশকের বেশি সময় নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে দেশে ফিরে তিনি দলের হাল ধরেছেন এবং তাঁর নেতৃত্বে দল বিপুল বিজয় পেয়েছে। জনগণ তাঁকে আস্থার প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করেছে এবং তাঁর কাছ থেকে একটি নতুন ধারার, সংযত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির প্রত্যাশা করছে। তাঁর সামনে এখন সুযোগ এসেছে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার মাধ্যমে এই সংকট সমাধানের। এই প্রথম চ্যালেঞ্জটি তিনি কীভাবে মোকাবেলা করেন, তার ওপর নির্ভর করছে তারেক রহমানের সরকারের ভবিষ্যৎ গতিপথ।

তারেক রহমান যদি গণভোটের রায়কে সম্মান জানিয়ে দলীয় ইশতেহারের সঙ্গে এর সমন্বয় ঘটাতে পারেন, তবে তা তাঁর নেতৃত্বকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। এটি প্রমাণ করবে যে তাঁর সরকার জনগণের ইচ্ছার প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে দেশ চালাতে আগ্রহী। কিন্তু এই সংকট সমাধানে ব্যর্থ হলে অর্থনীতি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মতো গভীর সমস্যাগুলো মোকাবেলা করার আগেই সরকার রাজনৈতিক বিতর্কের চোরাবালিতে আটকে যাবে।

সুতরাং, নতুন সরকারের সামনে পথ দুটি—হয় গণভোটের রায়কে শিরোধার্য করে জাতীয় ঐকমত্যের পথে হাঁটা, অথবা দলীয় ইশতেহারকে প্রাধান্য দিয়ে রাজনৈতিক ঝুঁকি নেওয়া। প্রথম পথটি সরকারের গণতান্ত্রিক ভিত্তি যেমন সুদৃঢ় করবে, তেমনই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে। দ্বিতীয় পথটি দেশকে ঠেলে দিতে পারে এক নতুন অনিশ্চয়তার দিকে। দেশবাসী আশা করে, নতুন সরকার প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার সঙ্গে প্রথম পথটিই বেছে নেবে এবং জুলাই সনদের আলোকে একটি গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করবে।

লেখক: সংবাদকর্মী

Ad 300x250

সম্পর্কিত