জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

সাক্ষাৎকারে আসিফ মোহাম্মদ শাহান

নতুন সরকারকে প্রমাণ করতে হবে যে তারা মানুষের প্রত্যাশাগুলো শুনতে পাচ্ছে

আসিফ মোহাম্মদ শাহান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক ও নাগরিক কোয়ালিশনের সদস্য। উন্নয়ন, সুশাসন এবং রাষ্ট্রনীতি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ হিসেবে বিশেষভাবে তিনি পরিচিত। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, গণভোট, সংস্কার, জুলাই সনদসহ নানা বিষয়ে ঢাকা স্ট্রিমের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।

স্ট্রিম: আপনার চোখে কেমন ছিল নির্বাচন?

আসিফ মোহাম্মদ শাহান: নির্বাচনটি মোটা দাগে আমার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছে। আমার মনে হয় এ ব্যাপারে খুব একটা সন্দেহ কারোরই নেই। ভোটের সামগ্রিক অবস্থা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ছোটখাটো কিছু অভিযোগ এসেছে। তবে বাংলাদেশে নির্বাচন ব্যবস্থায় অভিযোগ আসাটা খুব একটা অস্বাভাবিক নয়। এর আগে যেসব নির্বাচনকে আমরা গ্রহণযোগ্য মনে করি, সেগুলোতেও এমন ঘটনা ঘটেছে।

এখানে বড় প্রশ্ন হলো—এই অনিয়মগুলো এমন মাত্রায় ঘটেছে কি না, যাতে নির্বাচনের পুরো ফলাফল প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে? আমার কাছে সেরকম কোনো ঘটনা ঘটেছে বলে মনে হয়নি। নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে যেসব বক্তব্য এসেছে, সেগুলো বিশ্লেষণ করলেও এমন কোনো ব্যাপক অনিয়ম চোখে পড়ে না যা ভোটের সামগ্রিক ফলাফল বদলে দিতে পারে। তাই সব মিলিয়ে নির্বাচনটি আমার কাছে বেশ গ্রহণযোগ্যই মনে হয়েছে।

স্ট্রিম: নির্বাচনের ফলাফলকে আপনি কীভাবে বিশ্লেষণ করবেন? দলগুলোর জন্য এই ফল কতটা প্রত্যাশিত ছিল?

আসিফ মোহাম্মদ শাহান: সত্যি বলতে, ফলাফল দেখে আমি কিছুটা অবাক হয়েছি। বিএনপি জিতবে—এটা আমার ধারণা ছিল। আমি ভেবেছিলাম তারা হয়তো ১৫০ থেকে ১৬০, বা সর্বোচ্চ ১৭০টি আসন পেতে পারে। কিন্তু তারা যে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে, এতে আমি কিছুটা বিস্মিত হয়েছি।

জামায়াত যে ধরনের প্রচারণা চালিয়েছিল, তার একটা প্রভাব আমাদের সবার মধ্যেই পড়েছিল। আমরা ভেবেছিলাম জামায়াত হয়তো উল্লেখযোগ্যভাবে বড় কোনো জয়ের দিকে যাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে সেটা ঘটেনি। বিভিন্ন জরিপে আমরা যে ‘আনডিসাইডেড’ বা সিদ্ধান্তহীন ভোটারদের সংখ্যা দেখেছিলাম, মনে হচ্ছে তাদের একটা বড় অংশ শেষ পর্যন্ত ভোট দিতে আসেনি, অথবা যারা এসেছে তাদের বড় অংশ বিএনপির দিকেই ঝুঁকেছে।

আমি মূলত জয়ের ব্যবধান দেখে অবাক হয়েছি, এত বড় ব্যবধান আমি আশা করিনি। তবে সামগ্রিক ফলাফলে আমি খুব একটা অবাক হইনি, ফলাফল এমনই হওয়ার কথা ছিল। আমার ধারণা ছিল জামায়াত হয়তো ১০০ বা তার বেশি আসন পাবে, সেই জায়গাটিতেই মূলত আমার হিসাব মেলেনি।

স্ট্রিম: এই নির্বাচন আমাদের জন্য কী বার্তা বহন করে?

আসিফ মোহাম্মদ শাহান: এই নির্বাচনটি আমাদের খুব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা দরকার, কারণ এটি অনেকগুলো বার্তা দিচ্ছে। শুধুমাত্র সংখ্যার বিচারে মনে হতে পারে যে বিএনপির জন্য এটি খুব সহজ একটি জয় ছিল। তবে আমি বিএনপিকে বিশেষ একটি সতর্কবার্তা দিতে চাই। বিএনপি যদি আত্মতুষ্টিতে ভোগে যে তারা দুই-তৃতীয়াংশ বা ২১২টির মতো আসন পেয়েছে এবং তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে—তবে বিষয়টি ভুল হবে।

আমরা অনেক আগে থেকেই বলছিলাম যে তিনটি বিভাগে জামায়াতের অবস্থান খুব শক্তিশালী—রংপুর, রাজশাহী এবং খুলনা। জামায়াত যখন ২২৪টি আসনে মনোনয়ন দিয়েছিল, তখন এই তিনটি বিভাগে তাদের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ দেখা গিয়েছিল এবং নির্বাচনেও তারা সেখানে অত্যন্ত ভালো ফল করেছে। গাইবান্ধা ও সাতক্ষীরায় তারা চারের মধ্যে চারটি এবং রংপুরে ছয়ের মধ্যে ছয়টি আসন পেয়েছে (শাপলাকলি প্রতীককে ধরে)। রংপুরে জাতীয় পার্টির যে অবস্থান ছিল, জামায়াত সেটা পুরোপুরি দখল করে নিয়েছে এবং সেখানে তারা উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী হয়েছে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা যে উত্তরবঙ্গে জামায়াতের ভোট ও জয়ের সম্ভাবনা—উভয়ই বেড়েছে।

স্ট্রিম: এবারের নির্বাচনে ঢাকা সিটির ফলাফল নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে। এ বিষয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ জানতে চাই?

আসিফ মোহাম্মদ শাহান: ঢাকা নিয়ে বিএনপির সত্যিই ভাবা উচিত। বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে কখনো এমন হয়নি যে, সরকার গঠনকারী দল ঢাকা মহানগরের সব আসন পায়নি। সম্ভবত ’৯৬ সালই একমাত্র ব্যতিক্রম, যেখানে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলেও ঢাকার সাতটি আসন জিততে পারেনি (সেবার সাদেক হোসেন খোকা জিতেছিলেন)। এছাড়া সবসময় ক্ষমতাসীন দলই ঢাকার সব আসন জিতেছে।

কিন্তু এবার চিত্রটি ভিন্ন। ঢাকা মহানগরের ১৫টি আসনের মধ্যে সম্ভবত ৮টি বিএনপি এবং ৭টি জামায়াত পেয়েছে। মিরপুরের পুরো অংশটাই জামায়াতের নিয়ন্ত্রণে। ভোটের ব্যবধানের দিকে তাকালেও বিষয়টি স্পষ্ট হয়। ঢাকা-৮ আসনে ভোটের ব্যবধান মাত্র ৫ হাজারের মতো। তারেক রহমান তার নিজের আসনে খুব অল্প ব্যবধানে জিতেছেন। উত্তরার দিকেও শাপলাকলির অপেক্ষাকৃত অপরিচিত প্রার্থীরা যে পরিমাণ ভোট পেয়েছেন এবং এনসিপি-র ভোট মূলত জামায়াতেরই ভোট। অর্থাৎ, ঢাকায় জামায়াত শক্তি অর্জন করছে।

স্ট্রিম: নির্বাচনের ফলাফলে কি কোনো অসামঞ্জস্য বা বিশেষত্ব আপনার চোখে পড়েছে?

আসিফ মোহাম্মদ শাহান: ২১৪টি আসন দেখে মনে হতে পারে বিএনপি বিশাল ব্যবধানে জিতেছে, কিন্তু নির্বাচনটি আমার কাছে কিছুটা অদ্ভুত মনে হয়েছে। যেমন, পঞ্চগড়ের মতো জায়গায় জমিরউদ্দিন সরকারের আসনে জিততে নওশাদ জমিরকে বেশ কষ্ট করতে হয়েছে; মাত্র ৮ হাজার ভোটের ব্যবধানে তিনি জিতেছেন। যে নির্বাচনে বিএনপি একচেটিয়া জিতেছে, সেখানে দলের বড় প্রার্থীর এমন ফলাফল প্রত্যাশিত নয়। ঢাকায় এমন ফলাফলও প্রত্যাশিত ছিল না। এই ভোটগুলো সামান্য এদিক-সেদিক হলেই ফলাফল অন্যরকম হতে পারত।

আবার জামায়াত খুব ভালো করেছে, সেটাও পুরোপুরি বলা যাচ্ছে না। খুলনায় জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার তার নিজের আসন থেকে জিতে আসতে পারেননি। এটি প্রমাণ করে না যে দল হিসেবে তারা অসম্ভব ভালো করেছে। অনেকেই বলছেন ‘জুলাই বিপ্লব’-এর কারণে এমন ফলাফল হয়েছে। কিন্তু যদি জুলাই-ই একমাত্র ফ্যাক্টর হতো, তবে চট্টগ্রাম, রাজশাহী বা খুলনা সিটিতেও জামায়াতের ভালো করার কথা ছিল, যা হয়নি। চট্টগ্রাম সিটিতে বিএনপি ভালো করেছে। তাই আমার মনে হয়, এখানে স্থানীয় প্রভাবকগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ আসলে কী কারণে ভোট দেয় এবং ভবিষ্যতে এই ডাইনামিক্স বা সমীকরণ কেমন হবে, তা নিয়ে আমাদের আরও আলোচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করি।

স্ট্রিম: আঞ্চলিক এবং শ্রেণিভেদে ভোটের সমীকরণটা কেমন ছিল? আপনার পর্যবেক্ষণ কী বলে?

আসিফ মোহাম্মদ শাহান: দেখুন, নোয়াখালীর মতো জায়গা, যা বিএনপির অত্যন্ত শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত, সেখানেও জামায়াতের ভোট উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। নোয়াখালী-২ আসনে এনসিপির প্রার্থী খুব পরিচিত না হয়েও মাত্র ১৭ থেকে ২০ হাজার ভোটের ব্যবধানে হেরেছেন। নোয়াখালী-৬ এ হান্নান মাসুদ জয়ী হয়েছেন।

আবার উল্টো চিত্রও আছে। ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের সব আসন বিএনপি পেয়েছে। বরিশালের অধিকাংশ আসনও তাদের। সাধারণত ধরা হয়, এসব এলাকায় অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া বা স্বল্পশিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বেশি। তারা কিন্তু বিএনপির দিকেই গেছে, জামায়াতের দিকে নয়। তাই বলা যাবে না যে, শুধু এলিটরা বিএনপিকে ভোট দিয়েছে বা নির্দিষ্ট কোনো শ্রেণি জামায়াতকে ভোট দিয়েছে। ঢাকায় অনেক এলিট ভোট আবার জামায়াতের বাক্সে গেছে। অর্থাৎ, কৃষিপ্রধান এলাকায় জামায়াত ভালো করেছে—এমন সরলীকরণও পুরোপুরি খাটে না। কারণ ময়মনসিংহের ফলাফল একরকম, আবার উত্তরবঙ্গের ফলাফল আরেকরকম।

আসল চিত্র বুঝতে আমাদের আরও তথ্যের প্রয়োজন। বিশেষ করে নারী ও পুরুষের ভোটের পার্থক্যটা জানা খুব জরুরি। এবার যেহেতু নারী ও পুরুষ কেন্দ্র আলাদা ছিল, তাই নির্বাচন কমিশন চাইলেই কেন্দ্রভিত্তিক এই তথ্য দিতে পারে। এটা পাওয়া গেলে বোঝা যেত নারীদের ভোটের বড় অংশ কোন দিকে গেছে। গবেষক হিসেবে আমাদের জন্য এবং রাজনৈতিক দলগুলোর জন্যও এই তথ্য অত্যন্ত উপকারী হবে।

স্ট্রিম: আওয়ামী লীগ ইস্যু এখনও ঝুলে থাকায় ভবিষ্যতে কী সমস্যা তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন?

আসিফ মোহাম্মদ শাহান: বিষয়টি মূলত দুটি জায়গায় সমস্যা তৈরি করতে পারে। আমার কাছে এটি অনেকটা রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের ব্যাপার মনে হয়। মোটা দাগে আমার মনে হয়, শেখ হাসিনাকে নেতৃত্বে রেখে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফিরে আসাটা অত্যন্ত কঠিন—খুবই কঠিন। প্রশ্ন হলো, আওয়ামী লীগ কি নিজেদের শুধরে নেবে? তার চেয়েও বড় কথা, সব রাজনৈতিক দলই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে তারা একটি 'ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন' বা 'ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন' গঠন করবে। এখন তারা সেটা করতে চাইবে কি না, বা শেষ পর্যন্ত করবে কি না—সেটা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

আরেকটি বিষয় যা আমি বিএনপির জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছি—ভোটের হিসাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আওয়ামী লীগের বেশ কিছু ভোট এবার পড়েছে। যদিও বলা হচ্ছে কাস্টিং ৬০%, তার মানে এই নয় যে আওয়ামী লীগের প্রচুর ভোটার কেন্দ্রে এসেছেন। তবুও যেটুকু এসেছেন, প্রতি কেন্দ্রে যদি ১৫০০-২০০০ ভোটও হয়, তবে রেজাল্ট নির্ধারণে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। এখন পর্যন্ত যা মনে হচ্ছে, এই ভোটের একটা অংশ আসলে বিএনপির বাক্সে গেছে। তা না হলে সুনামগঞ্জ-২ এর মতো জায়গায় নাসের চৌধুরীর এত সহজে জিতে আসা কিংবা খুলনা-৫ এ লবি সাহেবের ২০০০ ভোটে জেতা—এগুলো আসলে সম্ভব হওয়ার কথা ছিল না।

এখন বিএনপির চ্যালেঞ্জ হলো—আমি যদি রাজনীতিতে আওয়ামী লীগকে সুযোগ দিই, তবে এই ভোটগুলো আবার আওয়ামী লীগে ফেরত যাবে। অথচ আগামী নির্বাচনে আমার তো এই ভোটগুলো দরকার হতে পারে। আর যদি সুযোগ না দিই, তবে এই ভোটারদের কোনো না কোনোভাবে আমার দলের মধ্যে জায়গা দিতে হবে। আমি যদি আওয়ামী লীগকে সুযোগ দিই, ভোট হারাব; আর সুযোগ না দিলে এই ভোটাররা কীভাবে আমার দিকে আসতে পারে তা নিশ্চিত করতে হবে। তাই আপনি ঠিকই বলেছেন, আওয়ামী লীগ ইস্যুটিকে অ্যাড্রেস করা কিছুটা চ্যালেঞ্জিং। তবে এর মানে এই নয় যে, এতে আওয়ামী লীগের জন্য রাজনীতির দুয়ার খুব সহজে খুলে যাচ্ছে। এখানে অনেকগুলো সমীকরণের ব্যাপার আছে এবং আমি নিশ্চিত বিএনপি সেসব হিসাব-নিকাশ করেই এগোবে।

স্ট্রিম: পূর্বে জামায়াতের পক্ষে কখনও এত ভোট দেখা যায়নি, এখন তারা এত ভোট পেল কীভাবে? আপনার কী মনে হয়?

আসিফ মোহাম্মদ শাহান: জামায়াতের ভোট ২ থেকে ৩ শতাংশ ছিল—এই ধারণাটি আসলে ঠিক নয়। আমরা সাধারণত ২০০১ বা ২০০৮ সালের নির্বাচনের ওপর ভিত্তি করে এই কথা বলি। কিন্তু মনে রাখতে হবে, তখন জামায়াত জোটের অংশ ছিল। ফলে জামায়াতের প্রচুর ভোট বিএনপিতে এবং বিএনপির ভোট জামায়াতে গিয়েছিল। আপনি যদি তাদের একক নির্বাচন দেখেন, ১৯৯১ সালে জামায়াত প্রায় ১২% ভোট পেয়েছিল। তখনও তারা ৩০০ আসনে প্রার্থী দেয়নি, সম্ভবত ২২০টির মতো আসনে ছিল। ১৯৯৬ সালে তারা ৩০০ আসনে একবারই নির্বাচন করে প্রায় ৮% ভোট পায়। অর্থাৎ, এই ৮ থেকে ১৩-১৪ শতাংশ জামায়াতের একটি নিজস্ব বা 'বেস ভোট' ছিল।

এখন সেটা বেড়েছে। তবে আমার কাছে মনে হয়, এই বৃদ্ধির মূল কারণ জামায়াতের প্রতি মানুষের ভালোবাসা বা তাদের আদর্শের প্রতি টান নয়; বরং এটি বিএনপির ওপর মানুষের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। গত ১৬-১৭ মাসে বিএনপির কর্মকাণ্ড অনেক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে এবং জামায়াত সেটাকে কাজে লাগিয়েছে। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে—চাঁদাবাজি, অভ্যন্তরীণ কোন্দল, মারামারি বা মৃত্যুর ঘটনা—সব মিলিয়ে বিএনপির সামগ্রিক ভাবমূর্তি মানুষের কাছে খুব একটা ইতিবাচক ছিল না। ফলে বিএনপির যে বেস ভোট বা সুইং ভোটাররা বিএনপিকে ভোট দেওয়ার কথা ভাবছিল, তাদের একটি অংশ জামায়াতের দিকে চলে গেছে।

জামায়াতের আগের সেই ১৪-১৫ শতাংশ ভোট হয়তো গত ১৭-১৮ বছরে স্বাভাবিকভাবেই বেড়েছে, তার সাথে এই ভোটগুলো যুক্ত হয়ে এখন তা ৩০ শতাংশের কাছাকাছি দাঁড়িয়েছে বলে মনে হচ্ছে। এটি আরও বাড়তে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত আমার মনে হয়েছে, যারা জামায়াতের দিকে যেতে চেয়েছিল, তাদের একটি অংশ আবার বিএনপির দিকেই ফিরে এসেছে। কারণ তারা হয়তো জামায়াতের নেতৃত্ব এবং তাদের পরিকল্পনা বা পলিসি নিয়ে পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারেনি। পাশাপাশি, আওয়ামী লীগের যে ভোটাররা ভোট দিতে এসেছেন—সংখ্যায় যত কমই হোক—তারাও বিএনপির জয়ের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

স্ট্রিম: গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করা বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ—এই বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখছেন?

আসিফ মোহাম্মদ শাহান: মূলত গণভোট বা রেফারেন্ডামের বিষয়বস্তু ছিল ৪৭টি সাংবিধানিক সংশোধনী। এগুলোকে আবার চার ভাগে ভাগ করা হয়েছে: ১. তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও সাংবিধানিক পদ, ২. উচ্চকক্ষ, ৩. যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে, এবং ৪. যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হয়নি (যা দলগুলো তাদের নিজস্ব ইশতেহার অনুযায়ী করবে)। আমার মনে হয়, মূল ঝামেলাটা তৈরি হবে উচ্চকক্ষ বা আপার চেম্বার নিয়ে।

কারণ, রেফারেন্ডামের প্রশ্নের গঠন বা ফ্রেমিংটা খুব চমৎকার। আপনি যদি ১ নম্বর প্রশ্নটি দেখেন, সেখানে বলা আছে—তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও সাংবিধানিক পদগুলোর নিয়োগ ‘জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ায়’ করা হবে। এখন ‘জুলাই সনদ’ কী? ‘জুলাই চার্টার ইমপ্লিমেন্টেশন অর্ডার’-এ এর সংজ্ঞা দেওয়া আছে। সেখানে বলা আছে, ১৭ অক্টোবর বা যে তারিখে সকল রাজনৈতিক দল স্বাক্ষর করেছে, সেটিই জুলাই সনদ। বিএনপি সহজেই ওই দলিল দেখিয়ে বলতে পারে, ‘দেখুন, আমরা যেটাতে স্বাক্ষর করেছি, সেখানে আমাদের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ (দ্বিমত) ছিল। যেহেতু আপনারা জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার কথা বলছেন, তার মানে আপনারা আমাকে আমার দ্বিমত ব্যবহারের সুযোগ দিচ্ছেন।’ ১ নম্বর প্রশ্নের ক্ষেত্রে বিএনপি এই যুক্তি ব্যবহার করতে পারে। ৩ এবং ৪ নম্বর প্রশ্নেও ‘জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়া’র কথা বলা আছে।

কিন্তু সমস্যা হলো ২ নম্বর প্রশ্ন নিয়ে। এটিই একমাত্র প্রশ্ন যেখানে কোনো ফাঁকফোকর বা ‘লুপহোল’ নেই। সেখানে ‘জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়া’র কথা বলা নেই। বরং স্পষ্টভাবে বলা আছে—‘একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে, সেখানে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব থাকবে এবং সংবিধান সংশোধনীর জন্য উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত লাগবে।’ এখানে জুলাই সনদের কোনো উল্লেখ নেই। তার মানে, এটি যদি পাস হয়, তবে বিএনপি এটি নিয়ে কোনো ভিন্নমত পোষণ করতে পারবে না।

যেসব বিষয়ে বিএনপি একমত হয়েছে (যেমন প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদকাল ইত্যাদি) বা যেগুলো তাদের ইশতেহার অনুযায়ী করতে চায়, তাতে সমস্যা নেই। কিন্তু ২ নম্বর প্রশ্নের ক্ষেত্রে বিএনপি যদি বলে ‘আমরা এটি মানব না’, তবে বড় ধরনের সংকট তৈরি হবে। বিএনপি বলতে পারে, ‘আমরা দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে এসেছি, তাই আমরা আমাদের মতো করব।’ কিন্তু যেহেতু এটি ‘গণপরিষদ’ এবং গণভোটের মাধ্যমে জনগণ সরাসরি রায় দিয়েছে, তাই বিএনপি চাইলেই রেফারেন্ডামের ফলাফলের অর্ধেক মানবে আর অর্ধেক মানবে না—এটা হতে পারে না। আগামীকাল যখন এমপিরা শপথ নেবেন (শোনা যাচ্ছে দুটি শপথ হবে), তখন শপথ নেওয়া মানেই রেফারেন্ডামের রায় মেনে নেওয়া। এরপর যদি তারা উচ্চকক্ষ না মানার কথা বলে, তবে জনগণের সার্বভৌমত্ব বা ‘পিপলস উইল’ নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।

বিএনপিকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—তারা কি ঝামেলা বাড়াতে চায়, নাকি দ্রুত এই বিষয়টির সুরাহা করে মূল কাজে মন দিতে চায়? এই বিতর্কে সময় ও সম্পদ ব্যয় করে জিতে এলেও, তার যে চড়া মূল্য দিতে হবে, তা পরে সামলানো কঠিন হবে। অর্থনৈতিক নীতি বা মানুষের আস্থা অর্জনের মতো জরুরি কাজগুলো বাধাগ্রস্ত হবে।

আরেকটি মজার বিষয় হলো, বিএনপি হয়তো হিসাবটি খেয়াল করছে না—উচ্চকক্ষ মেনে নিলে তাদের হারানোর কিছু নেই। ভোটের হিসাব দেখলে বোঝা যায়, সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে বিএনপি অনায়াসেই ৫০% আসন পাবে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সাধারণত দেখা যায়, এক মেয়াদের পর ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি হয়, ফলে পরের নির্বাচনে জেতা কঠিন হয়। বিএনপিকে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবা উচিত। বিএনপি যদি উচ্চকক্ষ মেনে নেয় এবং ভবিষ্যতে কোনো নির্বাচনে হেরেও যায়—ধরুন লোয়ার হাউসে তারা মাত্র ৪০-৭০টি আসন পেল—তবুও তাদের আগের ভোটের হারের কারণে উচ্চকক্ষে ১০০টি আসনের মধ্যে তাদের হাতে ৪০টির মতো বা তার বেশি আসন থাকবে। এই আসনগুলো তাদের সুরক্ষা দেবে। ভবিষ্যতে যদি অন্য কোনো দল (যেমন জামায়াত) ক্ষমতায় এসে সংবিধান বা আইন পরিবর্তন করতে চায়, তবে উচ্চকক্ষের এই ৪০-৪৫টি আসন বিএনপিকে রক্ষা করবে। তাই আমি বুদ্ধিমান হলে, যেহেতু আমার আবারও সুযোগ আছে, আমি এই সুযোগ কাজে লাগাতাম। যা নিয়ে ইতিমধ্যে সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে এবং যাতে আমার কোনো ক্ষতি নেই, তা নিয়ে কেন আমি সময় ও শক্তি নষ্ট করব? তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজে জোর দেওয়াই শ্রেয়।

স্ট্রিম: নতুন সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা এবং আচরণ কেমন হতে পারে?

আসিফ মোহাম্মদ শাহান: জনগণের আচরণ কেমন হওয়া উচিত আর কেমন হবে—সেটি ভিন্ন বিষয়। এখন মানুষের প্রত্যাশা বা এক্সপেকটেশন অনেক বেশি। এই সরকারের কাছে মানুষ অনেক কিছু আশা করবে। আর এখানেই বিপদ। সরকারকে প্রমাণ করতে হবে যে তারা এই প্রত্যাশাগুলো শুনতে পাচ্ছে এবং তাদের কাজে তার প্রতিফলন আছে। অতিরিক্ত প্রত্যাশার বিপদ হলো, আপনি যখন ডেলিভার করতে পারবেন না, তখন জনপ্রিয়তা খুব দ্রুত পড়ে যায়।

একটি উদাহরণ দিই। ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যখন এলো, আমরা বিআইজিডি থেকে একটি জরিপ করেছিলাম। তখন প্রায় ৭০% মানুষ মনে করত দেশ সঠিক পথে আছে এবং তারা চাইছিল সরকার সংস্কারের জন্য যতদিন দরকার থাকুক। মাত্র তিন মাসের মধ্যে এই ৭০% সমর্থন নেমে এলো ৪০%-এ। একটি বড় অংশ বলতে শুরু করল—‘না না, তাড়াতাড়ি নির্বাচন দরকার।’ কারণ মানুষ অনিশ্চয়তা বা আনসার্টেইনিটি খুব ভয় পায়। তাদের কাছে সংস্কারের স্বপ্নের চেয়ে বাস্তবতা বড় হয়ে দাঁড়ায়।

তাই সরকারের প্রতি মানুষের বড় আশা থাকবে, কিন্তু সরকারকে তা দ্রুত অ্যাড্রেস করতে হবে। এর উপায় কী? উপায় হলো জনগণের অংশগ্রহণ বাড়ানো। আমার মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন অতি দ্রুত দেওয়া দরকার। নির্বাচনের পর স্থানীয় সরকার বা ইউনিয়ন পরিষদ লেভেলে এবং আমলাতন্ত্রের কাছে জনগণ যাতে জবাবদিহিতা চাইতে পারে, সেই চ্যানেলগুলো তৈরি করতে হবে। বিএনপির ৩১ দফায় সম্ভবত একটি ‘স্থানীয় সরকার কমিশন’ গঠনের কথা ছিল। সেটি হলে সেই কমিশন কীভাবে দৈনন্দিন শাসনে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবে, তা দেখতে হবে। জনগণকে যত দূরে সরিয়ে রাখা হবে, তারা তত বেশি ক্ষিপ্ত হবে। এর মধ্যে যদি কোনো আন্দোলন হয়, তবে তার প্রভাব হবে ভয়াবহ। আর যদি তা নাও হয়, পাঁচ বছর পরের নির্বাচনে এর অত্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাই ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনই ভাবা উচিত।

স্ট্রিম: নতুন সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করতে চলেছে। তাদের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তো আপনার দৃষ্টিতে তাদের জন্য উল্লেখযোগ্য ৫টি চ্যালেঞ্জ কী হতে পারে?

আসিফ মোহাম্মদ শাহান: প্রথম চ্যালেঞ্জটি সরকার গঠনের পরপরই সামনে আসবে, আর তা হলো ‘জুলাই চার্টার’ বা জুলাই সনদ সম্পর্কিত বিষয়। যেহেতু গণভোট (রেফারেন্ডাম) পাস হয়েছে, তাই আমরা এমন একটি সংসদ পেতে যাচ্ছি যার দ্বৈত ভূমিকা থাকবে। এটি একই সঙ্গে সীমিত ক্ষমতার ‘গণপরিষদ’ এবং সাধারণ সংসদ হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। গণভোট পাস হওয়ার অর্থ হলো, জনগণ কিছু বিষয়ে স্পষ্ট রায় দিয়েছে। কিন্তু বিএনপির ইশতেহার পর্যালোচনায় দেখা যায়, তারা জুলাই চার্টারের কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে, বিশেষ করে উচ্চকক্ষ গঠনের প্রক্রিয়ার বিষয়ে পুরোপুরি একমত নয়।

এখন প্রশ্ন হলো, বিএনপি কি গণভোটের রায় মেনে নেবে, নাকি নিজেদের ইশতেহার অনুযায়ী দেশ চালাবে? বিএনপি যদি গণভোটের রায় উপেক্ষা করে, তবে তা তাদের জন্য বুমেরাং হতে পারে। কারণ জামায়াত বা এনসিপির মতো দলগুলো নির্বাচনী ফলাফলে খুব একটা সন্তুষ্ট নয় এবং তারা রাজপথে আন্দোলনের সুযোগ খুঁজছে। গণভোট পাস হওয়ায় এখন আর দ্বিমত পোষণের সুযোগ নেই—এমন যুক্তি দেখিয়ে তারা যদি সংঘাতে যায়, তবে আমাদের রাজনীতি বড় সংকটে পড়বে। তারেক রহমানকে আস্থার প্রতীক ভেবে মানুষ ভোট দিয়েছে, এখন তিনি যদি এই রাজনৈতিক সংকট দ্রুত সমাধান না করতে পারেন, তবে অর্থনীতি, কর্মসংস্থান বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মতো গভীর সমস্যাগুলো সমাধানের সময় পাবেন না।

দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জটি হলো অগ্রাধিকার নির্ধারণ ও ইশতেহার বাস্তবায়ন। কর্মসংস্থান নাকি সামাজিক নিরাপত্তা—কোনটিতে সরকার শুরুতে জোর দেবে, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন। ইশতেহারে এক লাইনে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বা অন্য সুবিধার কথা বলা সহজ, কিন্তু এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া জটিল। বাংলাদেশে একটি জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল রয়েছে। নতুন সরকার কি তাতে পরিবর্তন আনবে? যদি লাখ লাখ পরিবারকে কার্ড দেওয়া হয়, তবে অন্যান্য নিরাপত্তা কর্মসূচির সঙ্গে তা সমন্বয় করা এবং বাজেট নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর ‘এক্সক্লুশন এরর’ (যোগ্যরা বাদ পড়া) এবং ‘ইনক্লুশন এরর’ (অযোগ্যদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া) দূর করা। অতীতে ডিজিটাল পদ্ধতি বা সরাসরি মানবিক যোগাযোগ—কোনোটিই রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করতে পারেনি। এই পরিকল্পনাটি সঠিকভাবে ডিজাইন করা এখন অত্যন্ত জরুরি।

তৃতীয় চ্যালেঞ্জ হলো আমলাতন্ত্র। আমলাতন্ত্রকে সঠিকভাবে বুঝতে না পারলে এবং তাদের কাজে লাগাতে না পারলে কোনো প্রতিশ্রুতিই বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। গত ১৭ বছরে আওয়ামী লীগ আমলাতন্ত্রের বড় ক্ষতি করেছে। তারা শুরুতে আমলাতন্ত্রকে রাজনীতিকরণ করেছে এবং পরে তাদের ওপর এতটাই নির্ভর করেছে যে, আমলাতন্ত্র সব ধরনের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও এই সমস্যার সমাধান করতে পারেনি; বরং পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।

চতুর্থ চ্যালেঞ্জটি কিছুটা সরকারের এবং কিছুটা সুশীল সমাজের। সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কাঠামোতে সুশীল সমাজের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। গত ১৬ বছরে সুশীল সমাজের বড় একটি অংশ স্বেচ্ছায় বা বাধ্য হয়ে বিগত সরকারের তল্পিবাহকে পরিণত হয়েছিল। ফলে তারা মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে যথাযথ প্রতিবাদ করতে পারেনি। এখন সুশীল সমাজ যাতে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, সে জন্য আইনি বাধাগুলো সরকারকে দূর করতে হবে। একইসঙ্গে সুশীল সমাজকেও শিক্ষা নিতে হবে। নতুন সরকার যখন কোনো অপ্রিয় বা অন্যায় সিদ্ধান্ত নেবে, তখন তারা কি অন্ধ সমর্থন দেবে, নাকি প্রতিবাদ করবে—সেটাই তাদের জন্য বড় পরীক্ষা। তারা যদি পুনরায় ভুল করে, তবে তাদের আর কোনো গ্রহণযোগ্যতা থাকবে না।

পঞ্চম চ্যালেঞ্জ হলো স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা। স্থানীয় সরকারে জনগণের অংশগ্রহণের পথগুলো বর্তমানে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। শুধু নির্বাচন অনুষ্ঠানই যথেষ্ট নয়; ওয়ার্ড সভা, উন্মুক্ত বাজেট বৈঠকের মতো জনগণের অংশগ্রহণের চ্যানেলগুলো পুনরায় চালু করতে হবে। আমরা যেহেতু সাংবিধানিক পরিবর্তনের কথা বলছি, তাই দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে জনগণের সংযোগ ঘটাতে হবে। স্থানীয় সরকার হতে পারে সেই সংযোগের মাধ্যম। এই সংযোগ তৈরি করতে না পারলে সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।

স্ট্রিম: আমলাতন্ত্রের রাজনীতিকরণ থেকে কি বিএনপির বেরিয়ে আসা উচিত?

আসিফ মোহাম্মদ শাহান: আমলাতন্ত্রের রাজনীতিকরণ বা পলিটিসাইজেশন অত্যন্ত সমস্যাপূর্ণ একটি বিষয়। আপনি যত বেশি দলীয়করণ করবেন, আমলাতন্ত্র তত বেশি ‘জি হুজুর’ সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে যাবে। আমাদের একটি ভুল ধারণা আছে যে, আমলাতন্ত্রের কাজ শুধু পলিসি বাস্তবায়ন করা, এছাড়া তাদের কোনো ভূমিকা নেই। এটি সত্য নয়। আমলাতন্ত্রের কাছে প্রত্যাশা হলো—রাজনীতিবিদরা সব পলিসি বা প্রক্রিয়া না-ও জানতে পারেন। কোনো পলিসি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে যদি দেখা যায় তা জনস্বার্থবিরোধী বা বিদ্যমান আইনের লঙ্ঘন, তখন আমলাতন্ত্রের দায়িত্ব হলো তা ধরিয়ে দেওয়া। একে আমরা বলি ‘ক্ষমতার সামনে সত্য বলা’ ।

কিন্তু আপনি যখন দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ দেবেন, তখন আমলারা ভয়ে সেই সত্যটি বলবে না। রাজনীতিকরণ তিনটি ক্ষতি করে: ১. আমলাতন্ত্রে অসুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হয়—কে কার চেয়ে বেশি অনুগত হতে পারে, ২. মেধাভিত্তিক নিয়োগ বা মেরিটোক্রেসির কোনো গুরুত্ব থাকে না, এবং ৩. সরকার সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আমলাদের গুরুত্বপূর্ণ মতামত বা সমালোচনা থেকে বঞ্চিত হয়।

আপনাকে আমলাতন্ত্রের দক্ষতা বা এক্সপার্টাইজ ব্যবহার করতে জানতে হবে। তবে এটাও নিশ্চিত করতে হবে যেন আমলাতন্ত্র অতিমাত্রায় শক্তিশালী হয়ে না যায়, যেখানে মন্ত্রী আমলাদের দ্বারা চালিত হচ্ছেন এবং জনগণের চাওয়া-পাওয়ার খবর মন্ত্রীর কাছে পৌঁছাচ্ছেই না। একটু আগে যে জনগণের অংশগ্রহণের কথা বললাম, সেই চ্যানেলের পাশাপাশি আমলাতন্ত্রের জ্ঞান ব্যবহারের প্রক্রিয়াটিও জানতে হবে।

রাজনীতিকরণ কোনো সমাধান নয়। আমরা এর আগে অনেকবার চেষ্টা করেছি। ’৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এসে চেষ্টা করেছে, ’৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ‘জনতার মঞ্চ’ দিয়ে চেষ্টা করেছে, ২০০১-এর পর বিএনপি আবারও চেষ্টা করেছে। প্রতিবারই এটি বুমেরাং হয়েছে। তাই আমাদের দুটি কাজ করতে হবে: এক. আমলাতন্ত্র ও পুলিশকে রাজনীতিকরণ থেকে রক্ষা করা, এবং দুই. রক্ষা করতে গিয়ে তারা যেন আবার জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে উঠে বেশি শক্তিশালী না হয়ে যায়, সেই ভারসাম্য বা ব্যালেন্স বজায় রাখা। এটি করতে না পারলে আমরা গভীর সংকটে পড়ব।

স্ট্রিম: নতুন সরকারের জন্য আপনার পরামর্শ কী?

আসিফ মোহাম্মদ শাহান: আমার পরামর্শ হলো—গণপরিষদ বা কন্টিটিউয়েন্ট অ্যাসেম্বলি সংক্রান্ত বিষয়টি অতি দ্রুত সুরাহা করুন। এতে বেশি সময় নষ্ট করবেন না। ভাবুন, আপনার উপযোগিতা বা ইউটিলিটি কোথায় বেশি। এটি ইগো বা অহংকারের প্রশ্ন নয়। ‘আমি আগে এটা বলেছি, তাই আমাকে ওটাতেই অটল থাকতে হবে’—বিষয়টি এমন নয়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে কোনটি আপনার জন্য বেশি উপকারী এবং কোনটি ভবিষ্যতে সুফল বয়ে আনবে, সেই হিসাবটি করুন।

এটি আপনাদের জন্য একটি সুযোগ। আপনাদের বারবার বলা হচ্ছে যে আপনারা সংস্কারবিরোধী। আপনারা এই সুযোগে প্রমাণ করতে পারেন যে, আপনারাই সবচেয়ে বেশি সংস্কারমনা সরকার বা দল। এবং এটি করার জন্য আপনাদের কার্যত কিছুই হারাতে হচ্ছে না। তাই আমার পরামর্শ—শুরুতেই হোঁচট খাবেন না, ভুল করবেন না। এই বিষয়টি যত দ্রুত সমাধান করতে পারবেন, তত তাড়াতাড়ি আপনারা আপনাদের অগ্রাধিকার বা প্রায়োরিটি ইস্যুগুলোতে ফোকাস করতে পারবেন।

সর্বাধিক পঠিত
এই মুহূর্তে
Ad 300x250

সম্পর্কিত