leadT1ad

২০২৬ সালের বিশ্বরাজনীতি, যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবে কতটা বদলে যাবে পৃথিবী

ব্রেট ম্যাকগার্ক
ব্রেট ম্যাকগার্ক

স্ট্রিম গ্রাফিক

ঠিক এক বছর আগে এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ছিলেন জো বাইডেন। আমি তখন কাতারের দোহায় ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ও জিম্মি মুক্তি চুক্তি চূড়ান্ত করার আলোচনায় ব্যস্ত ছিলাম। ট্রাম্পের দল তখন ক্ষমতা গ্রহণের অপেক্ষায় ছিল। জিম্মিদের মুক্ত করতে ও যুদ্ধ থামাতে তারা আমাদের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছিল। সাধারণত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দলমতের ঊর্ধ্বে ওঠে এমন সহযোগিতা দেখা যায় না। মনে হচ্ছে যেন এই ঘটনার পর এক দশক কেটে গেছে। আসলে এক বছরেই যে অনেক কিছু বদলে যেতে পারে, ২০২৫ সাল তা প্রমাণ করে দিয়েছে।

কিউবান মিসাইল সংকটের পর ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল বাহিনী অবস্থান করছে। ইউক্রেন যুদ্ধবিরতির নতুন প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার জন্য রুশ প্রতিনিধিরা মিয়ামিতে এসেছেন। অথচ ওদিকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যুদ্ধের তীব্রতা বাড়িয়েই চলেছেন। গত গ্রীষ্মে ইরানে বোমা হামলা হয়েছিল। এরপর গাজায় যুদ্ধবিরতি তদারকির জন্য যুক্তরাষ্ট্র বিশেষ পদক্ষেপ নিয়েছে। তারা ইসরায়েলে একজন থ্রি-স্টার জেনারেলকে নিযুক্ত করেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বেইজিংয়ে একটি শীর্ষ সম্মেলনের পরিকল্পনা করছেন। এই সম্মেলন তাইওয়ানের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে। পাশাপাশি উন্নত প্রযুক্তি ও এআই-এর ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতার ভবিষ্যৎও ঠিক করে দিতে পারে।

গত বছরকে কেবল ক্ষমতার পালাবদলের বছর না বলে বরং রূপান্তরমূলক বছর বলেই বেশি মনে হচ্ছে। ২০২৬ সাল এখন বিশ্ব রাজনীতির এজেন্ডায় বহুবিধ বাঁক বদলের মুহূর্ত নিয়ে সন্ধিক্ষণের বছর হিসেবে রূপ নিচ্ছে। আসুন বিষয়গুলো বিস্তারিত দেখা যাক, বিশেষ করে ৬টি ইস্যুকে আমি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করব।

ভেনিজুয়েলা: অচলাবস্থা

ট্রাম্প প্রশাসন ক্যারিবিয়ান ও পশ্চিম আটলান্টিক অঞ্চলে স্নায়ুযুদ্ধের চরম উত্তেজনার পর থেকে এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় নৌবহর মোতায়েন করেছে। এই বিশাল বাহিনীতে রয়েছে একটি এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ, একাধিক ডেস্ট্রয়ার, উভচর আক্রমণকারী বাহিনী (অ্যাম্ফিবিয়স অ্যাসল্ট ফোর্সেস), রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম বোমারু বিমান ও বিশেষ অভিযান ইউনিট। এই অভিযানের প্রকৃত উদ্দেশ্য এখনো অস্পষ্ট। তবে মার্কিন বাহিনীর দাবি, তারা কথিত মাদক পাচারকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী অভিযান চালাচ্ছে। কংগ্রেসের কোনো অনুমোদন বা আলোচনা ছাড়াই এ পর্যন্ত প্রায় ৩০টি হামলা চালানো হয়েছে। গত এক সপ্তাহে ট্রাম্প উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি অবৈধ তেলের চালানের বিরুদ্ধে সামরিক অবরোধ ঘোষণা করেছেন এবং আরও তেল ট্যাঙ্কার জব্দ করেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে সরকার পরিবর্তনের নীতি বলেই মনে হচ্ছে। এই নীতির পেছনে সামরিক শক্তির জোর রয়েছে। হোয়াইট হাউস দৃশ্যত আশা করছে, ভেনিজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরো স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছেড়ে দেবেন। এরপর তিনি রাশিয়া বা অন্য কোথাও বাকি জীবন কাটাবেন। শোনা যাচ্ছে, ট্রাম্প সরাসরিই এমন দাবি জানিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্র রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের ক্ষেত্রে মার্কিন প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোর শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়তে চাচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসন সেই অংশীদারত্ব আরও দৃঢ় করার উদ্যোগ নিয়েছে। এর পাশাপাশি চীনসহ কিছু দেশের ওপর থাকা রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা কমানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু এমনটা ঘটার সম্ভাবনা কম। কেবল অর্থনৈতিক চাপ ও বাইরের হুমকির মুখে মাদুরোর মতো নেতার ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার উদাহরণ খুব কমই আছে। ট্রাম্প এখন জোর দিয়ে বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম গোলার্ধের প্রধান শক্তি হয়ে থাকবে ও আমেরিকার স্বার্থ উদ্ধারে প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করতেও প্রস্তুত থাকবে।

প্রশাসন তাদের নতুন নীতিকে ‘মনরো ডকট্রিন’-এর একটি ‘ট্রাম্প উপসিদ্ধান্ত’ বা সংযোজন বলে অভিহিত করছে। মনরো ডকট্রিন ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোকে আমেরিকার আঙিনা থেকে দূরে থাকার জন্য সতর্ক করেছিল। তবে ওই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো নৌবাহিনী ছিল না। অথচ এখন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী নৌবাহিনীর বড় অংশ ভেনিজুয়েলার অদূরে অবস্থান করছে।

এই সবকিছুর মানে কী? ২০২৬ সালে মাদুরোর ভাগ্যই হয়তো সেই প্রশ্নের উত্তর দেবে। তিনি যদি ক্ষমতায় টিকে যান, তবে ট্রাম্পের হুমকিতে কাজের চেয়ে গর্জনই বেশি বলে মনে হওয়ার ঝুঁকি থাকবে। আর যদি তিনি ক্ষমতা ছাড়েন, তবে গোলার্ধের একচ্ছত্র অধিপতি হিসেবে ট্রাম্পের সক্ষমতা নিয়ে মানুষের আর সন্দেহ থাকবে না। আমার কাছে মনে হয়, এসব পদক্ষেপের কোনোটিই খুব একটা ভেবেচিন্তে নেওয়া হয়নি। কিন্তু পাশা ছোড়া হয়ে গেছে। আগামী এক বছরে পরিস্থিতির সুরাহা কীভাবে হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়। এর ফলেই বোঝা যাবে, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের বাকি সময়ে এই ‘ট্রাম্প উপসিদ্ধান্ত’ বা নীতি থেকে আসলে কী আশা করা যায়।

ইউক্রেন: পঞ্চম বছর

ফেব্রুয়ারি মাসে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন পঞ্চম বছরে পা দেবে। সেই সময় পুতিনের অভিপ্রায় ছিল কিয়েভ দখল করা ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে ইউক্রেনকে ধ্বংস করা। আজ তাঁর বাহিনী পূর্ব ইউক্রেনের মাটিতে আটকে আছে। ১০ লাখেরও বেশি সৈন্য হতাহতের শিকার হয়েছে। রাশিয়ার জন্য এই যুদ্ধ এখন বিপর্যয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবুও পুতিন পিছু হটার কোনো লক্ষণ দেখাচ্ছেন না। অবশ্য তাঁর উদ্দেশ্য এখন অনেক সীমিত হয়ে এসেছে।

এই যুদ্ধের পঞ্চম বছর শান্তির দিকে মোড় ঘোরানোর সন্ধিক্ষণ হতে পারে, কারণ যুদ্ধরত পক্ষগুলো হয় ক্লান্তির দিকে এগিয়ে যায় অথবা অচলাবস্থা ভাঙতে আরও ঝুঁকিপূর্ণ বাজি ধরে। পুতিন নিজেকে ইতিহাসের ছাত্র বলে দাবি করেন ও সম্ভবত আগামী বছরকে ইউক্রেনের মনোবল ভেঙে দেওয়ার সুযোগ হিসেবে দেখছেন।

আজকের ইউক্রেনে কোনো পক্ষই বড় সাফল্যের জন্য প্রস্তুত নয়। যুদ্ধের পঞ্চম বছরটি হয়তো গত চার বছরের মতোই হবে। পুতিন মাসের পর মাস সীমিত ভূখণ্ড দখলের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এজন্য তিনি তাঁর জনবলকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছেন। অন্যদিকে, ইউক্রেন তাকিয়ে আছে পশ্চিমা অংশীদারদের দিকে। অর্থনৈতিক সহায়তা ও সামরিক সরঞ্জামের জন্য তাদের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে। ট্রাম্প একটি শান্তি চুক্তির চেষ্টা করছেন। শোনা যাচ্ছে, চুক্তি অনুযায়ী ইউক্রেনকে ভূখণ্ড ছেড়ে দিতে হতে পারে। বিনিময়ে তারা নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পাবে। এমন ব্যবস্থা পুতিনকে তাঁর সর্বোচ্চ লক্ষ্য থেকে সরে আসার সুযোগ করে দেবে।

হোয়াইট হাউস দৃশ্যত আশা করছে, ভেনিজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরো স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছেড়ে দেবেন। এরপর তিনি রাশিয়া বা অন্য কোথাও বাকি জীবন কাটাবেন। শোনা যাচ্ছে, ট্রাম্প সরাসরিই এমন দাবি জানিয়েছেন।

পুতিন এখন পর্যন্ত পিছু হটার কোনো লক্ষণ দেখাননি। ফলে আলোচনা ব্যর্থ হলে ট্রাম্প কি পুতিনকেই দায়ী করবেন? নাকি ট্রাম্প নিজেই পুরোপুরি সরে দাঁড়াবেন?

ট্রাম্প সরে গেলে ইউক্রেনের প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়বে। তাই যুদ্ধের পঞ্চম বছর আসলেই নির্ণায়ক হতে পারে। তবে যুদ্ধের ভাগ্য রণাঙ্গনের চেয়ে ওয়াশিংটনেই বেশি নির্ধারিত হবে।

তাইওয়ান: মেন্যুতে থাকা খাবার

২০২৫ সালে বেইজিংয়ের এক সমাবেশে আমরা এ বছরের অন্যতম আলোচিত দৃশ্য দেখেছি। যেখানে দেখা যায়, পুতিনের সঙ্গে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং উনের বন্ধুত্বপূর্ণ আলিঙ্গন করছেন এবং পেছনে রয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট। এই চার দেশ ‘সিআরআইএনকে’ নামে পরিচিত। তারা ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে সমর্থন করছে। তাদের লক্ষ্য একটি বিভক্ত বিশ্ব গড়ে তোলা। যেখানে যুক্তরাষ্ট্র পিছু হটবে আর সেই সুযোগে রাশিয়া ও চীন তাদের প্রভাব বলয়ে ছড়ি ঘোরাবে।

মজার বিষয় হলো, ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিগুলোও এই দৃষ্টিভঙ্গির সাথে মিলে যাচ্ছে। তাদের নতুন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল (এনএসএস) যুক্তরাষ্ট্রকে গোলার্ধীয় শক্তি হিসেবে বর্ণনা করে বলেছে, ‘অ্যাটলাসের মতো যুক্তরাষ্ট্রের পুরো বিশ্বব্যবস্থাকে কাঁধে নিয়ে রাখার দিন শেষ।’ নথিপত্রে আরও এগিয়ে গিয়ে প্রথাগত ইউরোপীয় মিত্রদের ‘অকার্যকর’ এবং শিথিল অভিবাসন নীতির কারণে ‘সভ্যতার বিলুপ্তি’র ঝুঁকিতে থাকা হিসেবে ভর্ৎসনা করা হয়েছে।

পুতিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেছেন, ট্রাম্পের এনএসএস অনেক দিক থেকেই আমাদের ভিশন বা দৃষ্টিভঙ্গির সাথে মিলে যায়।

তাইওয়ানের ক্ষেত্রে বিষয়টি আর তাত্ত্বিক পর্যায়ে নেই। ওয়াশিংটন গত অর্ধশতাব্দী ধরে তাইওয়ানের প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করেছে। তারা এক অস্পষ্ট নীতির মাধ্যমে সেখানে শান্তি বজায় রেখেছে। এই নীতি অনুযায়ী তাইওয়ানকে চীনের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। আবার একই সঙ্গে দ্বীপটির সঙ্গে নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সম্পর্কও বজায় রাখা হয়। গত সপ্তাহে ট্রাম্প তাইওয়ানের জন্য ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অস্ত্র প্যাকেজ অনুমোদন করেছেন। প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলারের সমমূল্যের এই প্যাকেজে মিসাইল, ড্রোন ও উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রয়েছে। এদিকে, ২০২৭ সালের মধ্যে তাইওয়ান আক্রমণের জন্য চীন তাদের সেনাবাহিনীকে প্রস্তুত করছে বলে জানা যায়।

ধারণা করা হচ্ছে, এই বসন্তে (মার্চ-মে) ট্রাম্প বেইজিং সফর করবেন এবং শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক হবে। এই বৈঠকে তাইওয়ান হবে আলোচনার কেন্দ্রীয় বিষয়। ফলে তাইওয়ানের ভবিষ্যৎ হয়তো ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। বৈশ্বিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এটি এখন অন্যতম বড় ইস্যু। তাইওয়ান যুক্তরাষ্ট্রের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। যুক্তরাষ্ট্রের গাড়ি ও ফোন সচল রাখার অধিকাংশ সেমিকন্ডাক্টর চিপ তাইওয়ানে তৈরি হয়। চীন যদি তাইওয়ান আক্রমণ করে বা অস্থিতিশীল করে তোলে, তবে এর ক্ষতির পরিমাণ ১০ ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে।

আজকের ইউক্রেনে কোনো পক্ষই বড় সাফল্যের জন্য প্রস্তুত নয়। যুদ্ধের পঞ্চম বছরটি হয়তো গত চার বছরের মতোই হবে। পুতিন মাসের পর মাস সীমিত ভূখণ্ড দখলের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এজন্য তিনি তাঁর জনবলকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছেন।

তবুও অস্পষ্ট রয়ে গেছে, ট্রাম্প কি আমেরিকার কয়েক দশকের নীতিকেই সমর্থন দিয়ে যাবেন? তাঁর সাম্প্রতিক অস্ত্র বিক্রির সিদ্ধান্ত অবশ্য সেদিকেই ইঙ্গিত দেয়। নাকি বাণিজ্য চুক্তির স্বার্থে তিনি বেইজিংয়ের আধিপত্য মেনে নেবেন? তাঁর এনএসএস বা জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের পূর্বাভাসে অবশ্য এমনটাই দেখা যাচ্ছে। তাইওয়ানের নীতিনির্ধারকরা নিঃসন্দেহে যুক্তরাষ্ট্র-চীনের এই বৈঠক নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন এবং ভাববেন, ‘আপনি যদি আলোচনার টেবিলে না থাকেন, তবে আপনি খাবারের মেন্যুতে আছেন’।

ইসরায়েল: গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন

গাজায় আগ্রাসন ও গণহত্যার কারণে সামরিক সাফল্যের বিচারে ২০২৫ সাল ইসরায়েলের জন্য ভালো ছিল। বছরের শুরুটা হয়েছিল জিম্মি মুক্তি ও যুদ্ধবিরতি চুক্তির দিয়ে। আর বছর শেষ হচ্ছে জীবিত সব জিম্মিকে ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে। এরই মধ্যে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ২০ দফার যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে। সেখানে হামাসকে নিরস্ত্র করার আহ্বান জানানো হয়েছে। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর ইরান এখন সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় আছে। একসময় হামাস ও হিজবুল্লাহর মতো গোষ্ঠীগুলো ইসরায়েলকে ঘিরে রেখেছিল। তাদের নেতারা এখন মৃত।

তবে সব মিলিয়ে ইসরায়েল ব্যর্থ হয়েছে। তারা তাদের সামরিক সাফল্যকে স্থায়ী রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক অর্জনে রূপ দিতে পারেনি। এর আংশিক কারণ তাদের নিজেদের বিভাজন। বর্তমানে ইসরায়েল জাতীয়তাবাদী ডানপন্থী দলগুলোর একচ্ছত্র আধিপত্যে ইতিহাসের অন্যতম সংকীর্ণমনা জোট সরকার দ্বারা শাসিত হচ্ছে।এই দলগুলো ইসরায়েলি সমাজকে বিভক্ত করে ফেলছে। একই সঙ্গে আরব দেশগুলোর সঙ্গে নতুন সম্পর্ক তৈরির পথও বন্ধ করে দিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু দেশটির ডানপন্থীদের দীর্ঘদিনের নেতা। মজার বিষয় হলো, নিজের এই চরম ডানপন্থী সরকারের মধ্যে তিনিই নিজেকে ‘সবচেয়ে উদার’ সদস্য বলে দাবি করেন।

খুব কম ইসরায়েলিই বিশ্বাস করেন যে, দুই বছরের যুদ্ধের পর এই শাসন ব্যবস্থা বেশি দিন টিকতে পারে বা টেকা উচিত। ২০২৬ সালের ২৭ অক্টোবরের মধ্যে ইসরায়েলকে অবশ্যই সংসদীয় নির্বাচন করতে হবে। আর নেতানিয়াহু যদি আগাম নির্বাচন ডাকেন অথবা বসন্তকালে তাঁর সরকার বাজেট পাস করতে ব্যর্থ হয়, তবে নির্বাচন আরও আগেই হতে পারে। এই নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণ করতে পারে, ইসরায়েল তার সামরিক সাফল্যকে সংহত করতে পারবে, নাকি ভঙ্গুর ও অনিশ্চিত স্থিতাবস্থায় আটকে থাকবে।

এই নির্বাচন থেকে যদি নতুন ঐক্যের সরকার ক্ষমতায় আসে, তবে পরিস্থিতি বদলাতে পারে। অথবা অন্তত নেতানিয়াহুর বর্তমান সরকারের চরমপন্থীদের বাদ দিয়ে যদি কোনো জোট গঠিত হয়, তাহলেও সুযোগ থাকবে। সেক্ষেত্রে ট্রাম্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই আব্রাহাম অ্যাকর্ডস সম্প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। এর আওতায় সৌদি আরবের সঙ্গেও চুক্তি হতে পারে। কিন্তু নির্বাচনে যদি অচলাবস্থা তৈরি হয় বা নতুন সরকার গঠন করা না যায়, তবে বিপদ আছে। কিংবা এর চেয়েও খারাপ কিছু হতে পারে—বর্তমান সরকারই আবার ফিরে আসতে পারে। এমনটা হলে কূটনৈতিক অগ্রগতির সম্ভাবনা কমে যাবে। এতে ইসরায়েল হয়তো একটি ঐতিহাসিক সুযোগ হারাবে।

ইরান: কিছু একটার পতন

ইরানের জন্য এই বছর ছিল ভয়াবহ। পরিস্থিতি বিবেচনায় বলাই যায়, ২০২৬ সাল আরও খারাপ হতে পারে। কিছুদিন আগেও মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের দাপট ছিল চোখে পড়ার মতো। হিজবুল্লাহ, হামাস, হুথি ও ইরাকি মিলিশিয়াদের মতো নিজেদের অনুগত বিভিন্ন সশস্ত্র বাহিনীকে ব্যবহার করে পুরো এলাকায় প্রভাব বজায় রাখত ইরান। নিজেদের শক্তিশালী মিসাইল বাহিনী, রাশিয়ার তৈরি আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং বিশেষ পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে তাদের বেশ গর্ব ছিল। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ ছিলেন ইরানের বিশ্বস্ত বন্ধু। ইরান মূলত সিরিয়াকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করত যাতে অঞ্চলজুড়ে তাদের শক্তি বাড়ানো যায় ও ইসরায়েলকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে ধ্বংস করার লক্ষ্য পূরণ করা সহজ হয়।

কিন্তু এখন সেই চিত্র সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের অনেক প্রভাবশালী নেতা নিহত হয়েছেন এবং তাদের সাজানো সশস্ত্র বাহিনীগুলো ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েছে। তাদের শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে ও পারমাণবিক কর্মসূচিও বড় ধরনের বাধার মুখে পড়েছে। এমনকি সিরিয়ার মতো দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্রকেও তারা এখন আর পাশে পাচ্ছে না।

দেশটি এখন সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু। পানির সংকটের কারণে তেহরানে লোকজনকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তার ওপর, দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির বয়স ৮৬ বছর। শোনা যাচ্ছে তিনি অসুস্থ।

ধারণা করা হচ্ছে, এই বসন্তে (মার্চ-মে) ট্রাম্প বেইজিং সফর করবেন এবং শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক হবে। এই বৈঠকে তাইওয়ান হবে আলোচনার কেন্দ্রীয় বিষয়। ফলে তাইওয়ানের ভবিষ্যৎ হয়তো ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

২০২৬ সালে ইরানের জন্য পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হবে না। ইরান যদি তাদের পারমাণবিক শক্তি বা ক্ষেপণাস্ত্রের ভান্ডার নতুন করে গড়ার চেষ্টা করে, তবে ইসরায়েল আবারও বড় ধরনের হামলা চালাতে পারে। এদিকে ইরানের তরুণ সমাজ বর্তমান ধর্মীয় শাসন ব্যবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করছে ও বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা খামেনির পরবর্তী উত্তরাধিকার নিয়ে সংকট তৈরি হলে এই শাসন ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই ২০২৫ সালের মতো সামনের দিনগুলোতেও ইরানের দিকে নজর রাখা জরুরি, কারণ সেখানে যেকোনো সময় বড় কোনো পরিবর্তন বা চমক দেখা যেতে পারে।

এআই: বিপ্লব

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর মতো অন্য কোনো বিষয় এত দ্রুত ও নিশ্চিতভাবে বিশ্ব আলোচনার কেন্দ্রে আসেনি। এই প্রযুক্তি দীর্ঘ সময় ধরে বিশ্ব রাজনীতির শীর্ষেই অবস্থান করবে। বেইজিং ও ওয়াশিংটন উভয় পক্ষই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে টিকে থাকার লড়াই হিসেবে বিবেচনা করে। মূলত সামরিক শক্তি বৃদ্ধি ও জাতীয় নীতির প্রতিটি ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আনার ক্ষমতার কারণে এই বিষয়কে স্নায়ুযুদ্ধের সময়ের মহাকাশ দৌড়ের সঙ্গে তুলনা করা হয়।

২০২৫ সালে চীন নতুন ফ্রন্টিয়ার রিজনিং মডেল, ‘ডিপসিক আর১’ (DeepSeek R1) চালু করে বিশ্বকে অবাক করে দিয়েছিল। এই মডেল নামমাত্র খরচে শীর্ষস্থানীয় আমেরিকান মডেলগুলোকে চ্যালেঞ্জ করেছিল। ডিপসিক দ্রুত অ্যাপলের অ্যাপ স্টোরের শীর্ষে উঠে আসে ও কিছু সময়ের জন্য আর্থিক বাজারকে কাঁপিয়ে দেয়। যার ফলে নাসডাকসূচকের বড় পতন ঘটে। বর্তমানে বাজার আবার ঘুরে দাঁড়ালেও এই ধাক্কা বড় শিক্ষা দিয়ে গেছে। প্রযুক্তির দৌড়ে এগিয়ে থাকার সুবিধা কত দ্রুত শেষ হতে পারে, তা এখন সবার কাছে স্পষ্ট।

যুক্তরাষ্ট্র রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের ক্ষেত্রে মার্কিন প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোর শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়তে চাচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসন সেই অংশীদারত্ব আরও দৃঢ় করার উদ্যোগ নিয়েছে। এর পাশাপাশি চীনসহ কিছু দেশের ওপর থাকা রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা কমানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এমন সিদ্ধান্তে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করলেও প্রস্তাবগুলো এখনো কার্যকর হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও সীমাবদ্ধতা বাড়ছে। বিদ্যুতের চাহিদা বাড়লেও ডেটা সেন্টারের বিশাল নেটওয়ার্ক সচল রাখতে প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ উৎপাদনে যুক্তরাষ্ট্র চীনের চেয়ে পিছিয়ে। এমন অবস্থায় ডেমোক্র্যাট দলের কিছু সদস্য নতুন ডেটা সেন্টার তৈরির ওপর পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞা আরোপের দাবি তুলছেন। স্নায়ুযুদ্ধের সময়ের মতো বিশ্বজুড়ে চলা প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপের মধ্যে এখন সরাসরি সংঘাত হতে পারে।

২০২৬ সালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত উন্নতি, অমীমাংসিত নীতি বিতর্ক ও তীব্র ভূ-রাজনৈতিক রেষারেষির কারণে সংঘাত বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সব মিলিয়ে সামনের বছরগুলোতে বিশ্ব রাজনীতি গড়ে তোলার পেছনে এআই সবচেয়ে প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখবে।

লেখক: সিএনএন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স বিশ্লেষক। তিনি প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ, বারাক ওবামা, ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জো বাইডেনের অধীনে সিনিয়র জাতীয় নিরাপত্তা পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সিএনএন প্রকাশিত মতামত। অনুবাদ করেছেন তুফায়েল আহমদ

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত