ফরেন পলিসির বিশ্লেষণ

দেশে ব্রিটিশ-বিরোধিতা, বিদেশে পশ্চিমাদের সঙ্গে গলাগলি, মোদির দ্বিমুখী নীতির কারণ কী

লেখা:
লেখা:
সি রাজা মোহন

এআই জেনারেটেড ছবি

২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শাসনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো মানসিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরকে ‘ঔপনিবেশিক প্রভাবমুক্ত’ করার উদ্যোগ নেওয়া। ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) দীর্ঘদিন ধরেই মনে করে, ব্রিটিশ শাসন ও পশ্চিমা প্রভাবের ফলে ভাষা, সংস্কৃতি ও চিন্তায় যে উত্তরাধিকার তৈরি হয়েছে, তা থেকে ভারতকে বেরিয়ে আসতে হবে। সেই লক্ষ্যেই মোদি সরকার ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে।

তবে একটি বড় পার্থক্যও দেখা গেছে। দেশের ভেতরে ব্রিটিশ আমলের উত্তরাধিকার কমানোর চেষ্টা চললেও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারত দ্রুত ঘনিষ্ঠ হচ্ছে ইংরেজি ভাষাভাষী দেশগুলোর সঙ্গে। অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় শক্তিশালী হয়েছে।

এভাবে স্বাধীনতা-পরবর্তী ভারতের প্রচলিত রাজনৈতিক ধারা অনেকটাই পাল্টে দিয়েছে বিজেপি। ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ২০০৫ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া এক বক্তৃতায় ইংরেজি ভাষা ও ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানগুলোর অবদানকে আধুনিক ভারতের উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। কিন্তু মোদি সরকার ও বিজেপির আদর্শিক সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) ইংরেজি ভাষা ও ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকারের সমালোচনা করে আসছে।

তবে কংগ্রেসের রাজনীতিতেও পশ্চিমা বিশ্বের সমালোচনা করার প্রবণতা রয়েছে। প্রকাশ্যে ভারতের উদারপন্থী বাম অভিজাতরা প্রায়ই ‘সাম্রাজ্যবাদী’ ইংরেজিভাষী বিশ্বের রাজনীতি ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সমালোচনা করেছেন। কিন্তু একই সঙ্গে তারা ইংরেজি ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও শিল্পকলার প্রশংসাও করেছেন। শুধু তাই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আজও অনেকের কাছে ইংরেজি ভাষা বিশ্বে স্বীকৃতি, সম্মান বা সাফল্য অর্জনের সবচেয়ে বড় পরিচয় হিসেবে বিবেচিত হয়।

বিজেপি এই প্রচলিত সমীকরণকে উল্টে দিয়েছে। একদিকে দেশে ঔপনিবেশিক প্রভাবমুক্তির (ডিকলোনাইজেশন) কর্মসূচির অংশ হিসেবে ব্রিটিশ আমলের অবশিষ্ট সাংস্কৃতিক বন্ধন ছিন্ন করার চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে সরকার ইংরেজি ভাষার দেশগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব আরও জোরদার করছে। একই সঙ্গে ডানপন্থী ও বামপন্থী উভয় ধারার রাজনৈতিক অবস্থানের আড়ালে ভারতের মধ্যবিত্তের বাস্তব জীবনযাত্রার এক ভিন্ন চিত্র ফুটে ওঠে। শিক্ষা, চাকরি ও স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগের জন্য বহু ভারতীয় দীর্ঘদিন ধরেই ব্যাপকভাবে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়াসহ ইংরেজিভাষী দেশগুলোর দিকে ঝুঁকছে। ফলে এই দেশগুলোই ভারতের মধ্যবিত্তের বিদেশমুখী শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও অভিবাসনের প্রধান গন্তব্যে পরিণত হয়েছে।

পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল ছাড়া বিদেশে বসবাসকারী ভারতীয়দের সবচেয়ে বড় অংশ পশ্চিমা দেশগুলোতে রয়েছে। এসব দেশে তারা শুধু পেশাগত ক্ষেত্রেই সফল হননি, অনেকেই রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে পৌঁছেছেন। ভারতে হিন্দুত্ববাদী ডানপন্থী থেকে শুরু করে উদারপন্থী উভয় রাজনৈতিক ধারার নেতারাই এখনো নিজেদের সন্তানদের উচ্চশিক্ষার জন্য বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পাঠান। বাইরে থেকে এটি অনেকের কাছে দ্বিমুখী নীতি মনে হতে পারে। তবে একই সঙ্গে এটি ঔপনিবেশিক-পরবর্তী ভারতের সঙ্গে ইংরেজিভাষী বিশ্বের দীর্ঘদিনের গভীর সম্পর্কেরও প্রতিফলন। বহু বছর চাপা থাকা দুই পক্ষের অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক সহযোগিতার সম্ভাবনাও এখন আবার সামনে আসছে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ছবি: নিউজ অন এয়ার
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ছবি: নিউজ অন এয়ার

২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শাসনামলে একদিকে বিশ্বের ইংরেজিভাষীদের প্রতি বিরূপতা, অন্যদিকে তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখার বাস্তব প্রয়োজন—এই দুই প্রবণতা পাশাপাশি চলেছে। ২০২২ সালের আগস্টে দিল্লির লালকেল্লা থেকে স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে তিনি দেশের সব ক্ষেত্রে ‘ঔপনিবেশিক মানসিকতা’ দূর করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। সরকারি কাজে ইংরেজির ব্যবহার কমানো, ‘ইন্ডিয়া’র পরিবর্তে ‘ভারত’ নামের ব্যবহার বাড়ানো এবং হিন্দিকে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

শুধু নাম পরিবর্তনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি এই প্রচেষ্টা। ব্রিটিশ আমলের ঐতিহ্য বহনকারী আইন, সড়ক ও স্থাপনার পাশাপাশি এখন সেনাবাহিনীর পোশাক ও রীতিনীতিতেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। সম্প্রতি ভারতীয় সেনাবাহিনী নতুন পোশাকবিধি চালু করেছে, যেখানে ব্রিটিশ ধাঁচের কিছু পোশাক বাদ দিয়ে দেশীয় নকশার ‘বান্দি’ জ্যাকেটের মতো পোশাক অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার মুছে ফেলার এই উদ্যোগের একটি অংশকে প্রয়োজনীয় আধুনিকায়নের উদ্যোগ হিসেবে দেখা হয়। তবে এর কিছু পদক্ষেপকে অনেকেই নিছক রাজনৈতিক প্রদর্শন বলেও মনে করেন। এর একটি উদাহরণ হলো, ব্রিটিশ আমলে নির্মিত নয়াদিল্লির প্রধান স্থপতি এডউইন লুটিয়েন্সের ভাস্কর্য রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে সরিয়ে দেওয়া। রাষ্ট্রপতি ভবনও লুটিয়েন্সের নকশা করা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। তবে একই সময়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইংরেজিভাষী বিশ্বের (অ্যাংলোস্ফিয়ার) সঙ্গে ভারতের সম্পর্ককে নতুনভাবে গড়ে তোলার উদ্যোগও নিয়েছেন। ২০১৬ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে ভারত ‘ইতিহাসজনিত দ্বিধা’ কাটিয়ে উঠেছে।

এটি শুধু আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ছিল না। ক্ষমতায় আসার পর মোদি দীর্ঘদিনের অনীহা কাটিয়ে ভারতীয় আমলাতন্ত্র ও রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে নতুন সুযোগ কাজে লাগাতে উৎসাহিত করেন। এরপর তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে সৃষ্টি হওয়া নানা টানাপোড়েনের মধ্যেও দুই দেশের সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখতে সক্ষম হয়েছেন। তবে এই পথ মোটেও সহজ ছিল না। বিরোধী কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ধারাবাহিকভাবে অভিযোগ করে আসছেন, মোদি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে ভারতের স্বার্থ বিসর্জন দিয়েছেন বা তাঁর কাছে নতি স্বীকার করেছেন।

মোদির অ্যাংলো-স্যাক্সন বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের উদ্যোগ শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই সীমাবদ্ধ নয়। অস্ট্রেলিয়াও তার পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে। জুলাইয়ের শুরুতে অস্ট্রেলিয়া সফরে মোদিকে যে তারকাসুলভ উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়, তা তার কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। মেলবোর্ন সফর শেষে মোদি যান নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ডে। গত ৪০ বছরের মধ্যে এটি ছিল কোনো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর প্রথম নিউজিল্যান্ড সফর।

সম্মান জানাতে নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লাক্সন নিজেই বিমানবন্দরে উপস্থিত থেকে মোদিকে স্বাগত জানান। এ সময় লাক্সন এপ্রিল মাসে ওয়েলিংটন ও নয়াদিল্লির মধ্যে স্বাক্ষরিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) দ্রুত অনুমোদনের পক্ষেও জোর দেন। এদিকে ১৫ জুলাই ভারত-যুক্তরাজ্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর হয়। এটি এখন পর্যন্ত ভারতের করা সবচেয়ে বড় বাণিজ্য চুক্তি। দীর্ঘদিনের জটিল ও সংবেদনশীল সম্পর্কের মধ্যেও লন্ডনের সঙ্গে এই চুক্তি বাস্তবায়নে নয়াদিল্লি নজিরবিহীন রাজনৈতিক উদ্যোগ নিয়েছে।

অন্যদিকে, চলতি মাসের শুরুতে কানাডার অটোয়ায় ভারত ও কানাডার মধ্যে তৃতীয় দফার বাণিজ্য আলোচনা শেষ হয়েছে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি আশা করছেন, চলতি বছরের শেষ দিকে মোদির অটোয়া সফরের সময় দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি সই হবে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তীকালীন ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করতে এখন মাত্র ১ শতাংশ কাজ বাকি রয়েছে। বর্তমানে পণ্য ও সেবা মিলিয়ে ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ২৫০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রকে ভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদারে পরিণত করেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই দশকের শেষ নাগাদ দুই দেশের বাণিজ্য ৫০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে চান।

অন্যদিকে ভারতের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে আলোচনায় ‘মাল্টি-অ্যালাইনমেন্ট’ বা একাধিক শক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কের কথা প্রায়ই শোনা যায়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, বর্তমানে ভারতের সবচেয়ে গভীর এবং দ্রুত সম্প্রসারিত কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে উঠছে ইংরেজিভাষী দেশগুলোর সঙ্গে। এখানেই সবচেয়ে বড় পার্থক্য দেখা যায়। একদিকে দেশের ভেতরে ঔপনিবেশবিরোধী ও ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার থেকে মুক্তির রাজনৈতিক বক্তব্য জোরালো করা হচ্ছে, অন্যদিকে স্বাধীনতার পর যেকোনো সময়ের তুলনায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের উত্তরসূরি রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ভারত আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলছে।

ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এক বক্তৃতায় ইংরেজি ভাষা ও ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানগুলোর অবদানকে আধুনিক ভারতের উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। ছবি: ফ্রন্টলাইন থেকে নেওয়
ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এক বক্তৃতায় ইংরেজি ভাষা ও ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানগুলোর অবদানকে আধুনিক ভারতের উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। ছবি: ফ্রন্টলাইন থেকে নেওয়

তবে পেছনে ফিরে তাকালে দেখা যায়, ভারত ও ইংরেজিভাষী অ্যাংলো-স্যাক্সন দেশগুলোর মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, সেটি আসলে ইতিহাসের একটি সাময়িক পরিবর্তন ছিল। এর পেছনে ছিল উপমহাদেশের জটিল উপনিবেশ-উত্তর পরিস্থিতি, ভারত বিভাগের প্রভাব, পাকিস্তানের প্রতি যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের ঝোঁক এবং ভারতের সমাজতন্ত্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতি ঘনিষ্ঠতা।

তবে রাষ্ট্রীয় সম্পর্কে টানাপোড়েন থাকলেও দুই পক্ষের অভিজাত শ্রেণির মধ্যে যোগাযোগ ও সম্পর্ক কখনো পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়নি। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু জোটনিরপেক্ষ নীতি অনুসরণ করলেও তিনি দেশকে ব্রিটিশ কমনওয়েলথে রেখেছিলেন। একই সময়ে ইংরেজিভাষী ভারতীয় মধ্যবিত্ত অ্যাংলো-স্যাক্সন বিশ্বের সঙ্গে ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করে গেছে, এমনকি স্নায়ুযুদ্ধের চূড়ান্ত মুহূর্তেও।

১৯৯১ সালের অর্থনৈতিক সংস্কার ভারতের জন্য এই সম্পর্ক নতুনভাবে আবিষ্কারের সুযোগ তৈরি করে। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে চীন ও এশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক সংযোগ জোরদারের চেষ্টা প্রত্যাশিত ফল না দেওয়ায়, ভারত ধীরে ধীরে তার ঐতিহাসিকভাবে ঘনিষ্ঠ ইংরেজিভাষী অংশীদারদের দিকেই বেশি মনোযোগ দিতে শুরু করে।

একসময় এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির উদ্যোগ নিলেও, ২০১৯ সালে ভারত এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় বৃহৎ বাণিজ্য জোট রিজিওনাল কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপের আলোচনা থেকে সরে দাঁড়ায়। এরপর থেকে ভারতের বাণিজ্য কূটনীতির মূল লক্ষ্য হয়ে ওঠে পশ্চিমা বিশ্ব। এর মধ্যে শুধু ইংরেজিভাষী দেশগুলোই নয়, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং ইউরোপীয় মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গেও অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদারে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

অ্যাংলো-স্যাক্সন বিশ্বে ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের সাফল্যই ভারত ও ইংরেজিভাষী দেশগুলোর নতুন বাণিজ্যিক সম্পর্কের অন্যতম শক্ত ভিত্তি হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের একজন প্রধানমন্ত্রী এবং যুক্তরাষ্ট্রের একজন ভারতীয় বংশোদ্ভূত ভাইস প্রেসিডেন্টের উত্থান এই প্রবাসী ভারতীয়দের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক প্রভাবেরই প্রতিফলন। একই সঙ্গে শিক্ষা, গণমাধ্যম ও ব্যবসা-বাণিজ্যেও ভারতীয়দের উপস্থিতি ও সাফল্য এখন স্পষ্টভাবে চোখে পড়ছে। তাহলে কি নরেন্দ্র মোদি ভারতের ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে নতুন কোনো ধারা তৈরি করেছেন? বাহ্যিকভাবে দেখলে মনে হতে পারে, বিশ্বের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক জোরদারে মোদি একা নন। বিস্ময়করভাবে, দীর্ঘদিন পশ্চিমা প্রভাবের সমালোচক হিসেবে পরিচিত রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘও (আরএসএস) এখন সেই সম্পর্ক উন্নয়নের পথে হাঁটছে।

একদিকে দেশের ভেতরে ঔপনিবেশবিরোধী ও ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার থেকে মুক্তির রাজনৈতিক বক্তব্য জোরালো করা হচ্ছে, অন্যদিকে স্বাধীনতার পর যেকোনো সময়ের তুলনায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের উত্তরসূরি রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ভারত আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলছে।

ভারতের উদারপন্থী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মতো আরএসএস ও বিজেপির আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক নেটওয়ার্কে আগে তেমন সম্পৃক্ততা ছিল না। তবে এখন তারা সেই অবস্থার পরিবর্তন করতে চাইছে। শুরুতে প্রবাসী ভারতীয়দের সংগঠিত করার দিকে জোর দিলেও, এখন তারা পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে আরও বিস্তৃত সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। এর অংশ হিসেবে স্থানীয় রাজনৈতিক, সামাজিক ও বুদ্ধিজীবী মহলের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গেও যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এই প্রচেষ্টা আরও জোরদার করতে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবতের চলতি বছরের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা সফরের সম্ভাবনা রয়েছে। এই সফরের মাধ্যমে ইংরেজিভাষী বিশ্বের সঙ্গে সংগঠনটির যোগাযোগ ও সম্পর্ক আরও গভীর করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

ভারত ও ইংরেজিভাষী বিশ্বের (অ্যাংলোস্ফিয়ার) সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হলেও, এর অর্থ এই নয় যে দুই পক্ষের মধ্যে সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। বিশেষ করে প্রবাসী ভারতীয়দের রাজনীতি ভবিষ্যতেও সম্পর্কে টানাপোড়েনের কারণ হতে পারে। কারণ, ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধ অনেক সময় প্রবাসী ভারতীয় সমাজেও ছড়িয়ে পড়ে। এরপর সেই ইস্যুতে সংশ্লিষ্ট দেশের রাজনৈতিক দল ও সরকারও জড়িয়ে যায়, যা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে প্রভাব ফেলে।

তবে পরিস্থিতি আরও ইতিবাচক হতে পারে এমন একটি ইঙ্গিত মিলেছে গত ৭ জুলাই। সেদিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে ভারতে সক্রিয় কয়েক ডজন অপরাধচক্রের সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে। এর মধ্যে ২০২৩ সালে শিখ অধিকারকর্মী হরদ্বীপ সিং নিজ্জার হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগও রয়েছে। এই তদন্তে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার গোয়েন্দা সহযোগিতা ছিল। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, অভিযোগপত্রে এই হত্যাকাণ্ডের নির্দেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে ভারতীয় রাষ্ট্রের কোনো ভূমিকা আছে এমন কোনো অভিযোগ আনা হয়নি।

ঔপনিবেশিক শাসন, দেশভাগের অভিজ্ঞতা এবং একটি বৃহৎ সভ্যতা হিসেবে স্বাধীনতার পর ভারতের ইংরেজিভাষী বিশ্বের (অ্যাংলোস্ফিয়ার) থেকে কিছুটা দূরে সরে যাওয়াই হয়তো স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতার বাস্তব প্রয়োজনীয়তা উপেক্ষা করা সম্ভব হয়নি। তবে ভারত আর আগের মতো পশ্চিমা বিশ্বের শর্ত মেনে সম্পর্ক গড়তে চায় না, বরং সমান মর্যাদাসম্পন্ন দুটি সার্বভৌম দেশের পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে নতুন ধরনের অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে চায়।

ভারতের দীর্ঘদিনের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বক্তব্যও ধীরে ধীরে সেই নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে। ক্রমেই শক্তিশালী ও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ভারত ইংরেজিভাষী বিশ্বের সঙ্গে পারস্পরিক লাভজনক, ভারসাম্যপূর্ণ ও দীর্ঘমেয়াদি নতুন সম্পর্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।

  • সি রাজা মোহন: ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা বোর্ডের সাবেক সদস্য

(ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন কাজী নিশাত তাবাসসুম)

Ad 300x250

সম্পর্কিত