বাংলাদেশ-ভারত নদী-যোগাযোগের পুনরুজ্জীবন কি সম্ভব
লেখা:গৌতম চক্রবর্তী

১৮৮৪ সালে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর সেই সময়ের তুলনায় বেশ আধুনিক একটি উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তিনি খুলনা ও বরিশালের মধ্যে বাণিজ্যিক স্টিমার সার্ভিস চালু করেন। এর প্রায় ৪০ বছর আগে তাঁর দাদা প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরও একই ধরনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ‘ইন্ডিয়া জেনারেল স্টিম নেভিগেশন কোম্পানি’র মাধ্যমে তিনি বাংলার নদীপথে বাণিজ্যিক নৌপরিবহন গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলেন।
সড়ক ও রেল যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার আগে বাংলার বদ্বীপজুড়ে একটি বড় ও কার্যকর নৌপরিবহন ব্যবস্থা ছিল। নদীপথে নারায়ণগঞ্জ, বরিশাল ও ফরিদপুরের পাট কলকাতার পাটকলগুলোতে যেত। আবার রাণীগঞ্জের কয়লাও নদীপথে বিভিন্ন এলাকায় আমদানি করা হতো।
স্টিমার চলাচলের কারণে খুলনা, গোয়ালন্দ, চাঁদপুর, ধুবড়ি এবং ব্রহ্মপুত্র নদী ব্যবস্থা একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি বড় নৌপথের নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিল। এই নৌপথ কলকাতা বন্দরের গুরুত্ব বাড়াতেও বড় ভূমিকা রেখেছে। একসময় কলকাতা বন্দর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় ব্যস্ততম বন্দরে পরিণত হয়েছিল।
কিন্তু ভারত ভাগের পর এই স্বাভাবিক যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে যায়। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর অভ্যন্তরীণ নৌপথে চলাচল কঠোরভাবে বন্ধ হয়ে যায়। ফলে ভারতের আসাম ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল সমুদ্রবন্দরে যাওয়ার সবচেয়ে সহজ ও সংক্ষিপ্ত নৌপথ হারিয়ে ফেলে।
অন্যদিকে, কলকাতাও নদীপথের মাধ্যমে যুক্ত বিশাল একটি বাণিজ্যিক অঞ্চল হারায়। এতে শুধু একটি পরিবহন ব্যবস্থা বন্ধ হয়নি, বরং একটি বড় অর্থনৈতিক ব্যবস্থাও ভেঙে পড়ে। সেই ব্যবস্থায় নদী ছিল একসঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যের পথ, কর্মসংস্থানের উৎস, মানুষের যোগাযোগের মাধ্যম এবং পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই পুরোনো যোগাযোগব্যবস্থার কিছু অংশ আবার চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে অভ্যন্তরীণ নৌপথে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন এবং বাণিজ্যের জন্য বিভিন্ন প্রটোকল চুক্তি করা হয়। সময়ের সঙ্গে কয়েক দফা নবায়নের মাধ্যমে এসব চুক্তির আওতাও বাড়ানো হয়েছে।
বর্তমানে এই ব্যবস্থায় ১০টি প্রটোকল রুট রয়েছে। ধুবড়ি ও পানগাঁওয়ে নতুন টার্মিনাল চালু হয়েছে। কোলাঘাট হয়ে রূপনারায়ণ নদী ব্যবহারের সুযোগও তৈরি হয়েছে। উত্তর-পূর্ব ভারতকে ভুটানের সঙ্গে যুক্ত করতে জোগিঘোপায় একটি মাল্টিমোডাল হাব তৈরির প্রস্তাবও রয়েছে।
তবে এসব উদ্যোগের সম্ভাবনা যতটা, বাস্তবে অগ্রগতি ততটা হয়নি। শুধু চুক্তি করলেই নৌপথ কার্যকর হয় না। নিয়মিত ড্রেজিং, নদীর নাব্যতা ও পানির গভীরতা পরীক্ষা, নেভিগেশন ব্যবস্থা, নদীশাসন এবং আধুনিক টার্মিনাল দরকার। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে এখনো নানা সমস্যা রয়েছে। অনেক নৌপথে পর্যাপ্ত ড্রেজিং হয় না।
বর্ষা ও শুষ্ক মৌসুমে নাব্যতার বড় পার্থক্য দেখা যায়। কোথাও টার্মিনাল নির্মাণে দেরি হচ্ছে, আবার কোথাও কাস্টমস ব্যবস্থাও জটিল। মুন্সিগঞ্জ টার্মিনাল এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। নাকুগাঁও-ডালু নৌপথের উন্নয়নও খুব বেশি এগোয়নি। ত্রিপুরার গোমতী নদীপথে স্থায়ী জেটি নির্মাণের কাজও এখনো শেষ হয়নি।
এ কারণে ২০২৬ সালটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের নতুন সরকার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে ভারতের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্কের বার্তা দিচ্ছে। ফলে ভারত ও বাংলাদেশের সামনে অভিন্ন নদী ও নৌপথ নিয়ে নতুন করে একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এর পাশাপাশি তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পে চীনের আগ্রহও রয়েছে। ফলে নদী ও পানিসম্পদ নিয়ে ভারতও কৌশলগতভাবে পিছিয়ে থাকতে চাইবে না। পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকারের সঙ্গেও ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের রাজনৈতিক অবস্থান একই। তাই কয়েক দশকের মধ্যে দিল্লি, কলকাতা ও ঢাকার সামনে নদী ও নৌপথ নিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করার একটি বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে রাজনৈতিক সমঝোতা হলেই হবে না। নদীকে উন্নয়ন ও সরকারি বিনিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ করতে হবে। পশ্চিমবঙ্গের উচিত কোলাঘাট প্রটোকল টার্মিনালের কাজ দ্রুত শেষ করা।
গেঁওখালিকে বড় লজিস্টিকস হাব হিসেবে গড়ে তোলা, নদীর তীরে আরও জেটি তৈরি করা এবং নৌপথের তথ্য ও নেভিগেশন ব্যবস্থা আধুনিক করাও জরুরি।
একই সঙ্গে হুগলি-রূপনারায়ণ নদীপথকে জাতীয় জলপথ-১ এর সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করতে হবে। পশ্চিমবঙ্গের বাজেটেও একাধিক নদীজেটি তৈরির পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। তবে শুধু পরিকল্পনা করলেই হবে না। এসব প্রকল্প কত দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে এবং নদীপথের সঙ্গে সড়ক ও রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা কতটা সহজ হচ্ছে, তার ওপরই সাফল্য নির্ভর করবে।
বছরের পর বছর নদীর স্বাভাবিক গতিপথ ও গঠন নিয়ে অবহেলা এবং হুগলি নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় বাংলার নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়েছে। প্রতি বর্ষায় কোথাও কৃষিজমি নদীতে বিলীন হচ্ছে, কোথাও ভেঙে পড়ছে নদীর বাঁধ।
তাই শুধু ড্রেজিং করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। নদীতে জমা পলি দিয়ে কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হবে, নদীর তীর কীভাবে রক্ষা করা হবে এবং নদীর গতিপথ কীভাবে বৈজ্ঞানিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে এসব বিষয়কে একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে হবে।
এই সমস্যা শুধু প্রকৌশলগত নয়, এর সঙ্গে ভূরাজনীতিও জড়িত। ১৯৯৬ সালের গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। ভারত চুক্তিতে আরও নমনীয়তা চায়। অন্যদিকে, বাংলাদেশ শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত পানিপ্রবাহের নিশ্চয়তা চায়। প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারাজ নিয়েও বাংলাদেশের উদ্বেগ রয়েছে।
আঞ্চলিক যোগাযোগ ও বাণিজ্যের জন্য নদী ও পানিসম্পদকে কাজে লাগাতে হলে পানিকে কোনোভাবেই রাজনৈতিক চাপের হাতিয়ার বানানো উচিত নয়।
বাংলার উন্নয়নের পরবর্তী অধ্যায় শুধু এক্সপ্রেসওয়ে বা সড়ক নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা, টেকসই বাঁধ তৈরি করা এবং ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে আবারও নদীপথে বাণিজ্য ও যোগাযোগ বাড়ানো এসবও ভবিষ্যৎ উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।
- গৌতম চক্রবর্তী: সাবেক নিরাপত্তা ও ঐতিহ্যবিষয়ক উপদেষ্টা, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী বন্দর, কলকাতা
(দ্য টেলিগ্রাফ অনলাইন থেকে অনুবাদ করেছেন কাজী নিশাত তাবাসসুম)
.png)







