কৃষক দল নেতার দুর্ব্যবহারের পর নিরাপত্তাহীনতায় স্কুল ছাড়ছে ছাত্রীরা
স্ট্রিম সংবাদদাতাকক্সবাজার

কক্সবাজারের মহেশখালিতে এক কৃষকদল নেতার দুর্ব্যবহার ও হুমকিতে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয় ছেড়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ইতোমধ্যে নবম শ্রেণির দুই ছাত্রী ছাড়পত্র নিয়েছেন। আজ মঙ্গলবার একই শ্রেণির আরও তিনজন ছাড়পত্র নেওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ছাত্রী ও অভিভাবকরা।
উপজেলার কালারমারছড়া উচ্চবিদ্যালয়ে এই ঘটনায় ঘটেছে। অভিযুক্ত শামসুল আলম ওই বিদ্যালয়ের অভিভাবক সদস্য ও কালারমারছড়া ইউনিয়ন কৃষক দলের সভাপতি।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী, তাদের অভিভাবক ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গত রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) টিফিনের সময় বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ওই পাঁচ শিক্ষার্থীসহ কয়েকজন পাশের একটি কোচিং সেন্টারে খাবার খেতে যায়। এ সময় সেখান কৃষক দলের নেতা শামসুল আলম উপস্থিত হয়ে তাদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে প্রধান শিক্ষকের কক্ষে নিয়ে আসেন। পরে অভিভাবককে ডেকে এনে তাদের সামনেও শিক্ষার্থীদের নিয়ে আপত্তিকর নানা কথা বলেন তিনি। অভিভাবকরা এর প্রতিবাদ করলে শিক্ষার্থীদের স্কুল বের করা দেওয়াসহ পরিবারের ক্ষতি করবেন বলে হুমকি দেন ওই নেতা।
এদিকে পরের দিন গতকাল সোমবার বিষয়টি সুরাহা করতে স্কুলে যান ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা। তবে প্রধান শিক্ষক ওই ঘটনার বিচার ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়ে আশ্বস্ত করতে না পারায় দুজন অভিভাবক সন্তানদের ছাড়পত্র নিয়ে নেন। আজ মঙ্গলবার আরও তিন শিক্ষার্থীর ছাড়পত্রের জন্য বিদ্যালয়ের যোগাযোগ করেন তাদের অভিভাকেরা।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা বলেন, স্কুলের খাবার পানি ব্যবহার অনুপযোগী হওয়া পার্শ্ববর্তী কোচিং সেন্টারে টিফিন করতে গিয়েছিল তারা। টিফিন শেষে ফেরার আগেই ওই নেতা গিয়ে কোনো কিছু জিজ্ঞেস না করেই তাদের মা-বাবা তুলে গালিগালাজ করেন। পরে প্রধান শিক্ষক ও অভিভাবকদের সামনে তাদের চরিত্র নিয়ে নানা কটু কথা বলেন তিনি।
ছাড়পত্র নেওয়া শিক্ষার্থীর এক অভিভাবক বলেন, ‘অভিভাবক হিসেবে দুইদিনই আমি স্কুলে গেছি। রবিবারের ঘটনার বিষয়ে প্রধান শিক্ষককে ব্যবস্থা নিতে বলি। কিন্তু তিনি অপরাগতা প্রকাশ করেন। রবিবার তাঁর সামনে যা ঘটেছে, তা লিখে দিতে বলি। আমরা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাব। সেটিও তিনি দেননি। এমনকি আমার বোনসহ অন্য শিক্ষার্থীদের স্কুলে ভেতরে নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব নয়, সাফ জানিয়ে দেন। পরে আমরা দুজনের জন্য ছাড়পত্র নেই। বাকি তিনজন মঙ্গলবার ছাড়পত্রের জন্য গেলেও প্রধান শিক্ষক না থাকায় পাননি।’
আরেক শিক্ষার্থীর বাবা বলেন, ‘ওই স্কুলে যে পরিবেশ, সেখানে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করানোর নিরাপত্তা নাই। তাই আমিসহ তিন অভিভাবক মঙ্গলবার স্কুলে গিয়েছিলাম ছাড়পত্র আনতে। প্রধান শিক্ষক না থাকায় আনতে পারিনি।’
গালিগালাজ ও হুমকি দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে কৃষক দলের সভাপতি শামসুল আলম বলেন, স্কুল চলাকালে ওই ৫ মেয়ে একটি কোচিং সেন্টারে অবস্থান করছিল। এক শিক্ষকের কাছ থেকে খবর পেয়ে আমি সেখানে গিয়ে ৫ শিক্ষার্থী স্কুলে নিয়ে আসি। পরে প্রধান শিক্ষকের মাধ্যমে তাদের অভিভাবকদের ডেকে এনে সন্তানদের নজরে রাখার পরামর্শ দেই। শিক্ষার্থীদের একটু শাসন করি। এর বাইরে কিছুই ঘটেনি।
শিক্ষার্থীদের ছাড়পত্র নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, এর কারণ আমার জানা নেই। এটা অভিভাবকরা ভালো বলতে পারবেন।
এদিকে শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করে, একই ক্লাসের ৯ জন ছাত্র মাঝেমধ্যেই তাদের উত্ত্যক্ত করে। বিভিন্ন সময় তাদের পথ রোধ করে আপত্তিকর খারাপ প্রস্তাব দেয়। বিষয়টি নিয়ে তারা প্রধান শিক্ষককে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। তাদের মধ্যে দুজন ওই অভিভাবক সদস্যের আত্মীয়।
এ বিষয়ে ছাড়পত্র নিয়ে চলে যাওয়া এক ছাত্রী বলে, ‘১৫-২০ আগে আমিসহ কয়েকজন সহপাঠী একই ক্লাসের ৯ জন শিক্ষার্থীর বিষয়ে অভিযোগ করি। তাদের মধ্যে একজন কৃষক দল নেতার নাতি ও আরেকজন তার বন্ধুর ছেলে। আমাদের ধারণা, ওই অভিযোগের কারণে প্রধান শিক্ষকসহ ওই নেতা আমাদের প্রতি অবিচার করেছেন।’
ওই ছাত্রী জানায়, অভিযোগের পর প্রধান শিক্ষক অভিযুক্তদের নিজ কক্ষে ডেকে মৃদু বকাঝকা ও ভবিষ্যতে এমন না করার জন্য বলেছিলেন। তবে তারা সেখান থেকে বের হয়েই অভিযোগকারী ছাত্রীদের হেনেস্তাসহ স্কুল থেকে বের করে দিবে বলে হুমকি দিয়েছিল বলে সে জানায়।
এ বিষয়ে কৃষক দল সভাপতি শামসুল আলম বলেন, ‘ওই বিদ্যালয়ে যারা লেখাপড়া করে, সবাই আমার আত্মীয়। আর যে অভিযোগের কথা ওরা বলছে, তার বিচার করা হয়েছে।’
স্কুল কমিটির সভাপতি আবু হেনা মোস্তফা বলেন, ‘সেখানে আমি ছিলাম না। গালমন্দ করার বিষয়টি তাই আমার জানা নেই।’
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক প্রিয়তোষ পাল বলেন, ‘এটি একটি সামান্য বিষয়। এখানে কোন গালমন্দের ঘটনা ঘটেনি।’ ছাড়পত্র নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘অভিভাবকরা চেয়েছেন আমি দিয়েছি।’
মহেশখালি মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাহিদুর রহমান বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আমি কিছুই জানি না। তবে কেউ যদি এভাবে করে গালমন্দ করে, এটি অন্যায়। এ বছরের এসএসসির ফলাফলের পর থেকেই স্কুলটিতে নানা সমস্যা দেখা দিয়েছে।’
উপজেলা কর্মকর্তা ইমরান মাহমুদ ডালিম বলেন, ‘আমি মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করব। এরপর দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিব।’
.png)






