চীনে রিয়েলিটি শো, জিতলে পুরস্কার হিসেবে মিলবে ‘চাকরি’
চাকরি পেতে সাধারণত পরীক্ষা, ইন্টারভিউ আর নানা ধাপ পেরোতে হয়। কিন্তু সেই চাকরি পেতে যদি আগে রিয়েলিটি শোতে নামতে হয়? চীনে এমনই এক টিভি শো চলছে, যেখানে প্রতিযোগীরা শুধু ক্যামেরার সামনে নিজেদের তুলে ধরেন না, বাস্তব কাজও করেন। দিনের পর দিন চলে পরীক্ষা, প্রতিযোগিতা আর ভুল থেকে শেখার লড়াই। শেষে সবার লক্ষ্য একটাই, কাঙ্ক্ষিত চাকরি।
স্ট্রিম ডেস্ক

কোনো ‘লোভনীয়’ চাকরির জন্য যদি একদল মেধাবী ও যোগ্যতাসম্পন্ন তরুণ একসঙ্গে প্রতিযোগিতা করে, তাহলে কী হতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজে চীনের জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো ‘এন এক্সসাইটিং অফার’।
দেশ-বিদেশের অনেক বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া চীনা শিক্ষার্থী ও সদ্য স্নাতক হওয়া তরুণদের নিয়ে এই অনুষ্ঠান। এক মাস ধরে তাঁরা বিশেষজ্ঞদের অধীনে ইন্টার্ন হিসেবে কাজ করেন। স্টুডিওতে থাকা একদল আলোচক অংশগ্রহণকারীদের বিভিন্ন কাজ, তাঁদের করা ভুল আর অগ্রগতি নিয়ে কথা বলেন।
দক্ষিণ কোরিয়ার ‘গুড পিপল’ অনুষ্ঠান থেকে এই শো-র ভাবনা নেওয়া হয়েছে। বর্তমান প্রজন্মের তরুণেরা ছোটবেলা থেকেই অন্যদের চেয়ে ভালো করার প্রতিযোগিতায় বড় হয়েছে। তাই সামনে এগিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি তাঁদের মনে কাজ করে পিছিয়ে পড়ার ভয়, নিজের যোগ্যতা নিয়ে দুশ্চিন্তা আর সবসময় ভালো করার চাপ। এসব বিষয় অনুষ্ঠানটিতে দেখানো হয়েছে।
গত বছর সেভেন সিজনে অনুষ্ঠানটি চলে যায় ড্রাগন টিভিতে। এটি চীনের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন প্রতিষ্ঠান সাংহাই মিডিয়া গ্রুপের একটি চ্যানেল।
অনুষ্ঠানের সেভেন সিজনে অংশ নেন ১০ জন তরুণ-তরুণী, যারা টেলিভিশন উপস্থাপক হতে চান। প্রথম পরীক্ষায় দুজন বাদ পড়েন। বাকি আটজন সাংহাই নেটওয়ার্কের নিউজরুমে ৩০ দিন থেকে বিভিন্ন অনুশীলনমূলক কাজে অংশগ্রহণ করেন।
এর মধ্যে ছিল খবর খোঁজা, তথ্যসূত্র বের করা ও তথ্য যাচাই করা, সংবাদ লেখা, সাক্ষাৎকার নেওয়া, ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রতিবেদন করা এবং সরাসরি সম্প্রচারে অংশ নেওয়া। আটটি ধাপে তাঁদের এই কাজগুলো করতে হয়। এর মধ্য দিয়ে দর্শকেরা জানতে পারেন, টেলিভিশনের পর্দায় দাঁড়িয়ে খবর পড়ার আগে একজন উপস্থাপককে কত ধরনের কাজ করতে হয়।
অনুষ্ঠানের জনপ্রিয়তা যেভাবে বেড়েছে
প্রতিযোগিতাকে আরও আকর্ষণীয় করতে অনুষ্ঠানে রিয়েলিটি শোর নানা উপাদান রাখা হয়েছে। তবে অন্য রিয়েলিটি শোর সঙ্গে এর পার্থক্য আছে। এখানে দর্শকদের ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই। পুরো অনুষ্ঠানেও কাউকে বাদ দেওয়া হয় না। প্রতিটি কাজের জন্য প্রতিযোগীরা পয়েন্ট পান। ১০০ পয়েন্ট পেলেই চূড়ান্ত সাক্ষাৎকারে যাওয়ার সুযোগ মেলে। সবশেষে একজন প্রতিযোগী ড্রাগন টিভিতে চাকরির প্রস্তাব পান।
২০১৯ সালে শুরু হওয়ার পর প্রথম চারটি সিজনে আইনজীবীদের নিয়ে অনুষ্ঠানটি করা হয়। টানা দুই মৌসুমে আইন পেশাকে ঘিরে অনুষ্ঠান হওয়ায় একসময় দর্শকদের কাছে তা কিছুটা একঘেয়ে হয়ে ওঠে। এরপর একটি সিজনে চিকিৎসক এবং আরেকটি সিজনে স্থপতিদের নিয়ে প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানটিকে নতুনভাবে সাজাতে ২০২৫ সালে চীনের বিনোদন প্ল্যাটফর্ম ‘টেনসেন্ট ভিডিও’ ড্রাগন টিভির সঙ্গে সহ-প্রযোজক হিসেবে যুক্ত হয়। এবার প্রতিযোগীদের জন্য খুলে দেওয়া হয় টেলিভিশনের নিউজরুম। তাঁদের প্রশিক্ষণের দায়িত্বে ছিলেন চীনের অভিজ্ঞ উপস্থাপক চেন লুয়ু। তাঁর সঙ্গে আরও কয়েকজন বিশেষজ্ঞ অংশ নেন। তাঁরা প্রতিযোগীদের সংবাদ ও উপস্থাপনার বিভিন্ন বিষয় শেখান। তাঁদের আলোচনা থেকে দর্শকেরাও টেলিভিশনে উপস্থাপনার নানা দিক জানতে পারেন।

অনুষ্ঠানে কমেডিয়ান ও ইন্টারনেট তারকারাও যুক্ত হন। তাঁদের উপস্থিতি প্রতিযোগিতার পাশাপাশি অনুষ্ঠানে বাড়তি বিনোদন যোগ করে।
ফলে নতুন এই সিজনটি দর্শকদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ওয়েইবোতে অনুষ্ঠানটি টানা ৫৬ দিন দুটি জনপ্রিয় অনুষ্ঠানের তালিকার শীর্ষে ছিল। ওয়েইবোতে অনুষ্ঠানটি নিয়ে ১ হাজার ২০০ বারের বেশি ট্রেন্ড তৈরি হয়। টেনসেন্ট ভিডিওর অনুষ্ঠানভিত্তিক ফোরামেও চার মিলিয়নের বেশি পোস্ট করা হয়।
চাকরির দুনিয়ায় নতুন বাস্তবতা
অনুষ্ঠানটি জনপ্রিয় হওয়ার একটি কারণ হলো তরুণদের মধ্যে টেলিভিশন উপস্থাপক হওয়ার আগ্রহ। তবে সময়ের সঙ্গে উপস্থাপকের কাজও বদলেছে। এখন শুধু টেলিভিশনে দাঁড়িয়ে খবর পড়াই উপস্থাপকের কাজ নয়। প্রতিদিন শত শত ইনফ্লুয়েন্সার লাখো মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন। আবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে এখন একইসঙ্গে সংবাদ লেখা, ভিডিওতে কণ্ঠ দেওয়া এমনকি সংবাদ উপস্থাপনাও করা সম্ভব।
অনুষ্ঠানের প্রতিযোগীদের যোগ্যতাও কম নয়। যেমন লি ইউজিয়া চায়না কমিউনিকেশন ইউনিভার্সিটিতে তাঁর ব্যাচে প্রথম হয়েছেন। পাং ঝেং সাংহাই থিয়েটার একাডেমিতে প্রথম হয়েছেন। ওয়াং ইউ পড়েছেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে। আর ওয়াং ইউনলিন এরই মধ্যে ক্যান্টনিজ টেলিভিশনে উপস্থাপক হিসেবে কাজ করেছেন।
তবে এত ভালো ফলাফল ও যোগ্যতাই তাঁদের জন্য নতুন চাপ তৈরি করে। এক পর্বে লি ইউজিয়া বলেন, ‘একসময় প্রথম হওয়াটা আমাকে গর্বিত করত। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, সেই প্রথম স্থানই কি আমার জন্য চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে?’
এখানেই অনুষ্ঠানটির মূল বিষয়টি সামনে আসে। প্রতিযোগীরা সবাই নিজেদের জায়গায় ভালো করতে অভ্যস্ত। কিন্তু এখানে এসে তাঁরা এমন এক পরিবেশে পড়েন, যেখানে সামান্য ভুলও অন্যদের সঙ্গে তুলনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আবার কোনো মেন্টর প্রশংসা করলেও মনে হয়, আরও ভালো করতে হবে।
চীনে এই পরিস্থিতিকে বোঝাতে ‘নেইজুয়ান’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। এর অর্থ হলো, সুযোগ কম থাকলেও সবাই টিকে থাকার জন্য আরও বেশি চেষ্টা করতে থাকে। একজন বেশি চেষ্টা করলে অন্যজনকেও আরও বেশি করতে হয়। এভাবে প্রতিযোগিতা বাড়তেই থাকে।
কিন্তু এত চেষ্টা করেও সবার জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হয় না। একজনকে টপকাতে গিয়ে আরেকজন আরও বেশি পরিশ্রম করেন, আবার তাঁকে টপকাতে অন্যজন আরও বেশি চেষ্টা করেন। এভাবে সবাই ছুটতে থাকেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সুযোগ থাকে সীমিত। এই পরিস্থিতিকে আমরা ‘ইঁদুরদৌড়’ বলতে পারি।
উদ্বেগ আর হতাশার গল্প
অনুষ্ঠানটির শুরুর দিকের মৌসুম থেকেই কিছু দর্শক মজা করে এর নাম দিয়েছিলেন ‘An offer to make you feel bad’। কারণ প্রতিযোগীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, পুরস্কার ও কাজের অভিজ্ঞতা দেখে অনেক দর্শকের নিজের জীবন নিয়েই হতাশা তৈরি হতে পারে। গত সিজনে যেমন আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ছিল ইন্টার্নশিপ শুরুর আগেই চীনের অন্যতম নামী বিশ্ববিদ্যালয় সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক স্নাতকের বাদ পড়ে যাওয়া।
অনুষ্ঠানের দর্শকদের বড় একটি অংশই উচ্চশিক্ষিত তরুণ। তারপরও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে এমন একটি সিজনের দাবি জানিয়েছেন, যেখানে ‘সাধারণ মানুষ’ অংশ নিতে পারবেন।
যে প্রজন্ম প্রতিদিন পড়াশোনা, চাকরি আর নানা প্রতিযোগিতার চাপের মধ্যে থাকে, তারাই অবসর সময়ে আবার অন্যদের চাকরি পাওয়ার লড়াই দেখতে বসে। পর্দায় অন্যদের এই লড়াই দেখতে গিয়ে তাঁরা নিজেদের জীবনেও মিল খুঁজে পান। ভালো করতে চাওয়া, ভুল হয়ে যাওয়া, চাপ অনুভব করা কিংবা ব্যর্থ হওয়ার ভয়—সবই তাঁদের কাছে পরিচিত অভিজ্ঞতা।
তবে অনুষ্ঠানটি শুধু চাপ বা হতাশার কথাই বলে না, দর্শকদের কিছুটা স্বস্তিও দেয়। বাস্তব জীবনে ভুল করলে অনেক সময় কেউ সেই ভুলের কারণ বুঝিয়ে দেন না। দ্বিতীয় সুযোগও সবসময় মেলে না। কিন্তু এই অনুষ্ঠানে প্রতিযোগীদের ভুল নিয়ে আলোচনা করা হয়। মেন্টররা তাঁদের ভুল ধরিয়ে দেন, কীভাবে আরও ভালো করা যায় তা শেখান। শেষ পর্যন্ত যোগ্যতা, পরিশ্রম, শৃঙ্খলা ও চেষ্টা গুরুত্ব পায়।
এ কারণেই এন এক্সসাইটিং অফার শুধু চাকরি পাওয়ার প্রতিযোগিতামূলক অনুষ্ঠান নয়। এর প্রতিযোগীরা সবাই ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন, নানা দক্ষতা অর্জন করেছেন এবং অন্যদের চেয়ে ভালো করার চেষ্টা করে এসেছেন। তারপরও তাঁদের মধ্যে কাজ করে পিছিয়ে পড়ার ভয়, নিজের যোগ্যতা নিয়ে দুশ্চিন্তা এবং নিজেকে বারবার প্রমাণ করার চাপ।
কারণ চাকরির বাজারে এসে তাঁরা বুঝতে পারেন, শুধু ভালো হলেই হয় না। ভালোদের ভিড়ে নিজেকে টিকিয়ে রাখাটাও এখন বড় পরীক্ষা।
- এল পাইস অবলম্বনে ফাবিহা বিনতে হক
.png)








