ad

সার্কিট হাউসের ভিআইপি কক্ষ থেকে মহাকাব্য, কোথায় নেই উইপোকা!

প্রাচীন যুগে উইপোকা মানুষের গায়ে ঢিবি বানিয়ে কাউকে ‘মহর্ষি’ বানাত, আর ২০২৬ সালে এসে কুমিল্লার সার্কিট হাউসে বিরোধী দলীয় উপনেতাকে ঘরছাড়া করে খবরের শিরোনাম বানাচ্ছে!

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক
ঢাকা

প্রকাশ : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫: ০৫
স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

জেলায় কোনো ভিআইপি এলে সাধারণত ওঠেন সার্কিট হাউসে। তেমনি কুমিল্লা সার্কিট হাউসের ‘রাধাচূড়া-২০২’ নম্বর কক্ষে উঠেছিলেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা ও কুমিল্লা-১১ আসনের সংসদ সদস্য সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। কিন্তু প্রায় মাঝরাতেই কক্ষ ত্যাগ করতে বাধ্য হন তিনি। কারণ তার আগেই ২০২ ছিল ‘প্রকৃতির ইঞ্জিনিয়ারদের’ দখলে।

উইপোকাকে প্রকৃতির ‘ইঞ্জিনিয়ার’ বলার কারণ তারা কোনো আধুনিক যন্ত্রপাতি, নকশা ছাড়াই মাটির নিচে ও ওপরে অবিশ্বাস্য স্থাপত্যশৈলীর ঢিবি ও সুড়ঙ্গ তৈরি করতে পারে। তাদের তৈরি এই মাটির ঢিবিগুলো প্রাকৃতিকভাবে সম্পূর্ণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। বাইরের তীব্র গরম কিংবা ঠাণ্ডার মধ্যেও ভেতরের তাপমাত্রা এবং বায়ু চলাচল একদম নিখুঁত! একই সঙ্গে, মাটির নিচে তারা মাইলের পর মাইল সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক তৈরি করে। শক্ত কাঠ ও জৈব পদার্থ ভেঙে মাটিকে উর্বর করে তোলে। কোনো কেন্দ্রীয় নেতা বা প্রধান প্রকৌশলী ছাড়াই লাখ লাখ উইপোকা মিলে নিখুঁত পরিকল্পনায় নিজেদের বাসস্থানের আমূল পরিবর্তন ঘটাতে পারে।

সরাসরি সূর্যালোক তাদের একদম পছন্দ নয়। ‘রাধাচূড়া-২০২’ নম্বর ভিআইপি কক্ষে উইপোকার উপস্থিতি অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও অস্বাভাবিক নয়। সরকারি সার্কিট হাউসগুলোর অনেক ভিআইপি কক্ষই দীর্ঘ সময় ধরে তালাবদ্ধ অবস্থায় খালি পরে থাকে। আলো-বাতাসহীন, স্যাঁতসেঁতে এবং আবদ্ধ পরিবেশ উইপোকার বংশবৃদ্ধি ও কলোনি তৈরির জন্য সবচেয়ে আদর্শ জায়গা।

সার্কিট হাউসের কক্ষগুলোতে সাধারণত পুরানো কাঠের আলমারি, ড্রেসিং টেবিল, দরজার ফ্রেম এবং ওয়াল প্যানেলিং থাকে। আলমারির ভেতরে থাকা সুতি কাপড় ও বালিশ-কম্বল উইপোকার প্রিয় খাবার (সেলুলোজ)। নিয়মিত ব্যবহার ও পরিষ্কার না করায় এগুলো উইপোকার নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়।

উইপোকারা ক্ষুদ্র হলেও রাষ্ট্র ও ইতিহাসের বড় বড় বয়ানে ঘুরে ফিরে এসেছে। রাজনৈতিক বক্তৃতায় প্রায়ই বলা হয়, ‘দুর্নীতি হলো রাষ্ট্রের কাঠামোর ভেতরে থাকা উইপোকা।’ যেমন একটি কাঠের ভবনের বাইরেটা দেখে মজবুত মনে হলেও ভেতরে উইপোকা খেলে ভবনটি আচমকা ধসে পড়ে, ঠিক তেমনি কোনো দেশের শাসনব্যবস্থায় দুর্নীতি-অব্যবস্থাপনা ঢুকে গেলে রাষ্ট্রব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে।

কুমিল্লা সার্কিট হাউজের ২০২ নম্বর কক্ষ দখলে নেওয়া উইপোকারা যেন রাষ্ট্রের দুর্বলতার দিকেই ইঙ্গিত করছে। সার্কিট হাউসে বিরোধীদলীয় উপনেতার মতো গুরুত্বপূর্ণ অতিথির কক্ষে উইপোকার দখলদারিত্ব, প্রশাসনিক পর্যায়ে রক্ষণাবেক্ষণের অবহেলাকে সামনে এনেছে।

উইপোকা ইতিহাসজুড়ে রাজপুরুষ, ঋষি এবং আমলাদের সমানভাবে শিক্ষা দিয়ে এসেছে। হিন্দু পৌরাণিক তথ্য অনুযায়ী, রামায়ণের রচয়িতা মহর্ষি বাল্মীকি যখন বছরের পর বছর কঠোর তপস্যায় মগ্ন ছিলেন, তখন তাঁর শরীর ঘিরে উইপোকা ঢিবি তৈরি করেছিল। সংস্কৃত ‘বল্মীক’ (উইপোকার ঢিবি) শব্দ থেকেই তাঁর নাম হয়েছিল ‘বাল্মীকি’।

প্রাচীন যুগে উইপোকা মানুষের গায়ে ঢিবি বানিয়ে কাউকে ‘মহর্ষি’ বানাত, আর ২০২৬ সালে এসে কুমিল্লার সার্কিট হাউসে বিরোধী দলীয় উপনেতাকে ঘরছাড়া করে খবরের শিরোনাম বানাচ্ছে!

কুমিল্লা সার্কিট হাউজের ২০২ নম্বর কক্ষ দখলে নেওয়া উইপোকারা যেন রাষ্ট্রের দুর্বলতার দিকেই ইঙ্গিত করছে। সার্কিট হাউসে বিরোধীদলীয় উপনেতার মতো গুরুত্বপূর্ণ অতিথির কক্ষে উইপোকার দখলদারিত্ব, প্রশাসনিক পর্যায়ে রক্ষণাবেক্ষণের অবহেলাকে সামনে এনেছে।

থাইল্যান্ডের লোকগাঁথায় উইপোকার ঢিবিকে ভূমির দেবী ‘ফরা মে থরানি’র সংকেত হিসেবে দেখা হতো। কোনো রাজকীয় বা প্রভাবশালী ব্যক্তি যদি উইপোকার বাসায় আঘাত হানতেন, তবে সাম্রাজ্যের অমঙ্গল নেমে আসবে বলে মনে করা হতো।

ইসলামি তাফসীরেও এসেছে উইপোকাদের কথা। তাতে জানা যায়, হযরত সুলাইমান (আ.) তাঁর ইবাদতখানায় কাঁচের ঘরের ভেতর লাঠিতে ভর দিয়ে আল্লাহর ইবাদতরত অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। আল্লাহ তাঁর দেহ অপরিবর্তিত রাখেন এবং উইপোকা (যাকে আরবিতে বলা হয়েছে ‘দাব্বাতুল আরদ্ব’) ধীরে ধীরে তাঁর কাঠের লাঠিটি ভেতরে ভেতরে খেতে থাকে। প্রায় এক বছর পর লাঠিটি দুর্বল হয়ে ভেঙে পড়লে তাঁর দেহ ভূমিতে পতিত হয়, এবং তখনই জিন জাতি জানতে পারে তিনি আগেই ইন্তেকাল করেছেন।

মধ্যযুগে রাজ-রাজড়ারা সবচেয়ে বেশি ভয় পেতেন উইপোকাকে। মুঘল সম্রাটদের গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব নথি এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রাথমিক কাঠামোগত নথিগুলোর একটি বড় অংশ যুদ্ধ ছাড়াই উইপোকা খেয়ে সাবাড় করেছিল।

প্রতিপক্ষকে ছোট করতেও ‘উইপোকা’ শব্দ ব্যবহারের চল দেখা যায়। ২০১৭ সালে ভারতের গুজরাট ও হিমাচল প্রদেশের বিধানসভা নির্বাচনের সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিরোধী দল কংগ্রেসকে ‘উইপোকা’র সঙ্গে তুলনা করে ভোটারদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, ‘যেসব জায়গায় এই উইপোকা ধরেছে, তা উপড়ে ফেলতে হবে।’

পরবর্তীতে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বাংলাদেশ থেকে যাওয়া ‘অবৈধ’ অভিবাসীদের ‘উইপোকা’ আখ্যা দিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছিলেন।

সাধারণ মানুষের কাছে বিরোধীদের অস্তিত্বকে ‘ক্ষতিকর’ হিসেবে দেখাতেও ‘উইপোকা’ শব্দ ব্যবহারের একটি ঝোঁক দেখা গেছে।

১৯৫৪ সালে ব্রিটিশ সেনারা মালয়েশিয়ার জঙ্গলে কমিউনিস্ট গেরিলাদের ধ্বংস করতে একটি বড় সামরিক অভিযানের নাম দিয়েছিল অপারেশন টারমাইট। অর্থাৎ, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ‘উইপোকা’ বলে আখ্যা দেওয়ার রেওয়াজ বেশ পুরনো।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত