চা-পাতার ভর্তা ‘পাতিচখা’ আর রুটি খেয়ে কাটে চা-শ্রমিকের দুপুর
স্ট্রিম সংবাদদাতামৌলভীবাজার

ভোরের আলো ফুটতেই আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ ধরে কাজে ছুটতে শুরু করেন চা শ্রমিকেরা। কারও মাথায় ঝুড়ি, কারও কাঁধে কাপড় প্যাঁচানো পাতা-ভর্তি ব্যাগ। সারি সারি সবুজ চা বাগানে শুরু হয় তাঁদের ব্যস্ততা। কচি চা-পাতা তুলতে তুলতে সকাল গড়িয়ে যায়।
দুপুর হলে সেই ব্যস্ততায় কিছুটা বিরতি আসে। গাছের ছায়ায় বসে পড়েন কয়েকজন শ্রমিক। কারও হাতে মুড়ি, কারও পান্তা ভাত। কেউ বের করেন সঙ্গে আনা আটার মোটা রুটি। সেই রুটির সঙ্গে থাকে চা-পাতা দিয়ে তৈরি এক ধরনের ভর্তা, চা শ্রমিকদের ভাষায় নাম তার ‘পাতিচখা’।
‘পাতিচখা’ বা চা-পাতার ভর্তা চা শ্রমিকদের পরিচিত খাবার। চা-পাতা দিয়ে তৈরি এই খাবার অনেকেই দুপুরে রুটির সঙ্গে খান। অনেকের সঙ্গে থাকে লবণ দিয়ে জ্বাল দেওয়া চা-পাতার পানিও। শ্রমিকেরা জানান, বহুদিন ধরে বাগানে কাজের সময় তাঁরা এই খাবার খেয়ে আসছেন।

নারী চা শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভোরে বাড়ি থেকে বের হয়ে দীর্ঘসময় বাগানে থাকতে হয় তাঁদের। সঙ্গে রান্না করা ভাত নিয়ে এলে তা অনেকক্ষণ ভালো থাকে না। আর ভাতের সঙ্গে অন্তত একটি তরকারী তো লাগেই। তাই অনেকে রুটি নিয়ে আসেন।
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী শমশেরনগর ইউনিয়নের কানিহাটি চা-বাগানে গিয়ে দেখা যায় এমনই এক দুপুরের চিত্র। শনিবার দুপুর ২টার দিকে চা-পাতা ওজন করে গাড়িতে তোলার অপেক্ষায় ছিলেন শ্রমিকেরা। কাজের ফাঁকে কেউ গাছের ছায়ায় বসে খাবার খাচ্ছিলেন, কেউ আবার অপেক্ষা করছিলেন পাতা ওজনের জন্য।
চা-বাগানের নারী শ্রমিক নিয়তী রানীর কথায় উঠে আসে সংসারের টানাপোড়েনের বাস্তবতা। তিনি বলেন, ‘ঘরে চাল থাকে না, ডাল বা তরকারি তো বিলাসিতা। রুটি বানিয়ে নিই, আর চায়ের কুঁড়ি দিয়ে পাতিচখা বানিয়ে খাই। কখনো কাঁচা, কখনো ভেজে নেই। তাতেই দিন চলে যায়।’
শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সপ্তাহের ছয় দিনই তাঁদের কাজ করতে হয়। সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত বাগানে কাজ করার পরও তাঁদের দিনের পরিশ্রম শেষ হয় না। ঘরে ফেরার পর অপেক্ষা করে রান্না, পানি সংগ্রহ, সন্তানদের দেখাশোনাসহ নানা কাজ।

একজন নারী শ্রমিক বলেন, ‘সপ্তাহে ছয় দিন সকালে আটটায় কাজে ঢুকি, বিকেল পাঁচটায় ছুটি। ঘরে ফিরে আবার রান্না, পানি আনা, বাচ্চাদের দেখভাল—সব করতে হয়।’
বাগান দূরে হলে ভোরের আগেই ঘর থেকে বের হতে হয়। অনেক শ্রমিক কয়েক কিলোমিটার হেঁটে কর্মস্থলে আসেন। দিনের শেষে তাঁদের হাতে আসে প্রায় ১৭৮ টাকা। আবার নির্ধারিত পরিমাণ চা-পাতা তুলতে না পারলে মজুরি কমে যাওয়ার আশঙ্কাও থাকে। এই ‘পাতিচখা’ যেন চা শ্রমিক পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতার প্রতীক।
মৌলভীবাজারে রয়েছে ৯২টি চা-বাগান। দেশের চা উৎপাদনের একটি বড় অংশ আসে এই অঞ্চল থেকে। চা শিল্পের পাশাপাশি পর্যটনের জন্যও মৌলভীবাজারের আলাদা পরিচিতি রয়েছে। শত বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে চা শিল্পের বিকাশ ঘটলেও এই শিল্পের অন্যতম প্রধান শক্তি চা শ্রমিকদের জীবনমান এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তাঁদের অনেকের বসতঘর পুরোনো ও জরাজীর্ণ। স্যানিটেশন ব্যবস্থা দুর্বল, স্বাস্থ্যসেবাও সীমিত। শিশুদের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকলেও শিক্ষার মান নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন।
ফলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম চা-বাগানকেন্দ্রিক জীবন কাটানো এই মানুষগুলোর একটি বড় অংশ এখনো দারিদ্র্য, অপুষ্টি ও নানা সামাজিক সংকটের সঙ্গে লড়াই করছেন। দূর থেকে চা-পাতা তোলার কাজ যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে তা ততটাই পরিশ্রমের। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঝুঁকে কাজ করতে হয়। গরম, বৃষ্টি কিংবা কাদামাটি-কোনোটিই তাদের কাজ থামায় না।

শ্রমিকদের কেউ কেউ জানান, দীর্ঘসময় কাজ করার ফলে পা ফুলে যায়, হাতে কড়া পড়ে, কখনো চামড়াও উঠে যায়। তবু সংসারের প্রয়োজনেই পরদিন আবার একই পথে হাঁটতে হয়। কারণ একদিন কাজ বন্ধ মানেই একদিনের আয় কমে যাওয়া। আর আয় কমলে কমে যায় পরিবারের খাবারের পরিমাণও।
কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সন্দ্বীপ তালুকদার বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে চা শ্রমিকদের পাশে থাকার চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘কেউ অসুস্থ হলে খোঁজ নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। পাশাপাশি কমলগঞ্জ উপজেলার ১২ হাজার ৫৯২ জন চা শ্রমিকের মাঝে প্রতি মাসে ৬৫০ টাকা করে দেওয়া হচ্ছে। এটি বাড়িয়ে ৭০০ টাকা করা হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে চা শ্রমিকরা বর্ধিত অর্থ পাবেন।’
চা-বাগানে শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ নিয়েও উদ্বেগের কথা জানান তিনি। সন্দ্বীপ তালুকদার বলেন, ‘চা-বাগানে পাতা তোলার কাজে শ্রমিকদের স্যানিটেশনের প্রয়োজন হয়, কিন্তু অনেক জায়গায় সেটি নেই। পাশাপাশি চা শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও পুষ্টির বিষয়েও বাগান ব্যবস্থাপকদের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করব।’
তিনি আরও বলেন, ‘চা শ্রমিকরা খুব কষ্টে জীবনযাপন করেন। তাঁদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য সরকার কাজ করছে।’
.png)








-23faa3-256x144.webp)