নাজিয়া আফরিন

আমরা যারা নব্বইয়ের দশকে বেড়ে উঠছিলাম, ‘ডিশের লাইনের’ মাধ্যমে আমাদের ঘরে ঢুকে পড়েছিল ফ্রেন্ডস, সাইনফিল্ড, ম্যালকম ইন দ্য মিডল, স্ক্রাবসের মতো বহু সিটকম। প্রায় কুড়ি বছর পর, ১০ এপ্রিল ম্যালকম ইন দ্য মিডলকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে চার পর্বের মিনিসিরিজ হিসেবে। স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম হুলুতে মুক্তি পাওয়ার প্রথম তিন দিনেই এটি ৮০ লাখের বেশি ভিউ হয়েছে। না, দারুণ গল্প, অসামান্য প্লট, ক্ষুরধার সংলাপ কিংবা পুরোনো কলাকুশলী নয়; এ সাফল্য এক ইন্ডাস্ট্রির, যা গড়ে উঠেছে স্মৃতিকে পণ্য বানানোর ওপর নির্ভর করে। এর নাম, নস্টালজিয়া ইন্ডাস্ট্রি।

স্মৃতির গায়ে দাম লেখা থাকে
ছোটবেলায় স্মৃতি ছিল খুব গোপন কোনো কিছু। ড্রয়ারে রাখা পুরনো ছবি বা চিঠির মতো গোপন। সেই অনুভূতির কোনো দাম কি ধরা যায়? এখন যায়।
৩৫ থেকে ৫৪ বছর বয়সী মানুষগুলো, যারা ২০০০ এর দশকের সেই সিটকমগুলো দেখে বড় হয়েছে, তারাই এখন স্ট্রিমিংয়ের সবচেয়ে বড় গ্রাহক। তারা নস্টালজিয়া কনটেন্টের প্রতি ২ দশমিক ৩ গুণ বেশি আবেগপ্রবণ এবং সেই আবেগ তাদের অপরিকল্পিত ক্রয়ের দিকে নিয়ে যায়। পিউ রিসার্চ নামের গবেষণা প্রতিষ্ঠান মানুষের স্মৃতির বাজারমূল্য মেপে এ তথ্যগুলো বের করে এনেছে।
কী, অস্বস্তি হয়? আমারও হয়। কারণ নস্টালজিয়া এখন আর কেবল অনুভূতি নয়, এটা একটা মার্কেটিং ক্যাটাগরি। ব্রায়ান ক্র্যান্সটন বলেছেন, ‘এ মুহূর্তে কমেডি জরুরি’ এবং কথাটা মিথ্যা নয়। তবে তিনি যা বলেননি, তা হলো কেন কমেডি এখন ফিরে আসছে। কারণ প্ল্যাটফর্মগুলো হিসেব কষে দেখেছে, এই ভীষণ অস্থির ও অশান্ত বিশ্বে মানুষ ক্লান্ত। আর ক্লান্ত মানুষের কাছে পরিচিত হাসি সহজে বিক্রি করা যায়।

অ্যালগরিদম এবং আমাদের দেখার অভ্যাস
নেটফ্লিক্স খুললেই ভাবি, নতুন কিছু দেখব। নেটফ্লিক্স আমাকে দেখায়, বাংলাদেশের শীর্ষ দশ, বিশ্বের শীর্ষ দশ, আমার জন্য ‘টপ পিক ফর টুডে’ এবং চোখের সামনে ভাসে ফ্রেন্ডস, দ্য অফিস, দ্য মেন্টালিস্ট, সাইনফিল্ড। এগুলো আমার পছন্দ, না অ্যালগরিদমের?
স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলো এখন আর শুধু কন্টেন্ট দেখায় না। তারা ‘রিটেনশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ করে। মানে, তারা চায় আমি যেন সাবস্ক্রাইব করা বন্ধ না করি। আর সেক্ষেত্রে সবচেয়ে নিরাপদ উপায় হলো আমাকে সেটাই দেখানো, যেটা আমার আগে ভালো লেগেছে এবং যেটার সঙ্গে আমার পুরনো সম্পর্ক আছে। অ্যালগরিদম এভাবেই কাজ করে। সে আমার ভিউয়িং হিস্ট্রি পড়ে, আমার অনুভূতির প্যাটার্ন বোঝে, এবং সেই অনুযায়ী আমার সামনে কনটেন্ট সাজায়। নতুন, ঝুঁকিপূর্ণ, অপরিচিত কিছু নয়। পরিচিত, আরামদায়ক, ‘নিরাপদ’ কিছু।
এই প্রক্রিয়ায় আমরা একটা লুপে আটকে যাই। আমি পুরনো শো দেখি, প্ল্যাটফর্ম বোঝে আমি পুরনো শো পছন্দ করি, সে আরও পুরনো শো বা তার রিবুট সামনে আনে, আমি সেটা দেখি। একই চক্রে ঘুরপাক খেতে থাকি।
আর রিলস? সে তো আরও ভয়ঙ্কর। কারণ রিলে নস্টালজিয়া আরও চেপেচুপে, আরও ঘন করে দেওয়া হয়। ৩০ সেকেন্ডে ফ্রেন্ডসের একটা দৃশ্য, ম্যালকম ইন দ্য মিডলের একটা সংলাপ, নব্বইয়ের দশকের কোনো বিজ্ঞাপন। দেখামাত্র ডোপামিন রাশ। আমরা ছুটি পরের রিলের দিকে। এখানে নস্টালজিয়া গভীর ও গোপন অনুভূতির খোলস ছেড়ে একটা ট্রিগার, একটা বেইট হয়ে ওঠে।
রিবুটের রাজনীতি
২০২৬ সালে শুধু ম্যালকম ইন দ্য মিডল নয়, প্রায় একশোটা এমন পুরোনো শো নানা সংস্করণে ফিরছে। সিকুয়াল, রিবুট, স্পিন অফ বা অ্যাডাপ্টেশন। এর মধ্যে রয়েছে দ্য ডেভিল ওয়্যারস প্রাডা এবং প্র্যাক্টিকাল ম্যাজিকের মতো জনপ্রিয় চলচ্চিত্রও।

এই তালিকাটা দেখলে মনে একটা সরল প্রশ্ন জাগে: জগতে কি নতুন গল্প নেই?
প্রশ্নটা সহজ আর উত্তরও জানা তবে অস্বস্তিকর। নতুন গল্পে ঝুঁকি আছে। একটা পরিচিত চরিত্র, পরিচিত গল্পের জগৎ বিক্রি করা অনেক সহজ। ডিজনি জানে ম্যালকম ইন দ্য মিডলের একটা বিল্ট ইন অডিয়েন্স আছে। সেই অডিয়েন্সকে রিঅ্যাক্টিভেট করতে তেমন কোনো শ্রমক্ষয়ের প্রয়োজন নেই, নস্টালজিয়াই যথেষ্ট। বুঝতে পারছেন তো, নস্টালজিয়ার ইন্ডাস্ট্রির কোর বিজনেস মডেলটা কি!
ফ্যাশন ও বিউটি প্ল্যাটফর্ম এনএসএস জি—ক্লাব একটা লেখায় সরাসরি বলছে, ‘পুঁজিবাদ দারুণভাবে ভোক্তার অনুভূতি এবং চাহিদা ভেদ করতে পারে এবং যখনই সম্ভব, তার চেয়ে নিচু মানের সংস্করণ সরবরাহ করতে পারে যেটা নিখুঁতভাবে সাজানো।’
এটাই বাস্তব। নস্টালজিয়া কার্যক্রমে জয় নিশ্চিত, কারণ আমরা আমাদের স্মৃতির বিরুদ্ধে যেতে পারি না। আমরা জানি, রিবুটটা হয়তো আসলটার মতো হবে না, তবু দেখি। কারণ সেই দেখায় লুকোনা থাকে সেই ছোট্ট আশা, হয়তো সেই পুরনো অনুভূতিটা ফিরে পাব। আর সেই আশাটাই সবচেয়ে বড় পণ্য।
অস্থির সময়ে পরিচিত সুখ
বিনোদনবিষয়ক আইনজীবী পিটার কফম্যান বলেছেন, ‘এই প্রজন্ম একটা স্থিতিশীল সময়ের অনুভবের প্রতি নস্টালজিক।’ অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, তথ্যের প্লাবন মিলিয়ে আমরা একটা অস্থির সময়ে বেঁচে আছি। এই পরিবেশে মানুষ স্বস্তি খোঁজে।
আর সেই স্বস্তির সবচেয়ে সহজলভ্য উৎস ‘পুরানো সেই দিনের কথা’।
যে মানুষটা সারাদিন অফিসে কাজ সেরে ক্লান্ত হয়ে রাতে বসে ফ্রেন্ডস রিওয়াচ করছে, সে কি ভুল করছে? সম্ভবত না। সে শুধু একটু বিশ্রাম নিচ্ছে। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়। সমস্যা হলো যখন একজন ব্যক্তির স্বস্তিকে ব্যবস্থাগত শোষণের যন্ত্রে পরিণত করা হয়। যখন প্ল্যাটফর্মগুলো সচেতনভাবে এমন কন্টেন্ট স্ট্র্যাটেজি নেয় যা মানুষকে নতুনের দিকে না নিয়ে গিয়ে পুরনোর মধ্যে আটকে রাখে। যখন অ্যালগরিদম মানুষের সৃজনশীল আগ্রহকে দমিয়ে তার স্বস্তির ক্ষেত্রের পুনরুৎপাদন করতে থাকে। তখন সেটা আর ব্যক্তিগত পছন্দ থাকে না, নির্মিত আকাঙক্ষায় পরিণত হয়।
রিলস, শর্টস এবং নস্টালজিয়ার মাইক্রো ডোজ
এই প্রবণতাটা রিলসে আরও প্রকট। আমি যখন ইন্সটাগ্রাম বা ফেসবুকে রিলস বা শর্টস স্ক্রল করি, তখন ঘুরে ঘুরে আসতে থাকে পুরনো গানের ক্লিপ, পুরনো কার্টুনের দৃশ্য, নব্বইয়ের দশকের খেলনা বা বিজ্ঞাপনের ছবি। কয়েক সেকেন্ডের ক্লিপ, কিন্তু রিঅ্যাকশন সেকশনে হাজারো মানুষ লিখছে—‘ছোটবেলা মনে পড়ে গেল’, ‘এটা দেখেই কান্না পেয়ে গেল।’ এই কান্নাটাও এখন প্ল্যাটফর্মের এনগেজমেন্ট মেট্রিক।
অ্যালগরিদম জানে, নস্টালজিক কন্টেন্ট বেশি লাইক পায়, বেশি শেয়ার হয়, বেশি কমেন্ট আসে। তাই সে সেই কন্টেন্টকে বেশি পুশ করে। কন্টেন্ট ক্রিয়েটররাও সচেতনভাবে নস্টালজিয়া বেটিং করেন। এমন কিছু বানান যা মানুষের পুরনো স্মৃতিকে ট্রিগার করবে। এভাবে নস্টালজিয়া একটা ফর্মুলা হয়ে যায়।
সে কি ভোলা যায়
আমি জানি এটা পড়তে পড়তে হয়তো অনেকে ভাবছেন, তাহলে কি দেখাই বন্ধ করব? পুরনো সিরিজ আর দেখব না? না। সেটা বলছি না।
আমি নিজেও দেখি। পুরনো শো, পুরনো ছবি। কিন্তু আমি চাই সেই দেখাটা সচেতন হোক। আমি চাই আমরা বুঝতে পারি কখন আমরা সত্যিই কিছু দেখতে চাইছি, আর কখন অ্যালগরিদম আমাদের দেখাচ্ছে। কখন নস্টালজিয়া আমার নিজের, আর কখন সেটা কেউ আমার কাছে ‘বিক্রি’ করছে।

আমরা যারা নব্বইয়ের দশকে বেড়ে উঠছিলাম, ‘ডিশের লাইনের’ মাধ্যমে আমাদের ঘরে ঢুকে পড়েছিল ফ্রেন্ডস, সাইনফিল্ড, ম্যালকম ইন দ্য মিডল, স্ক্রাবসের মতো বহু সিটকম। প্রায় কুড়ি বছর পর, ১০ এপ্রিল ম্যালকম ইন দ্য মিডলকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে চার পর্বের মিনিসিরিজ হিসেবে। স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম হুলুতে মুক্তি পাওয়ার প্রথম তিন দিনেই এটি ৮০ লাখের বেশি ভিউ হয়েছে। না, দারুণ গল্প, অসামান্য প্লট, ক্ষুরধার সংলাপ কিংবা পুরোনো কলাকুশলী নয়; এ সাফল্য এক ইন্ডাস্ট্রির, যা গড়ে উঠেছে স্মৃতিকে পণ্য বানানোর ওপর নির্ভর করে। এর নাম, নস্টালজিয়া ইন্ডাস্ট্রি।

স্মৃতির গায়ে দাম লেখা থাকে
ছোটবেলায় স্মৃতি ছিল খুব গোপন কোনো কিছু। ড্রয়ারে রাখা পুরনো ছবি বা চিঠির মতো গোপন। সেই অনুভূতির কোনো দাম কি ধরা যায়? এখন যায়।
৩৫ থেকে ৫৪ বছর বয়সী মানুষগুলো, যারা ২০০০ এর দশকের সেই সিটকমগুলো দেখে বড় হয়েছে, তারাই এখন স্ট্রিমিংয়ের সবচেয়ে বড় গ্রাহক। তারা নস্টালজিয়া কনটেন্টের প্রতি ২ দশমিক ৩ গুণ বেশি আবেগপ্রবণ এবং সেই আবেগ তাদের অপরিকল্পিত ক্রয়ের দিকে নিয়ে যায়। পিউ রিসার্চ নামের গবেষণা প্রতিষ্ঠান মানুষের স্মৃতির বাজারমূল্য মেপে এ তথ্যগুলো বের করে এনেছে।
কী, অস্বস্তি হয়? আমারও হয়। কারণ নস্টালজিয়া এখন আর কেবল অনুভূতি নয়, এটা একটা মার্কেটিং ক্যাটাগরি। ব্রায়ান ক্র্যান্সটন বলেছেন, ‘এ মুহূর্তে কমেডি জরুরি’ এবং কথাটা মিথ্যা নয়। তবে তিনি যা বলেননি, তা হলো কেন কমেডি এখন ফিরে আসছে। কারণ প্ল্যাটফর্মগুলো হিসেব কষে দেখেছে, এই ভীষণ অস্থির ও অশান্ত বিশ্বে মানুষ ক্লান্ত। আর ক্লান্ত মানুষের কাছে পরিচিত হাসি সহজে বিক্রি করা যায়।

অ্যালগরিদম এবং আমাদের দেখার অভ্যাস
নেটফ্লিক্স খুললেই ভাবি, নতুন কিছু দেখব। নেটফ্লিক্স আমাকে দেখায়, বাংলাদেশের শীর্ষ দশ, বিশ্বের শীর্ষ দশ, আমার জন্য ‘টপ পিক ফর টুডে’ এবং চোখের সামনে ভাসে ফ্রেন্ডস, দ্য অফিস, দ্য মেন্টালিস্ট, সাইনফিল্ড। এগুলো আমার পছন্দ, না অ্যালগরিদমের?
স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলো এখন আর শুধু কন্টেন্ট দেখায় না। তারা ‘রিটেনশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ করে। মানে, তারা চায় আমি যেন সাবস্ক্রাইব করা বন্ধ না করি। আর সেক্ষেত্রে সবচেয়ে নিরাপদ উপায় হলো আমাকে সেটাই দেখানো, যেটা আমার আগে ভালো লেগেছে এবং যেটার সঙ্গে আমার পুরনো সম্পর্ক আছে। অ্যালগরিদম এভাবেই কাজ করে। সে আমার ভিউয়িং হিস্ট্রি পড়ে, আমার অনুভূতির প্যাটার্ন বোঝে, এবং সেই অনুযায়ী আমার সামনে কনটেন্ট সাজায়। নতুন, ঝুঁকিপূর্ণ, অপরিচিত কিছু নয়। পরিচিত, আরামদায়ক, ‘নিরাপদ’ কিছু।
এই প্রক্রিয়ায় আমরা একটা লুপে আটকে যাই। আমি পুরনো শো দেখি, প্ল্যাটফর্ম বোঝে আমি পুরনো শো পছন্দ করি, সে আরও পুরনো শো বা তার রিবুট সামনে আনে, আমি সেটা দেখি। একই চক্রে ঘুরপাক খেতে থাকি।
আর রিলস? সে তো আরও ভয়ঙ্কর। কারণ রিলে নস্টালজিয়া আরও চেপেচুপে, আরও ঘন করে দেওয়া হয়। ৩০ সেকেন্ডে ফ্রেন্ডসের একটা দৃশ্য, ম্যালকম ইন দ্য মিডলের একটা সংলাপ, নব্বইয়ের দশকের কোনো বিজ্ঞাপন। দেখামাত্র ডোপামিন রাশ। আমরা ছুটি পরের রিলের দিকে। এখানে নস্টালজিয়া গভীর ও গোপন অনুভূতির খোলস ছেড়ে একটা ট্রিগার, একটা বেইট হয়ে ওঠে।
রিবুটের রাজনীতি
২০২৬ সালে শুধু ম্যালকম ইন দ্য মিডল নয়, প্রায় একশোটা এমন পুরোনো শো নানা সংস্করণে ফিরছে। সিকুয়াল, রিবুট, স্পিন অফ বা অ্যাডাপ্টেশন। এর মধ্যে রয়েছে দ্য ডেভিল ওয়্যারস প্রাডা এবং প্র্যাক্টিকাল ম্যাজিকের মতো জনপ্রিয় চলচ্চিত্রও।

এই তালিকাটা দেখলে মনে একটা সরল প্রশ্ন জাগে: জগতে কি নতুন গল্প নেই?
প্রশ্নটা সহজ আর উত্তরও জানা তবে অস্বস্তিকর। নতুন গল্পে ঝুঁকি আছে। একটা পরিচিত চরিত্র, পরিচিত গল্পের জগৎ বিক্রি করা অনেক সহজ। ডিজনি জানে ম্যালকম ইন দ্য মিডলের একটা বিল্ট ইন অডিয়েন্স আছে। সেই অডিয়েন্সকে রিঅ্যাক্টিভেট করতে তেমন কোনো শ্রমক্ষয়ের প্রয়োজন নেই, নস্টালজিয়াই যথেষ্ট। বুঝতে পারছেন তো, নস্টালজিয়ার ইন্ডাস্ট্রির কোর বিজনেস মডেলটা কি!
ফ্যাশন ও বিউটি প্ল্যাটফর্ম এনএসএস জি—ক্লাব একটা লেখায় সরাসরি বলছে, ‘পুঁজিবাদ দারুণভাবে ভোক্তার অনুভূতি এবং চাহিদা ভেদ করতে পারে এবং যখনই সম্ভব, তার চেয়ে নিচু মানের সংস্করণ সরবরাহ করতে পারে যেটা নিখুঁতভাবে সাজানো।’
এটাই বাস্তব। নস্টালজিয়া কার্যক্রমে জয় নিশ্চিত, কারণ আমরা আমাদের স্মৃতির বিরুদ্ধে যেতে পারি না। আমরা জানি, রিবুটটা হয়তো আসলটার মতো হবে না, তবু দেখি। কারণ সেই দেখায় লুকোনা থাকে সেই ছোট্ট আশা, হয়তো সেই পুরনো অনুভূতিটা ফিরে পাব। আর সেই আশাটাই সবচেয়ে বড় পণ্য।
অস্থির সময়ে পরিচিত সুখ
বিনোদনবিষয়ক আইনজীবী পিটার কফম্যান বলেছেন, ‘এই প্রজন্ম একটা স্থিতিশীল সময়ের অনুভবের প্রতি নস্টালজিক।’ অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, তথ্যের প্লাবন মিলিয়ে আমরা একটা অস্থির সময়ে বেঁচে আছি। এই পরিবেশে মানুষ স্বস্তি খোঁজে।
আর সেই স্বস্তির সবচেয়ে সহজলভ্য উৎস ‘পুরানো সেই দিনের কথা’।
যে মানুষটা সারাদিন অফিসে কাজ সেরে ক্লান্ত হয়ে রাতে বসে ফ্রেন্ডস রিওয়াচ করছে, সে কি ভুল করছে? সম্ভবত না। সে শুধু একটু বিশ্রাম নিচ্ছে। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়। সমস্যা হলো যখন একজন ব্যক্তির স্বস্তিকে ব্যবস্থাগত শোষণের যন্ত্রে পরিণত করা হয়। যখন প্ল্যাটফর্মগুলো সচেতনভাবে এমন কন্টেন্ট স্ট্র্যাটেজি নেয় যা মানুষকে নতুনের দিকে না নিয়ে গিয়ে পুরনোর মধ্যে আটকে রাখে। যখন অ্যালগরিদম মানুষের সৃজনশীল আগ্রহকে দমিয়ে তার স্বস্তির ক্ষেত্রের পুনরুৎপাদন করতে থাকে। তখন সেটা আর ব্যক্তিগত পছন্দ থাকে না, নির্মিত আকাঙক্ষায় পরিণত হয়।
রিলস, শর্টস এবং নস্টালজিয়ার মাইক্রো ডোজ
এই প্রবণতাটা রিলসে আরও প্রকট। আমি যখন ইন্সটাগ্রাম বা ফেসবুকে রিলস বা শর্টস স্ক্রল করি, তখন ঘুরে ঘুরে আসতে থাকে পুরনো গানের ক্লিপ, পুরনো কার্টুনের দৃশ্য, নব্বইয়ের দশকের খেলনা বা বিজ্ঞাপনের ছবি। কয়েক সেকেন্ডের ক্লিপ, কিন্তু রিঅ্যাকশন সেকশনে হাজারো মানুষ লিখছে—‘ছোটবেলা মনে পড়ে গেল’, ‘এটা দেখেই কান্না পেয়ে গেল।’ এই কান্নাটাও এখন প্ল্যাটফর্মের এনগেজমেন্ট মেট্রিক।
অ্যালগরিদম জানে, নস্টালজিক কন্টেন্ট বেশি লাইক পায়, বেশি শেয়ার হয়, বেশি কমেন্ট আসে। তাই সে সেই কন্টেন্টকে বেশি পুশ করে। কন্টেন্ট ক্রিয়েটররাও সচেতনভাবে নস্টালজিয়া বেটিং করেন। এমন কিছু বানান যা মানুষের পুরনো স্মৃতিকে ট্রিগার করবে। এভাবে নস্টালজিয়া একটা ফর্মুলা হয়ে যায়।
সে কি ভোলা যায়
আমি জানি এটা পড়তে পড়তে হয়তো অনেকে ভাবছেন, তাহলে কি দেখাই বন্ধ করব? পুরনো সিরিজ আর দেখব না? না। সেটা বলছি না।
আমি নিজেও দেখি। পুরনো শো, পুরনো ছবি। কিন্তু আমি চাই সেই দেখাটা সচেতন হোক। আমি চাই আমরা বুঝতে পারি কখন আমরা সত্যিই কিছু দেখতে চাইছি, আর কখন অ্যালগরিদম আমাদের দেখাচ্ছে। কখন নস্টালজিয়া আমার নিজের, আর কখন সেটা কেউ আমার কাছে ‘বিক্রি’ করছে।

সম্প্রতি নেটস্ফিয়ার থিকা পলিটিক্যাল স্ফিয়ার–মোটামুটি সব জায়গাতেই একটা শব্দ প্রচুর শোনা যাইতেছে। সেই শব্দটা হইতেছে ‘গুপ্ত’।
১ দিন আগে
গতরাতে আমি স্ক্রল করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছি। ফেসবুক থেকে ইনস্টাগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম থেকে টিকটক। এক ভিডিও শেষ হয়ে আরেকটা শুরু হয়। মুখ আসে, মুখ যায়। কোথাও বিয়ে, কোথাও ব্রেকআপ, কোথাও প্রতিবাদ, কোথাও নিখুঁত সাজানো ‘গার্ল ডিনার’। কোথাও কেউ তিরিশ সেকেন্ডে তার পুরো ট্রমা হিল করে ফেলছে—ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছে
৮ দিন আগে
বাংলাদেশে এক সময়ে যাত্রার যে রমরমা অবস্থা ছিল, বলা চলে আকাশ ছোঁয়া শিল্পী গোষ্ঠী তারই বিবর্তন। তাদের কস্টিউম, মেকআপ, এমনকি অভিনয়ের ধরনেও তারা যাত্রার প্রচন্ড হাইপার থিয়েট্রিকালিটিকে অনুসরণ করেন।
১০ দিন আগে
আগে আমি গান করতাম। আমার কিছু গান এখনো ইউটিউবে পাওয়া যায়, যা মোটামুটি ১০ থেকে ৪০ হাজার মানুষ শুনছেন। একদিন আমার চ্যানেলের কমেন্ট সেকশন ঘাটতে গিয়া একটা কমেন্টে চোখ আটকায় গেল। একজন লিখছেন: ‘ব্রো, প্লিজ এরকম আন্ডাররেটেডই থাইকেন!’
১৯ দিন আগে