সময় গণনার ইতিহাস মানবসভ্যতার ক্রমবিকাশের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই মানুষ ঋতু পরিবর্তন, দিন-রাতের আবর্তন ও চাঁদ-সূর্যের অবস্থান লক্ষ করে সময় নির্ধারণের চেষ্টা করেছে। আধুনিক সভ্যতায় এসে আমরা যে ঘড়ির কাঁটায় জীবনকে বেঁধে ফেলেছি, তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল হাজার বছর আগের সেই পঞ্জিকাগুলোতে। দিন, মাস ও বছর গণনা না করলে ইতিহাস রচনা, কৃষিকাজ, ধর্মীয় আচার পালন কিংবা সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবন—কোনোটাই সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হতো না।
পৃথিবীর বিভিন্ন সভ্যতা তাদের ভৌগোলিক অবস্থান, ধর্মীয় বিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করে ভিন্ন ভিন্ন বর্ষপঞ্জি তৈরি করেছে। আমাদের দেশে দৈনন্দিন জীবনে খ্রিষ্টাব্দ, হিজরি এবং বঙ্গাব্দ—এই তিন বর্ষপঞ্জির প্রভাব সবচেয়ে বেশি। এই তিন সময়ধারা কেবল দিনক্ষণ গণনার মাধ্যম নয়; বরং ভিন্ন ইতিহাস, দর্শন ও সংস্কৃতির ধারক ও বাহক।
খ্রিষ্টাব্দ
খ্রিষ্টাব্দ হলো যিশু খ্রিষ্টের জন্মকে কেন্দ্র করে গঠিত বর্ষ গণনা পদ্ধতি। শাব্দিক অর্থে ‘খ্রিষ্ট’ মানে যিশু খ্রিষ্ট, আর ‘অব্দ’ মানে দিন বা দিবস। অর্থাৎ যিশু খ্রিষ্টের জন্মের পর থেকে বছর গণনা শুরুর পদ্ধতিকে খ্রিষ্টাব্দ বলা হয়। ইংরেজি তারিখের পরে অ্যানো ডোমিনি (এডি) ব্যবহার হয়, যা মূলত খ্রিষ্টাব্দের ইংরেজি রূপ। লাতিন ভাষা থেকে আগত ‘অ্যানো ডোমিনি’-এর বাংলা অর্থ ‘প্রভুর বছর’। খ্রিষ্টাব্দ পঞ্জিকার সময় গণনা ১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে হলেও এই গণনার ধারণাগত সূচনা হয়েছিল ষষ্ঠ শতাব্দীতে। ৫২৫ খ্রিষ্টাব্দে রোমান খ্রিষ্টান পণ্ডিত ডায়োনিসিয়াস এক্সিগিউয়াস এই বর্ষপদ্ধতির প্রবর্তন করেন।
সময়ের ব্যবধানে খ্রিষ্টাব্দ বর্ষপঞ্জির বিকাশ সাধিত হয়েছে। এই বিকাশের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো ‘জুলিয়ান ক্যালেন্ডার’ ও ‘গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার’। প্রাথমিকভাবে রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার খ্রিষ্টপূর্ব ৪৬ সালে জুলিয়ান ক্যালেন্ডার চালু করেন। এই ক্যালেন্ডারে বছরে ৩৬৫ দিন ধরা হয় ও প্রতি চার বছরে একবার অতিরিক্ত এক দিন যোগ করে ‘লিপ ইয়ার’ নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু সূর্যবর্ষের প্রকৃত দৈর্ঘ্যের সঙ্গে এর সামান্য পার্থক্য থাকায় শত শত বছর পরে এই ক্যালেন্ডারে বড় ধরনের সময়গত বিচ্যুতি তৈরি হয়।
এই সমস্যার সমাধানে ১৫৮২ খ্রিষ্টাব্দে পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরি গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার প্রবর্তন করেন। এতে লিপ ইয়ার নির্ধারণের নিয়ম আরও সূক্ষ্ম করা হয়। যে বছরগুলো ১০০ দ্বারা বিভাজ্য কিন্তু ৪০০ দ্বারা বিভাজ্য নয়, সেগুলোকে লিপ ইয়ার ধরা হয় না। এর ফলে সূর্যের প্রকৃত আবর্তনের সঙ্গে বর্ষপঞ্জির সামঞ্জস্য অনেক বেশি নির্ভুল হয়। বর্তমানে সারা বিশ্বে যে খ্রিষ্টাব্দ ব্যবহৃত হচ্ছে, তা মূলত এই গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারভিত্তিক।
খ্রিষ্টাব্দ মূলত সূর্যভিত্তিক বর্ষপদ্ধতি। অর্থাৎ পৃথিবীর সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করতে যে সময় লাগে (প্রায় ৩৬৫.২৪২২ দিন), তার ওপর ভিত্তি করেই এই বর্ষপঞ্জি নির্মিত। এই বৈজ্ঞানিক ভিত্তির কারণেই কৃষিকাজ, ঋতু নির্ধারণ, জলবায়ু পর্যবেক্ষণ ও আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় খ্রিষ্টাব্দ বিশেষভাবে কার্যকর। বর্তমানে এই বর্ষপদ্ধতি সারা বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। অফিস-আদালত, শিক্ষা, বিমান চলাচল, বিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক—সব ক্ষেত্রেই খ্রিষ্টাব্দ চালু রয়েছে। যদিও এই বর্ষপদ্ধতি ইউরোপীয় ও খ্রিষ্টান সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত, তবুও বর্তমানে এটি আন্তর্জাতিক ক্যালেন্ডারে পরিণত হয়েছে।
হিজরি
৬২২ খ্রিষ্টাব্দে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে হিজরি সনের সূচনা হয়। পরবর্তী সময়ে খলিফা হজরত উমর (রা.)-এর শাসনামলে সরকারি দলিলপত্রের তারিখ নির্ধারণ, প্রশাসনিক কাজের সময়সীমা নির্ধারণসহ যাবতীয় কার্যক্রম ইসলামি আদর্শে পরিচালনার সুবিধার্থে হিজরি সন রাষ্ট্রীয়ভাবে চালু হয়। হিজরি সনের প্রথম বর্ষ ৬২২ খ্রিষ্টাব্দ থেকে গণনা করা হলেও এর প্রাতিষ্ঠানিক সূচনা হয় ৬৩৮ খ্রিষ্টাব্দে।
হিজরি সন চাঁদের ওপর নির্ভরশীল। রমজান, ঈদ, হজসহ সব ইসলামি ইবাদত ও উৎসব হিজরি সন অনুযায়ী পালন করা হয়। হিজরি মাস শুরু হয় নতুন চাঁদ দেখার মাধ্যমে ও একটি চন্দ্রমাসের দৈর্ঘ্য সাধারণত ২৯ বা ৩০ দিন হয়। ফলে হিজরি বছরে মোট দিনসংখ্যা হয় ৩৫৪ বা কখনো ৩৫৫ দিন, যা সৌরবর্ষের তুলনায় প্রায় ১০–১১ দিন কম। এই কারণেই রমজান, হজ কিংবা ঈদের সময় প্রতি বছর খ্রিষ্টাব্দের ক্যালেন্ডারে ১০ থেকে ১১ দিন করে এগিয়ে আসে।
হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর হিজরত কেবল স্থানান্তরের ঘটনা ছিল না, বরং ছিল ইসলামি ইতিহাসে এক রাজনৈতিক, সামাজিক ও সভ্যতাগত মোড় পরিবর্তন। মদিনায় হিজরতের মাধ্যমে মুসলিম সমাজ সুসংগঠিত রাষ্ট্রীয় কাঠামো লাভ করে। তাই হিজরতকে ভিত্তি করে বর্ষপঞ্জি নির্ধারণ করা ইসলামে সময় গণনা, সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে গভীর তাৎপর্য বহন করে।
বঙ্গাব্দ
বঙ্গাব্দ হলো বাংলা অঞ্চলের নিজস্ব বর্ষপদ্ধতি, যা বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। বঙ্গাব্দ মূলত কৃষিভিত্তিক সমাজের প্রয়োজন থেকে গড়ে উঠেছে। বঙ্গাব্দের ইতিহাস সাধারণত দুটি ধাপে ব্যাখ্যা করা হয়: প্রাচীন সূচনা ও মুঘল আমলের সংস্কার। রাজা শশাঙ্কের আমলে সূর্যভিত্তিক যে বর্ষগণনার প্রচলন ছিল, সেটিই পরবর্তী সময়ে বঙ্গাব্দের প্রাথমিক ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
তবে মুঘল সম্রাট আকবরের সময় (১৬শ শতক) এই বর্ষপঞ্জিকে আরও কার্যকর ও বাস্তবমুখী করে তোলা হয়। আকবরের নির্দেশে তৎকালীন হিজরি সন ও সৌরবর্ষের সমন্বয়ে নতুন সংস্কারকৃত বর্ষপদ্ধতি চালু করা হয়, যা ‘ফসলি সন’ নামেও পরিচিত ছিল।
এই সংস্কারের মূল উদ্দেশ্য ছিল কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি পরিচালনা সহজ করা। কারণ হিজরি সন চন্দ্রভিত্তিক হওয়ায় মাস ও ঋতুর সঙ্গে ফসল কাটার সময়ের মিল থাকত না। বঙ্গাব্দ সূর্যভিত্তিক হওয়ায় ঋতু, ফসল উৎপাদন, বীজ বপন ও খাজনা আদায়ের সময় নির্ধারণ অনেক বেশি সুশৃঙ্খল হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশে বর্তমানে যে বঙ্গাব্দ ব্যবহৃত হয়, তা ১৯৬৬ সালে বাংলা একাডেমির তত্ত্বাবধানে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে কিছু সংস্কারের মাধ্যমে প্রমিত রূপ লাভ করে। এই সংস্কারের ফলে মাসের দিনসংখ্যা নির্দিষ্ট করা হয় ও সরকারি কাজে বঙ্গাব্দের ব্যবহার আরও সুসংগঠিত হয়।
সময় গণনায় খ্রিষ্টাব্দ, হিজরি ও বঙ্গাব্দ—এই তিন ধারা যদিও ভিন্ন ভিন্ন উৎস থেকে এসেছে, তবুও আমাদের জীবনে এগুলো মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। আমাদের কর্মজীবন, অফিস-আদালত, ব্যাংক-বিমা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জন্য আমরা খ্রিষ্টাব্দের ওপর নির্ভরশীল। আমাদের ধর্মীয় বিশ্বাস, ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির জন্য আমরা হিজরি সনের দিকে তাকিয়ে থাকি। আর আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়, উৎসব ও ঋতুভিত্তিক জীবনযাপনের জন্য আমরা বঙ্গাব্দকে বুকে ধারণ করি। এই তিন সময়ধারার সমন্বয়েই গড়ে উঠেছে আমাদের বাঙালির দৈনন্দিন জীবন।