leadT1ad

ফিলিস্তিনিদের সোমালিল্যান্ডে পাঠানোর পরিকল্পনা করছে ইসরায়েল: সোমালিয়া

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০২৬, ১০: ৫৩
সোমালিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী আহমেদ মোয়ালিম ফিকি

উত্তর-পূর্ব আফ্রিকার দেশ সোমালিয়ার বিচ্ছিন্নতাবাদী অঞ্চল সোমালিল্যান্ডকে সম্প্রতি স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে ইসরায়েল। তবে এর নেপথ্যে দখলদার দেশটি ভিন্ন কিছু পরিকল্পনা করছে বলে অভিযোগ করেছে সোমালিয়া সরকার। সোমালিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী আহমেদ মোয়ালিম ফিকি অভিযোগ করেছেন, ইসরায়েল গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক সরিয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী অঞ্চল সোমালিল্যান্ডে পাঠানোর পরিকল্পনা করছে। তিনি এই কথিত পরিকল্পনাকে আন্তর্জাতিক আইনের ‘গুরুতর লঙ্ঘন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

শনিবার আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ফিকি বলেন, ‘আমাদের কাছে নিশ্চিত তথ্য আছে যে ইসরায়েলের একটি পরিকল্পনা রয়েছে, ফিলিস্তিনিদের স্থানান্তর করে (সোমালিল্যান্ডে) পাঠানোর।’

সোমালিয়ার প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরেই আশঙ্কা প্রকাশ করে আসছেন যে ইসরায়েল গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের জোর করে সোমালিল্যান্ডে পাঠাতে চায়। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এই মন্তব্যে সেই আশঙ্কা প্রকাশ্য অভিযোগে রূপ নিল। অবশ্য এই অভিযোগ সোমালিল্যান্ড ও ইসরায়েল দুপক্ষই অস্বীকার করেছে।

১৯৯১ সালে সোমালিল্যান্ড সোমালিয়া থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করলেও জাতিসংঘের স্বীকৃতি পায়নি। গত ডিসেম্বর ইসরায়েল প্রথম দেশ হিসেবে সোমালিল্যান্ডকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদেওন সার গত সপ্তাহে দেশটির চ্যানেল ১৪-কে বলেন, ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক সোমালিল্যান্ডে পাঠানো ‘আমাদের চুক্তির অংশ ছিল না’। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি রাজনীতি, নিরাপত্তা, উন্নয়নসহ নানা ক্ষেত্রে সোমালিল্যান্ডের সঙ্গে আমাদের অনেক বিষয় এগিয়ে নেওয়ার আছে… এবং আমি বলতে পারি, এটি আমাদের চুক্তির অংশ নয়।’ তবে ঠিক কী বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে, সে সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি। স্বীকৃতি ঘোষণার পর থেকে ইসরায়েল বা সোমালিল্যান্ড—কোনো পক্ষই নির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ করেনি। সোমালিল্যান্ড সরকারের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রও নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছে, ফিলিস্তিনিদের স্থানান্তর তাদের কোনো ছাড়ের অংশ ছিল না।

এর আগে সোমালিয়ার প্রেসিডেন্ট হাসান শেখ মোহামুদ আল জাজিরাকে বলেছিলেন, সোমালিল্যান্ড ইসরায়েলের তিনটি শর্ত মেনে নিয়েছে—ফিলিস্তিনিদের পুনর্বাসন, এডেন উপসাগরের উপকূলে একটি সামরিক ঘাঁটি স্থাপন এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে আব্রাহাম চুক্তিতে যোগ দেওয়া।

ফিকি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী অঞ্চলটির’ কূটনৈতিক স্বীকৃতি প্রত্যাহারের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, গত বছরের শেষ দিকে নেওয়া এই পদক্ষেপ সোমালিয়ার সার্বভৌমত্বের ওপর ‘সরাসরি আঘাত’।

সমালোচনা আরও বিস্তৃত করে ফিকি বলেন, ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরেই অঞ্চলটির দেশগুলোকে খণ্ডিত করার কৌশল অনুসরণ করছে এবং সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দেওয়াও সেই বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, ‘ইসরায়েলের বহুদিনের লক্ষ্য ও পরিকল্পনা আছে, হয়তো ২০ বছর ধরে; কীভাবে দেশগুলোকে ভাগ করা। তারা মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র ভাগ করে দেশগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। এ কারণেই তারা উত্তর-পশ্চিম সোমালিয়ার এই বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীটিকে খুঁজে পেয়েছে।’

এডেন উপসাগরে সামরিক ঘাঁটির অভিযোগ

সোমালি প্রতিরক্ষামন্ত্রী আরও অভিযোগ করেন, এডেন উপসাগরকে লোহিত সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে, এমন প্রণালি বাব আল-মানদেবে একটি সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করতে চায় এবং এতে অঞ্চলটি অস্থিতিশীল হবে। সোমালিল্যান্ডের এক কর্মকর্তা বলেন, এ ধরনের আলোচনা চলছে; যা তাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আগের অস্বীকৃতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা দেকা কাসিম ইসরায়েলের চ্যানেল ১২-কে বলেন, একটি ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটি ‘আলোচনার টেবিলে আছে’, তবে তা প্রতিষ্ঠা হবে কি না, তা শর্তের ওপর নির্ভর করবে।

হুতি নেতারা বলেছেন, এডেন উপসাগরের ওপারে সোমালিল্যান্ডে ইসরায়েলের কোনো উপস্থিতিকে তারা হুমকি হিসেবে দেখবেন এবং সেটি সম্ভাব্য সামরিক লক্ষ্য হতে পারে।

সোমালিল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আবদিরাহমান মোহাম্মদ আবদুল্লাহি (সিরো) প্রতিবেশী দেশগুলোর উদ্বেগ প্রশমিত করার চেষ্টা করে বলেছেন, ইসরায়েলের স্বীকৃতি কারও বিরুদ্ধে নয়। গত সপ্তাহে সার যখন হারগেইসায় যান, তখন সোমালিল্যান্ডের বিবৃতিতে বলা হয়, বৈঠকে নিরাপত্তা বিষয়টি আলোচনার মধ্যে ছিল।

এই সফরের পর ২২টি দেশ ও ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি) যৌথ বিবৃতিতে সার-এর ৬ জানুয়ারির সফরকে সোমালিয়ার সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার ‘স্পষ্ট লঙ্ঘন’ বলে নিন্দা জানায়।

ফিকির মন্তব্য আসে এমন এক সময়ে, যখন ডিসেম্বর মাসে নেতানিয়াহুর সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমালোচনা অব্যাহত আছে। শনিবার সৌদি আরবে ওআইসির ৫৭ সদস্যের এক জরুরি সম্মেলনে দুটি প্রস্তাব গৃহীত হয়; একটি ইসরায়েলের সিদ্ধান্তের নিন্দা জানিয়ে এবং আরেকটি ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে।

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান টিআরটি হাবারকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, তুরস্কসহ কয়েকটি মুসলিম দেশ অন্য দেশগুলোকে সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দেওয়া থেকে বিরত রাখতে সমন্বিত উদ্যোগ নিয়েছে। এদিকে সোমালিল্যান্ডের কর্মকর্তাদের দাবির বিপরীতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেছেন, ‘সোমালিয়ার সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। আমরা দেশটির সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি শ্রদ্ধার গুরুত্ব বারবার তুলে ধরি।’

শুক্রবার প্রেসিডেন্ট মোহামুদ জাতির উদ্দেশে ভাষণে সোমালিল্যান্ডের নেতাদের মোগাদিশুর সঙ্গে আলোচনায় বসে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে অবস্থান বদলানোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, যদি তারা বিচ্ছিন্নতার পথেই এগোতে চায়, তবে সোমালি সরকারের সম্মতি ছাড়া ব্যাপক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি সম্ভব হবে না এবং তারা কূটনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেই পড়ে থাকবে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত