গত বছরের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত যশোরে হত্যাকাণ্ড হয়েছে ৬২টি। অধিকাংশ হত্যায় ব্যবহার করা হয়েছে বিদেশি পিস্তল। সম্প্রতি ভারত থেকে এসব অস্ত্র ঢুকছে বলে জানিয়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
রাজনীতিক ও স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনীতিক পট পরিবর্তনের পর চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের আটক না হওয়ার পাশাপাশি অস্ত্র উদ্ধার না হওয়ায় অস্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে। সীমান্তবর্তী জেলা হওয়াতে সন্ত্রাসীদের কাছে মিলছে বিদেশি অস্ত্র।
যশোর মনিরামপুর উপজেলার কপালিয়া বাজারে ৫ জানুয়ারি সন্ধ্যায় রানা প্রতাপ বৈরাগী নামে এক ব্যবসায়ীকে নিজ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে ডেকে নিয়ে দুর্বৃত্তরা খুব কাছ থেকে গুলি ও গলা কেটে হত্যা করে। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ কয়েকটি গুলির খোসা উদ্ধার করে। ফরেনসিক রির্পোটে তথ্য মিলেছে, সিক্স পয়েন্ট ফাইভ এমএম মডেলের বিদেশি পিস্তলে এই হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়েছে।
৩ জানুয়ারি শহরের শংকরপুর এলাকায় মোটর সাইকেলে করে বাড়িতে ফিরছিলেন ৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেন। কয়েকজন যুবক অন্য মোটর সাইকেল থেকে আলমগীরকে গুলি করে পালিয়ে যান। গুলির ফরেনসিক রির্পোটে উঠে এসেছে, এ হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়েছে বেরেটা এম নাইন মডেলের পিস্তল।
শুধু এই দুটি হত্যাকাণ্ড নয়, বেশ কিছু হত্যায় পাওয়া গেছে বিদেশি পিস্তল ব্যবহারের প্রমাণ।
মানবাধিকারকর্মী ও ব্লাস্ট যশোরের সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট মোস্তফা হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘আমরা আসলেই উদ্বিগ্ন। যশোরসহ সারা দেশে অস্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে। যশোরে সম্প্রতি যে কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সামনে এসেছে, সবই মাথায় গুলির ঘটনা।’
সীমান্তবর্তী জেলাতে অবাধে অস্ত্র ঢুকছে; তবে ধরা পড়ছে দুয়েকটি। নির্বাচনের আগে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সীমান্তে অস্ত্র প্রবেশ আটকাতে না পারলে আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু পরিবেশ নিয়ে বাধাগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেন মোস্তফা হুমায়ুন কবীর।
অন্তত ১১ রুটে ঢুকছে অস্ত্র
যশোরের চৌগাছা, ঝিকরগাছা ও শার্শা উপজেলার ২৪০ কিলোমিটারজুড়ে ভারতীয় সীমান্ত। যশোর সীমান্তে ১১টি রুট—চৌগাছা, ঝিকরগাছা, শার্শা, শাহজাদপুর, হিজলা, পুটখালি, আন্দুলিয়া, মান্দারতলা, বেনাপোল সীমান্তের গোগা, কায়বা, শিকারপুর দিয়ে অস্ত্র-বিস্ফোরক অহরহ ঢুকছে। সম্প্রতি ও অতীতের সব অস্ত্র-বিস্ফোরক চালান আটক ও বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার অস্ত্র ব্যবসায়ীদের জবানিতে এমন তথ্য বারবার উঠে এসেছে। ভারতে স্থানীয়ভাবে নির্মিত অস্ত্রের মধ্যে বিহারের মুঙ্গেরে ‘কাট্টা রাইফেল’, বেলঘরিয়ার ‘বেলঘরিয়া পিস্তল’, খিদিরপুরের ‘ছক্কা পিস্তল’ ও মুর্শিদাবাদের ‘ময়ূর পিস্তল’ রয়েছে। তবে ইদানীং নাইন এমএম পিস্তল ও সিক্স পয়েন্ট ফাইভ এমএম পিস্তল, রিভলবার (পয়েন্ট ৩৮ ও পয়েন্ট ৩২ বোর) ধরনের আধুনিক সব অস্ত্র ব্যবহার হচ্ছে। আকারে ছোট হওয়ায় চোরাই পথে এসব অস্ত্র আনা সহজ হয় এবং সহজে লুকিয়ে রাখা যায় বলে ব্যবহারকারীরাও এসব অস্ত্র বেশি পছন্দ করেন।
বাহক ধরা পড়ে, বিক্রেতা ধরাছোঁয়ার বাইরে
সম্প্রতি সময়ে সবচেয়ে বড় অস্ত্রের চালান আটক হয়েছে গত বছরের ৩০ নভেম্বর। যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি সেভেন পয়েন্ট সিক্সটিভাইভ মডেলের পাঁচটি বিদেশি পিস্তল, ১০টি ম্যাগাজিন ও ৫০টি গুলি, সাড়ে চার কেজি গাঁজাসহ লিটন গাজী (৪০) নামের এক যুবককে আটক করেছে জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। শার্শা সীমান্ত দিয়ে পিস্তুলগুলো ভারতে প্রবেশ করলেও ধরা পড়ে যশোর শহরে। জিজ্ঞাসাবাদে আটক যুবক পুলিশকে জানায়, অস্ত্রগুলো কক্সবাজারে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছিল। তিনি পিস্তলটির বাহকমাত্র। ক্রেতা-বিক্রেতা কেউ তাঁর পরিচিত নয়।
চলতি বছরের ১১ জানুয়ারি বেনাপোল রঘুনাথপুর এলাকায় সাকিব নামে এক যুবকের বাড়িতে দুটি পিস্তল ৬টি গুলি উদ্ধার করা হয়। পুলিশের ধারণা, নির্বাচন উপলক্ষে অস্ত্রের চাহিদা বাড়াতে অস্ত্রের বাহকের পেশায় যোগদান করেছেন অনেকেই।
গত বছরের ৯ আগস্ট যশোরের বেনাপোলের পুটখালী সীমান্তে অভিযান চালিয়ে একটি বিদেশি পিস্তল, ৫টি গুলি ও দুটি ম্যাগাজিনসহ আক্তারুল ইসলাম (৪০) নামে এক অস্ত্র ব্যবসায়ীকে আটক করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। ২৯ মে যশোরের শার্শা উপজেলার পাঁচভুলোট সীমান্ত এলাকা থেকে দুটি বিদেশি পিস্তল, দুটি খালি ম্যাগাজিন ও দুটি মোবাইল ফোনসহ দুই অস্ত্র ব্যবসায়ীকে আটক করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
বেনাপোলে ২টি পিস্তলসহ যুবক আটক। ছবি: সংগৃহীতআইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাধারণত দালালেরা ক্রেতা ও বিক্রেতার যোগাযোগ ঘটিয়ে দেয়। বিক্রেতারা অস্ত্র দেওয়ার আগেই টাকা নিয়ে নেয়। টাকা নেওয়ার পর শহরের বাইরের কোনো এলাকা থেকে অস্ত্রটি সংগ্রহ করতে বলে। ইদানীং হাতে হাতে টাকা নেওয়ার বদলে বিভিন্ন মোবাইল ব্যাংকিং মাধ্যমেও টাকা নিচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রায়ই ক্রেতাকে অনুসরণ করে অস্ত্র বিক্রেতাদের ধরার চেষ্টা করে। আর তাই ক্রেতার হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়ার সময় বিক্রেতারা নানা কৌশল গ্রহণ করে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী স্বীকার করেছে, যে পরিমাণ অস্ত্র ঢুকছে, ধরা পড়ছে কম।
যশরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) আবুল বাশার বলেন, ‘সম্প্রতি যে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, সবই বিদেশি পিস্তলের মাধ্যমে। ভারত থেকে এসব পিস্তল যশোরে আসছে। ইতিমধ্যে কয়েকটি চালান জব্দ করা হয়েছে। এরপর আসামিদের তথ্যের ভিত্তিতে আমরা অস্ত্রের উৎস, অস্ত্র উদ্ধার অব্যহত রেখেছি।’
আবুল বাশার স্বীকার করেন, যাঁদের আটক করা হচ্ছে; তারা সবাই বাহক, অস্ত্র বিক্রেতা বা ক্রেতাকে এই বাহক চেনেন না।
তিনি জানান, আইনশৃঙ্খলা নিয়ে যশোরবাসীর বিচলিত হওয়ার কারণ নেই। অবৈধ বাইকে গুলির ঘটনা বৃদ্ধিতে জেলার ৪৯টি স্পটে নিয়মিত তল্লাশি করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
উদ্ধারকৃত পিস্তল ও গুলি। ছবি: সংগৃহীতএদিকে আসন্ন নির্বাচনের আগে হঠাৎ আইনশৃঙ্খলার পরিস্থিতি অবনতিতে ক্ষুদ্ধ রাজনীতিক দলের নেতারাও। বিএনপি খুলনা বিভাগীয় ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক অন্দিদ্য ইসলাম অমিত বলেন, ‘বারবার অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের আটকের দাবি জানালেও প্রশাসনের আন্তরিকতার অভাব দেখছি আমরা। সীমান্তবর্তী জেলা যশোরে অবাধে প্রবেশ করছে অস্ত্র। নির্বাচনের এই সময়ে অস্ত্র উদ্ধার ও প্রবেশ আটকাতে না পারলে নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ ব্যহত হবে।’
জেলা জামায়াতের প্রচার সম্পাদক অধ্যাপক শাহবুদ্দিন বিশ্বাস বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটলেই পিস্তলের ব্যবহার দেখছি। সীমান্তে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের আটকের দাবি জানাচ্ছি। তা না হলে যশোরে আইনশৃঙ্খলার পরিস্থিতি আরও অবনতি হবে।’
যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান বলেন, ‘সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। ভোটের পরিবেশ বিঘ্ন ঘটাতে না পারে; সেই লক্ষ্যে অস্ত্র উদ্ধারসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর রয়েছে।’