জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

ড. শাহমান মৈশানের বিশেষ সাক্ষাৎকার

নতুন সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশ: সংকট, সম্ভাবনা ও রাজনীতির রূপান্তর

নতুন সরকারের প্রথম ১০ দিনের পারফরম্যান্স, প্রশাসনিক রদবদল এবং আগামীর রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিয়ে ‘ঢাকা স্ট্রিম’-এর বিশেষ সাক্ষাৎকারে কথা বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও লেখক ড. শাহমান মৈশান

শাহমান মৈশান। ছবি: নাসির আলী মামুন

স্ট্রিম: মাত্র কয়েক দিন হলো নতুন সরকার গঠন হয়েছে। এই কয়েক দিনের পারফরম্যান্স আপনি কীভাবে দেখছেন? বিশেষ করে অতীতেও তো বিএনপি ক্ষমতায় ছিল, সেই সময়ের সঙ্গে বর্তমান সময়ের বিএনপির আচরণগত কী পার্থক্য আপনার চোখে পড়ছে?

শাহমান মৈশান: বিষয়টি বেশ গভীর। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি যখন প্রথম ক্ষমতায় আসে অর্থাৎ ১৯৯১-এর কথা যদি বলি, তখন আমি নিতান্তই শিশু। তবে অভিজ্ঞতার নিরিখে এবং সমকালীন ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে ব্যাখ্যা করলে দেখা যায়, এবারের বিএনপির মধ্যে একটা বড় পরিবর্তন এসেছে। কারণ বিএনপির ‘ভরকেন্দ্র’ বদলে গেছে। আগে যে রাজনৈতিক পরম্পরা খালেদা জিয়ার নামে নির্মিত হয়েছিল, এখন তা তারেক রহমানের নেতৃত্বে এক নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।

আমাদের শৈশব ছিল খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক বসন্তের সময়। ৯১-এর নির্বাচনের পর তিনি প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হলেন, বাংলাদেশ এমন এক বিশেষ রাজনৈতিক আখ্যানের মধ্যে প্রবেশ করল যার কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে উঠলেন একজন নারী। কিন্তু এখন সেই সময় বদলেছে। তার প্রয়াণের পর পুত্র তারেক রহমান এই বিশাল জনসমর্থন পুষ্ট এক দলের প্রধান ফেইসে পরিণত হয়েছেন। যদিও বহুদিন থেকেই তিনি কার্যত দলের নেতৃত্ব দিয়ে চলছেন। ফলে বলা যায় দীর্ঘদিনের একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই তিনি দলের নেতৃত্বে এসেছেন। সবাই জানেন, ২০০১-এ বিএনপি আবার সরকার গঠনের পর তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হন। এরপর ক্ষমতা হারানো, জীবনের ঝুঁকি নেওয়া, কারাবরণ এবং দীর্ঘ নির্বাসন—এই পর্যায়গুলো তাঁর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে এক নতুন ডাইমেনশন তৈরি করেছে নিঃসন্দেহে। নির্বাসিত ও অনিশ্চিত জীবন একজন মানুষের রাজনৈতিক দর্শনকে অনেক বেশি পরিণত করে তোলে। এর ছাপ প্রকাশ পাচ্ছে, যা তারেক রহমানের বর্তমান আচরণে আমরা দেখতে পাচ্ছি। এই পরিপক্বতা প্রজ্ঞায় পরিণত হয়েছে কিনা তা সময়ই বলে দেবে।

স্ট্রিম: আপনি রাজনৈতিক নেতৃত্বের মুখ পরিবর্তনের কথা বললেন। দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে এই পরিবর্তন কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ?

শাহমান মৈশান: উত্তর-ঔপনিবেশিক কালপর্বে দক্ষিণ এশিয়ার পার্টিকেন্দ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে মূলত এক ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব বা ‘পারসোনালিটি কাল্ট’কে কেন্দ্র করে। সংস্কৃতি তাত্ত্বিক, সমাজবিজ্ঞানী ও ইতিহাসবিদরা একে খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখেন। ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা এমনকি নেপালেও এক নেতার ব্যক্তিত্বকেন্দ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রবলভাবে দৃশ্যমান। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও কেনেডি বা ক্লিনটন পরিবারের ক্ষেত্রেও আমরা এটি দেখি। এই ব্যাপারটিকে এক দিক থেকে একটি বিশ্বজনীন প্রবণতাও বলা যায়। বিএনপির রাজনৈতিক নেতৃত্বের মুখ পরিবর্তন হওয়ার অর্থ হলো, দলটির অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার কাঠামোতেও একটি প্রজন্মগত বদল এসেছে। তারেক রহমানকে কেন্দ্র করে নির্বাচনে জয়লাভ এবং সরকার গঠনের মাধ্যমে বিএনপি এখন এক ধরনের অগ্নিপরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই নেতৃত্বকে প্রমাণ করতে হবে তারা স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থার পরবর্তী সময়ে দেশকে সার্থকভাবে পরিচালনা করতে সক্ষম। এর অর্থ হলো বাংলাদেশকে একটি লিবারাল ডেমোক্র্যাটিক রাষ্ট্র হিসেবে রূপান্তরের লক্ষ্যে কার্যকর নেতৃত্ব দিয়ে যেতে হবে।

স্ট্রিম: এই কয়েক দিনে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি একটা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। এর মধ্যে আমরা ‘মব কালচার’ বা বিশৃঙ্খল জনতা কর্তৃক কিছু কর্মকাণ্ডও দেখেছি। বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘটনাটি এর মধ্যে অন্যতম। আপনি বিষয়টিকে কীভাবে দেখেন?

শাহমান মৈশান: আমি রাজনীতিকে দেখি মানুষের আচরণের অভিব্যক্তি হিসেবে। জনপরিসরে মানুষের আচরণগুলোর একটি রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক অর্থ থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংকে যা ঘটেছে, সেটি অনাকাঙ্ক্ষিত ছিল। সরকার পরিবর্তনের পর পুলিশ, প্রশাসন অর্থাৎ রাষ্ট্রযন্ত্রের নানান স্তরে রদবদল খুবই স্বাভাবিক। নির্বাচিত সরকার তার ইশতেহার বাস্তবায়নের জন্য এক দিকে দক্ষ ও তাদের প্রতি রাজনৈতিকভাবে বিশ্বস্ত লোক নিয়োগ দেবে—এটা সমস্যার কিছু নয়। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো একটি স্পর্শকাতর ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে যেভাবে পুরনো গভর্নরের বিদায় ও নতুন গভর্নরের নিয়োগ হলো সেই প্রক্রিয়াটিকে যথেষ্ট সাংস্কৃতিক ও জবাবদিহিমূলক বলা যাবে না। কর্মকর্তাদের এই ‘বিক্ষোভ’কে নেপথ্য সাজানো বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে। তাছাড়া, এই বিক্ষোভের কোনও গণতান্ত্রিক অর্থ তৈরি হয়নি। বরং তা একটি সাংবিধানিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলার জন্য হুমকি হয়ে থাকলো। এই নিয়ে সরকারকে ভবিষ্যতে ভুগতে হতে পারে।

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় কাজ করবে বাংলাদেশের সংস্কৃতির বহুমাত্রিকতাকে বিকশিত-উদ্ভাসিত করার লক্ষ্য নিয়ে। বাংলাদেশ শুধু বাঙালির নয়, শুধু মুসলমানের দেশ নয়। এখানে অন্যান্য জাতি-গোষ্ঠী, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান—সবার সম অধিকার রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক মুদ্রানীতি প্রণয়ন করে, নোট ছাপায়। এখানে অত্যন্ত দক্ষ, অভিজ্ঞ, দৃঢ়চেতা এবং স্বচ্ছ পেশাগত রেকর্ডের একজন গভর্নর থাকবেন—এই প্রত্যাশা খুব স্বাভাবিক। ব্যবসায়ী যখন গভর্নর তখন এখানে ‘স্বার্থের দ্বন্দ্ব’ দেখা দেয়। যা মোটেও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কিন্তু ‘মব’ বা বিশৃঙ্খল স্টাফদের চাপে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা তো পরবর্তী গভর্নরের জন্যও ভয়ের কারণ। কারণ ওই মব গ্রুপটি তখন দাবি করবে যে, তাদের জন্যই নতুন গভর্নর নিয়োগ পেয়েছেন। আর পদে পদে তারা নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে চাইবে। অতীতেও এখানে গভর্নরকে অবরুদ্ধ করা বা মারধর করার ঘটনা ঘটেছে। ৯৬-৯৭ সালেও আমরা এমনটা দেখেছি। এই কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠী বা অলিগার্কি সবসময় কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়, যা রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।

স্ট্রিম: এবার মন্ত্রিসভার নিয়োগ নিয়ে কিছু কথা বলা যাক। অনেকেই সমালোচনা করছেন যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের জন্য টেকনোক্র্যাটিক বা বিশেষজ্ঞ জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিদের বেছে নেওয়া হয়নি। বিশেষ করে সংস্কৃতি বা অর্থ মন্ত্রণালয়ের কথা বলা হচ্ছে। এ ব্যাপারে আপনার অভিমত কী?

শাহমান মৈশান: দেখুন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় মন্ত্রী মানেই যে তাকে ওই বিষয়ের বিশেষজ্ঞ হতে হবে—এমন ধারণা সবসময় সঠিক নয়। যেমন ধরুন একজন তথ্যমন্ত্রীকে বহু বছরের সাংবাদিক হতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। মন্ত্রী হলেন একজন ‘পলিটিক্যাল অ্যাক্টর’ বা রাজনৈতিক অভিনেতা। তিনি তার দলের ইশতেহার বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয়ে রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেন। সেই নেতৃত্ব হবে ভিশনারি। আমলাতন্ত্রের স্থায়ী কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় করে তিনি রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেবেন—এটাই গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় সরকার পরিচালনার একটি ডিসেন্ট্রালাইজড ফর্ম।

কিন্তু সমস্যা হলো তখন, যখন কোনও কোনও মন্ত্রীর মধ্যে সেই ভিশন থাকে না। আর যদি থাকেও সেটা ভীষণ অস্পষ্ট। যেমন, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের কথাই ধরুন। শোনা যাচ্ছে, বর্তমান সংস্কৃতি মন্ত্রী বলেছেন তিনি আমাদের প্রতিবেশী দেশের মতো বড় বড় শিল্পী তৈরি করবেন। কিন্তু সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের কাজ কি কেবল শিল্পী তৈরি করা? একদমই না।

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় কাজ করবে বাংলাদেশের সংস্কৃতির বহুমাত্রিকতাকে বিকশিত-উদ্ভাসিত করার লক্ষ্য নিয়ে। বাংলাদেশ শুধু বাঙালির নয়, শুধু মুসলমানের দেশ নয়। এখানে অন্যান্য জাতি-গোষ্ঠী, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান—সবার সম অধিকার রয়েছে। তাদের সমৃদ্ধ বিচিত্র সাংস্কৃতিক ধারা বহমান আছে। এই বহুমুখী সংস্কৃতির বিবিধ ধারাকে এই জাতির জনগণের সংগ্রাম ও স্বপ্নের সঙ্গে মিলিয়ে চর্চা করার নীতি প্রণয়ন করে এগিয়ে যেতে হবে।

ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা এমনকি নেপালেও এক নেতার ব্যক্তিত্বকেন্দ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রবলভাবে দৃশ্যমান। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও কেনেডি বা ক্লিনটন পরিবারের ক্ষেত্রেও আমরা এটি দেখি। এই ব্যাপারটিকে এক দিক থেকে একটি বিশ্বজনীন প্রবণতাও বলা যায়।

মনে রাখতে হবে জনগণের মধ্যে থাকা বিচিত্র সংস্কৃতির অবাধ প্রকাশের মাধ্যমেই একটি রাষ্ট্রের সংহতি গড়ে উঠে। সংস্কৃতি হলো রাষ্ট্রের প্রাণস্পন্দন। এমনকি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেও ‘বহুমাত্রিক বাংলাদেশ’ বা ‘প্লুরালিজম’-এর কথা বলছেন। যদি তাই হয়ে থাকে, তবে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এই বৈচিত্র্যকে ধারণ করবে, মানবসম্পদ উন্নয়ন করবে এবং জনগণের কল্পনা ও সৃজনশীলতার নিত্য নতুন বিকাশ ঘটাবে।

আমরা জানি যে সংস্কৃতি বিশেষ্য নয়। সংস্কৃতি হলো ক্রিয়াপদ। জনগণের সৃজনশীল অনুশীলন ও উপভোগ জনগণের সামস্টিক সংস্কৃতিকে প্রকাশ করে। বাংলাদেশের সংস্কৃতির মধ্যে এদেশের সম্মিলিত আত্মার প্রকাশ ঘটবে। যদি কেবল শিল্পীই তৈরি করা সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের কাজ হয়, তবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কী করবে?

একইভাবে সড়ক পরিবহন মন্ত্রীর উচিত চাঁদাবাজির সংজ্ঞা নিয়ে তাত্ত্বিক বয়ান না দিয়ে কীভাবে সড়ককে জনবান্ধব করা যায়, সেদিকে মনোযোগ দেওয়া। মন্ত্রীদের বাকসংযমী হওয়া উচিত। কারণ তাদের প্রতিটি কথা তাদের মনোজগৎ ও কাজের ধরনকে প্রকাশ করে। তাই তাদের বলা প্রতিটি কথা সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমরা শুনি ও বিচার করি। এবং জনগণ যথা সময়ে তার প্রতিউত্তর দেয়।

স্ট্রিম: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক কিছু আচরণ—যেমন প্রটোকল কমিয়ে আনা, সাধারণ চেয়ারে বসা বা দ্রুত অফিসে যাওয়া—এগুলো কি কেবলই লোক দেখানো, নাকি এর কোনো গভীর রাজনৈতিক অর্থ আছে?

শাহমান মৈশান: রাজনৈতিক ইতিহাসে নেতারা নিজেদের যেভাবে জনগণের সামনে পরিবেশন করেন, তাকে বলতে পারি ‘সিম্বলিক ক্যাপিটাল’ বা প্রতীকী পুঁজি অর্জনের একটি অন্তহীন প্রচেষ্টা। থিয়েটার আর্টসে যেমন ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রের ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতিতে নতুন নতুন পোশাক বা বাচনিক ভঙ্গি থাকে, রাজনীতির রোল প্লেয়িংয়েও তাই থাকে।

প্রধানমন্ত্রী প্রোটোকল কমিয়ে বা সাধারণ মানুষের সাথে মিশে যাবার জেসচার তৈরির ভেতর দিয়ে তিনি হয়তো এক ধরনের রাজকীয়তা বা ‘রয়্যাল এন্টিটি’র সঙ্গে জনগণের দূরত্ব ভাঙতে চেয়েছেন। এই আচরণগুলোর মাধ্যমে তিনি জনগণের কাছে এই বার্তা দিতে চেয়েছেন যে, ‘আমি আপনাদেরই একজন’।

এই আচরণগুলো যদি জনগণের সঙ্গে তার গভীর মানসিক সংযোগ থেকে আসে, একটি গণতান্ত্রিক-সাংস্কৃতিক উপলব্ধির ফলাফল হয় তবে তা ইতিবাচক। তবে একে স্থায়ী রূপ দিতে হলে তা কেবল প্রধানমন্ত্রীর একার আচরণে সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না, তার পুরো মন্ত্রিসভা এবং দলের কর্মকাণ্ডেও এই জনসম্পৃক্ততার অকৃত্রিম উপলব্ধি ছড়িয়ে পড়তে হবে। এখন পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর এই প্রতীকী পরিবর্তনগুলো আমার কাছে অকৃত্রিমই মনে হচ্ছে। তবে আমি আগ্রহী থাকব শেষ পর্যন্ত দেখতে। কারণ কিছু আচরণ কেবল বাহ্যিক দৃশ্য হয়ে থাকে আর কিছু আচরণ দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। আর তা হয় সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার ভেতর দিয়ে।

স্ট্রিম: এবারের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ৬০টির বেশি আসন পেয়েছে, যা তাদের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি কি বাংলাদেশে ডানপন্থার একটি বড় উত্থান ঘটাচ্ছে?

শাহমান মৈশান: কোনো রাজনৈতিক পরিস্থিতিই নির্দ্বন্দ্ব নয়। এক পক্ষের অনুপস্থিতিতে জনগণ অন্য কোনো পক্ষ খুঁজে নেয়। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ স্বৈরাচারী শাসনের পর তারা যখন রাজনৈতিকভাবে অনুপস্থিত, তখন জামায়াত সেই শূন্যতা পূরণের একটি চেষ্টা করছে। তবে জামায়াতকে বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি বিশেষ সত্য উপলব্ধি করতে হবে। সেই সত্যটি হলো বাংলাদেশের জনগণ বস্তুত একটি মধ্যপন্থী গণতান্ত্রিক শক্তিকেই রাষ্ট্রক্ষমতায় দেখতে চায়। এবারের নির্বাচনে বিএনপি ৩০০ আসনের মধ্যে ২০০-এরও বেশি পেয়েছে—এতে কমপক্ষে এটা প্রমাণ হয় যে, বাংলাদেশের জনগণের বিরাট অংশ চরমপন্থার বদলে মধ্যপন্থাকেই বেছে নিয়েছে। রক্ষণশীলতার বদলে প্রগতিশীলতাকে ম্যান্ডেট দিয়েছে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের রাজনীতিতে মুক্তিযুদ্ধ এখনো ভাবাদর্শিক স্মৃতি হিসেবে ফ্যাক্টর হয়ে আছে।

জামায়াত বিচিত্র কৌশলগত কারণে, কখনো সহানুভূতি পেয়ে, কখনোবা বিকল্পের আকাঙ্ক্ষার কারণে আজকের এই নির্বাচনী সাফল্য পেয়েছে। কিন্তু তাদের রাজনীতির সঙ্গে বাংলাদেশের জনগণের গভীর মনস্তাত্ত্বিক সংযোগ এখনো খুব কম। ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক কারণেই কম। জামায়াতকে যদি প্রকৃত অর্থে রাজনীতি করতে হয়, তবে তাদের একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে দায় পরিষ্কার করতে হবে। আপনি যদি আওয়ামী লীগের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তবে আপনার নিজের নৈতিকতা ও গণহত্যার দায়ও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। জনগণের কাছে দ্বিমুখী নীতি কখনোই গ্রহণযোগ্য হয় না। ইতিহাস তার প্রমাণ।

স্ট্রিম: স্ট্রিমকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

শাহমান মৈশান: আপনাকেও ধন্যবাদ।

সর্বাধিক পঠিত
এই মুহূর্তে
Ad 300x250

সম্পর্কিত