leadT1ad

যশোরে রানা প্রতাপ খুনে আলোচনায় তিন কারণ

রানা প্রতাপ দুটি বিয়ে করার আগে স্থানীয় কাটাখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এক ছাত্রীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান। বিয়ের পর তাঁর স্বামী বিদেশে চলে যান। পরে রানার সঙ্গে ওই নারীর সম্পর্ক গভীর হয়।

Multiple Authors
এস এম নূরুজ্জামান ও স্ট্রিম সংবাদদাতা
যশোর

স্ট্রিম গ্রাফিক

যশোরের মনিরামপুরে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ব্যবসায়ী ও সাংবাদিক রানা প্রতাপ বৈরাগী। গত ৫ জানুয়ারি ফোন করে ডেকে নিয়ে নিজের প্রতিষ্ঠান কপালিয়া বরফকলের কাছে গুলি করে ও গলা কেটে তাঁকে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।

পুলিশ, স্বজন ও স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপে রানা প্রতাপের হত্যাকাণ্ড ঘিরে তিনটি কারণ সামনে এসেছে। তিনি এক সময় নিষিদ্ধ চরমপন্থী দলে সক্রিয় ছিলেন। স্বজনরা জানিয়েছেন, বছর পাঁচেক আগে স্বাভাবিক জীবনে ফেরেন। ব্যবসার পাশাপাশি নড়াইল থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক বিডি খবর’ নামের একটি পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন।

যদিও পুলিশের তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চরমপন্থী সংগঠনের অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেরে রানাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় গতকাল মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) নিহতের বাবা তুষার কান্তি বৈরাগী অজ্ঞাতদের বিরুদ্ধে মনিরামপুর থানায় মামলা করেন। তবে এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

তিন কারণে হত্যা

রানা প্রতাপের হত্যা নিয়ে স্বজন, স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে তিনটি কারণ আলোচনায় এসেছে। প্রথমত, রানা এক সময় নিষিদ্ধ চরমপন্থী সংগঠন পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টিতে সক্রিয় ছিলেন। চরমপন্থী নেতা দীপঙ্কর অনুসারী ছিলেন তিনি। এক পর্যায়ে যশোরের ভবদহের পাশাপাশি খুলনার ডুমুরিয়ায় তিনি একটি বাহিনী গড়ে তোলেন। এ নিয়ে অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জড়িয়ে পড়েন রানা। বছরপাঁচেক আগে তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছেন বলে স্বজনরা জানিয়েছেন। তবে চরমপন্থীদের সঙ্গে পূর্ব শত্রুতা রয়েই গেছে।

দ্বিতীয়ত, জিয়া নামে স্থানীয় ঘের ও বরফকল ব্যবসায়ীর সঙ্গে রানার দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। বছরখানেক আগে রানাকে হত্যার জন্য নানা পরিকল্পনা করেছিলেন জিয়া। বিভিন্ন সময় হুমকি দিতেন জিয়া। সেই বিরোধের জেরে রানাকে হত্যা করা হতে পারে বলে পরিবার ধারণা করছে।

যশোরের মনিরামপুরের বাড়িতে রানা প্রতাপ বৈরাগীর স্বজনের আহাজারি। সংগৃহীত ছবি
যশোরের মনিরামপুরের বাড়িতে রানা প্রতাপ বৈরাগীর স্বজনের আহাজারি। সংগৃহীত ছবি

তৃতীয়ত, রানা প্রতাপ দুটি বিয়ে করার আগে স্থানীয় কাটাখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এক ছাত্রীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান। বিয়ের পর তাঁর স্বামী বিদেশে চলে যান। পরে রানার সঙ্গে ওই নারীর সম্পর্ক গভীর হয়। এক পর্যায়ে রানা তাঁর বরফকলের অদূরে ওই নারীকে বিউটি পার্লার করতে সহযোগিতা করেন।

স্থানীয়রা বলছেন, ওই পার্লারে রানার নিয়মিত যাতায়াত ছিল। তাঁকে হত্যাও করা হয়েছে সেই বিউটি পার্লারের সামনে। অনৈতিক এই সম্পর্কের জেরে রানাকে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা স্থানীয়দের।

দুই স্ত্রীসহ স্বজন যা বলছেন

রানার প্রথম স্ত্রী সিমা মজুমদার বলেন, ‘জিয়া আগেও রানাকে হত্যা করতে চেয়েছিল। কিছুদিন আগে হুমকি দেন। ব্যবসা নিয়ে দ্বন্দ্বে এই হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে।’ দ্বিতীয় স্ত্রী পিংকি মল্লিক কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘রানা রাজনীতি করলেও কারও ক্ষতি করেনি। ব্যবসায় উন্নতি এবং মানুষের উপকারই তার কাল হয়েছে।’

রানার মা স্কুলশিক্ষক মাধুবি লতা বিশ্বাস বলেন, ‘রানা যে রাজনীতি করত, তাও বছরপাঁচেক আগে ছেড়ে দিয়েছে। ও চরমপন্থী ছিল না; পুলিশ তাঁকে ফাঁসিয়েছিল।’ তিনি বলেন, ‘ব্যবসার দ্বন্দ্বে রানাকে হত্যা করেছে প্রতিপক্ষ। আমি তাদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।’

চরমপন্থী থেকে আওয়ামী লীগে, ছিলেন আত্মগোপনে

কেশবপুরের আরুয়া গ্রামের তুষার কান্তি বৈরাগী ও মাধুবি লতা বিশ্বাসের ছেলে রানা প্রতাপ বৈরাগী। এক ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন বড়। দুই স্ত্রী পৃথক বাড়িতে বসবাস করেন। অভয়নগর, মনিরামপুর ও কেশবপুর– তিন উপজেলার সীমান্তে বাড়ি হওয়ায় আওয়ামী লীগের জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে তাঁর সখ্য ছিল।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা জানান, চরমপন্থী সংগঠন থেকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে রানা প্রতাপ বেছে নেন আওয়ামী লীগের রাজনীতি। পরে স্থানীয় বাজারে দুটি বরফকল দেন। একে একে ঘের ও মাছের আড়তের ব্যবসা শুরু করেন। পদপদবি না থাকলেও রানার বাসায় স্থানীয় এমপি থেকে জনপ্রতিনিধিদের অবাধ যাতায়াত ছিল।

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের পতনের পর রানা প্রতাপের বাড়িতে ভাঙচুর করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। কিছুদিন আত্মগোপনে থাকার পরে সম্প্রতি এলাকায় ফেরেন তিনি।

পুলিশ বলছে, রানার বিরুদ্ধে অভয়নগর থানায় একটি হত্যা, ধর্ষণ এবং কেশবপুর থানায় বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে তিনটি মামলা রয়েছে। ২০১৪ সালে অভয়নগর থানায় শ্রমিক নেতা ওলিয়ার হত্যা মামলায় চার্জশিটভুক্ত আসামি রানা। পরে ২০২০ সালে একই থানায় তাঁর বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগে আরেকটি মামলা হয়।

যা বলছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা

যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) আবুল বাশার জানান, রানার শরীরে লাগা চারটি গুলির উৎস সন্ধানে তারা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছেন। বিউটি পার্লারের কর্ণধারের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক, ব্যবসায়িক বিরোধ এবং চরমপন্থী সংগঠনের অভ্যন্তরীণ বিরোধে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে কিনা, সব বিষয় তদন্ত করা হচ্ছে। দ্রুত এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্‌ঘাটন করা সম্ভব হবে।

যশোরের সহকারী পুলিশ সুপার (মনিরামপুর সার্কেল) এমদাদুল হক বলেছেন, লেনদেন, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব ও চরমপন্থী সংগঠনের আধিপত্য বিস্তারের জেরে খুন হতে পারেন রানা প্রতাপ। আমরা সব বিষয়েই তদন্ত করছি। পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাব, ডিবি, সিআইডি ও পিবিআই তদন্ত করছে।

এ ব্যাপারে পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (অপারেশনস) রেজাউল করিম স্ট্রিমকে জানিয়েছেন, প্রাথমিক তদন্তে তারা রানা প্রতাপ বৈরাগী হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে সেখানকার চরমপন্থী গ্রুপের অভ্যন্তরীণ বিরোধের তথ্য পেয়েছেন। এর সঙ্গে আসা অন্যান্য সম্ভাব্য কারণ বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত এবং জড়িতদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত