জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

কম বিতর্কের পুরস্কার, থ্রিলারে উদাসীন বাংলা একাডেমি

প্রকাশ : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২২: ২৯
স্ট্রিম গ্রাফিক

দেশের সাহিত্য অঙ্গনের অন্যতম সম্মানজনক স্বীকৃতি ‘বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার’। তবে প্রতিবছরই এই পুরস্কার ঘিরে লেখক, পাঠক ও সাহিত্যপ্রেমীদের মধ্যে আগ্রহ, কৌতূহল ও বিতর্ক কাজ করে। তবে এবারের পুরস্কারপ্রাপ্তদের তালিকা প্রকাশের পর সাহিত্য অঙ্গনে কম বিতর্ক দেখা গেছে।

সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) বাংলা একাডেমির ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে এই পুরস্কারের জন্য মনোনীতদের নাম ঘোষণা করা হয়। এ বছর কবিতায় মোহন রায়হান, কথাসাহিত্যে নাসিমা আনিস, প্রবন্ধ ও গদ্য শাখায় সৈয়দ আজিজুল হক, শিশুসাহিত্যে হাসান হাফিজ, অনুবাদসাহিত্যে আলী আহমদ, গবেষণায় যৌথভাবে মুস্তাফা মজিদ ও ইসরাইল খান, বিজ্ঞানে ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী এবং মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্যে মঈদুল হাসান এবারের বাংলা একাডেমি পুরস্কার পাচ্ছেন।

বাংলা একাডেমি সাহিত্যের ক্ষেত্রে থ্রিলারের দিকে উদাসীন এমন মন্তব্য করে জনপ্রিয় লেখক ও অনুবাদক মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন ‘আমি চাইব ভবিষ্যতে এমন কোনো থ্রিলার লেখক আসবেন, যার লেখনী এমনই শক্তিশালী হবে যে কর্তৃপক্ষ তাঁকে পুরস্কার দিতে বাধ্য করবে।’

তিনি উদাহরণ টেনে বলেন, এর আগে মিউজিক বা সংগীতকেও সাহিত্যের বাইরে রাখা হতো। কিন্তু বব ডিলান যখন সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলেন, তখন থেকে সবাই মিউজিককেও গুনতে শুরু করেছে। থ্রিলার সাহিত্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

এবারের পুরস্কার ঘোষণার পর বিগত বছরের একটি ঘটনার প্রসঙ্গও নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে। বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০২৪-এর ক্ষেত্রে বেশ কিছু জটিলতার সৃষ্টি হয়েছিল। শুরুতে ১০টি ভিন্ন ভিন্ন ক্যাটাগরিতে ১০ জনের নাম ঘোষণা করা হলেও পরে সেই তালিকা নিয়ে বিভিন্ন মহলে অভিযোগ ওঠে।

অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলা একাডেমি তালিকা স্থগিত করে নতুন তালিকা প্রকাশ করে। সেই প্রাথমিকভাবে ঘোষিত তালিকা থেকে কথাসাহিত্যে সেলিম মোরশেদ, শিশুসাহিত্যে ফারুক নওয়াজ এবং মুক্তিযুদ্ধ ক্যাটাগরিতে মোহাম্মদ হাননান বাদ পড়েছিলেন। তবে কথাসাহিত্যিক সেলিম মোরশেদ নিজ উদ্যোগেই পুরস্কার থেকে নিজের নাম প্রত্যাহার করে নেন।

প্রাবন্ধিক, কবি মোরশেদ শফিউল হাসান স্ট্রিমকে বলেন, ‘এবারের বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখকদের সবাইকে আমার পক্ষ থেকে আন্তরিক অভিনন্দন। এদের মধ্যে কয়েকজন আমার অত্যন্ত পছন্দের মানুষ রয়েছেন, সে জন্য বিশেষ ভালো লাগছে।’

মোরশেদ শফিউল হাসান কিছুটা আক্ষেপও প্রকাশ করে জানান, এদের মধ্যে দু-একজন কেন আরও আগে এই পুরস্কারটি পাননি, সেটি জেনে তিনি বিস্মিত হচ্ছেন।

মোরশেদ শফিউল হাসানের মতে, উপযুক্ত ও যোগ্য এমন অনেকেই হয়তো এবারও বাদ রয়ে গেলেন। তবে তিনি নিজেকে এই ভেবে সান্ত্বনা দেন যে, কোনো ক্ষেত্রেই পুরস্কার পাওয়াটা একজন ব্যক্তির মেধা, যোগ্যতা বা কৃতিত্ব বিচারের একমাত্র মাপকাঠি নয়। এটি মূলত একটি স্বীকৃতিমাত্র; ভাগ্যক্রমে বা নির্দিষ্ট কোনো কার্যকারণ সূত্রে কেউ এই স্বীকৃতি পান, আবার কেউ হয়তো কখনোই পান না।

শিশুসাহিত্যিক ও সম্পাদক আহমাদ মাযহার ফেসবুকে এক পোস্টে উল্লেখ করেন, এবারের পুরস্কারপ্রাপ্ত নাসিমা আনিস ও ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী—এই দুজনের কাজ নিয়েই তাঁর সম্পাদিত ‘বইয়ের জগৎ’-এ প্রায় এক যুগ আগে আলোচনা করা হয়েছিল। ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী নিজেই ‘বইয়ের জগৎ’ পত্রিকায় লিখে কাগজটিকে সমৃদ্ধ করেছিলেন। এ ছাড়া বর্তমান বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক মোহাম্মদ আজম বহু বছর আগেই নাসিমা আনিসকে শনাক্ত করে রেখেছিলেন। মোহাম্মদ আজম সেই সময়ে ‘বইয়ের জগৎ’ পত্রিকায় নাসিমা আনিসের লেখা ‘মোহিনীর থান’ উপন্যাসটি নিয়ে একটি আলোচনা করেছিলেন।

এবারের মুক্তিযুদ্ধ ক্যাটাগরিতে মঈদুল হাসানের পুরস্কার পাওয়া নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা হয়েছে। লেখক ফিরোজ আহমেদ তাঁর ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘মঈদুল হাসান কখনো বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেতেন, একটা আস্ত গণঅভ্যুত্থান না হলে!’ ফিরোজ আহমেদ তার পোস্টে আরও লেখেন, মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাসকে আওয়ামী দখলদারত্ব থেকে এই সাহসী মানুষটি মুক্ত রেখেছেন। আর এই রকম সাহসী কাজের জন্য তাকে বহু রকম উপেক্ষার মূল্যও চোকাতে হয়েছে। তিনি মঈদুল হাসানের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘মূলধারা একাত্তর’-এর কথা স্মরণ করে বলেন, প্রবাসী সরকার, তাজউদ্দীন আহমদ এবং আরও অন্যান্য অসাধারণ সব মানুষের জীবন ও কর্ম সম্পর্কে আমরা যে প্রামাণ্য ইতিহাস জানতে পেরেছি, তা এই ‘মূলধারা একাত্তর’ বইটি থেকেই।

কবি রাসেল রায়হান বলেন, ‘এবার বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার তুলনামূলক ভালো হয়েছে। অন্তত আগের মতো মাস্তানি করে অযোগ্য লোকজন এই পুরস্কার নেয়নি বলে ধারণা করছি। ফেসবুকে যারা “অমুককে চিনি না... তমুকের নাম শুনিনি...অমুক দলীয় কোটায় পুরস্কার পেয়েছেন” বলে মন্তব্য করছেন, তাঁরা একটু কষ্ট করে খুঁজে খুঁজে সবার লেখা পড়লে হতাশ হবেন না বলেই মনে করি।’

এ ছাড়াও জানতে চাওয়া হয়েছিল পুরস্কার নিয়ে আপনার কোনো পরামর্শ আছে কিনা, তিনি বাংলা একাডেমির প্রতি বলেন, ‘এই পুরস্কারে সবচেয়ে বড় যে সমস্যা রয়ে গেছে, তা হলো বয়স। পুরস্কারপ্রাপ্তদের গড় বয়স ষাটের বেশি। সবচেয়ে কম সম্ভবত ৫৩। সত্তরোর্ধ্ব লেখকও আছেন। আমার পরামর্শ হলো, প্রতিটা ক্যাটাগরিতে ৪-৫ জন করে যোগ্য লেখককে এই পুরস্কার দিয়ে জটটা কমিয়ে ফেলা হোক। সেই সাথে পুরস্কারের অর্থমূল্য বাড়াতে হবে। অন্তত ৫ ভরি স্বর্ণমূল্য যেন দেওয়া হয়।’

কথাসাহিত্যিক এনামুল রেজা স্ট্রিমকে বলেন, কবিতা বাদে বাকি পুরস্কারের নির্বাচন তুলনামূলক ভালো হয়েছে বলে মনে করি।

Ad 300x250

সম্পর্কিত