কাজী মারুফুল ইসলামের সাক্ষাৎকার
ড. কাজী মারুফুল ইসলাম শিক্ষাবিদ ও গবেষক। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্বরত আছেন। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য তিনি। এছাড়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের সদস্য হিসেবেও তিনি যুক্ত ছিলেন। বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, নতুন সরকার ও মন্ত্রীপরিষদসহ দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গণের নানা বিষয় নিয়ে ঢাকা স্ট্রিমরে সঙ্গে কথা বলেন তিনি।
স্ট্রিম ডেস্ক

স্ট্রিম: নতুন সরকারের মন্ত্রীরা শপথ গ্রহণ করেছেন। কেমন দেখলেন, কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক হলো?
কাজী মারুফুল ইসলাম: প্রথমত আমি বলব, সরকার গঠনের এই উদ্যোগ বা প্রচেষ্টার মধ্যে এক ধরনের অভিনবত্ব রয়েছে। মন্ত্রিসভা গঠনে তরুণ ও প্রবীণের একটি মিশ্রণ ঘটানো হয়েছে। বয়স এবং রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা—উভয় দিক থেকেই এই সমন্বয় লক্ষণীয়। তবে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের বিষয়টিও এখানে বিবেচ্য। যেমন, নারী প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে মাত্র তিনজন মন্ত্রী রয়েছেন। আদিবাসী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থেকেও মাত্র একজন করে প্রতিনিধি নেওয়া হয়েছে। ফলে, জনসংখ্যার বৈচিত্র্য অনুযায়ী সমাজে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর যে প্রতিনিধিত্ব থাকা উচিত, তার পূর্ণ প্রতিফলন এই মন্ত্রিসভায় ঘটেনি।
দ্বিতীয়ত, যে পরিস্থিতিতে এই মন্ত্রিসভা গঠিত হলো, অর্থাৎ '২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে, সেই গণ-অভ্যুত্থানের মূল রূপকার ছিল এদেশের তরুণ সমাজ। কিন্তু সেই তারুণ্যের আকাঙ্ক্ষাকে প্রতিনিধিত্ব করার মতো জোরালো কণ্ঠস্বর, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল থেকে যারা বিভিন্ন জনপরিসরে সক্রিয় ছিলেন, তাদের উপস্থিতি মন্ত্রিসভায় খুব বেশি দেখছি না। তবুও তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত এই মন্ত্রিসভায় বিভিন্ন পেশাজীবী ও বয়সের যে মিশ্রণ ঘটানো হয়েছে, তা পূর্ববর্তী মন্ত্রিসভাগুলোর তুলনায় কিছুটা অভিনব বলতে হবে।
স্ট্রিম: নতুন সরকারের সামনে পাঁচটি বড় চ্যালেঞ্জ কী বলে আপনি মনে করেন?
কাজী মারুফুল ইসলাম: নতুন সরকারের সামনের প্রধান পাঁচটি চ্যালেঞ্জকে আমি কয়েকটি ভাগে ভাগ করতে চাই। কিছু চ্যালেঞ্জ সরকার পরিচালনার সঙ্গে সম্পর্কিত, আর কিছু সামাজিক ও রাজনৈতিক।
প্রথম চ্যালেঞ্জটি হলো আইনশৃঙ্খলা ও মব সংস্কৃতি নিয়ন্ত্রণ। গত দেড় বছর ধরে বাংলাদেশে দুর্ভাগ্যজনকভাবে যে মব সংস্কৃতির বিকাশ ও বাড়বাড়ন্ত হয়েছে, তা বন্ধ করা এবং কঠোরভাবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা এখন সরকারের এক নম্বর চ্যালেঞ্জ। দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ প্রতিষ্ঠানে আস্থা ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। নাগরিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে মানুষের আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাত ও বিপর্যস্ত স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে পুনরায় সক্রিয় করে জনমনে আস্থা ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা জরুরি।
তৃতীয় চ্যালেঞ্জ জুলাই সনদের বাস্তবায়ন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ধারণ করে যে ‘জুলাই সনদ’ তৈরি হয়েছে, তার প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হতে হবে। সংসদীয় প্রক্রিয়ায় এই সনদকে কীভাবে বৈধতা ও আইনগত ভিত্তি দেওয়া হবে এবং কার্যকর করা হবে, সেটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। চতুর্থত, সামাজিক বিভাজন ও উগ্রবাদের মোকাবিলা। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দক্ষিণপন্থী ধর্মভিত্তিক রাজনীতির উত্থান এবং ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধকে ভুলিয়ে দেওয়ার প্রবণতা সমাজে বড় বিভাজন সৃষ্টি করছে। এই বিভাজন ও অকারণ পরিচয়ের ভিন্নতার রাজনীতি মোকাবিলা করা সরকারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি এখনই সমাধান না করলে ভবিষ্যতে আইন প্রণয়ন ও শাসনকাজে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সর্বশেষ, অর্থনীতি ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি। স্থবির হয়ে থাকা বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা পঞ্চম চ্যালেঞ্জ। সরকারের এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতেই হবে। আর বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে হলে সরকারি খাতেও (যেমন—কারখানায় বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে) বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
স্ট্রিম: জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সংস্কার প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে নতুন সরকারের অবস্থানকে আপনি কীভাবে বিশ্লেষণ করছেন?
কাজী মারুফুল ইসলাম: সংবিধান সংস্কার পরিষদে বিএনপির সদস্যদের শপথ না নেওয়ার ঘোষণাটি অপ্রত্যাশিত হলেও, আমি এখনই এটিকে উদ্বেগজনক মনে করছি না। মূল বিষয় হলো জুলাই সনদের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করা। এর জন্য সংবিধানে পরিবর্তন আনা জরুরি। বিএনপির যুক্তি অনুযায়ী, তারা বিদ্যমান সংবিধানের কাঠামোর ভেতর থেকেই পরিবর্তন আনতে চায়। যতক্ষণ পর্যন্ত তারা জুলাই সনদের মূল দাবিগুলো (যেমন: সংসদের উচ্চকক্ষ তৈরি, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য সার্চ কমিটি গঠন এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানের গঠন প্রক্রিয়া সংস্কার) বাস্তবায়নে নেতিবাচক মনোভাব না দেখাচ্ছে, ততক্ষণ আমি উদ্বিগ্ন নই।
তবে, বিএনপি অতীতে এ ধরনের সংস্কারের প্রতি খুব বেশি আগ্রহী ছিল না। যদিও তাদের ঘোষিত ৩১ দফার প্রথম ১১টি দফায় রাষ্ট্র সংস্কারের কথা এবং এই বিষয়গুলোর অনেকগুলোর উল্লেখ ছিল।
যে গণ-অভ্যুত্থান এবং তরুণদের আত্মত্যাগের ফলে বিএনপি ও তার নেতৃত্ব আজ রাজনৈতিকভাবে দ্বিতীয় জীবন পেয়েছে, সেই জুলাই সনদের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে যদি বিশ্বাসঘাতকতা হয় বা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হয়, তাহলে তার পরিণতি ভালো হওয়ার কথা নয়।
স্ট্রিম: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর বড় সংখ্যক আসন লাভ ও ভোটের হার বৃদ্ধির বিষয়টি আমাদের কী কোনো বার্তা প্রদান করছে?
কাজী মারুফুল ইসলাম: আমরা আগস্টের পাঁচ তারিখের পর থেকে দক্ষিণপন্থী রাজনীতির উত্থান লক্ষ্য করছি, কিন্তু এর যাত্রা সেদিন শুরু হয়নি। এই রাজনীতির বিকাশ এক বা দুই বছরে সম্ভব নয়। সুতরাং, জামায়াতে ইসলামী ও তার সহযোগী সংগঠনগুলোর এই প্রসারকে যদি আমরা গত দেড়-দুই বছরের ফল হিসেবে দেখি, তবে তা ভুল হবে। কোনো রাজনৈতিক ধারাই এত অল্প সময়ে বিকশিত হতে পারে না। এর অর্থ হলো, ২০১৩ সালকে যদি একটি পর্যায় হিসেবে ধরি, তবে এরপর থেকে এই দলটি এক ধরনের আপাত নিষ্ক্রিয়তার কৌশল গ্রহণ করে। রাজনৈতিক জনপরিসরে সক্রিয় থাকার চেয়ে তারা ভিন্ন কৌশল নেয়। এই কৌশলের অংশ হিসেবে তারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, দল, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং ছাত্রদের মধ্যে তাদের কার্যক্রম প্রসারিত করে এবং নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে।
অন্যান্য দলের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির একটি বড় পার্থক্য হলো, তাদের কর্মীদের মধ্যে এক ধরনের নিষ্ঠা ও রাজনৈতিক পেশাদারিত্ব রয়েছে। এই পেশাদারিত্বকে কাজে লাগিয়ে তারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ধীরে ধীরে নিজেদের প্রভাব ও সমর্থক বৃদ্ধি করেছে। আমি দেখেছি, কিছু প্রতিষ্ঠানে মূলত তিন ধরনের মানুষেরই আধিপত্য: জামাত-সমর্থিত, জামাত-ঘনিষ্ঠ এবং জামাত-মনস্ক। জনমনে নিজেদের প্রতি এমন ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করা সহজ কোনো বিষয় নয়।
স্ট্রিম: দ্বিদলীয় রাজনীতির ব্যর্থতার ফলেই কী তাদের এই উত্থান নাকি অন্য কারণ রয়েছে?
কাজী মারুফুল ইসলাম: জামায়াতের সঙ্গে এক ধরনের বিরোধিতা আমরা উপর থেকে দেখেছি। কিন্তু লক্ষ্য করলে দেখবেন, যুদ্ধাপরাধী শীর্ষ নেতাদের অপসারণ ছাড়া জামায়াতে ইসলামীর মূল সংগঠন বা সাধারণ নেতাকর্মীদের খুব একটা ক্ষতি বা বিচ্যুতি হয়নি। জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতিকে আদর্শগতভাবে মোকাবেলা করার জন্য যে বিকল্প রাজনীতি প্রয়োজন, তা আওয়ামী লীগ উপস্থাপন করতে পারেনি। অন্যদিকে, বিএনপি তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত জামায়াতের এই উত্থান ও বিকাশের সিংহভাগ কৃতিত্ব বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকেই দিতে হবে। তাদের সমর্থন ও আশ্রয়েই জামায়াতের আজকের এই অবস্থান। সুতরাং, বিএনপি বা আওয়ামী লীগ— কেউই এই পরিস্থিতির দায় এড়াতে পারে না।
আওয়ামী লীগ আমলেও আমাদের পাঠ্যক্রমে এমন পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা হেফাজত ও জামায়াতের ভাবাদর্শকে জায়গা করে দিয়েছে। তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেত্রী হেফাজতের মতো একটি কট্টর ডানপন্থী সংগঠনকে নানাভাবে প্রশ্রয় দিয়েছেন। এই সংগঠনগুলোকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা না করে, কখনো অর্থের বিনিময়ে বা কখনো জবরদস্তির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়েছে, যা ফলপ্রসূ হয়নি।
আওয়ামী লীগ ভুলে গিয়েছিল যে, এই সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে যারা আছেন, তারাই সবকিছু নন। এর বাইরে বিভিন্ন মাদ্রাসা ও সম্প্রদায়ের মধ্যে অসংখ্য সাধারণ, অরাজনৈতিক কিন্তু ধর্মপ্রাণ মানুষ রয়েছেন। এই দলগুলো সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে এক ধরনের ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আওয়ামী লীগের দমন-পীড়নমূলক নীতি বাংলাদেশের প্রগতিশীল রাজনীতির জন্য বিপরীত ফল বয়ে এনেছে এবং ডানপন্থী রাজনীতির প্রসারে সহায়তা করেছে।
আরেকটি বাস্তবতা হলো, কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করে বাস্তবে কোনো লাভ হয় না। একটি রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার অর্থ হলো তাকে টিকে থাকার সঞ্জীবনী দেওয়া। জামায়াতে ইসলামী প্রায় নিষিদ্ধ হওয়ার কাছাকাছি অবস্থায় পৌঁছে গিয়েছিল, কিন্তু তাতে দলটির পতন ঘটেনি। রাজনীতিকে রাজনীতি ও আদর্শ দিয়েই মোকাবেলা করতে হয়, যে কাজটি আওয়ামী লীগ করেনি।
স্ট্রিম: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ করতে না দেওয়ায় কোনো জটিলতা তৈরি হবে কী?
কাজী মারুফুল ইসলাম: আমার পূর্ববর্তী বক্তব্যের সঙ্গে মিলিয়েই উত্তরটি দিতে চাই। '২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের পর যে আওয়ামী লীগকে আমরা দেখেছি, তার মধ্যে তিনটি সুস্পষ্ট উপাদান রয়েছে। প্রথমত, শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনা পরিবারকেন্দ্রিক একটি ক্ষুদ্র অংশ, যাদের মূল ভূমিকা ছিল লুণ্ঠন। দ্বিতীয়ত, দলের উচ্চপদস্থ নেতা ও মন্ত্রী, যারা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় নির্যাতন ও নিপীড়নের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। তৃতীয়ত, একটি বিশাল অংশ, যারা আদর্শগতভাবে, বঙ্গবন্ধুর প্রতি ভালোবাসা থেকে দলটিকে সমর্থন করে।
কাজেই, যারা গণ-অভ্যুত্থানের সময় নির্যাতনকারী, লুণ্ঠন ও দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত এবং ক্ষমতার অপব্যবহারকারী—তাদের বাইরেও আওয়ামী লীগকে সমর্থন করে এমন একটি বিশাল জনগোষ্ঠী রয়েছে। ফলে, প্রায় ৭৮-৭৯ বছরের পুরোনো এই সংগঠনটির কার্যক্রম সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করা গেলেও, এর সমর্থকদের মন থেকে দলটিকে মুছে ফেলা সম্ভব নয়।
স্ট্রিম: এই নির্বাচন কী ২০১৪ সালের নির্বাচনের মতো প্রশ্নের সম্মুখীন হবে?
কাজী মারুফুল ইসলাম: এই নির্বাচনে সকলের অংশগ্রহণ কাম্য ছিল, তবে আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণ না করায় এটি প্রশ্নবিদ্ধ হবে বলে আমি মনে করি না। কেউ প্রশ্ন তুললে তার যথাযথ উত্তরও রয়েছে।
’২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানে দলটির ভূমিকা এবং দেশের মানুষের ওপর নির্যাতনের কারণে, আওয়ামী লীগকে অন্য সব গণতান্ত্রিক দলের মতো নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়ার সুযোগ নেই। তাদের কৃতকর্মের জন্য অপরাধ স্বীকার করতে হবে, অনুশোচনা প্রকাশ করতে হবে এবং জনসমক্ষে ক্ষমা চাইতে হবে। এরপর তারা জনগণের কাছে ফিরে আসতে পারে; জনগণ তাদের গ্রহণ বা বর্জন করার সিদ্ধান্ত নেবে।
’২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান সংক্রান্ত এই অবস্থানের মীমাংসা না হওয়া পর্যন্ত, নির্বাচনে তাদের অংশগ্রহণের বিষয়টি গুরুত্ব পাবে না।
স্ট্রিম: এবার নির্বাচনে কিছু ভালো প্রার্থী ছিল, কিন্তু তারা জিততে পারেনি। অনেকে বলেছিলেন, ৫ই আগস্ট পরবর্তীতে মানুষের মনস্তত্ত্বে পরিবর্তন এসেছে। সেটি কী আদৌ হয়েছে বলে মনে করছেন?
কাজী মারুফুল ইসলাম: আমি আশাবাদী হতে চাই যে মানুষের মনস্তত্ত্বে পরিবর্তন আসবে, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। আমি সেদিন ক্লাসে পড়াচ্ছিলাম যে মানুষ কেন ভোট দেয় বা তার ভোটিং প্যাটার্ন কী দিয়ে নির্ধারিত হয়। এটি কেবল শিক্ষা বা নিরক্ষরতার ওপর নির্ভর করে না। এর অনেক ব্যাখ্যা থাকলেও ‘র্যাশনাল চয়েস থিওরি’ বা যৌক্তিক পছন্দ তত্ত্বটি বেশ জনপ্রিয়। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষ ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে লাভ-ক্ষতির হিসাব করে। নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসে, মানুষ চিন্তা করে—এই প্রার্থীকে ভোট দিলে আমার তাৎক্ষণিক কী লাভ হবে। দীর্ঘমেয়াদি লাভের বিষয়টি তখন গৌণ হয়ে যায়। ভোটার ভাবে, অমুক প্রার্থী কি আমার এলাকার বা স্কুলের জন্য এখনই কিছু করতে পারবে? যেহেতু তারা স্বল্পমেয়াদে চিন্তা করে, তাই ভোটের সিদ্ধান্তও সেভাবেই নেয়।
তাছাড়া এখনকার নির্বাচনী প্রচারণা প্রচণ্ডভাবে অর্থনির্ভর হয়ে গেছে। আমি গবেষণার কাজে নির্বাচনের আগে বেশ কিছু এলাকায় ঘুরে দেখেছি, সেখানে বিপুল পরিমাণ অর্থের ছড়াছড়ি। ভোটারদের টাকা দেওয়ার বিষয়টি বাদ দিলেও পোস্টার প্রিন্টিং, দল চালানো, কর্মী বাহিনী ও মোটরসাইকেলের শোভাযাত্রার জন্য বিশাল খরচ হয়। মনীষা বা তাসনিম জারার মতো প্রার্থীরা যখন বিপুল অর্থ ও সাংগঠনিক শক্তিসম্পন্ন প্রার্থীদের মোকাবিলা করেন, তখন ভোটারদের মধ্যে দৃশ্যমান প্রভাব ফেলা তাদের জন্য সহজ হয় না।
আসলে এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। আমি বা আপনি কেউই তো সমাজের বাইরে নই। আমাদের সমাজের মধ্যে দুর্ভাগ্যজনকভাবে যে ভোগবাদী ও লোভী প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তা আমাদের মনস্তত্ত্বকে আচ্ছন্ন করেছে। ফলে আমরা বিকল্প খোঁজার চেয়ে চাকচিক্য, বিজ্ঞাপন এবং বড় শক্তির সঙ্গে যুক্ত হতে চাই। সার্বিক পরিবেশের এই ভোগবাদিতা ও দুর্বৃত্তপরায়ণতা মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে, যা নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলে।
স্ট্রিম: শিক্ষিত সমাজের মধ্যেও কী মানসিক পরিবর্তন ঘটেছে?
কাজী মারুফুল ইসলাম: আমি বরং উল্টো করে বলব—যারা নিরক্ষর বা সাধারণ মানুষ, এই ভোগবাদিতার প্রভাব তাদের মধ্যে তুলনামূলক কম। কিন্তু শিক্ষিত, শহুরে ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে এটি তীব্র। যদিও আমার কাছে এই মুহূর্তে কোনো নির্দিষ্ট গবেষণার তথ্য নেই, তবে সাদা চোখে দেখা যায় যে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত—সবার মধ্যেই এই প্রবণতা ঢুকেছে। শ্রমজীবী মানুষদের নিয়ে আমাদের অনেক রোমান্টিসিজম থাকলেও সেখানেও ভোগবাদিতার প্রসার ঘটেছে। আবার আমরা মনে করি শিক্ষিত ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণি হয়তো বুঝে-শুনে সিদ্ধান্ত নেবে, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাদের মধ্যেও এই পচন ধরেছে। সামগ্রিকভাবে আমাদের মনস্তত্ত্বে এই নেতিবাচক পরিবর্তনটি ঘটেছে, যা সত্যিই কষ্টের।
স্ট্রিম: রাজনৈতিক দলগুলো সংসদ সদস্য হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য যাদের নির্বাচিত করেছেন, তাদের অনেকের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠেছে। তারা কী আরো ভালো প্রার্থী নির্বাচন করতে পারত না?
কাজী মারুফুল ইসলাম: আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে দেখা যায়, অভ্যুত্থান বা বিপ্লব হুট করে ঘটে না, এটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ফসল। কিন্তু এই অভ্যুত্থানের পেছনে যদি দীর্ঘমেয়াদি কোনো আদর্শিক সংগ্রাম না থাকে, তবে মানুষের রাজনৈতিক সামাজিকীকরণ বা পলিটিক্যাল সোশ্যালাইজেশন ঘটে না। নানা চলকের সংমিশ্রণে হয়তো একটা বিস্ফোরণ ঘটতে পারে, কিন্তু এর ফলে মানুষের মনস্তত্ত্ব দ্রুত বদলে যায় না।
দলগুলোর দিকে তাকালে দেখবেন—যেমন জামায়াতে ইসলামী, ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর বিশেষ কোনো অবদান বা উদ্যোগ ছিল না। তাদের কর্মীরা হয়তো ব্যক্তিগতভাবে আন্দোলনে ছিল, কিন্তু দলগতভাবে মানুষকে সচেতন করা বা কোনো কর্মসূচি দেওয়ার নজির আমি দেখিনি। অর্থাৎ দলকে প্রস্তুত করার বিষয়টি তাদের ছিল না। একইভাবে, পুরো আন্দোলনের ভেতরে সংগঠন হিসেবে বিএনপির অস্তিত্ব ছিল না বললেই চলে। ছাত্রদল বা বিএনপির অনেক নেতাকর্মী হয়তো ত্যাগ স্বীকার করেছেন ও আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন, কিন্তু সংগঠন হিসেবে বিএনপি নতুন কোনো বক্তব্য, কর্মসূচি, প্রস্তুতি বা আদর্শ হাজির করতে পারেনি। তাদের সাংগঠনিক নিউক্লিয়াসে কোনো পরিবর্তন হয়নি। আন্দোলনের পর যখন পরিবেশ অনুকূল হয়েছে, তখনই তারা ফুলে-ফেঁপে ওঠার চেষ্টা করছে।
এই দলগুলোর নেতৃত্ব, মনস্তত্ত্ব, আদর্শ বা কার্যক্রমে মৌলিক কোনো পরিবর্তন আসেনি। আমরা শুনেছি, এবারও সব দলের মনোনয়নের পেছনে অর্থের লেনদেন হয়েছে। তাহলে পরিবর্তনটা কোথায় হলো? আমি নিশ্চিত, এমন পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ থাকলে তারাও একই কাজ করত। এর মূল কারণ হলো দলগুলোর ভেতরে গণতন্ত্রের চর্চা নেই। আমি জানি, ছাত্রদল বা বিএনপির অনেক তরুণ কর্মী এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি পছন্দ করে না, কিন্তু দলের ভেতরে তাদের কণ্ঠস্বর প্রকাশের সুযোগ নেই। সব দলেই তোষামোদ ও চাটুকারিতার মাধ্যমে পদ-পদবি পাওয়া যায়। যদি তৃণমূল থেকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নেতৃত্ব উঠে আসত, তবেই কেবল এই রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন সম্ভব হতো।
স্ট্রিম: ৫ আগস্ট পরবর্তীতে তরুণ নেতৃত্বের ওপর একটা আশা তৈরি হয়েছিল যে তরুণরা আমাদের নেতৃত্ব দিবে, তরুণ নেতৃত্ব তৈরি হবে। সেই আশা কতটা পূরণ হলো?
কাজী মারুফুল ইসলাম: তরুণদের প্রতি আমার আশা একটুও কমেনি। কিন্তু তরুণদের যে অংশটি তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব করার দাবি নিয়ে রাজনৈতিক দল গঠন করেছে, তাদের প্রতি আমার আশাভঙ্গ হয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যারা নিজেদের প্রাণ দিতে প্রস্তুত ছিল, সেই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে উঠে আসা নেতৃত্বের কাছে আমার প্রত্যাশা ছিল ভিন্ন।
এনসিপি বা নতুন যে রাজনৈতিক উদ্যোগ আমরা দেখছি, যারা আজ জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে বিলীন হওয়ার উপক্রম হয়েছে, তারা পরিষ্কারভাবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। সারা দেশের স্কুল-কলেজ, জাতীয় ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অসংখ্য তরুণ এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তারা তাদের নেতাদের নির্দেশনা মেনেছে। কিন্তু নিশ্চিতভাবে এই সাধারণ শিক্ষার্থীদের কেউ ভাবেনি যে, দিনশেষে তাদের নেতারা জামায়াতে ইসলামীর অংশ হয়ে যাবে। এটি স্পষ্টতই বিশ্বাসঘাতকতা। সংগঠন হিসেবেও তারা ভিন্ন কোনো সংস্কৃতি বা নতুন কিছু প্রবর্তন করতে পারেনি। যতটুকু দেখেছি, এনসিপি মাত্র কয়েক দিনের সংগঠন, হয়তো ভবিষ্যতে তাদের পরিবর্তন হবে। এখন তাদের জামায়াতের খুব ঘনিষ্ঠ মনে হচ্ছে, আবার কয়েক বছর পর দূরত্বও তৈরি হতে পারে। তাই তাদের সম্পর্কে চূড়ান্ত কথা বলার সময় হয়তো এখনো আসেনি।
স্ট্রিম: অন্য তরুণরা কী এটি দেখে হতাশ হবেন না?
কাজী মারুফুল ইসলাম: হ্যাঁ, অবশ্যই। বিশ্বাসঘাতকতার প্রশ্নটি ওখানেই আসছে। তরুণরা প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর আস্থা রাখতে পারছিল না বলেই এমন একটি প্ল্যাটফর্ম চেয়েছিল, যা তাদের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করবে। সেই জায়গায় এই নেতারা চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়েছেন।
আমি জানি না, তবে তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এবং সচিবালয়ের ভেতরে বিভিন্ন তদবির বা দালালি করার অভিযোগ রয়েছে, যার কিছু প্রমাণ আমার কাছেও আছে। আমাদের সন্তানেরা তাদের কাছে এই ধরনের আচরণ আশা করেনি। এটি নিশ্চিতভাবে আমাদের কষ্ট দিয়েছে। যাদের রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ ছিল এবং যারা এই সুযোগের অপব্যবহার করেছেন, তাদেরও তদন্ত হওয়া উচিত এবং বিচারের আওতায় আনা প্রয়োজন।
স্ট্রিম: অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?
কাজী মারুফুল ইসলাম: অন্তর্বর্তী সরকার সম্পর্কে আমার মূল্যায়ন হয়তো অনেকের সঙ্গে মিলবে না, তবে আমি মনে করি আমরা তাদের প্রতি যথেষ্ট কৃতজ্ঞতা দেখাইনি। ড. ইউনূস এমন এক সময়ে দায়িত্ব নিয়েছিলেন যখন আমাদের সামনে হাল ধরার মতো কেউ ছিল না। তিনি এবং তাঁর সরকার ছিলেন গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক শক্তি ও জাতীয় ঐক্যের প্রতীক। অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং রাষ্ট্রকে ভেঙে পড়ার হাত থেকে বাঁচাতে আমরা দ্বিতীয় কোনো ব্যক্তি পাইনি। সেই পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনী দায়িত্ব নিলে আমরা কি তা মেনে নিতাম? ড. ইউনূস ছাড়া অন্য কেউ দায়িত্ব নিলে আন্তর্জাতিক বিশ্বে এই সরকারের গ্রহণযোগ্যতা পাওয়া কঠিন হতো। তাই রাষ্ট্রকে বড় ধরনের ভাঙন থেকে বাঁচানোর কৃতিত্ব তাদের দিতেই হবে।
তবে তাদের কাছে আমাদের বিপুল প্রত্যাশা ছিল। প্রথমত, জুলাইয়ের অপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়ায় তাদের যথেষ্ট দক্ষতা বা পরাঙ্গমতা দেখিনি। আইনি প্রক্রিয়ায় দুর্বলতা ছিল, বিচার ধীরগতিতে হয়েছে এবং সব অপরাধীকে সমানভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। তাছাড়া ঢালাও মামলাবাজি নিয়ন্ত্রণ করতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্র সংস্কারের ক্ষেত্রে তারা সংবিধান সংস্কারে বেশি মনোযোগ দিয়েছেন। কিন্তু পুলিশ, আমলাতন্ত্র, দুর্নীতি দমন কমিশন বা স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সংস্কারের জন্য সংবিধান পরিবর্তনের প্রয়োজন ছিল না। দুর্ভাগ্যবশত, সরকার এদিকে নজর দেয়নি। তারা মব সংস্কৃতি বা উচ্ছৃঙ্খল জনতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি, বরং এক ধরনের প্রশ্রয় দিয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও তা খুব উল্লেখযোগ্য নয়। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে তাদের অর্জন নেই বললেই চলে; উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে দলীয়করণের সেই পুরনো ধারাই বজায় রাখা হয়েছে। অর্জনের তুলনায় ব্যর্থতার পাল্লা ভারী হলেও, চরম সংকটময় মুহূর্তে রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখার জন্য তাদের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।
স্ট্রিম: বাংলাদেশের উন্নয়ন ও এগিয়ে যাওয়ার জন্য নতুন সরকারের করণীয় কি হওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?
কাজী মারুফুল ইসলাম: অর্থনীতির সংকট দীর্ঘদিনের, তবে অন্তর্বর্তী সরকার সেটাকে মোটামুটি একটা স্থিতিশীল জায়গায় আনতে সক্ষম হয়েছিল। বর্তমানে অর্থনীতির মূল সংকট হলো—বিনিয়োগ স্থবির হয়ে আছে এবং সরকারের রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি রয়েছে। রপ্তানিও কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়ছে না, বরং কিছুটা নিম্নমুখী। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারের চাপ, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চাপ।
এই পরিস্থিতিতে অর্থনীতিতে গতিশীলতা বা ‘ডিনামিজম’ তৈরি করা জরুরি। ঐতিহাসিকভাবে এমন পরিস্থিতিতে সরকারকেই এগিয়ে আসতে হয় এবং একটি ‘বিগ পুশ’দিতে হয়। সামনে যে বাজেট আসছে, সেখানে সরকারকে চমক দেখাতে হবে। বিশেষ করে রাজস্ব সংগ্রহের ক্ষেত্রে নতুন কর্মসূচি ও সংস্কার আনতে হবে। অপচয় রোধ করতে হবে—যেমন এলএনজি আমদানি বা ঋণের কিস্তি পরিশোধে বিশাল অর্থ চলে যাচ্ছে, পাশাপাশি অদরকারি প্রকল্পগুলোতে অর্থের অপচয় বা 'ড্রেনেজ' বন্ধ করা জরুরি।
সরকার যদি রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারে, তবে সেই অর্থ দিয়ে এমন সব খাতে সরকারি বিনিয়োগ করতে হবে যা বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করবে। বর্তমানে বেসরকারি বিনিয়োগ প্রায় ২২ শতাংশের মতো আছে, এটাকে বাড়াতে হবে। অর্থাৎ, কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হলে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।

ড. কাজী মারুফুল ইসলাম শিক্ষাবিদ ও গবেষক। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্বরত আছেন। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য তিনি। এছাড়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের সদস্য হিসেবেও তিনি যুক্ত ছিলেন। বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, নতুন সরকার ও মন্ত্রীপরিষদসহ দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গণের নানা বিষয় নিয়ে ঢাকা স্ট্রিমরে সঙ্গে কথা বলেন তিনি।
স্ট্রিম: নতুন সরকারের মন্ত্রীরা শপথ গ্রহণ করেছেন। কেমন দেখলেন, কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক হলো?
কাজী মারুফুল ইসলাম: প্রথমত আমি বলব, সরকার গঠনের এই উদ্যোগ বা প্রচেষ্টার মধ্যে এক ধরনের অভিনবত্ব রয়েছে। মন্ত্রিসভা গঠনে তরুণ ও প্রবীণের একটি মিশ্রণ ঘটানো হয়েছে। বয়স এবং রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা—উভয় দিক থেকেই এই সমন্বয় লক্ষণীয়। তবে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের বিষয়টিও এখানে বিবেচ্য। যেমন, নারী প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে মাত্র তিনজন মন্ত্রী রয়েছেন। আদিবাসী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থেকেও মাত্র একজন করে প্রতিনিধি নেওয়া হয়েছে। ফলে, জনসংখ্যার বৈচিত্র্য অনুযায়ী সমাজে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর যে প্রতিনিধিত্ব থাকা উচিত, তার পূর্ণ প্রতিফলন এই মন্ত্রিসভায় ঘটেনি।
দ্বিতীয়ত, যে পরিস্থিতিতে এই মন্ত্রিসভা গঠিত হলো, অর্থাৎ '২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে, সেই গণ-অভ্যুত্থানের মূল রূপকার ছিল এদেশের তরুণ সমাজ। কিন্তু সেই তারুণ্যের আকাঙ্ক্ষাকে প্রতিনিধিত্ব করার মতো জোরালো কণ্ঠস্বর, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল থেকে যারা বিভিন্ন জনপরিসরে সক্রিয় ছিলেন, তাদের উপস্থিতি মন্ত্রিসভায় খুব বেশি দেখছি না। তবুও তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত এই মন্ত্রিসভায় বিভিন্ন পেশাজীবী ও বয়সের যে মিশ্রণ ঘটানো হয়েছে, তা পূর্ববর্তী মন্ত্রিসভাগুলোর তুলনায় কিছুটা অভিনব বলতে হবে।
স্ট্রিম: নতুন সরকারের সামনে পাঁচটি বড় চ্যালেঞ্জ কী বলে আপনি মনে করেন?
কাজী মারুফুল ইসলাম: নতুন সরকারের সামনের প্রধান পাঁচটি চ্যালেঞ্জকে আমি কয়েকটি ভাগে ভাগ করতে চাই। কিছু চ্যালেঞ্জ সরকার পরিচালনার সঙ্গে সম্পর্কিত, আর কিছু সামাজিক ও রাজনৈতিক।
প্রথম চ্যালেঞ্জটি হলো আইনশৃঙ্খলা ও মব সংস্কৃতি নিয়ন্ত্রণ। গত দেড় বছর ধরে বাংলাদেশে দুর্ভাগ্যজনকভাবে যে মব সংস্কৃতির বিকাশ ও বাড়বাড়ন্ত হয়েছে, তা বন্ধ করা এবং কঠোরভাবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা এখন সরকারের এক নম্বর চ্যালেঞ্জ। দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ প্রতিষ্ঠানে আস্থা ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। নাগরিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে মানুষের আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাত ও বিপর্যস্ত স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে পুনরায় সক্রিয় করে জনমনে আস্থা ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা জরুরি।
তৃতীয় চ্যালেঞ্জ জুলাই সনদের বাস্তবায়ন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ধারণ করে যে ‘জুলাই সনদ’ তৈরি হয়েছে, তার প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হতে হবে। সংসদীয় প্রক্রিয়ায় এই সনদকে কীভাবে বৈধতা ও আইনগত ভিত্তি দেওয়া হবে এবং কার্যকর করা হবে, সেটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। চতুর্থত, সামাজিক বিভাজন ও উগ্রবাদের মোকাবিলা। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দক্ষিণপন্থী ধর্মভিত্তিক রাজনীতির উত্থান এবং ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধকে ভুলিয়ে দেওয়ার প্রবণতা সমাজে বড় বিভাজন সৃষ্টি করছে। এই বিভাজন ও অকারণ পরিচয়ের ভিন্নতার রাজনীতি মোকাবিলা করা সরকারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি এখনই সমাধান না করলে ভবিষ্যতে আইন প্রণয়ন ও শাসনকাজে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সর্বশেষ, অর্থনীতি ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি। স্থবির হয়ে থাকা বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা পঞ্চম চ্যালেঞ্জ। সরকারের এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতেই হবে। আর বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে হলে সরকারি খাতেও (যেমন—কারখানায় বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে) বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
স্ট্রিম: জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সংস্কার প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে নতুন সরকারের অবস্থানকে আপনি কীভাবে বিশ্লেষণ করছেন?
কাজী মারুফুল ইসলাম: সংবিধান সংস্কার পরিষদে বিএনপির সদস্যদের শপথ না নেওয়ার ঘোষণাটি অপ্রত্যাশিত হলেও, আমি এখনই এটিকে উদ্বেগজনক মনে করছি না। মূল বিষয় হলো জুলাই সনদের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করা। এর জন্য সংবিধানে পরিবর্তন আনা জরুরি। বিএনপির যুক্তি অনুযায়ী, তারা বিদ্যমান সংবিধানের কাঠামোর ভেতর থেকেই পরিবর্তন আনতে চায়। যতক্ষণ পর্যন্ত তারা জুলাই সনদের মূল দাবিগুলো (যেমন: সংসদের উচ্চকক্ষ তৈরি, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য সার্চ কমিটি গঠন এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানের গঠন প্রক্রিয়া সংস্কার) বাস্তবায়নে নেতিবাচক মনোভাব না দেখাচ্ছে, ততক্ষণ আমি উদ্বিগ্ন নই।
তবে, বিএনপি অতীতে এ ধরনের সংস্কারের প্রতি খুব বেশি আগ্রহী ছিল না। যদিও তাদের ঘোষিত ৩১ দফার প্রথম ১১টি দফায় রাষ্ট্র সংস্কারের কথা এবং এই বিষয়গুলোর অনেকগুলোর উল্লেখ ছিল।
যে গণ-অভ্যুত্থান এবং তরুণদের আত্মত্যাগের ফলে বিএনপি ও তার নেতৃত্ব আজ রাজনৈতিকভাবে দ্বিতীয় জীবন পেয়েছে, সেই জুলাই সনদের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে যদি বিশ্বাসঘাতকতা হয় বা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হয়, তাহলে তার পরিণতি ভালো হওয়ার কথা নয়।
স্ট্রিম: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর বড় সংখ্যক আসন লাভ ও ভোটের হার বৃদ্ধির বিষয়টি আমাদের কী কোনো বার্তা প্রদান করছে?
কাজী মারুফুল ইসলাম: আমরা আগস্টের পাঁচ তারিখের পর থেকে দক্ষিণপন্থী রাজনীতির উত্থান লক্ষ্য করছি, কিন্তু এর যাত্রা সেদিন শুরু হয়নি। এই রাজনীতির বিকাশ এক বা দুই বছরে সম্ভব নয়। সুতরাং, জামায়াতে ইসলামী ও তার সহযোগী সংগঠনগুলোর এই প্রসারকে যদি আমরা গত দেড়-দুই বছরের ফল হিসেবে দেখি, তবে তা ভুল হবে। কোনো রাজনৈতিক ধারাই এত অল্প সময়ে বিকশিত হতে পারে না। এর অর্থ হলো, ২০১৩ সালকে যদি একটি পর্যায় হিসেবে ধরি, তবে এরপর থেকে এই দলটি এক ধরনের আপাত নিষ্ক্রিয়তার কৌশল গ্রহণ করে। রাজনৈতিক জনপরিসরে সক্রিয় থাকার চেয়ে তারা ভিন্ন কৌশল নেয়। এই কৌশলের অংশ হিসেবে তারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, দল, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং ছাত্রদের মধ্যে তাদের কার্যক্রম প্রসারিত করে এবং নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে।
অন্যান্য দলের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির একটি বড় পার্থক্য হলো, তাদের কর্মীদের মধ্যে এক ধরনের নিষ্ঠা ও রাজনৈতিক পেশাদারিত্ব রয়েছে। এই পেশাদারিত্বকে কাজে লাগিয়ে তারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ধীরে ধীরে নিজেদের প্রভাব ও সমর্থক বৃদ্ধি করেছে। আমি দেখেছি, কিছু প্রতিষ্ঠানে মূলত তিন ধরনের মানুষেরই আধিপত্য: জামাত-সমর্থিত, জামাত-ঘনিষ্ঠ এবং জামাত-মনস্ক। জনমনে নিজেদের প্রতি এমন ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করা সহজ কোনো বিষয় নয়।
স্ট্রিম: দ্বিদলীয় রাজনীতির ব্যর্থতার ফলেই কী তাদের এই উত্থান নাকি অন্য কারণ রয়েছে?
কাজী মারুফুল ইসলাম: জামায়াতের সঙ্গে এক ধরনের বিরোধিতা আমরা উপর থেকে দেখেছি। কিন্তু লক্ষ্য করলে দেখবেন, যুদ্ধাপরাধী শীর্ষ নেতাদের অপসারণ ছাড়া জামায়াতে ইসলামীর মূল সংগঠন বা সাধারণ নেতাকর্মীদের খুব একটা ক্ষতি বা বিচ্যুতি হয়নি। জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতিকে আদর্শগতভাবে মোকাবেলা করার জন্য যে বিকল্প রাজনীতি প্রয়োজন, তা আওয়ামী লীগ উপস্থাপন করতে পারেনি। অন্যদিকে, বিএনপি তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত জামায়াতের এই উত্থান ও বিকাশের সিংহভাগ কৃতিত্ব বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকেই দিতে হবে। তাদের সমর্থন ও আশ্রয়েই জামায়াতের আজকের এই অবস্থান। সুতরাং, বিএনপি বা আওয়ামী লীগ— কেউই এই পরিস্থিতির দায় এড়াতে পারে না।
আওয়ামী লীগ আমলেও আমাদের পাঠ্যক্রমে এমন পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা হেফাজত ও জামায়াতের ভাবাদর্শকে জায়গা করে দিয়েছে। তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেত্রী হেফাজতের মতো একটি কট্টর ডানপন্থী সংগঠনকে নানাভাবে প্রশ্রয় দিয়েছেন। এই সংগঠনগুলোকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা না করে, কখনো অর্থের বিনিময়ে বা কখনো জবরদস্তির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়েছে, যা ফলপ্রসূ হয়নি।
আওয়ামী লীগ ভুলে গিয়েছিল যে, এই সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে যারা আছেন, তারাই সবকিছু নন। এর বাইরে বিভিন্ন মাদ্রাসা ও সম্প্রদায়ের মধ্যে অসংখ্য সাধারণ, অরাজনৈতিক কিন্তু ধর্মপ্রাণ মানুষ রয়েছেন। এই দলগুলো সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে এক ধরনের ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আওয়ামী লীগের দমন-পীড়নমূলক নীতি বাংলাদেশের প্রগতিশীল রাজনীতির জন্য বিপরীত ফল বয়ে এনেছে এবং ডানপন্থী রাজনীতির প্রসারে সহায়তা করেছে।
আরেকটি বাস্তবতা হলো, কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করে বাস্তবে কোনো লাভ হয় না। একটি রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার অর্থ হলো তাকে টিকে থাকার সঞ্জীবনী দেওয়া। জামায়াতে ইসলামী প্রায় নিষিদ্ধ হওয়ার কাছাকাছি অবস্থায় পৌঁছে গিয়েছিল, কিন্তু তাতে দলটির পতন ঘটেনি। রাজনীতিকে রাজনীতি ও আদর্শ দিয়েই মোকাবেলা করতে হয়, যে কাজটি আওয়ামী লীগ করেনি।
স্ট্রিম: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ করতে না দেওয়ায় কোনো জটিলতা তৈরি হবে কী?
কাজী মারুফুল ইসলাম: আমার পূর্ববর্তী বক্তব্যের সঙ্গে মিলিয়েই উত্তরটি দিতে চাই। '২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের পর যে আওয়ামী লীগকে আমরা দেখেছি, তার মধ্যে তিনটি সুস্পষ্ট উপাদান রয়েছে। প্রথমত, শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনা পরিবারকেন্দ্রিক একটি ক্ষুদ্র অংশ, যাদের মূল ভূমিকা ছিল লুণ্ঠন। দ্বিতীয়ত, দলের উচ্চপদস্থ নেতা ও মন্ত্রী, যারা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় নির্যাতন ও নিপীড়নের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। তৃতীয়ত, একটি বিশাল অংশ, যারা আদর্শগতভাবে, বঙ্গবন্ধুর প্রতি ভালোবাসা থেকে দলটিকে সমর্থন করে।
কাজেই, যারা গণ-অভ্যুত্থানের সময় নির্যাতনকারী, লুণ্ঠন ও দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত এবং ক্ষমতার অপব্যবহারকারী—তাদের বাইরেও আওয়ামী লীগকে সমর্থন করে এমন একটি বিশাল জনগোষ্ঠী রয়েছে। ফলে, প্রায় ৭৮-৭৯ বছরের পুরোনো এই সংগঠনটির কার্যক্রম সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করা গেলেও, এর সমর্থকদের মন থেকে দলটিকে মুছে ফেলা সম্ভব নয়।
স্ট্রিম: এই নির্বাচন কী ২০১৪ সালের নির্বাচনের মতো প্রশ্নের সম্মুখীন হবে?
কাজী মারুফুল ইসলাম: এই নির্বাচনে সকলের অংশগ্রহণ কাম্য ছিল, তবে আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণ না করায় এটি প্রশ্নবিদ্ধ হবে বলে আমি মনে করি না। কেউ প্রশ্ন তুললে তার যথাযথ উত্তরও রয়েছে।
’২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানে দলটির ভূমিকা এবং দেশের মানুষের ওপর নির্যাতনের কারণে, আওয়ামী লীগকে অন্য সব গণতান্ত্রিক দলের মতো নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়ার সুযোগ নেই। তাদের কৃতকর্মের জন্য অপরাধ স্বীকার করতে হবে, অনুশোচনা প্রকাশ করতে হবে এবং জনসমক্ষে ক্ষমা চাইতে হবে। এরপর তারা জনগণের কাছে ফিরে আসতে পারে; জনগণ তাদের গ্রহণ বা বর্জন করার সিদ্ধান্ত নেবে।
’২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান সংক্রান্ত এই অবস্থানের মীমাংসা না হওয়া পর্যন্ত, নির্বাচনে তাদের অংশগ্রহণের বিষয়টি গুরুত্ব পাবে না।
স্ট্রিম: এবার নির্বাচনে কিছু ভালো প্রার্থী ছিল, কিন্তু তারা জিততে পারেনি। অনেকে বলেছিলেন, ৫ই আগস্ট পরবর্তীতে মানুষের মনস্তত্ত্বে পরিবর্তন এসেছে। সেটি কী আদৌ হয়েছে বলে মনে করছেন?
কাজী মারুফুল ইসলাম: আমি আশাবাদী হতে চাই যে মানুষের মনস্তত্ত্বে পরিবর্তন আসবে, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। আমি সেদিন ক্লাসে পড়াচ্ছিলাম যে মানুষ কেন ভোট দেয় বা তার ভোটিং প্যাটার্ন কী দিয়ে নির্ধারিত হয়। এটি কেবল শিক্ষা বা নিরক্ষরতার ওপর নির্ভর করে না। এর অনেক ব্যাখ্যা থাকলেও ‘র্যাশনাল চয়েস থিওরি’ বা যৌক্তিক পছন্দ তত্ত্বটি বেশ জনপ্রিয়। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষ ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে লাভ-ক্ষতির হিসাব করে। নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসে, মানুষ চিন্তা করে—এই প্রার্থীকে ভোট দিলে আমার তাৎক্ষণিক কী লাভ হবে। দীর্ঘমেয়াদি লাভের বিষয়টি তখন গৌণ হয়ে যায়। ভোটার ভাবে, অমুক প্রার্থী কি আমার এলাকার বা স্কুলের জন্য এখনই কিছু করতে পারবে? যেহেতু তারা স্বল্পমেয়াদে চিন্তা করে, তাই ভোটের সিদ্ধান্তও সেভাবেই নেয়।
তাছাড়া এখনকার নির্বাচনী প্রচারণা প্রচণ্ডভাবে অর্থনির্ভর হয়ে গেছে। আমি গবেষণার কাজে নির্বাচনের আগে বেশ কিছু এলাকায় ঘুরে দেখেছি, সেখানে বিপুল পরিমাণ অর্থের ছড়াছড়ি। ভোটারদের টাকা দেওয়ার বিষয়টি বাদ দিলেও পোস্টার প্রিন্টিং, দল চালানো, কর্মী বাহিনী ও মোটরসাইকেলের শোভাযাত্রার জন্য বিশাল খরচ হয়। মনীষা বা তাসনিম জারার মতো প্রার্থীরা যখন বিপুল অর্থ ও সাংগঠনিক শক্তিসম্পন্ন প্রার্থীদের মোকাবিলা করেন, তখন ভোটারদের মধ্যে দৃশ্যমান প্রভাব ফেলা তাদের জন্য সহজ হয় না।
আসলে এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। আমি বা আপনি কেউই তো সমাজের বাইরে নই। আমাদের সমাজের মধ্যে দুর্ভাগ্যজনকভাবে যে ভোগবাদী ও লোভী প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তা আমাদের মনস্তত্ত্বকে আচ্ছন্ন করেছে। ফলে আমরা বিকল্প খোঁজার চেয়ে চাকচিক্য, বিজ্ঞাপন এবং বড় শক্তির সঙ্গে যুক্ত হতে চাই। সার্বিক পরিবেশের এই ভোগবাদিতা ও দুর্বৃত্তপরায়ণতা মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে, যা নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলে।
স্ট্রিম: শিক্ষিত সমাজের মধ্যেও কী মানসিক পরিবর্তন ঘটেছে?
কাজী মারুফুল ইসলাম: আমি বরং উল্টো করে বলব—যারা নিরক্ষর বা সাধারণ মানুষ, এই ভোগবাদিতার প্রভাব তাদের মধ্যে তুলনামূলক কম। কিন্তু শিক্ষিত, শহুরে ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে এটি তীব্র। যদিও আমার কাছে এই মুহূর্তে কোনো নির্দিষ্ট গবেষণার তথ্য নেই, তবে সাদা চোখে দেখা যায় যে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত—সবার মধ্যেই এই প্রবণতা ঢুকেছে। শ্রমজীবী মানুষদের নিয়ে আমাদের অনেক রোমান্টিসিজম থাকলেও সেখানেও ভোগবাদিতার প্রসার ঘটেছে। আবার আমরা মনে করি শিক্ষিত ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণি হয়তো বুঝে-শুনে সিদ্ধান্ত নেবে, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাদের মধ্যেও এই পচন ধরেছে। সামগ্রিকভাবে আমাদের মনস্তত্ত্বে এই নেতিবাচক পরিবর্তনটি ঘটেছে, যা সত্যিই কষ্টের।
স্ট্রিম: রাজনৈতিক দলগুলো সংসদ সদস্য হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য যাদের নির্বাচিত করেছেন, তাদের অনেকের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠেছে। তারা কী আরো ভালো প্রার্থী নির্বাচন করতে পারত না?
কাজী মারুফুল ইসলাম: আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে দেখা যায়, অভ্যুত্থান বা বিপ্লব হুট করে ঘটে না, এটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ফসল। কিন্তু এই অভ্যুত্থানের পেছনে যদি দীর্ঘমেয়াদি কোনো আদর্শিক সংগ্রাম না থাকে, তবে মানুষের রাজনৈতিক সামাজিকীকরণ বা পলিটিক্যাল সোশ্যালাইজেশন ঘটে না। নানা চলকের সংমিশ্রণে হয়তো একটা বিস্ফোরণ ঘটতে পারে, কিন্তু এর ফলে মানুষের মনস্তত্ত্ব দ্রুত বদলে যায় না।
দলগুলোর দিকে তাকালে দেখবেন—যেমন জামায়াতে ইসলামী, ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর বিশেষ কোনো অবদান বা উদ্যোগ ছিল না। তাদের কর্মীরা হয়তো ব্যক্তিগতভাবে আন্দোলনে ছিল, কিন্তু দলগতভাবে মানুষকে সচেতন করা বা কোনো কর্মসূচি দেওয়ার নজির আমি দেখিনি। অর্থাৎ দলকে প্রস্তুত করার বিষয়টি তাদের ছিল না। একইভাবে, পুরো আন্দোলনের ভেতরে সংগঠন হিসেবে বিএনপির অস্তিত্ব ছিল না বললেই চলে। ছাত্রদল বা বিএনপির অনেক নেতাকর্মী হয়তো ত্যাগ স্বীকার করেছেন ও আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন, কিন্তু সংগঠন হিসেবে বিএনপি নতুন কোনো বক্তব্য, কর্মসূচি, প্রস্তুতি বা আদর্শ হাজির করতে পারেনি। তাদের সাংগঠনিক নিউক্লিয়াসে কোনো পরিবর্তন হয়নি। আন্দোলনের পর যখন পরিবেশ অনুকূল হয়েছে, তখনই তারা ফুলে-ফেঁপে ওঠার চেষ্টা করছে।
এই দলগুলোর নেতৃত্ব, মনস্তত্ত্ব, আদর্শ বা কার্যক্রমে মৌলিক কোনো পরিবর্তন আসেনি। আমরা শুনেছি, এবারও সব দলের মনোনয়নের পেছনে অর্থের লেনদেন হয়েছে। তাহলে পরিবর্তনটা কোথায় হলো? আমি নিশ্চিত, এমন পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ থাকলে তারাও একই কাজ করত। এর মূল কারণ হলো দলগুলোর ভেতরে গণতন্ত্রের চর্চা নেই। আমি জানি, ছাত্রদল বা বিএনপির অনেক তরুণ কর্মী এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি পছন্দ করে না, কিন্তু দলের ভেতরে তাদের কণ্ঠস্বর প্রকাশের সুযোগ নেই। সব দলেই তোষামোদ ও চাটুকারিতার মাধ্যমে পদ-পদবি পাওয়া যায়। যদি তৃণমূল থেকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নেতৃত্ব উঠে আসত, তবেই কেবল এই রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন সম্ভব হতো।
স্ট্রিম: ৫ আগস্ট পরবর্তীতে তরুণ নেতৃত্বের ওপর একটা আশা তৈরি হয়েছিল যে তরুণরা আমাদের নেতৃত্ব দিবে, তরুণ নেতৃত্ব তৈরি হবে। সেই আশা কতটা পূরণ হলো?
কাজী মারুফুল ইসলাম: তরুণদের প্রতি আমার আশা একটুও কমেনি। কিন্তু তরুণদের যে অংশটি তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব করার দাবি নিয়ে রাজনৈতিক দল গঠন করেছে, তাদের প্রতি আমার আশাভঙ্গ হয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যারা নিজেদের প্রাণ দিতে প্রস্তুত ছিল, সেই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে উঠে আসা নেতৃত্বের কাছে আমার প্রত্যাশা ছিল ভিন্ন।
এনসিপি বা নতুন যে রাজনৈতিক উদ্যোগ আমরা দেখছি, যারা আজ জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে বিলীন হওয়ার উপক্রম হয়েছে, তারা পরিষ্কারভাবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। সারা দেশের স্কুল-কলেজ, জাতীয় ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অসংখ্য তরুণ এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তারা তাদের নেতাদের নির্দেশনা মেনেছে। কিন্তু নিশ্চিতভাবে এই সাধারণ শিক্ষার্থীদের কেউ ভাবেনি যে, দিনশেষে তাদের নেতারা জামায়াতে ইসলামীর অংশ হয়ে যাবে। এটি স্পষ্টতই বিশ্বাসঘাতকতা। সংগঠন হিসেবেও তারা ভিন্ন কোনো সংস্কৃতি বা নতুন কিছু প্রবর্তন করতে পারেনি। যতটুকু দেখেছি, এনসিপি মাত্র কয়েক দিনের সংগঠন, হয়তো ভবিষ্যতে তাদের পরিবর্তন হবে। এখন তাদের জামায়াতের খুব ঘনিষ্ঠ মনে হচ্ছে, আবার কয়েক বছর পর দূরত্বও তৈরি হতে পারে। তাই তাদের সম্পর্কে চূড়ান্ত কথা বলার সময় হয়তো এখনো আসেনি।
স্ট্রিম: অন্য তরুণরা কী এটি দেখে হতাশ হবেন না?
কাজী মারুফুল ইসলাম: হ্যাঁ, অবশ্যই। বিশ্বাসঘাতকতার প্রশ্নটি ওখানেই আসছে। তরুণরা প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর আস্থা রাখতে পারছিল না বলেই এমন একটি প্ল্যাটফর্ম চেয়েছিল, যা তাদের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করবে। সেই জায়গায় এই নেতারা চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়েছেন।
আমি জানি না, তবে তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এবং সচিবালয়ের ভেতরে বিভিন্ন তদবির বা দালালি করার অভিযোগ রয়েছে, যার কিছু প্রমাণ আমার কাছেও আছে। আমাদের সন্তানেরা তাদের কাছে এই ধরনের আচরণ আশা করেনি। এটি নিশ্চিতভাবে আমাদের কষ্ট দিয়েছে। যাদের রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ ছিল এবং যারা এই সুযোগের অপব্যবহার করেছেন, তাদেরও তদন্ত হওয়া উচিত এবং বিচারের আওতায় আনা প্রয়োজন।
স্ট্রিম: অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?
কাজী মারুফুল ইসলাম: অন্তর্বর্তী সরকার সম্পর্কে আমার মূল্যায়ন হয়তো অনেকের সঙ্গে মিলবে না, তবে আমি মনে করি আমরা তাদের প্রতি যথেষ্ট কৃতজ্ঞতা দেখাইনি। ড. ইউনূস এমন এক সময়ে দায়িত্ব নিয়েছিলেন যখন আমাদের সামনে হাল ধরার মতো কেউ ছিল না। তিনি এবং তাঁর সরকার ছিলেন গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক শক্তি ও জাতীয় ঐক্যের প্রতীক। অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং রাষ্ট্রকে ভেঙে পড়ার হাত থেকে বাঁচাতে আমরা দ্বিতীয় কোনো ব্যক্তি পাইনি। সেই পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনী দায়িত্ব নিলে আমরা কি তা মেনে নিতাম? ড. ইউনূস ছাড়া অন্য কেউ দায়িত্ব নিলে আন্তর্জাতিক বিশ্বে এই সরকারের গ্রহণযোগ্যতা পাওয়া কঠিন হতো। তাই রাষ্ট্রকে বড় ধরনের ভাঙন থেকে বাঁচানোর কৃতিত্ব তাদের দিতেই হবে।
তবে তাদের কাছে আমাদের বিপুল প্রত্যাশা ছিল। প্রথমত, জুলাইয়ের অপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়ায় তাদের যথেষ্ট দক্ষতা বা পরাঙ্গমতা দেখিনি। আইনি প্রক্রিয়ায় দুর্বলতা ছিল, বিচার ধীরগতিতে হয়েছে এবং সব অপরাধীকে সমানভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। তাছাড়া ঢালাও মামলাবাজি নিয়ন্ত্রণ করতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্র সংস্কারের ক্ষেত্রে তারা সংবিধান সংস্কারে বেশি মনোযোগ দিয়েছেন। কিন্তু পুলিশ, আমলাতন্ত্র, দুর্নীতি দমন কমিশন বা স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সংস্কারের জন্য সংবিধান পরিবর্তনের প্রয়োজন ছিল না। দুর্ভাগ্যবশত, সরকার এদিকে নজর দেয়নি। তারা মব সংস্কৃতি বা উচ্ছৃঙ্খল জনতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি, বরং এক ধরনের প্রশ্রয় দিয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও তা খুব উল্লেখযোগ্য নয়। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে তাদের অর্জন নেই বললেই চলে; উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে দলীয়করণের সেই পুরনো ধারাই বজায় রাখা হয়েছে। অর্জনের তুলনায় ব্যর্থতার পাল্লা ভারী হলেও, চরম সংকটময় মুহূর্তে রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখার জন্য তাদের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।
স্ট্রিম: বাংলাদেশের উন্নয়ন ও এগিয়ে যাওয়ার জন্য নতুন সরকারের করণীয় কি হওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?
কাজী মারুফুল ইসলাম: অর্থনীতির সংকট দীর্ঘদিনের, তবে অন্তর্বর্তী সরকার সেটাকে মোটামুটি একটা স্থিতিশীল জায়গায় আনতে সক্ষম হয়েছিল। বর্তমানে অর্থনীতির মূল সংকট হলো—বিনিয়োগ স্থবির হয়ে আছে এবং সরকারের রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি রয়েছে। রপ্তানিও কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়ছে না, বরং কিছুটা নিম্নমুখী। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারের চাপ, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চাপ।
এই পরিস্থিতিতে অর্থনীতিতে গতিশীলতা বা ‘ডিনামিজম’ তৈরি করা জরুরি। ঐতিহাসিকভাবে এমন পরিস্থিতিতে সরকারকেই এগিয়ে আসতে হয় এবং একটি ‘বিগ পুশ’দিতে হয়। সামনে যে বাজেট আসছে, সেখানে সরকারকে চমক দেখাতে হবে। বিশেষ করে রাজস্ব সংগ্রহের ক্ষেত্রে নতুন কর্মসূচি ও সংস্কার আনতে হবে। অপচয় রোধ করতে হবে—যেমন এলএনজি আমদানি বা ঋণের কিস্তি পরিশোধে বিশাল অর্থ চলে যাচ্ছে, পাশাপাশি অদরকারি প্রকল্পগুলোতে অর্থের অপচয় বা 'ড্রেনেজ' বন্ধ করা জরুরি।
সরকার যদি রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারে, তবে সেই অর্থ দিয়ে এমন সব খাতে সরকারি বিনিয়োগ করতে হবে যা বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করবে। বর্তমানে বেসরকারি বিনিয়োগ প্রায় ২২ শতাংশের মতো আছে, এটাকে বাড়াতে হবে। অর্থাৎ, কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হলে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।

নতুন এমপিদেরও কেউ কেউ যদি হাঁসের মাংস খাওয়ার জন্য রাত-বিরাতে পূর্বাচলের তিন শ ফুটে কিংবা অনুরূপ কোথাও ঘুরে বেড়ান, তাতে মোটেও আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না। তবে তেমনটি যাতে না ঘটে, সেটিই জনগণের প্রত্যাশা।
৩ ঘণ্টা আগে
সম্প্রতি জামায়াতপন্থী হিসেবে পরিচিত সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহরিয়ার কবির একটি ভাইরাল ভিডিওতে আলোচনার জন্ম দেন। নির্বাচনী প্রচারণার সময় তাকে এক পান বিক্রেতার হাতে টাকা ধরিয়ে দিতে দেখা যায়।
৩ ঘণ্টা আগে
চীনের কাছে এই নির্বাচন কেবল রাজনৈতিক ঘটনা নয় বরং পর্যবেক্ষণের এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত ছিল। এর প্রভাব বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের ভবিষ্যতের ওপর পড়বে।
১ দিন আগে
ভাষা শহীদরা কিন্তু রক্ত দিয়েছিলেন আমাদের কথা বলার অধিকারের জন্য, আমাদের পরিচয়ের জন্য। তারা কি জানতেন, একদিন তাদের স্মৃতির মিনারের সামনে দাঁড়িয়ে কে কোন দিকে মুখ ফিরিয়ে দোয়া করবে, তা নিয়ে একটা গোটা জাতি দুই ভাগ হয়ে যাবে?
২ দিন আগে