ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পর এবার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) ছাত্র সংসদ নির্বাচনেও নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল। গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর একে একে অনুষ্ঠিত হওয়া এই পাঁচটি শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের এমন অভাবনীয় সাফল্যের কারণ নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
বিশ্লেষকদের মতে, সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি চরম বিতৃষ্ণা, দীর্ঘ সময় ধরে ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক চর্চার অভাব এবং ছাত্রশিবিরের সুসংগঠিত ‘গুপ্ত রাজনীতি’ এই জয়ের পেছনে মূল কারিগর হিসেবে কাজ করেছে।
জকসু নির্বাচনে শিবিরের বড় জয়
সর্বশেষ গত ৬ জানুয়ারি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে ২১টি পদের মধ্যে ভিপি, জিএস ও এজিএসসহ ১৬টি পদেই জয়ী হয়েছে ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘অদম্য জবিয়ান ঐক্য’ প্যানেল। বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনে ৬৬ দশমিক ১৮ শতাংশ শিক্ষার্থী তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন।
অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্র
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর গত ৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ডাকসু) থেকে শুরু করে একে একে জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিটি নির্বাচনেই ভিপি ও জিএসসহ শীর্ষ পদগুলোতে জয়জয়কার ছিল শিবিরের। যদিও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিপি পদে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক এবং চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে দু-একটি পদে ছাত্রদল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন, তবে সামগ্রিক প্রভাব ছিল শিবির সমর্থিত প্যানেলগুলোর। এমনকি রাজশাহীতে জয়ী হওয়া ‘আধিপত্যবিরোধী ঐক্য’কে অনেকেই শিবিরের ‘বি টিম’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
জয়ের নেপথ্যে যেসব কারণ
১. প্রতিষ্ঠিত ছাত্র সংগঠনের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব
বিশ্লেষকরা বলছেন, গত দেড় দশকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রলীগের একচ্ছত্র আধিপত্য ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর নানা নিপীড়ন রাজনৈতিক দল সমর্থিত প্যানেলগুলোর প্রতি শিক্ষার্থীদের মনে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি করেছে। ফলে শিক্ষার্থীরা প্রচলিত ধারার বাইরে বিকল্প শক্তি হিসেবে শিবিরকে বেছে নিয়েছে।
২. ছদ্মবেশে সাংগঠনিক সক্রিয়তা
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে ছাত্রশিবির প্রকাশ্যে রাজনীতি করতে না পারলেও অত্যন্ত গোপনে তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে গেছে। অনেকে ছাত্রলীগের ভেতরে বা সাধারণ শিক্ষার্থীর পরিচয়ে ক্যাম্পাসে সক্রিয় ছিলেন। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সরদার ফরিদ আহমদ বলেন, যখন অন্যান্য সংগঠনের কাঠামো ভেঙে পড়েছিল, তখন শিবির তাদের সাংগঠনিক শক্তি টিকিয়ে রাখতে পেরেছে, যা নির্বাচনে সুফল দিয়েছে।
৩. শিবিরের ‘দৃশ্যমানতা’ ও সমন্বয়
গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর গণমাধ্যমে বলেছেন, অন্য দলগুলো যখন কোণঠাসা ছিল, তখন শিবির ছাত্রলীগের ভেতরে মিশে থেকে বা কৌশল বদলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বজায় রেখেছে। এছাড়া শিবিরের এই জয়ের পেছনে তাদের মূল সংগঠন জামায়াতে ইসলামীর সুসংগঠিত সমর্থন ও রসদও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
৪. গণতান্ত্রিক চর্চার অনুপস্থিতি ও শূন্যতা
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দীর্ঘ সময় ছাত্র সংসদ নির্বাচন না হওয়ায় এক ধরনের রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছিল। শিক্ষার্থীরা নিজেদের অধিকার আদায়ে কোনো প্ল্যাটফর্ম পাচ্ছিল না। নির্বাচনের সুযোগ তৈরি হতেই তারা সুশৃঙ্খল এবং সক্রিয় হিসেবে পরিচিত প্যানেলকে ভোট দিয়ে বিজয়ী করেছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের এই ধারাবাহিক জয় দেশের ভবিষ্যৎ ছাত্ররাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের এই রায় যেমন শিবিরের জন্য বড় প্রাপ্তি, তেমনি অন্যান্য ছাত্র সংগঠনগুলোর জন্য এটি আত্মোপলব্ধি ও পুনর্গঠনের বড় বার্তাও বটে।