জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

উর্দু বলা ও লেখা ভুলছে বিহারি ক্যাম্পের তরুণরা

মোহম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্প। ছবি: সংগৃহীত

ঘিঞ্জি গলি। পাশাপাশি দুজন দাঁড়ানোও কষ্টকর। রাজধানীর মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্পে গলির মুখে বসা ষাটোর্ধ্ব নাসিমা খাতুন। পাশে থাকা নাতি মোহাম্মদ আরমানকে দেখিয়ে বলছেন, ‘হাম লোগ কা জবান হি খতম হো যায়েগা। ইয়ে লোগ না উর্দু বোল পাতা হ্যায়, না ঠিক সে লিখ পাতা হ্যায়।’ (আমাদের ভাষাই শেষ হয়ে যাবে। এরা না উর্দু বলতে পারে, না ঠিকভাবে লিখতে পারে)।

নাসিমা কথাগুলো বিশুদ্ধ উর্দুতে বলতে পারলেও, পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া আরমান একই বিষয় বাংলা ও উর্দু মিশিয়ে বলল। নাতির জবাবে নাসিমার চোখেমুখে হতাশা স্পষ্ট।

প্রতিবছর ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি আসে। ইউনেস্কো ও জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অনুমোদনে মাতৃভাষা দিবস আন্তর্জাতিকভাবে পালিত হচ্ছে। তবে সব মাতৃভাষার সমান অধিকার আর বাস্তবায়ন হয় না। শেষ হয় না নাসিমার মতো উর্দুভাষীদের আফসোস।

শিক্ষার মাধ্যম বাংলা

বাংলাদেশে আটকে পড়া ‘বিহারী’দের আইনি সহায়তা, পুনর্বাসন, শিক্ষা ও ভূমি অধিকার নিয়ে কাজ করে কাউন্সিল অব মাইনরিটি (সিওএম)। সংস্থাটির মতে, বাংলাদেশের ১১৬টি ক্যাম্পে প্রায় ৪ লাখ বিহারি উর্দুভাষী মানুষ বসবাস করে।

২০০৮ সালে হাইকোর্টের রায়ে বাংলাদেশের উর্দুভাষীরা নাগরিকত্ব পান। লাভ করেন জাতীয় পরিচয়পত্র ও ভোটাধিকার। তবে তাতে উর্দুভাষীদের সংকট কাটেনি। বিহারী ক্যাম্পের বাসিন্দারা উর্দু বা উর্দু-বাংলার মিশেলে কথা বলতে পারলেও বেশির ভাগেই লিখতে-পড়তে পারেন না।

নাসিমা খাতুন স্ট্রিমকে বলেন, ‘ক্যাম্পের বয়স্কদের অনেকে উর্দু পড়তে ও লিখতে পারেন। তবে তরুণরা শুধু বলতে পারে, লিখতে পারে না। চর্চার অভাবে তারা উর্দু লেখা পড়তে পারে না।’

জানা যায়, যেসব বিহারী শিশু স্কুলে যায়, তাদের পড়াশোনা করতে হয় বাংলা মাধ্যমে। উর্দু শেখার জন্য ক্যাম্পগুলোতে নেই সরকারি-বেসরকারি কোনো উদ্যোগ। পরিবারিক বা ব্যক্তিগত উদ্যোগে যারা যতটুকু উর্দু শেখে, সেটুকুই সম্বল।

জেনেভা ক্যাম্পের বাসিন্দা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী মোহাম্মদ জিয়া উদ্দিন স্ট্রিমকে বলেন, ‘তরুণদের মধ্যে উর্দু শেখার আগ্রহ থাকলেও উপায় নেই। নেই কোনো বিশেষ প্রতিষ্ঠান। স্কুলগুলোতেও কোনো সাবজেক্ট রাখা হয়নি। ফলে আমাদের মাতৃভাষা এখন বিলুপ্তির পথে।’

ক্যাম্পের আরেক বাসিন্দা মোহাম্মদ আলীম বলেন, ‘আমি এক সময় উর্দু পড়তে পারতাম। কিন্তু চর্চা না থাকায় এখন পড়তে পারি না। যারা পড়তে ও লিখতে পারেন, দিনকে দিন তাদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে।’

ভাষাগত সংখ্যালঘু

কাউন্সিল অফ মাইনরিটির প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট খালিদ হোসেনের মতে, রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশে উর্দুভাষীদের অদৃশ্য একটা বৃত্তে আটকে রাখা হয়েছে। তাদের ব্যাপারে বিভিন্ন নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হওয়ায় উর্দু ভাষা নিয়েও ঘৃণাবোধ রয়েছে। ফলে উর্দুভাষীদের লেঙ্গুইস্টিক মাইনরিটি বা ভাষাগত সংখ্যালঘু বলা যায়।

তিনি স্ট্রিমকে বলেন, উচ্চশিক্ষা স্তরের আগে বাংলাদেশে উর্দু ভাষা শেখার কোনো একাডেমিক ব্যবস্থা নেই। কওমি মাদ্রাসায় উর্দু পড়ানো হলেও ক্যাম্পের শিশুরা সেখানে যায় না। তারা স্কুলে যায় কিন্তু সেখানে নিজের মাতৃভাষা শেখার কোনো সুযোগ নেই। বাংলাদেশে ৩৬টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা রয়েছে। এখানে মানুষ উর্দু, ভোজপুরি ও তামিল ভাষায় কথা বলে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলো, দেশে বাংলা ছাড়া অন্য কোনো ভাষা রাষ্ট্রীয় সম্মান পায়নি। চর্চাও হচ্ছে না।

রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে বাংলাদেশের ভাষাগুলোর সংরক্ষণ ও চর্চা প্রয়োজন। এটি করা গেলে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার খুবই বৈচিত্রময় দেশ হিসেবে পরিচিতি পাবে বলে মনে করেন খালিদ হোসেন।

বাংলাদেশে উর্দু সাহিত্য চর্চা নিয়ে কাজ করে বাংলা-উর্দু ফাউন্ডেশন। সংস্থার নারীবিষয়ক সম্পাদক ও লেখক শাবানা নাভেদ স্ট্রিমকে বলেন, ‘শুধু একাডেমিকভাবে উর্দু চালু করলেই হবে না। উর্দুভাষীদের কর্মসংস্থানেরও ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ যখন এই ভাষা কাজেই লাগবে না, তখন মানুষ কেন পরিশ্রম করে শিখবেন? ক্যাম্পের ছেলে-মেয়েরা তো বাংলায় বেশি আগ্রহী। তাদের অনেকে কর্মের জন্য ক্যাম্পের বাইরে গিয়ে বাঙালি পরিচয় দেন।’

দেশের প্রখ্যাত উর্দু কবি প্রয়াত নওশাদ নুরীর কন্যা শাবানা আরও বলেন, ‘যারা বাংলাদেশে উর্দু সাহিত্য চর্চাকে সমৃদ্ধ করেছেন, এই প্রজন্ম সেসব কবি ও সাহিত্যিকদের নামও জানে না। উর্দু চর্চা ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না হলে এক সময় ভাষাটাই হারিয়ে যাবে।’

৫২ মানে সমান অধিকার

১৯৫২ সালের চেতনা শুধুমাত্র একটা ভাষার আন্দোলন ছিল না বরং এদেশের সব মানুষ ও ভাষার সমান অধিকারের চেতনা ছিল বলে মনে করেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। স্ট্রিমকে তিনি বলেন, ‘এদেশের সব ভাষাভাষী মানুষের মাতৃভাষা চর্চার অধিকারের চেতনা ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে অন্তর্নিহিত ছিল। কিন্তু আজ সেই চেতনা বিলুপ্তির পথে। একইসঙ্গে বাংলাদেশের যে স্বকীয় সত্তা, যে আত্মপরিচয়, সেটাও কিন্তু এই চেতনার মধ্যে অন্তর্নিহিত।’

ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, ’৫২-র পর থেকে ২০২৪ পর্যন্ত যে ঐতিহাসিকভাবে বিবর্তন হয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে– ভাষার যথাযথ মর্যাদা দেওয়া হয়নি। সেটি মাতৃভাষা বাংলাই হোক বা অন্যদের ভাষা হোক। পাশাপাশি সব মানুষের সমান অধিকারের বিষয়গুলোর মর্যাদা নিশ্চিত হয়নি।

জানতে চাইলে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের অতিরিক্ত পরিচালক (ভাষা, গবেষণা ও পরিকল্পনা) মোহাম্মদ নূরে আলম সিদ্দিকী বলেন, বাংলাদেশে আপাতত উর্দু চর্চার প্রতিষ্ঠানিক কোনো ব্যবস্থা নেই। তবে ভবিষ্যতে উর্দু চর্চার ব্যবস্থার বিষয়ে আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত