যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের শুল্ককে শুক্রবার অবৈধ ঘোষণা করেন। আদালতের রায়ে বলা হয়, কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়া ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট (আইইপিএ) ব্যবহার করে শুল্ক আরোপ করার ক্ষমতা ট্রাম্পের নেই। ওই আইনে শুল্কের কথা উল্লেখ নেই।
প্রতিক্রিয়ায় সুপ্রিম কোর্টের রায়কে ‘লজ্জাজনক আখ্যা দিয়ে নতুন শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বলেন, অন্য আইনের মাধ্যমে এসব শুল্ক বহাল রাখা হবে। সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প সুপ্রিম কোর্টকে আক্রমণ করে বলেন, আদালত ‘বিদেশি স্বার্থের প্রভাবে’ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
গতবছরের ২ এপ্রিল বিশ্বের ১৫৭টি দেশের পণ্যের ওপর বিভিন্ন হারে পাল্টা শুল্ক (রেসিপ্রকাল ট্যারিফ) আরোপ করেছিলেন ট্রাম্প। তাঁর যুক্তি ছিল অন্য দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে এতদিন ধরে ‘ছিঁড়েখুঁড়ে’ খেয়েছে। তিনি এই শুল্ক আরোপের দিনটিকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্বাধীনতা দিবস’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন।
ট্রাম্পের মূল আপত্তি ছিল বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে। ভিয়েতনাম বা বাংলাদেশের মতো দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রে প্রচুর পণ্য রপ্তানি করে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র সেই তুলনায় ওই দেশগুলোতে কম পণ্য পাঠায়। ট্রাম্পের শুলক নীতি অনুসারে, যে দেশ মার্কিন পণ্যে যত শুল্ক বসাবে যুক্তরাষ্ট্রও তাদের পণ্যে ততটাই শুল্ক বসাবে।
বাংলাদেশের পণ্যে প্রথমে ৩৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল। পরে তা কমিয়ে ২০ শতাংশে আনা হয়। শেষ পর্যন্ত দর-কষাকষি করে ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোকাল ট্রেড’ নামে একটি চুক্তি হয়। এর ফলে বাংলাদেশের ওপর মার্কিন শুল্ক দাঁড়ায় ১৯ শতাংশে। বিনিময়ে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা ও সয়াবিন এবং বোয়িং বিমান কেনার প্রতিশ্রুতি দিতে হয়। বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদরা তখন এই চুক্তিকে ‘অসম’ ও ‘জবরদস্তিমূলক’ বলে সমালোচনা করেছিলেন।
বাংলাদেশের জন্য স্বস্তি না শঙ্কা?
আদালতের রায়ে আগের ১৯ শতাংশ শুল্ক বাতিল হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের জন্য আপাতদৃষ্টিতে সুযোগ তৈরি হয়েছে। নতুন ঘোষণায় শুল্ক ১০ শতাংশে নেমে এসেছে। এতে রপ্তানিকারকদের খরচ প্রায় অর্ধেক কমে যাবে। তবে অন্যান্য দেশের জন্যও একই হারে শুল্ক প্রযোজ্য হওয়ায় ভারত বা ভিয়েতনামের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হতে পারে।
আইনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন গত এক বছরে অবৈধভাবে আদায় করা শুল্ক ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের রপ্তানিকারকেরা যদি গত এক বছরে কয়েক শ কোটি ডলার বাড়তি শুল্ক দিয়ে থাকেন তবে সেই অর্থ ফেরত পাওয়ার একটি আইনি পথ তৈরি হয়েছে। বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটে এটি দেশের জন্য বড় উদ্দীপনা হতে পারে।
তবে শঙ্কার জায়গাও কম নয়। ১০ শতাংশ শুল্কও মার্কিন বাজারে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেবে। একটি ১০ ডলারের টি-শার্টের দাম ১১ ডলার হয়ে গেলে ক্রেতাদের চাহিদা কমতে পারে। এতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের ৪৬ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
বাংলাদেশের করণীয় কী?
বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বিবিসি বাংলাকে বলেন, এই মুহূর্তে পুরনো চুক্তি নিয়ে আলোচনার চেষ্টা না করে বাংলাদেশের উচিত নিরব দর্শকের ভুমিকা পালন করা। তিনি বলেন যে সমস্ত শর্তে আমরা চুক্তি করতে বাধ্য হয়েছি সেগুলো নিয়ে এখন আলোচনা করতে গেলে ট্রাম্প প্রশাসন আরও কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
ড. জাহিদ হোসেন পরামর্শ দেন ১৫০ দিনের এই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের উচিত অভ্যন্তরীণ পরিবেশ উন্নত করা। মার্কিন প্রশাসন এই সময়ে বাংলাদেশের শ্রমবাজার ও কর্মপরিবেশ এবং পরিবেশ দূষণ নিয়ে তদন্ত করবে। সেখানে কোনো ঘাটতি থাকলে তা ঠিক করতে হবে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন মতে, ব্যবসায়ীরা বলছেন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা রিসিপ্রোকাল শুল্ক চুক্তির চূড়ান্ত অনুমোদন আপাতত স্থগিত রাখা উচিত। যেহেতু নতুন শুল্কের মেয়াদ মাত্র ১৫০ দিন তাই এই সময়ের মধ্যে ওয়াশিংটনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা চালিয়ে বিশেষ ছাড় আদায়ের চেষ্টা করতে হবে। এ ছাড়া এককভাবে মার্কিন বাজারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আসিয়ান দেশগুলোতে রপ্তানি বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে।
অর্থনীতি বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ট্রাম্পের সবকিছুই দ্বিপক্ষীয়। তিনি বিধিবদ্ধ ব্যবস্থা লঙ্ঘন করে নিজের খেয়ালখুশিমতো সিদ্ধান্ত নেন। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হলো। কারণ ট্রাম্প নানা আইন খুঁজে বের করে শুল্ক আরোপ করেই যাবেন।
কার লাভ, কার ক্ষতি?
বিশেষজ্ঞদের মতে ট্রাম্পের এই ঘোষণা ভারতীয় রপ্তানিকারকদের জন্য বড় সুবিধা এনে দেবে। নতুন শুল্কের ফলে প্রায় ৮৭ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্যের ওপর থেকে চাপ কমবে। ভারতের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৬ থেকে ৬ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে স্থিতিশীল থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে বিশ্বের অন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য চিত্রটি বেশ উদ্বেগের। বিশেষ করে যারা কৃষি ও বস্ত্র খাতের রপ্তানির জন্য মার্কিন বাজারের ওপর নির্ভরশীল। এসব দেশের বার্ষিক রপ্তানি আয় প্রায় ৮৯ বিলিয়ন ডলার কমতে পারে। ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়া এবং ব্রাজিলের মতো দেশগুলোর জিডিপি ১ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।
বিশ্বব্যাপী মন্দারও আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। অনেক পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় মার্কিন চাহিদা কমলে সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হতে পারে। ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত রপ্তানি কমে যাওয়ার পাশাপাশি মুদ্রার অস্থিরতা এবং মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে আফ্রিকা ও এশিয়ার স্বল্পোন্নত এবং ছোট দ্বীপ দেশগুলো।