‘যেদিন মুই তোমাক পতথম দেখচোম, সেইদিন থাইকেই মুই তোমাক ভালোবাসি ফেলচোম...’—গাইবান্ধার আঞ্চলিক ভাষার এমন মায়াবী আর আবেগময় প্রকাশ আজ আর আগের মতো শোনা যায় না। আধুনিকতা, শহরমুখী জীবনযাত্রা আর প্রমিত বাংলার প্রভাবে ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে রংপুরি বা কামতাপুরি উপ-ভাষার এই স্বতন্ত্র রূপটি। সচেতন মহল মনে করছেন, একটি ভাষা হারিয়ে যাওয়া মানে একটি অঞ্চলের ইতিহাস ও পরিচয় হারিয়ে যাওয়া।
আবুল কাশেম সম্পাদিত ‘বাংলা আঞ্চলিক ভাষার ইতিহাস’ গ্রন্থ অনুযায়ী, গাইবান্ধার এই ভাষা ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবারের পূর্বাঞ্চলীয় ইন্দো-আর্য শাখা থেকে বিকশিত। একসময় এই ভাষা ছিল এ অঞ্চলের মানুষের আত্মপরিচয়ের প্রধান ভিত্তি। প্রাচীনকালে ঘোড়াঘাট প্রশাসনিক কেন্দ্র এবং পরবর্তীতে বৃহত্তর রংপুর জেলার অংশ হিসেবে গাইবান্ধার এই উপভাষা নিজস্ব শব্দভাণ্ডার ও স্বতন্ত্র রূপ নিয়ে দাঁড়িয়েছিল। এমনকি ‘গাইবাঁধা’ (গাভী বেঁধে রাখার স্থান) নামটির উৎপত্তিও এই সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
তবে বর্তমান চিত্র উদ্বেগজনক। স্কুল-কলেজ ও গণমাধ্যমে প্রমিত বাংলার প্রাধান্য এবং নতুন প্রজন্মের অনীহার কারণে আঞ্চলিক ভাষার চর্চা সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এ বিষয়ে অধ্যাপক এবিএম বজলুর রশীদ (রুপম) বলেন, ‘শিক্ষার হার বৃদ্ধি পাওয়ায় মানুষ প্রচলিত ভাষা ব্যবহার করতে চায় না। এমনকি মায়ের মুখে শুনে বড় হলেও পরবর্তীতে চর্চার অভাবে এটি হারিয়ে যাচ্ছে।’
গাইবান্ধার বিশিষ্ট কবি ও সাহিত্যিক বিমল সরকারের মতে, স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর উদ্যোগের অভাব এবং গবেষণামূলক কাজ কমে যাওয়ায় এ ভাষা অবহেলার শিকার হচ্ছে। ফলে এর শব্দভাণ্ডার ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য হারানোর ঝুঁকি বাড়ছে। কবি হাফিজুল হেলালি বাবু আক্ষেপ করে বলেন, ‘তরুণরা মনে করে আঞ্চলিকতা মানেই অশিক্ষিত লোকের ভাষা। অথচ আমার মায়ের ভাষা হওয়ায় এটি আমাদের প্রজন্মের প্রকৃত মাতৃভাষা।’
এই সংকটের মধ্যেও আশার আলো দেখাচ্ছেন কিছু তরুণ কন্টেন্ট ক্রিয়েটর। গাইবান্ধার আঞ্চলিক ভাষায় গীত ও নাটক পরিবেশন করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছেন ২৬ বছর বয়সী মঞ্জু মিয়া। তিনি জানান, ছোটবেলায় বিয়েবাড়িতে শোনা ‘গীত’ এখন তিনি ফেসবুক ও নাট্যপালার মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন, যা শ্রোতারা বেশ ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করছে।
গাইবান্ধা সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক বাবুল আকতার বলেন, ‘ভাষা রক্ষা করতে হলে পরিবার থেকেই এর ব্যবহার শুরু করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমকে আঞ্চলিক ভাষাভিত্তিক নাটক, গান ও গল্প তৈরিতে এগিয়ে আসতে হবে।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীনির্ভর জীবন আর কৃষিনির্ভর ঐতিহ্যের মিশেলে তৈরি এই ভাষা যদি সংরক্ষণের উদ্যোগ এখনই নেওয়া না হয়, তবে অচিরেই হারিয়ে যাবে গাইবান্ধার এই প্রাচীন সাংস্কৃতিক সম্পদ।