জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

ইনবক্সের বাইরে—৫

মিনার, মোনাজাত এবং আমাদের ‘জানুস’ দ্বান্দ্বিকতা

এআই জেনারেটেড ছবি

সহকর্মী শিমুল ভাইকে বিদায় দিয়ে বাসার দিকে ফিরছিলাম। শীত পালাই পালাই করা ঢাকা শহরে ঘন হয়ে রাত নামছে। মহল্লার গলির মুখে পরিচিত চায়ের দোকানে দেখা হয়ে গেল পুরোনো বন্ধু রাকিব আর ফরহাদের সঙ্গে।

ওরা চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে আড্ডা দিচ্ছিল। দোকানের দেয়ালে ঝোলানো টেলিভিশনে দেখাচ্ছে গতকাল রাতের প্রথম প্রহরের ফুটেজ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের পর কিবলামুখী হয়ে মোনাজাত করছেন।

আজ সারাদিন ফেসবুকের এরকম দুটো ছবি ঘুরে বেড়াতে দেখলাম। একটি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আরেকটি বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের। তারেক রহমান কিবলামুখী হয়ে মোনাজাত করছেন, আর শফিকুর রহমান শহীদ মিনার অভিমুখে দাঁড়িয়েই মোনাজাত করছেন।

আমার বন্ধু রাকিব পাঁড় সেকুলার। সে কপালে ভাঁজ ফেলে বলল, ‘দেখলি তো! দীর্ঘদিনের একটা প্রটোকল কীভাবে অবজ্ঞা করা হলো? শহীদ মিনার আমাদের জাতীয় চেতনার প্রতীক। এখানে মিনারকে সামনে রেখেই তো শ্রদ্ধা জানানো দস্তুর। মিনার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া কি ঠিক হলো?’

কিন্তু ফরহাদ আবার ঠিক এর বিপরীত। তার ভাষ্য, ‘আরে ভাই, একজন মুসলমান দোয়া-মোনাজাতের সময় কিবলামুখী হবে, এটাই তো স্বাভাবিক। এ নিয়ে তোরা এত ত্যানা পেঁচাচ্ছিস কেন? যত্তসব সংকীর্ণ মানসিকতা! শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে নিয়ম মেনে দোয়া করাই উচিত।’

এদের তর্ক শুনছিলাম আর ফেসবুক স্ক্রল করছিলাম। দেখলাম, ফ্যাক্টচেকাররা বলছে, শহীদ মিনারে দোয়া-মোনাজাত করা নতুন কিছু না। এর আগে শেখ মুজিবুর রহমানও শহীদ মিনারে দাঁড়িয়ে দোয়া করেছিলেন। তার মানে শহীদ মিনারে ধর্মীয় আচার পালন করা নতুন কিছু নয়।

সুতরাং এই বিতর্ক সাধারণ কোনো বিতর্ক নয়। এর শিকড় অনেক গভীরে। এই বিতর্কের পেছনে যতটা না আদর্শিক কারণ রয়েছে, তার চেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে বর্তমান রাজনৈতিক মেরুকরণ। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘জাতীয়তাবাদ’ ও ‘ধর্মীয় মূল্যবোধ’ সবসময়ই একটি স্পর্শকাতর জায়গা দখল করে আছে। এক পক্ষ যখন একে ‘সাংস্কৃতিক বিচ্যুতি’ হিসেবে দেখছে, অন্য পক্ষ তখন একে ‘ধর্মীয় স্বকীয়তা পুনরুদ্ধার’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করছে। মূলত, একটি সাধারণ দৃশ্যকে রাজনৈতিক চশমায় দেখার প্রবণতাই এই বিতর্ককে দীর্ঘস্থায়ী করছে।

আমি চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে রাকিব আর ফরহাদের উদ্দেশে বললাম, ‘তোরা কি ফ্রান্সিস ফুকুয়ামার নাম শুনেছিস? ফুকুয়ামা বলেছেন, আধুনিক সময়ের রাজনীতি শুধু রুটি-রুজির লড়াই নয়, এটা ‘‘রিকগনিশন’’ বা পরিচয়ের স্বীকৃতির লড়াই। বাংলাদেশে এক পক্ষ চায় আমাদের ‘‘বাঙালি’’ পরিচয়কে প্রধান করতে, অন্য পক্ষ চায় ‘‘মুসলিম’’ বা ‘‘বাংলাদেশি’’ পরিচয়কে। শহীদ মিনারে কিবলামুখী হয়ে দোয়া করা কেবল একটি ধর্মীয় কাজ নয়, এটি একটি প্রতীকী বার্তা। রাষ্ট্র যেন জানান দিচ্ছে—তার মূল চালিকাশক্তি এখন থেকে ধর্মীয় মূল্যবোধের সমান্তরালে চলবে।’

সমাজবিজ্ঞানী পিয়েরে বুর্দিয়ুর একটা ধারণা আছে—‘কালচারাল ক্যাপিটাল’ বা সাংস্কৃতিক পুঁজি। শহীদ মিনার আমাদের সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক পুঁজি। এই পুঁজিকে কে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে, কার নিয়ম সেখানে খাটবে, সেটাই ‍মূল বিষয়।

রাকিব প্রশ্ন করল, ‘কিন্তু রাষ্ট্র তো একটা নিয়ম মেনে দীর্ঘদিন ধরে একুশে ফেব্রুয়ারিতে শহীদ মিনারে ফুল দেয়, নাকি? সেই নিয়ম কি অনুসরণ করা উচিত নয়?’

ভাষা শহীদরা কিন্তু রক্ত দিয়েছিলেন আমাদের কথা বলার অধিকারের জন্য, আমাদের পরিচয়ের জন্য। তারা কি জানতেন, একদিন তাদের স্মৃতির মিনারের সামনে দাঁড়িয়ে কে কোন দিকে মুখ ফিরিয়ে দোয়া করবে, তা নিয়ে একটা গোটা জাতি দুই ভাগ হয়ে যাবে?

আমি হাসলাম। বললাম, ‘গ্রিক ট্র্যাজেডি ‘‘অ্যান্টিগোনে’’ পড়েছিস? সেখানে অ্যান্টিগোনে তার ভাইয়ের মৃতদেহ সমাহিত করতে চেয়েছিল ‘‘ঐশ্বরিক নিয়ম’’ মেনে। কিন্তু রাজা ক্রিয়ন চাইলেন ‘‘রাষ্ট্রীয় আইন’’ মানতে। আমাদের শহীদ মিনারের এই বিতর্কও অনেকটা সেরকম। প্রধানমন্ত্রী কি ‘‘ধর্মীয় নিয়ম’’ মানবেন নাকি ‘‘রাষ্ট্রীয় প্রথা’’? এই সংঘাত চিরন্তন।’

বাস্তবতা হলো, আমাদের রাজনীতিতে একটা ‘জানুস’ সত্তা কাজ করে। রোমান পুরাণে জানুস হলেন দুই মুখ বিশিষ্ট দেবতা—যার এক মুখ অতীতে, অন্য মুখ ভবিষ্যতের দিকে। বাংলাদেশের এক মুখ অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের দিকে, অন্য মুখ গভীর ধর্মীয় বিশ্বাসের দিকে। সমস্যাটা তখনই বাড়ে যখন রাষ্ট্র বা রাজনীতি কেবল একটি দিকেই তার মুখ স্থির করতে চায়।

মওলানা ভাসানী সেই পঞ্চাশের দশকে ধর্মীয় আর সাংস্কৃতিক চেতনার এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন। কিন্তু সেটি টেকসই হয়নি। সত্তর বা আশির দশকে শহীদ মিনারকে পুরোপুরি একটি ‘সেকুলার আইকন’ হিসেবে দাঁড় করানো হয়। এরপর আবার রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় যখন ‘বাঙালি’র বদলে ‘বাংলাদেশি’ জাতীয়তাবাদ এল, সংবিধানে যুক্ত হলো ‘বিসমিল্লাহ’, তখন থেকে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে ধর্মীয় অনুষঙ্গগুলো আবার গুরুত্ব পেতে শুরু করে। এবারের একুশের প্রথম প্রহরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শহীদ মিনারে কিবলামুখী হয়ে মোনাজাত করে কি জিয়াউর রহমানের জাতীয়তাবাদ ও ইসলামী ধারায় ফিরে যাওয়ার ইঙ্গিত দিলেন?

চায়ের আড্ডা শেষ করে ফেরার পথে ভাবছিলাম, শহীদ মিনার তো শুধুই ইট-সিমেন্টের স্তম্ভ না। এটি আমাদের আত্মপরিচয়ের আয়না। সেই আয়নায় আমরা নিজেদের বাঙালি হিসেবে দেখি। কখনো মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, নৃগোষ্ঠী, সংখ্যাগুরু, সংখ্যালঘু ইত্যাদি হিসেবে দেখি না। কিন্তু যখনই এসব পরিচয়ের মধ্যে ভারসাম্য নষ্ট হয়, তখনই শুরু হয় বিতর্ক।

আসলে আমরা এখনো ঠিক করতে পারিনি, আমরা আগে কোনটা। অথচ ভাষা শহীদরা কিন্তু রক্ত দিয়েছিলেন আমাদের কথা বলার অধিকারের জন্য, আমাদের পরিচয়ের জন্য। তারা কি জানতেন, একদিন তাদের স্মৃতির মিনারের সামনে দাঁড়িয়ে কে কোন দিকে মুখ ফিরিয়ে দোয়া করবে, তা নিয়ে একটা গোটা জাতি দুই ভাগ হয়ে যাবে?

আমরা যদি একই সঙ্গে অসাম্প্রদায়িকতা ও ইসলামী মূল্যবোধ—দুটোকেই ধারণ করতে না পারি, তাহলে এই বিতর্ক আরও বহু ফেব্রুয়ারিতে ফিরে আসবে। আর আমরা প্রতিবারই অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করব, এত ফুল, এত দোয়া—তবু কেন এত বিভাজন!

  • মারুফ ইসলাম: কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক
Ad 300x250

সম্পর্কিত