বিশ্ববিখ্যাত সাময়িকী ‘টাইম ম্যাগাজিন’-এ প্রচ্ছদে ঠাঁই করে নিয়েছিলেন বাংলাদেশের দুই রাজনীতিক। ২০০৬ সালের ১০ এপ্রিল ছাপা হয়েছিল বিএনপির চেয়ারপার্সন ও জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ছবি। আর ২০২৩ সালের ২ নভেম্বর ছাপা হয়েছিল তিনবারের অনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার ছবি।
খালেদা জিয়ার কভার প্রচ্ছদ প্রতিবেদন ছিল ‘রেসকিউ মিশন’ আর শেখ হাসিনার ছিল ‘হার্ড পাওয়ার−প্রাইম মিনিস্টার শেখ হাসিনা অ্যান্ড দ্য ফেট অব ডেমোক্রেসি ইন বাংলাদেশ’। এ দুটো ছবির একটি বলে দেয়−এই দেশ, দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, আঞ্চলিক অখণ্ডতা, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, আইনের শাসন, অর্থনীতি এবং সমতা-ভিত্তিক উন্নয়ন ও সকলকে নিয়ে রাজনীতি কার হাতে নিরাপদ ও সুরক্ষিত ছিল। সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মুত্যুর পর তাঁর স্বপ্নের বাংলাদেশ বির্নিমাণে আপসহীন নেত্রী খালেদা জিয়া সত্যিকারের একজন লড়াকু নেতা হয়ে সমস্ত দেশি-বিদেশি আগ্রাসনবাদী শক্তির বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর ‘আপসহীন চরিত্র’ ও ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি’ উপাধি ছিল যেন একই অঙ্গে দুটি ফুল।
মুক্তিযুদ্ধ, সিপাহী-জনতার বিপ্লব, ‘স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলন ও সবশেষ হাসিনার দানবিক শক্তির বিরুদ্ধে খালেদা জিয়ার আমরণ লড়াই আমাদের মুক্তির বার্তা দিয়েছিল বারবার। স্বাধীনতার পর থেকে আজ অবধি দেশের সকল সংকট ও সমাধানে তাঁর দেশপ্রেমিক দায়িত্বশীল ভূমিকা ছিল জাদুর টোটকা। কী এমন সব জাদুকরি ভূমিকা ছিল খালেদা জিয়ার? রাষ্ট্র যখনই ক্রান্তিকালে পতিত হয় তখনই তাঁকে ‘নিজে’র করে তুলতে হয়?
একাত্তরের ২৫ মার্চ দিবাগত রাত এগারোটার পর পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী একসঙ্গে এদেশের বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্ট থেকে আধুনিক ট্যাংক, সাঁজোয়া যান, যুদ্ধজাহাজ, গানবোট ও যুদ্ধ বিমানে সজ্জিত হয়ে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ ঘোষণা দিয়ে বের হয়। সেই মুহূর্তে খালেদা জিয়া চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে তাঁর অবুঝ দুই শিশুপুত্র নিয়ে একা ছিলেন। কারণ মেজর জিয়াউর রহমানকেও একই সময়ে তাঁর কমান্ডিং বস পাকিস্তানি আর্মি অফিসার লে. কর্নেল জানজুয়া চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর করা পাকিস্তানি অস্ত্রের জাহাজ ‘সোয়াত’ থেকে অস্ত্রশস্ত্র খালাস তদারকি করার জন্য পাঠিয়েছিলেন।
মেজর জিয়া ক্যান্টনমেন্টে ফিরলেন। সব বাঙালি অফিসার ও সৈনিকদের সঙ্গে নিয়ে তাঁর কমান্ডিং অফিসার কর্নেল জানজুয়াকে হত্যা করে পুরো সেনানিবাসের দায়িত্ব নেন। বেগম খালেদা জিয়ার সেই দুঃসাহসী ও প্রাজ্ঞ সিদ্ধান্ত সেদিন জিয়াউর রহমানকে পুরো চট্টগ্রাম সেনানিবাস নিয়ন্ত্রণে সহযোগিতা করেছিল। অতঃপর জিয়াউর রহমান যখন বিদ্রোহ করে কালুরঘাট থেকে বেরিয়ে গেছেন, তখন তিনি একা দুই পুত্র সন্তানকে নিয়ে বেরিয়েছেন ঢাকার উদ্দেশ্যে। তারপর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বেগম খালেদা জিয়াকে শিশুপুত্রসহ জুলাই থেকে ডিসেম্ভর পর্যন্ত দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ মাস ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের কারাগারে আটক রাখে।
স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে বেগম খালেদা জিয়ার সাহস, দৃঢ় মনোবল, ত্যাগ ও লড়াই-সংগ্রামের পর্বগুলো প্রমাণ করে তিনি একজন খাঁটি দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ মহীয়সী নারী ও যোদ্ধা।
২.
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া রাজনৈতিক দল (বিএনপি) দুই দুইবার চরম বিপর্যয়ে পড়ে-একবার জেনারেল এরশাদের হাতে, আরেকবার জেনারেল মইন ইউ আহমদের এক-এগারোর সময়। স্বৈরাচার এরশাদের হাতে দলটি যখন বিপর্যয়ে পরে, খালেদা জিয়া তখন ছিলেন একজন সাদামাটা গৃহিণী, যার সম্বল ছিল সাহস, দৃঢ় মনোবল, ত্যাগ ও লড়াই-সংগ্রামের ইতিহাস। তিনি খুব নিবিড়ভাবে দেখলেন, শহীদ জিয়ার কাছের মানুষগুলোর ভিন্নরূপ, ভিন্ন ভিন্ন মেরুকরণ, দলে ঘাপটি মেরে থাকা মীরজাফরদের দৌড়াদৌড়ি এবং সুচতুর এরশাদের সঙ্গে সাত্তার সাহেবের মাখামাখি।
খালেদা জিয়া ১৯৮২ সালের ১৩ জানুয়ারি একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে দলের হাল ধরেন এবং মাত্র আড়াই বছরের মধ্যে দলের চেয়ারপার্সন হন। এরপর থেকে দলের সাংগঠনিক ভিত্তি তৈরির জন্য থানা ও জেলা কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেন এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় অফিস থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যন্ত পার্টি অফিস চালু করার নির্দেশনা দেন। ফলে দেশজুড়ে শক্ত ভিত রচিত হয় দলের।
অন্যদিকে, ১/১১ সরকারের বিরাজনীতিকরণের ফর্মুলা ‘মাইনাস ২’ কেবল ভেস্তে যায় খালেদা জিয়ার দৃঢ়চিত্ত সংকল্পে। সে সময় দল ভাঙার চক্রান্ত হয়েছিল। এরকম টানাপোড়েনের মধ্যে খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার করে তৎকালীন সরকার। তার আগেই অবশ্য দলের ঐক্য ধরে রাখার জন্য খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেন বিচক্ষণ খালেদা জিয়া।
জেলে ঘটে আর এক হৃদয়বিদারক ঘটনা। তারেক রহমানকে নির্যাতন করে তাঁর মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে দেওয়া হয় এবং আরাফাত রহমান কোকোকে করা হয় মৃত্যুর মুখোমুখি। এরকম অবস্থায় সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে দলের একজন নেতাকে দিয়ে জেলে খালেদা জিয়ার কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়- ‘মাতৃত্ব না নেতৃত্ব’ কোনটি চান? সেদিন খালেদা জিয়া বলেছিলেন, ‘আমি আমার দুই ছেলেকে আল্লাহর জিম্মায় রেখে নেতৃত্বকেই বেছে নিলাম’। সেই চুড়ান্ত সিদ্ধান্তই আজ বিএনপিকে তুলনারহিত সংগঠনে রূপান্তর করেছে।
ইতিহাস সাক্ষী বিএনপি কখনো গণতন্ত্র হত্যাকারী কোনো শক্তিকে স্বাগত বা বৈধতা দেয়নি। জিয়াউর রহমান বাকশালের কারাগার থেকে গণতন্ত্রকে মুক্তি দিয়েছেন। সেই গণতন্ত্র আবার চলে গেল স্বৈরাচার এরশাদের কারাগারে। সেই গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার লড়াইয়ে জোটভুক্ত হয় বিএনপি ও আওয়ামী লীগ এবং স্বৈরাচার এরশাদের পাতানো নির্বাচনে কেউই অংশ নিবে না—এই মর্মে চুক্তিও হয় জোট দুটির ভিতর।
অথচ ১৯৮৬ সালে জোটের সিদ্ধান্ত লঙ্ঘন করে শেখ হাসিনা এরশাদের সঙ্গে সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়। ওই নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় এরশাদ প্রাণ পায় এবং তাঁর অবৈধ ক্ষমতা প্রলম্বিত করার সুযোগও পায়। এরশাদের নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় ১৯৮৭ সালে বেগম খালেদা জিয়াকে ‘আপসহীন দেশনেত্রী’ উপাধি দেওয়া হয়।
এরপর থেকে খালেদা জিয়া ‘এরশাদ হটাও’—এক দফার আন্দোলন শুরু করেন। একটানা নিরলস ও আপসহীন সংগ্রামের পর ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর দেশ স্বৈরাচার মুক্ত হয়, তাঁর হাত ধরেই গণতন্ত্র ফিরে আসে। যার সঙ্গে হাতে হাত রেখে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করলেন, সেই হাসিনা ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে জনগণের ভোট দেওয়ার বা স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়া এখতিয়ারকে চিরতরে বন্ধ করে। আদতে এক দলের মার্কায় ভোট দেওয়ার পরিবেশ তৈরি করে।
এর প্রতিবাদে আপসহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া দেশ, জাতি ও গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলনে সকলকে ঐক্যবদ্ধ করে ঝাপিয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে সরকার খালেদা জিয়াকে গুলশান কার্যালয়ে দীর্ঘ দিন অবরুদ্ধ করে রাখেন। গৃহবন্দি অবস্থায় পানির লাইন ও বিদ্যুৎ বন্ধ করে দেয়। শুধু তা-ই নয় বাইরে থেকে খাবার সরবরাহ বন্ধ করে দেয়।
২৯ ডিসেম্বর বিএনপির আহ্বানে ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ প্রোগ্রামে ঢাকা চলো সমাবেশের ডাক দিলে খালেদা জিয়াকে প্রায় ৭ দিন বাসার সামনে পুলিশ ব্যারিকেড, রাস্তার দুই পাশে বালু ও ইট ভর্তি ট্রাক এবং পুলিশের ভ্যান দিয়ে অবরুদ্ধ করে রাখে।
অন্যদিকে ভারতীয় প্রভাবে এরশাদকে নির্বাচনে অংশগ্রহণে বাধ্য করা হলো। এত কিছুর পরেও দেশ প্রত্যক্ষ করল এক প্রার্থীবিহীন, ভোটারবিহীন প্রহসনের নির্বাচন যেখানে ১৫৩টি আসনে কোনো নির্বাচনই হয়নি। তারই ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালে ঘটে বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাসে এক চরম জালিয়াতি—‘দিনের ভোট রাতে’।
এরপর ১/১১-এর সময়কার করা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ক্যাঙারু কোর্টের রায়ে খালেদা জিয়াকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দিয়ে কারাগারে প্রেরণ করা হয়।
খালেদা জিয়া কারাগারে থেকেই বিভিন্ন মামলার হাজিরা দেন এবং করোনার পুরো সময় বাসভবনে গৃহবন্দি জীবন কাটান। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত বেগম খালেদা জিয়া কারারুদ্ধ ছিলেন। গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার জন্য তিনি জীবনের ২৬টি বছর লড়াই করেছেন।
শেখ হাসিনা বিভিন্ন সময় বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে অপমানসূচক কথা বলেছেন। শহীদ মঈনুল হোসেন রোডের জিয়াউর রহমানের বাড়ি থেকে বেগম জিয়াকে উচ্ছেদ প্রসঙ্গে ২০২২ সালে শেখ হাসিনা বলেন ‘ওই ক্যান্টনমেন্টে আর বসবাস করা লাগবে না। যেদিন সুযোগ পাব বের করে দিব। বের করে দিয়েছি না?’
পদ্মা সেতু উদ্বোধনের আগে শেখ হাসিনা বলেন ‘পদ্মা সেতুতে নিয়ে গিয়ে ওখান থেকে টুস করে নদীতে ফেলে দেওয়া উচিত’। খালেদা জিয়ার লিভারের সমস্যা নিয়ে ব্যঙ্গ করে বলেছেন, ‘ডাক্তার রিপোর্ট দিয়েছে তাঁর নাকি খুবই অবস্থা খারাপ। তার লিভার নাকি পচে শেষ। কী খেলে লিভার তাড়াতাড়ি পচে সেটা তো সবাই জানে এটা আমি মুখ দিয়ে বলতে চাই না’।
সর্বশেষ ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে লন্ডনে এক নাগরিক সংবর্ধনা সভায় হাসিনা বলেছিলেন ‘খালেদা জিয়ার বয়স এখন আশির ওপরে। রোজই শুনি এই মরে-মরে, এই যায়-যায়। এমনিই! সময় হয়ে গেছে, তার মধ্যে অসুস্থ। এখন এত কান্নাকাটি করে লাভ নাই।’ তিনি আরো বলেছিলেন ‘খালেদা জিয়া ‘আরামে-আয়েশে থাকলেও’ মামলার তারিখ পরলেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। আদালতের তারিখ চলে গেলেই তিনি ‘ভালো’ হয়ে যান।’ এমন অশিষ্ট কথার পরও খালেদা জিয়া সহনশীল আচরণ করেছেন।
সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বলতেন ‘ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, আর দলের চেয়ে বড় দেশ’। খালেদা জিয়াও এই উক্তিটি পুনরুল্লেখ করতেন। খালেদা জিয়া আরেকটি কথা বলতেন ‘বিদেশে আমাদের কোনো প্রভু নেই, সবাই আমাদের বন্ধু’। বিএনপি নিয়ে আরেকটি কথা প্রায়ই উচ্চারণ করতেন, ‘আমরা অতি ডানও নই, অতি বামও নই, আমরা মধ্যপন্থী দল।’ ২০১৫ সালের ১ নভেম্বর খালেদা জিয়া বলেছিলেন, ‘দেশের বাইরে আমার কোনো ঠিকানা নেই। এই দেশ, এই দেশের মাটি-মানুষই আমার সব কিছু।’
২০২৫ সালে চিকিৎসার জন্য লন্ডন যাওয়ার আগে তিনি বলেছিলেন ‘কেবল বৃহৎ ঐক্যই আমাদের সম্পদ’। সবশেষ অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে বিএনপির বৈরিতা দেখা মাত্রই তিনি সবাইকে ডেকে জানালেন, বিএনপির কোনো দাবি থাকলে সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে শেষ করতে, কোনো আন্দোলন করা যাবে না। এমনকি ২০২৫ সালের ১৩ জুন ড. ইউনূস ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বৈঠকের মূল কারিগর ছিলেন খালেদা জিয়া।
মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি দুর্যোগকালে এই দেশের জনগণের অধিকার আদায়ে খালেদা জিয়া সব সময় সোচ্চার ছিলেন। এ কারণে দিনশেষে সাফল্যও পেয়েছিলেন। বাংলাদেশ মনে রাখবে তাঁর জাদুকরি ক্ষমতার কথা।
লেখক: অধ্যাপক ও গবেষক, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ