প্রতীক বরাদ্দের পর থেকেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছয়টি সংসদীয় আসনে জমে উঠেছে প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণা। প্রত্যেকে উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি নিয়ে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর ও বিজয়নগর উপজেলা নিয়ে গঠিত ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে এই আসনের ভোটারদের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ৩০ লাখেরও বেশি জনসংখ্যার ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নেই সরকারি মেডিকেল কলেজ। জেলার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট সদর হাসপাতালে প্রতিদিন ভার্তি থাকেন ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ রোগী। প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল ও যন্ত্রপাতির অভাবে বেশিরভাগ রোগীকে রেফার্ড করা হয় ঢাকায়। এ ছাড়া শয্যা না পেয়ে হাসপাতালের মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা নিতে হয় রোগীদের। ব্রাহ্মণবাড়িয়া ছাড়াও পার্শ্ববর্তী হবিগঞ্জের বিভিন্ন স্থান থেকে রোগী আসে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদর হাসপাতালে।
দীর্ঘদিন ধরে জেলায় সরকারি মেডিকেল কলেজ ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের জন্য আন্দোলন করে আসছে সাধারণ শিক্ষার্থী, ছাত্রমৈত্রীসহ নাগরিক সংগঠনগুলো। এ জেলায় কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় না থাকায় উচ্চ শিক্ষার জন্য শিক্ষার্থীদের ঢাকামুখী হতে হচ্ছে। এতে করে ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে উচ্চ শিক্ষাগ্রহণ।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা ছাত্রমৈত্রীর সভাপতি ফাহিম মুনতাসির বলেন, ‘জটিল কোনো রোগের চিকিৎসা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় করা যায় না। রোগীদের ঢাকায় রেফার্ড করা হয়। চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়নে আমরা মেডিকেল কলেজ করার দাবি জানিয়ে আসছি। এছাড়া, অনেক দরিদ্র শিক্ষার্থী অর্থের অভাবে ঢাকায় গিয়ে পড়াশোনা করতে পারছে না। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন জরুরি বলে আমরা মনে করি। আশা করব নতুন জনপ্রতিনিধি নাগরিকদের এ দাবিগুলো পূরণ করবেন।’
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, জেলা শহরের বেশিরভাগ সড়ক ভাঙা। ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ও কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কের ব্রাহ্মণবাড়িয়া অংশ দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়ন কাজ চলছে। তবে ধীরগতির কারণে বিলম্বিত হচ্ছে নির্মাণ কাজ। এতে করে মহাসড়কগুলোতে চলাচলে মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে।
বর্তমানে সড়ক পথে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ঢাকা যেতে সময় লাগে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা। আর ট্রেনে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা। এ অবস্থায় ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন গন্তব্যে যাতায়াতের জন্য ট্রেনের ওপর যাত্রীদের চাপ বাড়ছে।
যাত্রীদের দুর্ভোগ লাঘবে ব্রাহ্মণাবড়িয়া রেলওয়ে স্টেশনে যাত্রাবিরতি করা বিদ্যমান ট্রেনগুলোর আসন সংখ্যা বৃদ্ধি এবং ঢাকা-ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলপথে নতুন একটি ট্রেন চালুর দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করছে জেলা নাগরিক ফোরাম। কয়েক দফায় স্মারকলিপিও দেওয়া হয়েছে রেলপথ মন্ত্রণালয়ে।
বাধন পাল নামে একজন তরুণ ভোটার জানান, ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলওয়ে স্টেশনে এমনিতেই টিকিট সংকট থাকে। তার মধ্যে বেশিরভাগ টিকিট চলে যায় কালোবাজারে। ফলে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ দামে টিকিট কিনতে হয় কালোবাজারিদের কাছ থেকে। এ অবস্থায় যাত্রীদের দুর্ভোগ কমাতে ট্রেনের আসন সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি নতুন ট্রেন চালুর বিষয়ে প্রার্থীদের কাছে জোরালো দাবি জানান তিনি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা নাগরিক ফোরামের সভাপতি পীযূষ কান্তি আচার্য বলেন, ‘বিগত ১০ বছর ধরে আমরা ট্রেনের আসন সংখ্যা বৃদ্ধি, নতুন ট্রেন চালু এবং কয়েকটি ট্রেনের যাত্রাবিরতির জন্য আন্দোলন করে আসছি। এর প্রেক্ষিতে ইতোমধ্যে ঢাকা-সিলেট রুটে চলাচলকারী আন্তঃনগর কালনী এক্সপ্রেস ট্রেনের যাত্রাবিরত দেয়। আমরা চাই নতুন যিনি সংসদ সদস্য হবেন, তিনি আমাদের এই দাবিগুলো পূরণে সচেষ্ট হবেন।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনের ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-এর প্রার্থী গাজী নিয়াজুল করীম বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা সেবার দূরাবস্থার কারণে বেসরকারি হাসপাতালগুলো বিশাল বাণিজ্যে লিপ্ত হয়ে পড়েছে। আমি নির্বাচিত হতে পারলে একটি মেডিকেল কলেজ স্থাপনের বিষয়ে সর্বোচ্চ চেষ্টার পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালগুলোকেও একটি নিয়মের মধ্যে নিয়ে আসব, যেন দরিদ্র রোগীরা সুলভ মূল্যে চিকিৎসা সেবা নিতে পারেন। এছাড়া ঢাকা-ব্রাহ্মণবাড়িয়া রুটে যেন একটি বিশেষ ট্রেন চালু করা যায়, সেই পরিকল্পনাও আমার রয়েছে।’
এ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামল বলেন, জেলাবাসীর প্রধান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে আমার নির্বাচনী ইশতেহার প্রস্তুত করেছি। পৌরশহরের ভাঙাচোরা সড়কগুলোর টেকসই মেরামতসহ মহাসড়কে চলমান উন্নয়ন কাজ দ্রুত শেষ করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব। এছাড়া মেডিকেল কলেজ ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের জন্য ইতোপূর্বে অর্থ উপদেষ্টার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে ডিও লেটার দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনে বিজয়ী হতে পারলে নতুন ট্রেন চালুসহ ভোটারদের দাবিগুলো বাস্তবায়নে সর্বাত্মক চেষ্টা করব।