leadT1ad

প্রচারণায় তারেক-শফিকের দ্বৈরথ এবং ক্ষমতার অলিখিত সমীকরণ

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ২৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১৪: ৪৬
নির্বাচনি জনসভায় ডা. শফিকুর রহমান ও তারেক রহমান। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনকে শুধু ক্ষমতার পালাবদলের আয়োজন ভাবার সুযোগ নেই। এটি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তনের সম্ভাবনার সন্ধিক্ষণ ছিল। যদিও সেসবের অধিকাকাংশ এখন আর আলোচনায় নেই। রাজপথের এককালীন মিত্র বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী এখন নির্বাচনি ময়দানে একে অপরের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। সিলেট থেকে চট্টগ্রাম, উত্তরবঙ্গ থেকে ঢাকা—মাঠপর্যায়ের প্রতিটি জনসভায় তারেক রহমান এবং ডা. শফিকুর রহমানের দেওয়া বক্তব্যগুলো কেবল ভোটারদের মন জয় করার প্রয়াসের সঙ্গে একেকটি রাজনৈতিক বয়ানও বটে। এই দুই নেতার প্রচারণার ধরন, শব্দ চয়ন এবং কৌশলী অবস্থানের গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের নির্বাচনি সংস্কৃতিতে এক নতুন ধরনের স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়েছে।

তারেক রহমানের অবতরণ: ‘মডারেট’ ভাবমূর্তির অন্তরালে ধর্মীয় পপুলিজম

দীর্ঘ নির্বাসন এবং দূরনিয়ন্ত্রিত নেতৃত্বের এক যুগ পেরিয়ে তারেক রহমান ঝটিকা সফরে নামলেন। তাঁর প্রধান লক্ষ্য ছিল বিএনপির রাজনৈতিক ভাষ্যকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করা। তাঁর প্রচারণার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে প্রকাশ্য বিচ্ছেদ। সিলেটের আলিয়া মাদরাসা মাঠে তিনি যখন সরাসরি জামায়াতের রাজনীতিকে ‘আল্লাহর সাথে শিরক’ হিসেবে আখ্যা দিলেন, তখন তা বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এক বড় ধরনের ভূমিকম্পের মতো ছিল।

তারেক রহমান এখানে একটি অত্যন্ত জটিল চাল চেলেছেন। একদিকে তিনি জামায়াতের ধর্মতাত্ত্বিক ভিত্তিকে আঘাত করেছেন। অন্যদিকে নিজেই ‘তাহাজ্জুদ’ পড়ার আহ্বান জানিয়ে এক ধরনের প্রতিযোগিতামূলক ধর্মীয় পপুলিজম তৈরি করেছেন। বাংলাদেশের নির্বাচনি সংস্কৃতিতে জামায়াত সাধারণত ‘ইসলামের পাহারাদার’ হিসেবে নিজেদের তুলে ধরে। তারেক রহমান সেই তকমাটি ছিনিয়ে নিয়ে বিএনপিকে একটি ‘মডারেট কিন্তু ধর্মপ্রাণ’ জাতীয়তাবাদী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন। এই ‘রিব্র্যান্ডিং’-এর উদ্দেশ্য পরিষ্কার—পশ্চিমা বিশ্বের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়া এবং একই সাথে দেশীয় রক্ষণশীল ভোটারদের নিজের বলয়ে ধরে রাখা। তবে এখানে একটি বড় প্রশ্ন থেকে যায়—যে দলের সঙ্গে বিএনপি এক সময় ক্ষমতার ভাগাভাগি করেছে, তাকে আজ ‘দেশবিরোধী’ তকমা দেওয়া কীভাবে তাদের অতীত মিত্রতা ব্যাখ্যা করবে?

ডা. শফিকের ‘উদার’ জামায়াত: রেটোরিক বনাম বাস্তবতা

জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান এবার এক নতুন ধরনের জামায়াতের গল্প শোনাচ্ছেন। কুষ্টিয়া থেকে সিরাজগঞ্জ—প্রতিটি জনসভায় তিনি নারীদের নিরাপত্তা ও মর্যাদার কথা বলছেন। এমনকি কৌতুক করে বলছেন যে, নারীদের ঘরে বন্দি করার জন্য তালা কেনার টাকাও জামায়াতের নেই। এটি একটি অত্যন্ত পরিকল্পিত রাজনৈতিক রেটোরিক। জামায়াতের ওপর দীর্ঘদিনের যে ‘নারী-বিদ্বেষী’ বা ‘কট্টরপন্থী’ তকমা রয়েছে, তা মোচন করতেই এই বয়ান তৈরি করা হয়েছে।

কিন্তু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, জামায়াতের এই ‘উদারতা’ কেবল তাদের প্রচারণার ভাষাতেই সীমাবদ্ধ। নির্বাচনি মনোনয়নের ক্ষেত্রে জামায়াত এবারও কোনো নারীকে প্রার্থী করেনি।

সম্প্রতি কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে জামায়াত আমির জানিয়েছেন, দলের প্রধান (আমির) পদে কোনো নারী কখনো দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন, এটা আল্লাহপ্রদত্ত সৃষ্টিগত পার্থক্যের কারণে সম্ভব নয়।

এটিই প্রমাণ করে যে, তাদের নীতিগত অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসেনি। একে অনেকে ভোটারদের কাছে টানার কৌশল মাত্র মনে করছেন। জামায়াত এখানে ‘জুলাই বিপ্লবের’ আবেগ এবং আবরার ফাহাদের মতো শহীদদের নাম ব্যবহার করে এক ধরনের নৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করছে। ডা. শফিক যখন ধূপখোলা মাঠে দাঁড়িয়ে বিএনপিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘চোর-ডাকাতদের দিয়ে দেশ চোর-ডাকাত মুক্ত করা যায় না’। এই বক্তব্য মূলত বিএনপির গত আমলের ‘দুর্নীতিবাজ’ ইমেজকে ভোটারদের সামনে নতুন করে জীবন্ত করে তুলতে চাইছে।। পরে তারেক রহমান যৌক্তিক পালটা প্রশ্নটি করেছেন। এক দফায় তো বিএনপি সরকারে জামায়াতের দুইজন মন্ত্রী ছিলেন। তারা পদত্যাগ করেননি কেন?

ভাতা বনাম কর্মসংস্থান: পপুলিজমের দুই ভিন্ন মুখ

বাংলাদেশের নির্বাচনে ভোটারদের তুষ্ট করতে ‘উপহার’ বা ‘সুবিধা’ দেওয়ার সংস্কৃতি দীর্ঘদিনের। তারেক রহমান এখানে অত্যন্ত চতুরতার সাথে ‘বেকার ভাতা’ এবং ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর টোপ ফেলেছেন। এটি সাধারণ মানুষের তাৎক্ষণিক চাহিদাকে স্পর্শ করে। তারেক রহমানের এই ‘দাতা রাষ্ট্র’ সুলভ প্রতিশ্রুতি ভোটারদের একটি বড় অংশকে আকৃষ্ট করতে সক্ষম হতে পারে।

এর বিপরীতে ডা. শফিকুর রহমান গাইবান্ধার জনসভায় দাঁড়িয়ে ভাতার এই রাজনীতিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলছেন, ‘জামায়াত কাউকে ভাতার লোভ দেখাবে না, বরং কাজের সুযোগ তৈরি করবে।’ জামায়াতের এই অবস্থান আপাতদৃষ্টিতে অনেক বেশি যৌক্তিক মনে হলেও, এর ভেতরে লুকিয়ে আছে এক গভীর আক্রমণ। জামায়াত বিএনপিকে একটি ‘বিলাসী ও লুটপাটকারী’ দল হিসেবে চিত্রিত করতে চাইছে, যারা কেবল টাকা বিলিয়ে ভোট কিনতে চায়। জামায়াত উত্তরবঙ্গকে ‘কৃষি রাজধানী’ করার যে স্বপ্ন দেখাচ্ছে, তা আঞ্চলিক আবেগকে দারুণভাবে উসকে দিয়েছে। তবে তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে তাদের একক প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। অপরদিকে, বেশ আগেই বিএনপি তিস্তা নিয়ে নদী পারেই এক বিশাল সমাবেশ করে এই বিষয়ে তাদের গুরুত্ব জানান দিয়েছিল।

দিল্লি-পিন্ডি ফ্যাক্টর: জাতীয়তাবাদের এক নতুন ফ্রেম

বাংলাদেশের নির্বাচনে বিদেশি প্রভাব, বিশেষ করে ‘ভারত ফ্যাক্টর’ সব সময় বড় নিয়ামক। তারেক রহমানের সবচেয়ে কার্যকর রাজনৈতিক উদ্ভাবন হলো— ‘দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, সবার আগে বাংলাদেশ’। এই এক স্লোগানে তিনি একসাথে দুই শত্রুকে ঘা দিয়েছেন। তিনি আওয়ামী লীগকে ভারতের ওপর নির্ভরশীল এবং জামায়াতকে পাকিস্তানি ভাবাদর্শের উত্তরাধিকারী হিসেবে চিত্রিত করেছেন। নরসিংদীর জনসভায় তাঁর বক্তব্য— ‘একজন তো দিল্লি ভাইগা গেছে, আরেকজন কিছু হলেই পিণ্ডি চলে যায়’—এই ফ্রেমকে আরও ধারালো করেছে।

এর পাল্টা জবাবে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট এবং কর্নেল অলি আহমদ বিএনপিকেই ‘দিল্লির সেবাদাস’ হিসেবে অভিযুক্ত করেছেন। ডা. শফিকুর রহমান দিল্লিকে হস্তক্ষেপ না করতে বলে যে বিবৃতি দিয়েছেন। হর্ষ বর্ধন শ্রিংলার মন্তব্যের যে প্রতিবাদ তিনি জানিয়েছেন, তা দিয়ে তিনি জাতীয়তাবাদী ভোটারদের বোঝাতে চাইছেন যে, জামায়াতই একমাত্র দল যারা ভারতের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে পারে। এই ‘ভারত-বিদ্বেষী’ বয়ানের প্রতিযোগিতায় কে জিতবে, তার ওপর নির্ভর করছে জাতীয়তাবাদী ভোটব্যাংকের মালিকানা।

গণভোট ও সংস্কার: আজাদি বনাম কৌশলী নীরবতা

১২ ফেব্রুয়ারির গণভোট এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় অমীমাংসিত ইস্যু। জামায়াত একে ‘আজাদি বনাম গোলামি’র লড়াই হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছে। তারা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর আমূল সংস্কার চায় এবং সরাসরি ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারণা চালাচ্ছে। ডা. শফিকের কাছে এই গণভোট হলো জুলাই আন্দোলনের পূর্ণতা পাওয়ার একমাত্র পথ।

অন্যদিকে তারেক রহমান এই ইস্যুতে প্রায় নীরবতা পালন করছেন। বিএনপির ভেতরে ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’ উভয় পক্ষই সক্রিয়। তারেক রহমানের এই কৌশলী মৌনতার পেছনে দুটি কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, তিনি নির্বাচনের সময়সীমা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে চান না। দ্বিতীয়ত, সংস্কারের চেয়ে ক্ষমতাকেই তিনি বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। জামায়াত যখন ‘নতুন বাংলাদেশের’ কথা বলছে, তারেক রহমান তখন ‘পুরানো কিন্তু স্থিতিশীল’ বিএনপির দিকে ভোটারদের আহ্বান জানাচ্ছেন। এই সংস্কার বনাম স্থিতিশীলতার লড়াই এবারের নির্বাচনের ভাগ্য নির্ধারণ করে দিতে পারে।

তথ্যের রাজনীতি ও আশঙ্কার সংস্কৃতি

মাঠপর্যায়ের প্রচারণায় তারেক রহমান আরেকটি কথা বলছেন। তা হলো ‘ডেটা জালিয়াতি’র অভিযোগ। এনআইডি এবং মোবাইল নম্বর সংগ্রহের মাধ্যমে ভোট চুরির যে আশঙ্কা তিনি নারায়ণগঞ্জে তুলে ধরেছেন, তা ছাড়াই ভোটারদের মনে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি করেছে। এটি প্রয়োজনে পরে নির্বাচনের ফলাফলকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে কাজে লাগবে।

অন্যদিকে, জামায়াত মাঠে খেলছে ‘শহীদ কার্ড’ নিয়ে। তারা প্রতিটি সভায় জুলাই আন্দোলনে নিহতদের রক্তকে পুঁজি করে ভোটারদের মনে এক ধরনের ‘নৈতিক ঋণের’ বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে। ডা. শফিকের রেটোরিক হলো—যদি আপনারা জামায়াতকে ভোট না দেন, তবে শহীদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি করা হবে। এই আবেগ বনাম আশঙ্কার লড়াই বাংলাদেশের ভোটারদের জন্য এক চরম মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা।

সব মিলিয়ে

তারেক রহমান ও ডা. শফিকুর রহমানের প্রচারণার এই বিশদ বিশ্লেষণ থেকে এটি স্পষ্ট যে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে শূন্যতা আছে। সেই শূন্যতা পূরণে উভয় দলই মরিয়া। তারেক রহমান বিএনপিকে একটি মডারেট, আধুনিক এবং ব্যক্তিগত ইমেজ-নির্ভর দল হিসেবে গড়ে তুলতে চাইছেন। সেখানে ধর্মের মিশেল থাকলেও উগ্রতা নেই। অন্যদিকে ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে জামায়াত নিজেদের একটি দক্ষ, সুসংগঠিত এবং জুলাই আন্দোলনের প্রকৃত সুফলদাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়।

তারেক রহমানের রাজনীতি যেখানে ‘ভাতা ও ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডিং’ কেন্দ্রিক, ডা. শফিকুর রহমানের রাজনীতি সেখানে ‘কাঠামোগত পরিবর্তন ও ধর্মীয় আবেগ’ কেন্দ্রিক। তবে জামায়াতের মনোনয়ন কৌশলে নারীর অনুপস্থিতি এবং বিএনপির পুরোনো দুর্নীতির ছায়া ভোটারদের মনে সংশয় জিইয়ে রেখেছে। বাংলাদেশের নির্বাচনি সংস্কৃতিতে এই দুই ধারার কোনটি জয়ী হবে, তা কেবল ব্যালট পেপারে নির্ধারিত হবে না। এখানে একইসঙ্গে ভূমিকা রাখবে মানুষের মনের সেই গহীন কোণ যেখানে একাধারে মুক্তি, স্বস্তি এবং দোরগোড়ায় সুবিধার আকাঙ্ক্ষা কাজ করে। ১২ তারিখের নির্বাচনই বলে দেবে—বাংলাদেশ কি নতুন মোড়কে পুরোনো দিনে ফিরবে, নাকি এক অনিশ্চিত কিন্তু আশাবাদী পথে পা বাড়াবে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত