leadT1ad

কে-ড্রামা কেন নারীদের কাছে জনপ্রিয়

বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তা পেয়েছে কোরিয়ান ড্রামা বা কে-ড্রামা। যদিও এই জনপ্রিয়তা নতুন নয়। গবেষণা ও দর্শক-অধ্যয়নে দেখা যায়, আন্তর্জাতিকভাবে কে-ড্রামার ভিউয়ারশিপ বা ফ্যানডমে নারীদের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে বেশি। কিন্তু কেন কে-ড্রামা নারীদের কাছে জনপ্রিয়?

বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তা পেয়েছে কোরিয়ান ড্রামা বা কে-ড্রামা। ছবি: স্ট্রিম গ্রাফিক

কোরিয়ান ড্রামা বা কে-ড্রামার জনপ্রিয়তা দিন দিন বেড়েই চলেছে। যদিও এই জনপ্রিয়তা নতুন নয়। নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে চীন ও এশিয়াজুড়ে দক্ষিণ কোরিয়ার বিনোদন শিল্পের বিস্তার ঘটতে থাকে। এই ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা দেখে বেইজিং ইয়ুথ ডেইলির সাংবাদিকরা ‘কোরিয়ান ওয়েভ’ (বা হ্যালিউ) শব্দদ্বয়ের প্রচলন করেন। এই জনপ্রিয়তা সবচেয়ে বেশি বেড়ে যায় কোভিড-১৯ চলাকালীন সময়ে।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রিপোর্ট এবং স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম-এর ডেটা অনুযায়ী, কে-ড্রামার বড় গ্রাহক হলো নারীরা। দর্শক-ভিত্তিতে নারীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। একাডেমিক গবেষণা ও দর্শক-অধ্যয়নেও দেখা যায়, আন্তর্জাতিকভাবে কে-ড্রামার ভিউয়ারশিপ বা ফ্যানডমে নারীদের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে বেশি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই জনপ্রিয়তার পেছনে যে কারণগুলো আছে তার মধ্যে একটি হলো কে-ড্রামার গল্প বলার ধরন। এটি স্ক্রিনে এমনভাবে দৃশ্যায়ন করা হয় যা ভৌগলিক সীমারেখা ছাপিয়ে বিশ্বের সব অঞ্চলের দর্শকদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করে। বিশেষ করে নারীদের কাছে। নেটফ্লিক্সের মতো স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলোও কে-ড্রামাকে এমন সব দর্শকদের কাছে পৌঁছে দিয়েছে যারা আগে কোনোদিন এগুলো দেখেইনি।

২০২৬ সালে কোন ৯টি কে-ড্রামা আপনার ওয়াচলিস্টে রাখতেই হবে। ছবি: স্ট্রিম গ্রাফিক
২০২৬ সালে কোন ৯টি কে-ড্রামা আপনার ওয়াচলিস্টে রাখতেই হবে। ছবি: স্ট্রিম গ্রাফিক

এই জনপ্রিয়তার মনস্তাত্ত্বিক কারণ খুঁজতে গেলে চলচ্চিত্র ও মিডিয়া তাত্ত্বিকরা একটি বিশেষ থিওরি বা তত্ত্বের কথা বলেন, যার নাম ‘ফিমেল গেজ’ বা নারীর দৃষ্টিভঙ্গি।

লরা মালভে প্রবর্তিত ‘মেইল গেজ’ বলে একটি তত্ত্ব আছে, যেখানে নারীকে সাধারণত পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখানো হয়। কিন্তু কে-ড্রামা চলে ঠিক এর উল্টো পথে। দেখা গেছে, এখানে ‘ফিমেল গেজ’ বা নারীর দৃষ্টিভঙ্গিকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়। কে-ড্রামাতে ক্যামেরা বা গল্পের ফোকাস থাকে নারীর আবেগ, ইচ্ছা ও মানসিক সন্তুষ্টির ওপর।

অর্থাৎ অধিকাংশ নারী জীবনসঙ্গী হিসেবে যেমন পুরুষ কামনা করেন, কে-ড্রামাগুলোতে ঠিক তার প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যায়। এখানে নায়কের সিক্স প্যাক বডির চেয়ে মায়াবী চোখ, পরিপাটি পোশাক কিংবা প্রেমিকার প্রতি মুগ্ধ দৃষ্টির ওপর ক্যামেরা বেশি সময় ধরে ফোকাস করা হয়। একজন নারী তাঁর সঙ্গীর কাছ থেকে যে সম্মান ও মনোযোগ আশা করে, কে-ড্রামা ঠিক সেটিই ভিজ্যুয়ালি তৈরি করে।

দক্ষিণ এশীয় সংস্কৃতিতে অনেক সময় ‘রাফ অ্যান্ড টাফ’ পুরুষদের হিরো হিসেবে দেখানো হয়। যেমন বলিউডের জনপ্রিয় সিনেমা ‘কবির সিং’-এ শহীদ কাপুর কিংবা ‘এনিমেল’ সিনেমায় রণবীর কাপুর অথবা ‘বরবাদ’ বা ‘তুফান’-এর মতো ব্যবসাসফল সিনেমায় শাকিব খানের চরিত্র। যেখানে ভালোবাসা প্রকাশে জোরজবরদস্তি বা আগ্রাসী মনোভাব থাকে।

২০২১ সালে নেটফ্লিক্সে জনপ্রিয় কয়েকটি কে-ড্রামা। নেটফ্লিক্সের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া ছবি
২০২১ সালে নেটফ্লিক্সে জনপ্রিয় কয়েকটি কে-ড্রামা। নেটফ্লিক্সের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া ছবি

কিন্তু কে-ড্রামা এই ধারণাটি সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। সেখানের নায়ক ‘সফট’ বা নমনীয় এবং নায়িকার প্রতি অসম্ভব যত্নশীল। উদহারণ হিসেবে ‘ক্র্যাশ ল্যান্ডিং অন ইউ’-এর ক্যাপ্টেন রি কিংবা ‘স্ট্রং ওম্যান ডো বং সুন’-এর মিন-হিউকের কথা ধরা যাক। তারা শক্তিশালী, কিন্তু তাদের মাচো-ভাব ভালোবাসার পথে প্রকাশ হয় না। প্রেমিকার জন্য রান্না করা, তার চুলের ক্লিপ ঠিক করে দেওয়া কিংবা জুতার ফিতা বেঁধে দেওয়ার মত ছোট ছোট বিষয়গুলো মেয়েদের মন জয় করে নেয়। কল্পনার রাজ্যে ভাসতে ভাসতে মেয়েরা ভাবে, ‘আহা আমাকেও যদি কেউ এভাবে ভালোবাসত!’

বেশিরভাগ কে-ড্রামা ভক্ত মেয়েরা এমন ছেলে পছন্দ করে, যারা সব বিপদ থেকে তাঁদেরকে আগলে রাখবে, ঠিক তেমনি নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করতেও কখনও দ্বিধা করবে না। কে-ড্রামাতেও তাঁরা এমন পুরুষ দেখে, যে কিনা প্রেমিকার সামনে কাঁদতেও লজ্জা পায় না। এই ‘গ্রিন ফ্ল্যাগ’ চরিত্রগুলো মেয়েদের বিশ্বাস করায় যে, পুরুষরাও সংবেদনশীল ও কোমল হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কে-ড্রামার প্রেমের ধরণটিও এই ‘ফিমেল গেজ’ থিওরি দ্বারা প্রভাবিত। দেখা যায়, কে-ড্রামার কাহিনিগুলোতে নারী-পুরুষের অন্তরঙ্গ মেলামেশার বিষয়টিও খুব কম দেখানো হয় বা ক্ষেত্রবিশেষে দেখানোই হয় না। বরং এখানকার রোমান্স হলো ‘স্লো বার্ন’ বা ধীরগতির। চোখের ইশারা, একটু লাজুক হাসি বা হাতের আলতো স্পর্শ; এই সামান্য বিষয়গুলোতেই যে তীব্র ভালোবাসা লুকিয়ে থাকতে পারে, তা কে-ড্রামা খুব নিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলে। এই মানসিক সংযোগ বা ‘ইমোশনাল ইন্টিমেসি’ নারীদের কাছে স্বস্তিদায়ক।

আবার কোরিয়ান ড্রামায় নারীদের দৃষ্টিভঙ্গি ফুটে ওঠার পেছনে যে বিষয়টি কাজ করছে তা হলো, এই ইন্ডাস্ট্রিতে চিত্রনাট্যকারদের অনেকেই নারী এবং অনেক নারীই প্রোডাকশনের কাজে জড়িত আছেন। কোনো কোনো হিসাব অনুযায়ী, ইন্ডাস্ট্রিতে চিত্রনাট্যকারদের প্রায় ৯০ শতাংশই নারী। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রে সকল পরিচালক, লেখক, প্রযোজক ও অন্যান্য প্রোডাকশন স্টাফ মিলিয়ে মাত্র ২৭ শতাংশ নারী। মাই লাভ ফ্রম দ্য স্টার, লিজেন্ড অফ দ্য ব্লু সি, ক্র্যাশ ল্যান্ডিং অন ইউ-এর মত জনপ্রিয় ড্রামার পেছনে কাজ করেছে নারী চিত্রনাট্যকাররা।

কে-ড্রামার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বেশিরভাগ ড্রামাতেই ‘হ্যাপি এন্ডিং’ থাকে। নেটফ্লিক্স থেকে নেওয়া ছবি
কে-ড্রামার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বেশিরভাগ ড্রামাতেই ‘হ্যাপি এন্ডিং’ থাকে। নেটফ্লিক্স থেকে নেওয়া ছবি

এছাড়া আমাদের বাঙালি বা এশীয় সংস্কৃতির সঙ্গে কোরিয়ানদের অনেক সামঞ্জস্যতা আছে। পারিবারিক মূল্যবোধ, বড়দের সম্মান করা এবং সবাই মিলে খাবার টেবিলে খাওয়া—এসবকিছু দেখলে মনেই হবে না আপনি ভিনদেশী কোনো সিরিজ দেখছেন। বরং মনে হবে এটি আপনার পরিবারেরই গল্প।

পাশাপাশি কে-ড্রামাগুলোর সিনেমাটোগ্রাফি এত সুন্দর যে আপনার মনে হবে এই রূপকথার রাজ্যে যেতে পারলে জীবনে আর কোন সমস্যা থাকত না।

কে-ড্রামার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বেশিরভাগ ড্রামাতেই ‘হ্যাপি এন্ডিং’ থাকে যা দর্শকের মনে আশার সঞ্চার করে। বেশিরভাগ ড্রামাগুলোতেই মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাপারে অত্যন্ত জোর দেওয়া হয়। ‘ইটস ওকে টু নট বি ওকে’ বা ‘ডেইলি ডোজ অফ সানশাইন’-এর মতো ড্রামায় ট্রমা বা ডিপ্রেশন থেকে সেরে ওঠার গল্প খুব যত্ন নিয়ে দেখানো হয়। এই ‘হিলিং ড্রামা’গুলো দেখে দর্শকরা অনুভব করেন যে, ‘ভালো না থাকা’টা দোষের কিছু নয়। কারণ নায়িকা মানসিকভাবে যতটাই অসুস্থ হোক না কেন, নায়ক খুব ধৈর্য্য নিয়ে তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনবেই আনবে।

দিনশেষে কে-ড্রামার নিশ্চিত ‘হ্যাপি এন্ডিং’ বা সুখের সমাপ্তি দর্শকদের মনে এক বিশাল স্বস্তি এনে দেয়। বাস্তব পৃথিবীর অনিশ্চয়তার ভিড়ে তারা অন্তত এটুকু নিশ্চিত থাকে যে, ড্রামার শেষে সব বাধা পেরিয়ে নায়ক-নায়িকা ঠিকই এক হয়ে যাবে।

সবমিলে এসব ইতিবাচক অনুভূতি আর স্বপ্ন দেখানোর ক্ষমতাই কে-ড্রামাকে নারীদের কাছে জনপ্রিয় করে তুলেছে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত