আধুনিক প্রযুক্তি আমাদের হাতের মুঠোয় সব সুবিধা এনে দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু কেড়ে নিয়েছে মানুষের সঙ্গে মানুষের এই সহজ মিলনমেলা। হাতে বানানো সেমাই যেভাবে আমাদের পাত থেকে হারিয়ে যাচ্ছে, তাতে মনে হয় একটি সুন্দর ঐতিহ্য নিঃশব্দে আমাদের মাঝ থেকে বিদায় নিচ্ছে।
স্ট্রিম সংবাদদাতা

রমজান মাস এলেই একসময় গ্রামবাংলার বাড়ির উঠোনগুলো এক অন্যরকম উৎসবে মেতে উঠত। দুপুরের কড়া রোদে বাঁশের চাটাই পেতে শুকানো হতো ধবধবে সাদা লম্বা সেমাই। ঘরের ভেতর চলত সেমাই বানানোর ধুম। পিতলের একটা কল বসানো হতো কাঠের পিঁড়ি বা টুলের ওপর। কেউ সেই কলের হ্যান্ডেল ঘোরাত, কেউবা ওপর থেকে ময়দার খামির আঙুল দিয়ে ঠেসে দিত। একেকবার চাপ পড়লে কলের ছোট ছোট ছিদ্র দিয়ে জালের মতো বেরিয়ে আসত সেমাই।
এ দৃশ্য এখন প্রায় অচেনা। হাতে বানানো সেমাই তো দূরের কথা, পিতলের সেই হাতে ঘোরানো মেশিনটিও এখন আর চোখে পড়ে না।
আগেকার দিনে রমজানের আগে বা শীতের শেষদিকে পাড়ায় পাড়ায় শুরু হতো সেমাই তৈরির ধুম। চালের গুঁড়ো বা ময়দা দিয়ে খামির বানানো হতো যত্ন করে। বাড়ির পুরুষরা বসতেন কলের পাশে, হ্যান্ডেল ঘোরানোর দায়িত্ব তাদের। নারীরা খামির তৈরি করে মেশিনের মুখে আঙুল দিয়ে চাপ দিতেন। শিশুরাও পাশে দাঁড়িয়ে দেখত, কেউ কেউ ছোট কাজে হাত লাগাত।
কলের চাপ বাড়লে সূক্ষ্ম জালি দিয়ে বেরিয়ে আসত লম্বা সেমাই। সেগুলো সাবধানে তুলে রোদে শুকাতে দেওয়া হতো। বিকেলের দিকে পুরো উঠোন ভরে যেত সাদা সুতোর মতো সেমাইয়ে।
এই সেমাই দিয়ে রমজানজুড়ে দুধ-নারকেল দুধ-নারকেল মিশিয়ে সুস্বাদু সব রান্না হতো। ঈদের সকালে পুরো বাড়ি মৌ মৌ করত হাতে বানানো সেমাইয়ের গন্ধে। সেই স্বাদে কোনো কৃত্রিমতা ছিল না, ছিল পরিবারের সবার ভালোবাসা আর খাটাখাটনি।
কিন্তু সময় বদলে গেছে। এখন বাজারে গেলেই পাওয়া যায় লাচ্ছা, প্যাকেটজাত লম্বা সেমাইসহ হরেক পদের প্রক্রিয়াজাত পণ্য। মেশিনে তৈরি এসব সেমাই যেমন সস্তা, তেমনি ঝামেলাহীন। তাই পরিশ্রম করে হাতে সেমাই বানানোর সেই ঝক্কি এখন আর কেউ নিতে চায় না।
গ্রামের উঠোনে চাটাই পেতে সেমাই শুকানোর দৃশ্য আজ প্রায় বিলুপ্ত। পিতলের সেই সুন্দর কলগুলো হয়তো এখন কোনো বাড়ির অন্ধকার কোণে পড়ে আছে, অথবা লোহালক্কড়ের দোকানে বিক্রি হয়ে গেছে।
স্কুল শিক্ষক মনসুর নবী তাঁর ছোটবেলার কথা মনে করে খুব আক্ষেপ করলেন। তিনি জানালেন, আগে দুই ধরনের সেমাই দেখা যেত। একটি হাতে বানানো, অন্যটি বাজারের, যেটাকে তারা বলতেন ‘বুম্বাই সেমাই’।

মনসুর নবী জানান, ২০০৭ সালে চট্টগ্রাম শহরের হালিশহর এলাকায় তিনি শেষবারের মতো কাউকে হাতে সেমাই বানিয়ে রোদে শুকাতে দেখেছিলেন। এরপর আর কোথাও এমন দৃশ্য তাঁর চোখে পড়েনি। তাঁর মতে, ‘সেমাই শুধু খাবার ছিল না, এটা ছিল একটা সামাজিক আয়োজন। সবাই মিলে কাজ করার যে আনন্দ, সেটা এখনকার কেনা সেমাইয়ে কোথায়!’
চট্টগ্রাম শহরের বাসিন্দা ফাহিমা বেগমের গল্পটাও একই রকম। তিনি যখন সন্দ্বীপে থাকতেন, তখন প্রতি রমজানেই বাড়িতে সেমাই বানানো হতো। কিন্তু এখন শহরে সেই কলও নেই, জায়গাও নেই, আর সেভাবে মানুষের সময়ও নেই। এমনকি তাঁর সন্তানদেরও হাতে বানানো সেমাইয়ের প্রতি তেমন কোনো আগ্রহ নেই।
হাতে বানানো এই সেমাইয়ের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল আমাদের পারিবারিক বন্ধন আর পাড়াপড়শির সখ্যতা। এক বাড়িতে কল থাকলে পাশের বাড়ির লোকজনও আসত সেমাই বানাতে। কাজের ফাঁকে চলত হাসি-ঠাট্টা আর জম্পেশ আড্ডা।
আধুনিক প্রযুক্তি আমাদের হাতের মুঠোয় সব সুবিধা এনে দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু কেড়ে নিয়েছে মানুষের সঙ্গে মানুষের এই সহজ মিলনমেলা। হাতে বানানো সেমাই যেভাবে আমাদের পাত থেকে হারিয়ে যাচ্ছে, তাতে মনে হয় একটি সুন্দর ঐতিহ্য নিঃশব্দে আমাদের মাঝ থেকে বিদায় নিচ্ছে।

রমজান মাস এলেই একসময় গ্রামবাংলার বাড়ির উঠোনগুলো এক অন্যরকম উৎসবে মেতে উঠত। দুপুরের কড়া রোদে বাঁশের চাটাই পেতে শুকানো হতো ধবধবে সাদা লম্বা সেমাই। ঘরের ভেতর চলত সেমাই বানানোর ধুম। পিতলের একটা কল বসানো হতো কাঠের পিঁড়ি বা টুলের ওপর। কেউ সেই কলের হ্যান্ডেল ঘোরাত, কেউবা ওপর থেকে ময়দার খামির আঙুল দিয়ে ঠেসে দিত। একেকবার চাপ পড়লে কলের ছোট ছোট ছিদ্র দিয়ে জালের মতো বেরিয়ে আসত সেমাই।
এ দৃশ্য এখন প্রায় অচেনা। হাতে বানানো সেমাই তো দূরের কথা, পিতলের সেই হাতে ঘোরানো মেশিনটিও এখন আর চোখে পড়ে না।
আগেকার দিনে রমজানের আগে বা শীতের শেষদিকে পাড়ায় পাড়ায় শুরু হতো সেমাই তৈরির ধুম। চালের গুঁড়ো বা ময়দা দিয়ে খামির বানানো হতো যত্ন করে। বাড়ির পুরুষরা বসতেন কলের পাশে, হ্যান্ডেল ঘোরানোর দায়িত্ব তাদের। নারীরা খামির তৈরি করে মেশিনের মুখে আঙুল দিয়ে চাপ দিতেন। শিশুরাও পাশে দাঁড়িয়ে দেখত, কেউ কেউ ছোট কাজে হাত লাগাত।
কলের চাপ বাড়লে সূক্ষ্ম জালি দিয়ে বেরিয়ে আসত লম্বা সেমাই। সেগুলো সাবধানে তুলে রোদে শুকাতে দেওয়া হতো। বিকেলের দিকে পুরো উঠোন ভরে যেত সাদা সুতোর মতো সেমাইয়ে।
এই সেমাই দিয়ে রমজানজুড়ে দুধ-নারকেল দুধ-নারকেল মিশিয়ে সুস্বাদু সব রান্না হতো। ঈদের সকালে পুরো বাড়ি মৌ মৌ করত হাতে বানানো সেমাইয়ের গন্ধে। সেই স্বাদে কোনো কৃত্রিমতা ছিল না, ছিল পরিবারের সবার ভালোবাসা আর খাটাখাটনি।
কিন্তু সময় বদলে গেছে। এখন বাজারে গেলেই পাওয়া যায় লাচ্ছা, প্যাকেটজাত লম্বা সেমাইসহ হরেক পদের প্রক্রিয়াজাত পণ্য। মেশিনে তৈরি এসব সেমাই যেমন সস্তা, তেমনি ঝামেলাহীন। তাই পরিশ্রম করে হাতে সেমাই বানানোর সেই ঝক্কি এখন আর কেউ নিতে চায় না।
গ্রামের উঠোনে চাটাই পেতে সেমাই শুকানোর দৃশ্য আজ প্রায় বিলুপ্ত। পিতলের সেই সুন্দর কলগুলো হয়তো এখন কোনো বাড়ির অন্ধকার কোণে পড়ে আছে, অথবা লোহালক্কড়ের দোকানে বিক্রি হয়ে গেছে।
স্কুল শিক্ষক মনসুর নবী তাঁর ছোটবেলার কথা মনে করে খুব আক্ষেপ করলেন। তিনি জানালেন, আগে দুই ধরনের সেমাই দেখা যেত। একটি হাতে বানানো, অন্যটি বাজারের, যেটাকে তারা বলতেন ‘বুম্বাই সেমাই’।

মনসুর নবী জানান, ২০০৭ সালে চট্টগ্রাম শহরের হালিশহর এলাকায় তিনি শেষবারের মতো কাউকে হাতে সেমাই বানিয়ে রোদে শুকাতে দেখেছিলেন। এরপর আর কোথাও এমন দৃশ্য তাঁর চোখে পড়েনি। তাঁর মতে, ‘সেমাই শুধু খাবার ছিল না, এটা ছিল একটা সামাজিক আয়োজন। সবাই মিলে কাজ করার যে আনন্দ, সেটা এখনকার কেনা সেমাইয়ে কোথায়!’
চট্টগ্রাম শহরের বাসিন্দা ফাহিমা বেগমের গল্পটাও একই রকম। তিনি যখন সন্দ্বীপে থাকতেন, তখন প্রতি রমজানেই বাড়িতে সেমাই বানানো হতো। কিন্তু এখন শহরে সেই কলও নেই, জায়গাও নেই, আর সেভাবে মানুষের সময়ও নেই। এমনকি তাঁর সন্তানদেরও হাতে বানানো সেমাইয়ের প্রতি তেমন কোনো আগ্রহ নেই।
হাতে বানানো এই সেমাইয়ের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল আমাদের পারিবারিক বন্ধন আর পাড়াপড়শির সখ্যতা। এক বাড়িতে কল থাকলে পাশের বাড়ির লোকজনও আসত সেমাই বানাতে। কাজের ফাঁকে চলত হাসি-ঠাট্টা আর জম্পেশ আড্ডা।
আধুনিক প্রযুক্তি আমাদের হাতের মুঠোয় সব সুবিধা এনে দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু কেড়ে নিয়েছে মানুষের সঙ্গে মানুষের এই সহজ মিলনমেলা। হাতে বানানো সেমাই যেভাবে আমাদের পাত থেকে হারিয়ে যাচ্ছে, তাতে মনে হয় একটি সুন্দর ঐতিহ্য নিঃশব্দে আমাদের মাঝ থেকে বিদায় নিচ্ছে।
.png)

ইন্টারনেটের হাজারো নেতিবাচকতার ভিড়ে প্রাণীদের ‘কিউট’ ভিডিও ছিল এক চিলতে স্বস্তি। কিন্তু এআই-এর যুগে সেই নির্ভেজাল বিশ্বাসে এখন ফাটল ধরেছে। কোনো ভিডিও দেখে হাসার বদলে আমাদের মনে আগে প্রশ্ন জাগছে, এটি কি আসল নাকি এআই দিয়ে তৈরি? অবিশ্বাসের এই ডিজিটাল চোরাবালিতে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন উঠছে, আমাদের ছোট ছোট আনন্দ
১০ ঘণ্টা আগে
সমকালীন বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। জনপ্রিয়তা ও মননশীলতার মেলবন্ধনের দুর্লভ উদাহরণ তিনি। সৃজনশীল ব্যক্তিত্বের পাশাপাশি তিনি একজন কর্মবীর। আজ তিনি সাতাশি বছর পূর্ণ করলেন।
১১ ঘণ্টা আগে
এইতো কিছুদিন আগে কথা। অফিস থেকে বেরিয়ে বিশেষ একটি কাজে শাহবাগের উদ্দেশ্যে রিকশায় উঠেছিলাম। বিকেলের ব্যস্ত ঢাকার চিরচেনা যানজটে রিকশাটি একসময় থেমে গেল। চারপাশে শুধু হর্নের শব্দ, মানুষের কোলাহল আর অসংখ্য গাড়ির সারি। ঠিক সেই মুহূর্তেই কানে ভেসে এলো এক পরিচিত সুর ‘আলো আমার আলো ওগো, আলো ভুবনভরা’…!
১৩ ঘণ্টা আগে
প্রাক-আধুনিক যুগের আদর্শবাদী তারুণ্য থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের টেক-স্যাভি ‘জেন জি’ প্রজন্ম—প্রতিটি যুগের তারুণ্যের রক্তস্রোত প্রমাণ করেছে যে বন্দুকের নল বা রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন দিয়ে মানুষের মুক্তির স্পৃহাকে চিরতরে বন্দি করা যায় না। আর এই প্রতিটি রক্তঝরা লড়াইয়ে নারীর সক্রিয়, সমান্তরাল, আপসহীন ও বীরত্বপূ
১৩ ঘণ্টা আগে