leadT1ad

আল-জাজিরার প্রতিবেদন

ট্রাম্পের হাতে মাদুরো আটক: ইরানের জন্য কি অশনি সংকেত?

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ০৫ জানুয়ারি ২০২৬, ২২: ০৭
গ্রাফিক: তুফায়েল আহমদ

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নেওয়ার খবর বিশ্বজুড়ে ছড়াতে না ছড়াতেই ইরানের দিকে আঙুল তুলেছে ইসরায়েল। দেশটির রাজনীতিক ইয়ার ল্যাপিড সোজা জানিয়ে দিয়েছেন, তেহরান যেন কারাকাসের এই ঘটনার দিকে নজর রাখে। মাত্র এক সপ্তাহ আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছিলেন। তখনই তিনি ইরানের ওপর নতুন করে হামলার হুমকি দিয়েছিলেন, তারপরই ভেনেজুয়েলায় এই ঘটনা। তাই অনেক বিশেষজ্ঞ ভাবছেন, আমেরিকার পরবর্তী লক্ষ্য হতে পারে ইরান।

যদিও ওয়াশিংটনের সঙ্গে কারাকাস ও তেহরানের ঝামেলার কারণ আলাদা এবং পরিস্থিতির ধরনও ভিন্ন। তবু বিশ্লেষকরা বলছেন, মাদুরোর বিরুদ্ধে ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের সম্ভাবন উসকে দিচ্ছে। ন্যাশনাল ইরানিয়ান আমেরিকান কাউন্সিলের (এনআইএসি) প্রেসিডেন্ট জামাল আবদি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, এই নতুন অরাজকতা বিশ্বকে আরও অস্থিতিশীল করবে। যুদ্ধের আশঙ্কা আরও বাড়িয়ে তুলবে।

জামাল আবদির মতে, ট্রাম্প ‘সার্জিক্যাল’ বা ঝটিকা অভিযানের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের প্রেমে পড়েছেন। অথবা তিনি হয়তো নেতানিয়াহুকে এমন কাজের অনুমতি দিয়ে দিয়েছেন। যারা ইরানের সাথে নতুন করে যুদ্ধ বাধাতে চায় তারা এতে জোর পাবে। মাদুরোকে অপহরণের ঘটনা ইরানকেও বিচলিত করতে পারে। ইরান হয়তো এমন কিছু করে বসবে যাতে সামরিক সংঘাত শুরু হয়ে যায়। তারা নিজেদের সামরিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে পারে। অথবা আমেরিকা বা ইসরায়েলের হামলার আগেই তারা পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পারে।

সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির ফেলো নেগার মুর্তজাভিও একই সুরে বলছেন, ভেনেজুয়েলায় আমেরিকার কর্মকাণ্ড ট্রাম্পের চূড়ান্ত আগ্রাসী মনোভাব প্রকাশ করে। এতে কূটনীতির সুযোগ কমে যাচ্ছে। তেহরান ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনায় আগ্রহী নয়। কারণ তারা মনে করে এই প্রশাসন আসলে তাদের পূর্ণ আত্মসমর্পণ চায়। তাই কূটনীতির সুযোগ নেই বললেই চলে। উল্টো সংঘাতের পথ খুলে যাচ্ছে। ইসরায়েল, ইরান আর আমেরিকা এখন সম্ভাব্য সংঘাতের পথেই হাঁটছে।

জামাল আবদিও একই মত দিয়েছেন। এই ঘটনা আমেরিকার উদ্দেশ্য নিয়ে সব সন্দেহ বাড়িয়ে দিচ্ছে। ইরানে যারা বলে আমেরিকার সঙ্গে আলোচনা করে লাভ নেই, তাদের কথাই এখন শক্তিশালী হচ্ছে। তারা মনে করে পারমাণবিক প্রতিরোধ গড়ে তোলাই এখন একমাত্র বাঁচার পথ।

ইরান ও ভেনেজুয়েলার দোস্তি

মাদুরোকে তুলে আনার আগে কয়েকমাস ধরে ট্রাম্প ভেনেজুয়েলা সরকারের বিরুদ্ধে হুমকি দিচ্ছিলেন। মার্কিন কর্মকর্তারা মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদকচক্র চালানোর অভিযোগ এনেছেন। ট্রাম্প ও তার সঙ্গীরা যুক্তি দিচ্ছেন ভেনেজুয়েলার বিশাল তেলের ভান্ডারের ওপর আমেরিকার অধিকার আছে।

মাদুরোর সঙ্গে ইরানের সম্পর্কের প্রসঙ্গ টেনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও অভিযোগ করেছেন, কারাকাস হিজবুল্লাহকে পশ্চিম গোলার্ধে জায়গা করে দিচ্ছে। যদিও এর কোনো প্রমাণ তিনি দেননি।

মাদুরো ইরানের একজন ঘনিষ্ঠ মিত্র। দুই দেশের ওপরই নিষেধাজ্ঞা আছে। তারা নিজেদের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক কয়েক বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যেতে চাইছিল। মাদুরো এখন নেই। সিরিয়ায় বাশার আল আসাদের পতন হয়েছে। লেবাননে হিজবুল্লাহও দুর্বল হয়েছে। তাই ইরানের মিত্রদের তালিকা ছোট হয়ে আসছে।

ইরান সরকার দ্রুত ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হামলার নিন্দা জানিয়েছে। তারা জাতিসংঘকে হস্তক্ষেপ করার ও এই বেআইনি আগ্রাসন থামানোর আহ্বান জানিয়েছে। ইরান বলছে, জাতিসংঘের সদস্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের ওপর আমেরিকার এই সামরিক আগ্রাসন আঞ্চলিক শান্তির লঙ্ঘন। এর ফলে পুরো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে।

হুমকি-পাল্টা হুমকি

শনিবার মার্কো রুবিও বলেছেন মাদুরোর অপহরণ ট্রাম্প যুগে আমেরিকার সব শত্রুর জন্য বার্তা। কিন্তু ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি দমে যাননি। কারাকাসে মার্কিন অভিযানের পর তিনি তার অবস্থানে অনড় থাকার কথা বলেছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি লিখেছেন আমরা শত্রুর কাছে মাথানত করব না। আমরা শত্রুকে হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য করব।

গত সপ্তাহে ট্রাম্প ফ্লোরিডায় নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে তিনি ইরানকে আবার বোমা মারার হুমকি দেন। তিনি বলেন ইরান যদি পরমাণু বা ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি আবার শুরু করে তবে তাদের ধ্বংস করে দেওয়া হবে।

গত জুন মাসে ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছিল। তখন ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ডার ও পরমাণু বিজ্ঞানীরা নিহত হন। শত শত সাধারণ মানুষ মারা যায়। আমেরিকাও সেই হামলায় যোগ দেয়। তারা ইরানের তিনটি প্রধান পরমাণু কেন্দ্রে বোমা মারে। ট্রাম্প দাবি করেন ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। তবে ইরানের শাসন ব্যবস্থা সেই ধকল কাটিয়ে টিকে আছে। তেহরান ইসরায়েলে শত শত রকেট মেরে জবাব দিয়েছে। এর অনেকগুলো আকাশ প্রতিরক্ষা ভেদ করেছিল। যুদ্ধবিরতির আগ মুহূর্ত পর্যন্ত ইরানি বাহিনী গুলি চালিয়ে গেছে।

ভেনেজুয়েলার কায়দায় কি ইরানেও হামলা হবে?

বিশ্লেষকরা বলছেন ইসরায়েলের লক্ষ্য ইরানে সরকার পরিবর্তন করা। ট্রাম্পও এখন সেই পথেই হাঁটছেন। গত শুক্রবার ট্রাম্প জানিয়েছেন, আমেরিকা অস্ত্র নিয়ে প্রস্তুত। ইরান সরকার যদি চলমান বিক্ষোভে কাউকে হত্যা করে তবে আমেরিকা হামলা চালাবে। রোববার তিনি আবারও একই হুমকি দেন।

প্রশ্ন উঠছে আমেরিকা কি ভেনেজুয়েলার স্টাইলে ইরানেও সরকার প্রধানকে সরিয়ে দিতে পারে? এনআইএসি-র জামাল আবদি মনে করিয়ে দেন ইসরায়েল আগেই ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানসহ শীর্ষ নেতাদের হত্যার চেষ্টা করেছে। ট্রাম্প নিজেও বারবার খামেনিকে হত্যার হুমকি দিয়েছেন।

ইরানি কর্মকর্তারা বলেছেন তাদের বিকল্প পরিকল্পনা আছে। নেতাদের হত্যা করলেও তাদের সরকার সহজে পতন হবে না। আবদি বলেন ইরানে এমন 'ধরে নিয়ে আসা' বা 'স্ন্যাচ অ্যান্ড গ্র্যাব' অপারেশন চালানো অনেক কঠিন হবে। কারণ আমেরিকার স্বার্থ ও কর্মীদের ওপর ইরানের পাল্টা আঘাত করার ক্ষমতা আছে।

মাদুরোকে ছাড়াও চলছে ভেনেজুয়েলা

মাদুরোকে সরানোর পরেও ভেনেজুয়েলার সরকার এখনো ভেঙে পড়েনি। অন্তত এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি তেমনই। ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ এখন ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন মাদুরোই এখনো একমাত্র নেতা। তিনি মার্কিন হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন মাদুরোকে অপহরণের পেছনে ইসরায়েলের হাত আছে।

রদ্রিগেজের বক্তব্যের জবাবে ট্রাম্প পালটা হুমকি দিয়েছেন। আটলান্টিক ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছেন, আমেরিকার দাবি না মানলে তাকেও (রদ্রিগেজ) মাদুরোর চেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে। ভেনেজুয়েলা 'চালানো' ও এর তেলের নিয়ন্ত্রণের জন্য ট্রাম্পের পরিকল্পনা এখনো সফল হয়নি। এজন্য আরও সামরিক অভিযানের দরকার হতে পারে।

বিশ্লেষক নেগার মুর্তজাভি মনে করেন, ভেনেজুয়েলার সমস্যা এক আঘাতেই মিটবে না। যদিও ট্রাম্প ঝটিকা অভিযানে বিশ্বাসী। তিনি আইসিস নেতা বাগদাদি ও ইরানি জেনারেল কাসেম সোলেইমানিকে হত্যার উদাহরণ দেন। আমেরিকার সাধারণ মানুষ দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চায় না। ট্রাম্প প্রশাসন সেটা জানে। কিন্তু ট্রাম্প ইতিমধ্যেই ভেনেজুয়েলায় স্থল অভিযান বা 'বুটস অন দ্য গ্রাউন্ড'-এর ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি বলেছেন দরকার হলে সেখানে সেনা পাঠানো হবে। আমরা এই অভিযান বৃথা যেতে দেব না।

তেলের রাজনীতি ও নতুন সমীকরণ

জামাল আবদি মনে করেন ভেনেজুয়েলায় আমেরিকা দীর্ঘমেয়াদি দ্বন্দ্বে জড়ালে ইরানের ওপর যুদ্ধের চাপ কিছুটা কমতে পারে। আমেরিকা সেখানে আটকা পড়লে ইরানে নতুন যুদ্ধ শুরু করার সক্ষমতা হারাবে। ২০০৩ সালে ইরাক দখলের পর ইরানই ছিল আমেরিকার পরবর্তী টার্গেট। কিন্তু ইরাকের পরিস্থিতি আমেরিকার সেই পরিকল্পনা বদলে দিয়েছিল। ট্রাম্প হয়তো এখনই 'মিশন সফল' ঘোষণা করতে চাইবেন না।

তবে কিছু সমালোচক ভিন্ন কথা বলছেন। রিপাবলিকান কংগ্রেসওম্যান মার্জরি টেলর গ্রিন যুক্তি দিয়েছেন মাদুরোকে সরানোর ফলে ভেনেজুয়েলার তেলের নিয়ন্ত্রণ পাওয়া যাবে। এতে ইরানের সাথে যুদ্ধে তেলের বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হতো তা সামাল দেওয়া যাবে। বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল হরমুজ প্রণালী দিয়ে যায়। সর্বাত্মক যুদ্ধ বাধলে ইরান সেই পথ বন্ধ করে দিতে পারে।

জামাল আবদি বলছেন ভেনেজুয়েলার তেল হয়তো তাত্ত্বিকভাবে উপসাগরীয় অঞ্চলের ঘাটতি মেটাতে পারবে। তবে এর জন্য আমেরিকাকে ভেনেজুয়েলায় সবকিছু ঠিকঠাক মতো নিয়ন্ত্রণে নিতে হবে। এখনই সেই সিদ্ধান্তে আসা খুব তাড়াহুড়ো হয়ে যাবে।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা থেকে অনুবাদ করেছেন তুফায়েল আহমদ।

Ad 300x250

সম্পর্কিত